ঢাকার এমবাসি গেমস: খেলতে খেলতে কূটনীতি

কূটনীতির ভাষা সাধারণত বেশ চেনা। বৈঠক, আলোচনা, সমঝোতা, আনুষ্ঠানিকতা, প্রোটোকল। সেখানে প্রতিটি শব্দের ওজন আছে, প্রতিটি অবস্থানের পেছনে থাকে একটি দেশের স্বার্থ।

কিন্তু সেই একই কূটনীতিক যখন হাতে ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেট তুলে নেন কিংবা টেবিল টেনিসের ব্যাট তুলে নেন তখন দৃশ্যটা কিছুটা বদলে যায়। একজন প্রতিপক্ষকে হারাতে হয়, পয়েন্টের জন্য লড়তে হয়, আবার খেলা শেষে সেই প্রতিপক্ষের সঙ্গেই হাত মেলাতে হয়। রাষ্ট্রের অবস্থান তখনও বদলায়নি, কিন্তু মানুষ দুজন হয়তো একে অন্যকে একটু অন্যভাবে চিনে ফেলেছেন। 

সারা বিশ্বে যখন যুদ্ধের দামামা বাজছে, একটি দেশ আরেকটি দেশকে বোমা মেরে পরাহত করতে চাইছে, তখন ঢাকায় দুদিন ধরে চললো দেশগুলোর মধ্যে এক মিষ্টিমধুর যুদ্ধ। এই যুদ্ধে রক্তক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই কিন্তু জয় পরাজয় আছে। কিন্তু সেই জয় কিংবা পরাজয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার মত একটা মধুর ব্যাপারও আছে।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকা-তে (আইএসডি) ২৮ ও ২৯এ অগাস্ট অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় এমবাসি ইনডোর গেমসের গল্পটা ঠিক তাই। শুধু চারটি ক্রীড়া বিভাগের চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণের গল্প নয়। এর আরেকটি গল্প আছে, কূটনীতির আনুষ্ঠানিক পরিসরের বাইরে মানুষে মানুষে যোগাযোগ তৈরির।

ক্রীড়ার মাধ্যমে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগ, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এই দুই দিনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ২৬টি কূটনৈতিক মিশন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রায় ১২০ জন প্রতিনিধি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এবং গেম প্লে লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায় শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১০টায় উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের আয়োজন। উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খালিলুর রহমান।

টেবিল টেনিস একক, টেবিল টেনিস দ্বৈত, ব্যাডমিন্টন দ্বৈত এবং ব্যাডমিন্টন মিশ্র দ্বৈত, এই চার বিভাগে চলে প্রতিযোগিতা।

কিন্তু আয়োজকদের কাছে প্রতিযোগিতার ফলাফলই শেষ কথা ছিলো না।

‘আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের বাইরে’ একটি জায়গা

প্রতিযোগিতার শেষ দিন শনিবার পুরস্কার বিতরণ করতে এসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কবিষয়ক সচিব ড. নজরুল ইসলাম আলাপ’কে বলেন, “স্পোর্টসের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে একটা ইনফরমাল কমিউনিকেশন চ্যানেল প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে আমরা একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি, চিনতে পারি এবং সম্পর্ক গড়ে ওঠে।”

কূটনীতিকদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে নির্দিষ্ট প্রটোকল ও কাঠামো মেনে চলতে হয়। আলোচনার বিষয়ও থাকে নির্ধারিত। কোর্টে সেই কাঠামো অনেকটাই আলাদা।

ড. নজরুল ইসলামের ভাষায়, আনুষ্ঠানিক আলোচনায় কর্মকর্তারা একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ও প্রোটোকল মেনে চলেন। কিন্তু খেলার কোর্টে সেই কাঠামোর বাইরে বসা, কথা বলা এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়।

কূটনৈতিক যোগাযোগে এমন অনানুষ্ঠানিক পরিসরের গুরুত্ব নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে কূটনীতিকদের নিয়ে রিট্রিট আয়োজনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানেও আনুষ্ঠানিক আলোচনার বাইরে সম্পর্ক তৈরির সুযোগ থাকে। এমবাসি ইনডোর গেমসেরও তেমন একটি পরিসর তৈরি করছে। 

“তবে এবার আলোচনার টেবিলের বদলে হাতে র‍্যাকেট", বলেন ড. ইসলাম।

আর এই সম্পর্কের মূল্য ভবিষ্যতেও থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

কোনো দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে তৈরি হওয়া ভালো সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে সহযোগিতা, যোগাযোগ কিংবা ক্রীড়া বিনিময়ের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এক দেশের দল অন্য দেশে যেতে পারে, আবার অন্য দেশের দল বাংলাদেশে আসতে পারে। অর্থাৎ একটি ব্যাডমিন্টন ম্যাচের পরিচয় কখনো কখনো ক্রীড়াঙ্গনের বাইরেও যোগাযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।

খেলাধুলা সত্যিই রাজনীতির বাইরে?

