মাঠে গোল, মাঠের বাইরে বিলিয়নিয়ার: মেসির সাফল্যের নতুন অধ্যায়

মেসির মোট সম্পদের পরিমাণ এখন প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বে এখন পর্যন্ত মাত্র চারজন খেলোয়াড় বিলিয়নিয়ার হতে পেরেছেন। অন্য তিনজন হলেন আমেরিকান বাস্কেটবল খেলোয়াড় লেব্রন জেমস, আমেরিকান গলফার টাইগার উডস ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

ফুটবল মাঠে নিজে পায়ের জাদুতে দুই দশকেরও বেশি সময় বিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছেন লিওনেল মেসি। মাঠের নৈপুন্যকে ছাপিয়ে মেসি এখন বিশ্বের বিলিয়নিয়ার খেলোয়াড়দের ক্লাবেও নাম লেখালেন।

ফোর্বসের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ইন্টার মায়ামির এই আর্জেন্টাইন তারকার মোট সম্পদের পরিমাণ এখন প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বে এখন পর্যন্ত মাত্র চারজন খেলোয়াড় বিলিয়নিয়ার হতে পেরেছেন। অন্য তিনজন হলেন আমেরিকান বাস্কেটবল খেলোয়াড় লেব্রন জেমস, আমেরিকান গলফার টাইগার উডস ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

তবে প্রশ্ন আসতেই পারে, অর্থের এই সাম্রাজ্য কি হঠাৎ ধরা দিয়েছে মেসির হাতে? নাকি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন সম্পদ।

মেসি দুই দশক ধরে শুধু খেলছেন না। পাশাপাশি করছেন বিজ্ঞাপন, ব্যবসা এবং বিনিয়োগ। এসব থেকেই হয়ে উঠলেন একজন বিলিয়নিয়ার। 

বিলিয়নিয়ার হওয়ার সূচনা

২০০৪ সালে ফুটবলে অভিষেকের পর থেকেই মেসির ক্যারিয়ার ছিলো ঊর্ধ্বমুখী।

ফোর্বাসের সর্বোচ্চ আয় করা তালিকায় ২০০৮ সালেই জায়গা করে নেন লিওনেল মেসি। ওই সময় তার বার্ষিক আয় ছিলো প্রায় ১১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। এরপর প্রতি বছরই আয়ের অংক বাড়তে থাকে।

বার্সেলোনায় ১৭ বছর কাটানোর পর তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া খেলোয়াড়দের একজন হয়ে ওঠেন।

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল মুন্ডোর প্রতিবেদন বলছে, শুধু ২০১৭-১৮ মৌসুমেই মেসি প্রায় ১৭৭ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিলেন। পরে পিএসজিতে দুই মৌসুম খেলে ২০২৩ সালে ক্লাব ছাড়ার সময় মোট আয় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। 

ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়েও কমেনি আয়

পিএসজির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মেসির সামনে ছিলো নতুন ক্লাব বেছে নেওয়ার বড় সিদ্ধান্ত। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর সৌদি আরব থেকে রেকর্ড অংকের প্রস্তাব থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পথ বেছে নেন।

সৌদি আরবের একটি ক্লাব থেকে বছরে প্রায় ৪০ কোটি ডলারের প্রস্তাব পেয়েছিলেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ক্লাব ইন্টার মায়ামিতেই যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

অনেকে মনে করেছিলেন, এতে হয়তো তার আয় কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টো। ইন্টার মায়ামিতে মেসির বার্ষিক বেতন ২৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার। তবে মেসির আয় শুধু বেতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

অ্যাডিডাস ও অ্যাপলের সঙ্গে করা বাণিজ্যিক চুক্তি থেকেও তিনি আয় করেন। এসব থেকে বছরে তার মোট আয় দাঁড়ায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার।

এছাড়াও ইন্টার মায়ামির সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী ভবিষ্যতে এই ক্লাবের মালিকানার অংশ কিনতে পারবেন মেসি। তিনি ক্লাবে যোগ দেওয়ার আগে ইন্টার মায়ামির বাজারমূল্য ছিলো প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার। 

বর্তমানে সেই মূল্য বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে ক্লাবটির মূল্য যতো বেড়েছে, ততই বেড়েছে মেসির সম্ভাব্য সম্পদের মূল্যও। 

বিজ্ঞাপন, ব্যবসা ও বিনিয়োগ থেকে আয় 

মেসির সম্পদের বড় একটি অংশ এসেছে মাঠের বাইরের আয় থেকে। ২০১৭ সালে অ্যাডিডাসের সঙ্গে করা আজীবন অংশীদারত্বের চুক্তি এখনও তার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সম্পদের উৎস।

এছাড়াও মাস্টারকার্ড, লেইস চিপস, মিকোলেব আল্ট্রাসহ এক ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ড চুক্তি রয়েছে।

ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর টেকজায়ান্ট অ্যাপল এবং স্পোর্টস ই-কমার্স ও মার্চেন্ডাইজ ব্র্যান্ড ফ্যানাটিকসের সঙ্গেও আলাদা চুক্তি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশন এবং অফিসিয়াল মার্চেন্ডাইজ বিক্রি থেকেও তিনি আয় করেন।

শুধু বিজ্ঞাপনেই থেমে থাকেননি মেসি। স্পেনে তার ‘এডিফিসিও রোস্টোভার সোসিমি’ নামে একটি রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট রয়েছে।

এছাড়া মেসির বিনিয়োগের তালিকায় রয়েছে ‘মিআইএম হোটেলস’ নামের একটি বিলাসবহুল বুটিক হোটেল চেইন। স্পেন ও আন্দোরার বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় এর একাধিক হোটেল রয়েছে।

গত বছর লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে মিলে তিনি উরুগুয়ের ‘দেপোর্তিভো এলএসএম’ নামে একটি ফুটবল ক্লাবও প্রতিষ্ঠা করেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে দুটি ফুটবল ক্লাবের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত তিনি।

২০২৫ সালে ইন্টার মায়ামিকে প্রথমবারের মতো এমএলএস কাপ জেতানোর পর ক্লাবটির বাণিজ্যিক মূল্য আরও বেড়ে যায়। মাঠের সাফল্যও তাই তার ব্যবসায়িক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।

মেসি কি এখন রোনালদোর চেয়েও ধনী

মেসির সম্পদের পরিমাণ এখনো রোনালদোকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তবে দুজনের ব্যবধান খুব বেশি না।

কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব বলছে, রোনালদোর বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। সৌদি আরবের আল নাসরে তার বিশাল অংকের বেতন তাকে এগিয়ে রেখেছে।

অন্যদিকে, মেসির বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। তবে তার অর্জনের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অংকের সৌদি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েও তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, ব্যবসা এবং নিজের বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের মূল্য কাজে লাগিয়ে বিলিয়নিয়ারের কাতারে পৌঁছেছেন।

ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ডেভিড বেকহ্যামও সম্প্রতি বিলিয়নিয়ার হয়েছেন। তবে তিনি এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন অবসরের ১৩ বছর পর। সেদিক থেকে মেসি ভিন্ন। অবসর জীবনে নয়, খেলোয়াড় জীবনে থাকতেই হয়েছেন বিলিয়নিয়ার। ইতিহাসে এমন খেলোয়াড় আছেন চারজন।

বর্তমানে মেসি আর্জেন্টিনার পঞ্চম ধনী ব্যক্তি। ফুটবল ইতিহাসে মেসির নাম আগেই লেখা হয়েছিলো সোনার অক্ষরে। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি পরিচয়। তিনি শুধু সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারই নন, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী খেলোয়াড়দেরও একজন।