২০২৬ বিশ্বকাপ জিতলে লিওনেল মেসি কি শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবেন?

গত দুই দশক ধরে ফুটবলপ্রেমী, বিশ্লেষক আর সাধারণ দর্শক— সবার কাছে একটা প্রশ্ন ভীষণ কমন, ‘মেসি কি সর্বকালের সেরা?’ এখন উত্তরটা অনেকের কাছেই পরিষ্কার। আপনার কাছে যদি তা না হয়, তাহলে পালটা প্রশ্ন আসতেই পারে, আর কী করতে হবে মেসিকে?

দ্বিতীয় বিশ্বকাপ? যদি ফাইনালে গোল করেন অথবা হ্যাট্রিক? তখন কী বিশ্বাস করবেন? কিন্তু আপনি তার আগেও বা কীভাবে অস্বীকার করবেন! সর্বশেষ ইংল্যান্ড ম্যাচটার কথাই ধরুন। মেসি গোল করেননি, হয়তো আপনার তখন মনে হবে মেসি বোধ হয় বন্দি হয়ে গেছেন কোথাও। কিন্তু…তার দুইটা অ্যাসিস্ট ভাগ্য বদলে দিয়েছে পরে এই ম্যাচের। সব ম্যাচেই কোথাও না কোথাও একটা কিছু ঠিকই খুঁজে নেওয়ার এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতাটা আর কার আছে!.

এই বিশ্বকাপের আগে অনেক কথা হয়েছে বড় তারকাদের ভালো খেলা নিয়ে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো পারেননি। কিন্তু কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হলান্ড, ভিনিসিয়ুস, হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহাম— সবাই তাদের দলের জন্য এগিয়ে এসেছেন। তারকারা যেমন করেন আর কী।  

কিন্তু দিনশেষে তারা কেউই এখন বিশ্বকাপে নেই, দলকে ফাইনাল অবধি নিয়ে আসতে পারেননি। যখন দরকার ছিল, কেউই অবিশ্বাস্য কিছু করতে পারেননি। যিনি পেরেছেন, তিনিই সর্বকালের সেরার তর্কে ছিলেন, আছেন, হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবেন। তবু আপনি মানতে চাইছেন না? 

২০২২ বিশ্বকাপের আগে আপনার দলে ছিলেন আরও অনেকে। ক্যারিয়ারজুড়ে মেসি গোলের পর গোল করেছেন, লিগ জিতেছেন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগও …কিন্তু বিশ্বকাপ! তা না জিতলে কেউ এই তর্কেই আসতে পারবে না যেন, ব্যাপারটা তখনও ছিল এমন। 

অবশেষে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে সব হিসাব বদলে যায়। গনজালো মন্তিয়েলের নেওয়া পেনাল্টি শটটি যখন ফ্রান্সের জাল ছুঁল, তখন পৃথিবী কেবল একটা ফুটবল ম্যাচ জয় দেখেনি; তৈরি হয়েছিল একটা রূপকথারও। 

মেসির এই বিশ্বকাপ জয়ের আসল গুরুত্ব বুঝতে হলে তাঁকে যে দীর্ঘ মানসিক যন্ত্রণা আর ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়েছে, তা জানাটাও জরুরি। বহু বছর ধরে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মেসির ক্যারিয়ার ছিল একটা ট্র্যাজিক সিনেমা। 

খুব অল্প বয়সে বার্সেলোনায় চলে যাওয়ায় অনেকেই তাকে ‘আর্জেন্টাইনের চেয়ে কাতালান বেশি’ বলে খোঁচা দিতেন। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে একের পর এক ট্রফি জিতলেও, জাতীয় দলের হয়ে তার ক্যারিয়ার ছিল শুধুই বুকভাঙা কষ্টের।

২০১৪ বিশ্বকাপে রিও ডি জেনিরোতে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে ট্রফির একদম কাছ দিয়ে মেসির হেঁটে যাওয়ার সেই দৃশ্যটা মনে থাকার কথা সবার। কোপা আমেরিকার ফাইনালে টানা হারের পর ২০১৬ সালে অভিমানে মেসি বিদায় বলে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলকেই। খোদ ডিয়েগো ম্যারাডোনাও ঘোষণা দিয়েছিলেন, ও কখনো নেতা হতে পারবে না!

কিন্তু মেসির গল্পের পূর্ণতাটাও এখানেই— তিনি দমে যাননি। ২০২২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে অপ্রত্যাশিত হার থেকে শুরু করে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল পর্যন্ত— মেসি একজন লড়াকু যোদ্ধার মতো খেলে গেছেন। 

আর্জেন্টিনায় ফুটবল খেলা মানেই ছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার এক অদৃশ্য দেবতারূপী ছায়ার মুখোমুখি হওয়া। দশকের পর দশক ধরে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সকে সে দেশে একটা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের মতো দেখা হতো। 

ম্যারাডোনা কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিদ্রোহী নায়ক। মেসি যত ব্যালন ডি’অর-ই জিতুন না কেন, আর্জেন্টাইনদের ভাবনাটা ছিল সহজ, “সে তো ডিয়েগোর মতো বিশ্বকাপ জেতেনি।” 

২০২২ সালে মেসি কেবল ম্যারাডোনার সেই কীর্তিই স্পর্শই করেননি, নিজের জন্য একটা নতুন ইতিহাসও লিখেছেন। গ্রুপ পর্ব, শেষ ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালে গোল করেছেন। ম্যারাডোনার তেজ ছিল তীব্র কিন্তু সংক্ষিপ্ত, মেসি তার দুই দশকের অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতার সঙ্গে জয় করেছেন বিশ্ব। আর এভাবেই তিনি ম্যারাডোনার ছায়া থেকে বের হয়ে ফুটবলের চূড়ায় একা আসন নিয়েছেন।

এসব বিতর্কে সাধারণত ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু মেসির বিশ্বকাপ জয় ছিল একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। ২০২২ সালের আগে ‘মেসি বনাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’ দ্বৈরথটি ছিল এই প্রজন্মের ফুটবল আলোচনার মূল প্রাণ। একদিকে মেসির সহজাত, জাদুকরী প্রতিভা; অন্যদিকে রোনালদোর কঠোর পরিশ্রম ও অবিশ্বাস্য গোল করার ক্ষমতা।

বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে মেসি এই দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষ অধ্যায়টি নিজের নামে লিখে নিয়েছেন। তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যে ট্রফিটি কখনো ছুঁতে পারেননি, মেসি টুর্নামেন্টের সেরা তারকা হয়ে সেটি নিজের করেছেন।

৪০টিরও বেশি শিরোপা, ৮টি ব্যালন ডি’অর, গোল-অ্যাসিস্টের সব রেকর্ড নিজের ঝুলিতে পুরে মেসির ক্যারিয়ার এখন প্রায় নিখুঁত। এখন আর তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার কোনো যুক্তিই বাকি নেই। এই বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য সেই পথচলায় নতুন একটা অধ্যায়ই যোগ হয়েছে কেবল।

ভবিষ্যতে হয়তো অনেকেই অনেক গোল করবেন বা বড় বড় ট্রফি জিতবেন। কিন্তু ফুটবল শৈলী, নিখুঁত ফিনিশিং ও দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অনন্য ধারাবাহিকতার পর এমন এক রূপকথার মতো শেষ অধ্যায়— এমনটা আর কখনোই দেখা যাবে না।

৩৯ বছর বয়সে এসে আরেকটা বিশ্বকাপ জিতলে, হয়তো সব বিতর্ক শেষ হয়ে যাবে সেখানেই!