রাজনীতি যেখানে এক পাশে, খেলা যেখানে আলাদা

এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিলো ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের একই কোর্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা।

আমরা প্রায়ই বলি, ‘স্পোর্টস রাজনীতির ঊর্ধ্বে’। খেলার মাঠে একজন খেলোয়াড়ের পরিচয় তার দেশের রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে যে সে খেলোয়াড়, প্রতিপক্ষ এবং একই সঙ্গে একজন মানুষ। কিন্তু এমবাসি ইনডোর গেমসর কোর্টে দাঁড়িয়ে এই কথাটার মধ্যেই যেন একটি অন্যরকম প্রশ্ন তৈরি হয়।

কারণ একই কোর্টে খেলছেন এমন সব দেশের প্রতিনিধিরা, যাদের নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক সবসময় একই রকম নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মতপার্থক্য কিংবা সংঘাতের বাইরে কয়েক ঘণ্টার জন্য তারা দাঁড়াচ্ছেন একই নিয়মের অধীনে, কখনো প্রতিপক্ষ হিসেবে, কখনো সতীর্থ হিসেবে।

তাহলে কি খেলাধুলা সত্যিই রাজনীতির বাইরে?

হয়তো পুরোপুরি নয়। বরং খেলাধুলা রাজনীতিকে অস্বীকার না করেও তার বাইরে একটি আলাদা জায়গা তৈরি করতে পারে, যেখানে মতপার্থক্য থাকলেও যোগাযোগ বন্ধ হয় না।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান সবসময় এক নয়। কিন্তু আইওএমের প্রতিনিধি ও এবারের ব্যাডমিন্টন দ্বৈতের চ্যাম্পিয়ন সোহেল বড়ুয়া মনে করেন, খেলাধুলা সেই পার্থক্যগুলোকে অস্বীকার না করেও মানুষকে একটি ভিন্ন জায়গায় দাঁড় করাতে পারে।

“আমাদের রাজনৈতিক আদর্শ যার যার জায়গায় আছে। কিন্তু স্পোর্টসের জায়গাটা হচ্ছে একটা আলাদা জায়গা। এখানে আমরা আমাদের নিজেদের অবস্থান আলাদা রেখে একসঙ্গে থাকতে পারছি।”

এবারের এমবাসি ইনডোর গেমসের অংশ নিয়ে সোহেল নিজেও সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কয়েকজন অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে তার একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।

“তারা আমাদের অ্যাপ্রিশিয়েট করেছে, আমাদের সাপোর্ট করেছে। আমরা এখানে একটা ভালো বন্ডিং তৈরি করতে পেরেছি এবং তারা সবসময় আমাদের পাশে ছিলো।”

তার কাছে সেটিই ছিলো এই আয়োজনের একটি ‘মিনিংফুল ইন্টারঅ্যাকশন', কারণ এমন একটি যোগাযোগ, যা হয়তো অন্য কোনো জায়গায়, অন্য কোনো পরিস্থিতিতে এই মানুষগুলোর সঙ্গে তৈরি করা সম্ভব হতো না। 

অর্থাৎ, খেলায় প্রতিপক্ষ হওয়া আর ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রতিপক্ষ হয়ে থাকা এক জিনিস নয়।

খেলার কোর্টে দুজনের লক্ষ্য হয়তো একটাই, জেতা। কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার পর সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় তৈরি হতে পারে পরিচয়, বন্ধুত্ব কিংবা ভবিষ্যতের যোগাযোগ।

সোহেলের কথায়, “এখানে আমরা সবাই একসঙ্গে খেলছি, একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছি। ফলে একটা আলাদা ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়।”

প্রতিযোগিতার বাইরেও যেখানে থাকে ‘পুরো অভিজ্ঞতা’

এই অভিজ্ঞতা শুধু বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের জন্য নয়। ইন্দোনেশিয়ার রানারআপ নূরের কাছেও এমবাসি ইনডোর গেমসের ছিলো প্রতিযোগিতার চেয়ে বড় কিছু।

তার জন্য এই আয়োজনের গুরুত্ব শুধু কে জিতল বা কে হারল, সেখানে নয়। বরং ভিন্ন দেশ ও ভিন্ন পটভূমির মানুষের সঙ্গে একই জায়গায় দেখা হওয়া, কথা বলা এবং একে অপরকে জানার মধ্যেই রয়েছে এর আসল মূল্য।

“এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো অভিজ্ঞতা, ভিন্ন পটভূমির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং একে অপরকে জানার সুযোগ।”

ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেওয়াটাকেও তিনি দেখছেন নিজের দেশের পরিচয় তুলে ধরার একটি সুযোগ হিসেবে।

“নিজেদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে আমরা একই সঙ্গে আমাদের দেশকেও তুলে ধরছি।”

এখানেই খেলাধুলার আরেকটি দিক সামনে আসে, সফট পাওয়ার। কূটনীতিকরা বৈঠকের টেবিলে নিজেদের দেশের অবস্থান তুলে ধরেন, আর খেলার কোর্টে কখনো কখনো তুলে ধরেন নিজেদের দেশের সংস্কৃতি, সক্ষমতা ও মানুষের পরিচয়।

নূরের কাছে দুই ধরনের প্রতিনিধিত্বের পার্থক্যটাও স্পষ্ট। অফিস বা আনুষ্ঠানিক বৈঠকে যোগাযোগের ধরন নির্ধারিত থাকে, সেখানে একটি নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে চলতে হয়। কিন্তু ক্রীড়া আয়োজনের পরিবেশ অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ।

“এই ধরনের পরিবেশ অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বচ্ছন্দ। এখানে আমরা মানুষের সঙ্গে অন্যভাবে যোগাযোগ করতে পারি।”

অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিক কূটনীতিতে যেখানে একজন ব্যক্তি প্রথমে নিজের দেশের প্রতিনিধি, কোর্টে সেখানে সেই পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি হয়ে ওঠেন একজন খেলোয়াড়ও, যার সঙ্গে অন্য দেশের একজন খেলোয়াড়ের প্রতিযোগিতা হতে পারে, আবার বন্ধুত্বও তৈরি হতে পারে।

স্পোর্টস কি রাজনীতির ঊর্ধ্বে?

খেলার মাঠে রাজনীতি না থাকলেও, সেই মাঠ থেকে তৈরি হওয়া সম্পর্কের প্রভাব যে রাজনীতির বাইরেই থাকবে, এমন নয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মনে করেন, আজ খেলার মাঠে তৈরি হওয়া একটি পরিচয় ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত যোগাযোগ ও সহযোগিতার পথ তৈরি করতে পারে।

“এখন যে সম্পর্কটা তৈরি হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আমাদের আরও ভালোভাবে সহযোগিতা করতে পারে। অনেক সময় সেই দেশের টিম আমাদের দেশে আসতে চাইতে পারে, আবার আমাদের টিমও তাদের দেশে যেতে পারে। এই যোগাযোগটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

“সারা বিশ্বে যখন যুদ্ধ হচ্ছে, তখন এক জায়গায় কূটনীতিকরা একসঙ্গে খেলতে আসছেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ”, বলেন পররাষ্ট্রসচিব ড. নজরুল ইসলাম।

এই কথাটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়। উক্রেইন বা ইরানের মতো জায়গায় যখন সংঘাত চলছে, তখন কূটনীতিকরা একদিকে যুদ্ধ ও সংকট মোকাবিলায় আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করছেন, অন্যদিকে মানুষের স্বাভাবিক জীবনও থেমে থাকে না। বিনোদন থাকে, সংস্কৃতি থাকে, খেলাধুলাও থাকে।

সেই বাস্তবতার মধ্যেই ঢাকার এই আয়োজন একটি ভিন্ন বার্তা দেয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও যোগাযোগের সব দরজা বন্ধ হয় না। একই কোর্টে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের খেলতে দেখা সেই সম্ভাবনাটিই সামনে আনে।

রাশিয়া, চীন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা একই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন।

পিং-পংয়ের শিক্ষা

খেলাধুলা যে আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরেও যোগাযোগের দরজা খুলতে পারে, তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ‘পিং-পং ডিপ্লোমেসি’। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো শুধু এই নয় যে টেবিল টেনিস দুই দেশের সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করেছিলো। বরং শিক্ষা হলো, কূটনীতি কখনো কখনো শুরু হতে পারে এমন একটি জায়গা থেকে, যেটিকে প্রথম দেখায় কূটনীতি বলেই মনে হয় না।

১৯৭১ সালে জাপানে বিশ্ব টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে চীন ও মার্কিন খেলোয়াড়দের মধ্যে তৈরি হওয়া যোগাযোগ এবং পরবর্তী পারস্পরিক সফর দুই দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক দূরত্বের মধ্যে একটি নতুন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল তৈরি করেছিলো। সেই যোগাযোগ পরে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগের পথ আরও সহজ করার একটি প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে ওঠে। পরের বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় বড় অগ্রগতি আসে।

যদিও ঢাকার এমবাসি ইনডোর গেমসকে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সমতুল্য কোনো উদ্যোগ বলা হচ্ছে না। এখানকার পরিসরও অনেক ছোট, উদ্দেশ্যও ভিন্ন। কিন্তু ধারণাগত একটি মিল আছে, মানুষকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে আসা, যেখানে রাষ্ট্রীয় অবস্থানের আগে তারা একে অন্যের সঙ্গে মানুষ হিসেবে যোগাযোগ করতে পারে। 

কূটনীতির জন্য নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম

সহ আয়োজক প্রতিষ্ঠান গেম প্লে’র চেয়ারম্যান ফয়সাল তিতুমীরের কাছে এমবাসি ইনডোর গেমসের গুরুত্ব শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

“স্পোর্টস ডিপ্লোমেসি একটা নেগোশিয়েটিং টুল হতে পারে। শুধু দুই দেশের এমবাসির মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের বাইরে, একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করাই আমরা চেষ্টা করছি।”

এই আয়োজনের বিশেষত্ব আরও স্পষ্ট হয় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর বৈচিত্র্যে। রাশিয়া, চীন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা একই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যাদের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন, তারাই এখানে একই কোর্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন ফয়সাল তিতুমীর।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উদাহরণ টেনে ফয়সাল মনে করেন, রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ থাকলেও খেলাধুলা মানুষের মধ্যে যোগাযোগের জায়গা তৈরি করতে পারে।

যাদের হয়তো অন্য কোথাও দেখা হতো না

এই অনানুষ্ঠানিকতার মূল্য সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় আয়োজনের ভেন্যু আইএসডি’র পরিচালক মাইক মিলারের কথায়।

তার কাছে খেলাধুলা একা নয়, মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমানোর ক্ষমতা আছে সংগীত ও শিল্পেরও। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি কিংবা ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার মানুষকে একই জায়গায় এনে এই মাধ্যমগুলো এমন একটি যোগাযোগ তৈরি করতে পারে, যা অনেক সময় কথার মাধ্যমেও সম্ভব হয় না।

খেলা শেষ হয়ে যায়, গান থেমে যায়, প্রদর্শনীও একসময় শেষ হয়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া পরিচয় থেকে যেতে পারে।

আর এমবাসি ইনডোর গেমসের সবচেয়ে বড় অর্জনও সম্ভবত সেখানেই, এমন কিছু মানুষকে একই জায়গায় নিয়ে আসা, যাদের অন্য কোনো পরিস্থিতিতে হয়তো দেখা হওয়ার সুযোগই হতো না।

“আমি মনে করি, এই ইভেন্ট ছাড়া অন্য কোথাও তাদের সঙ্গে দেখা হওয়া খুব, খুব কঠিন হতো,” বলেন মাইক মিলার।

তার চোখে, এই আয়োজন শুধু প্রতিযোগিতার জায়গা নয়, বরং বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধন তৈরির একটি সুযোগ। তার বিশ্বাস, খেলাধুলা, সংগীত ও শিল্প এসব মানুষকে একত্র করে, বিভক্ত করে না।

এই ভাবনাটিই এমবাসি ইনডোর গেমসের মূল দর্শনের সঙ্গে মিলে যায়। কারণ এখানে জেতা-হারার হিসাব আছে ঠিকই, কিন্তু তার বাইরেও আছে একই কোর্টে দাঁড়ানো, একই গ্যালারিতে বসা, একসঙ্গে ছবি তোলা, গল্প করা এবং একে অপরকে একটু কাছ থেকে চেনার সুযোগ।

একটি প্রতিযোগিতা হয়তো একজনকে চ্যাম্পিয়ন বানায়। কিন্তু একটি ভালো আয়োজন তার চেয়েও বেশি কিছু করতে পারে, মানুষের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করতে পারে।

আজ যারা একই কোর্টে খেললেন, কাল তাদের কেউ হয়তো কোনো আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে বসবেন। তখন হয়তো মনে পড়বে না কে সেই ম্যাচে কত পয়েন্ট পেয়েছিলো। মনে থাকতে পারে শুধু, একদিন তারা একই কোর্টে দাঁড়িয়েছিলেন, একসঙ্গে খেলেছিলেন, কথা বলেছিলেন।

সেখানেই হয়তো স্পোর্টস ডিপ্লোমেসির আসল শক্তি। এটি সবসময় বড় কোনো চুক্তি তৈরি করে না, রাতারাতি কোনো রাজনৈতিক দূরত্বও কমিয়ে দেয় না। বরং ধীরে ধীরে তৈরি করে পরিচয়, আস্থা ও যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্ক, যার প্রয়োজন হতে পারে ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে।

কূটনীতিতে সব সম্পর্ক কোনো চুক্তি দিয়ে শুরু হয় না। কখনো শুরুটা হতে পারে একটি পরিচয় থেকে, একটি কথোপকথন থেকে অথবা একটি ব্যাডমিন্টন ম্যাচ থেকে।