মুভি রিভিউ

স্রোতের বিপরীতে নারীপ্রধান ছবি ‘প্রেশার কুকার’

‘বড়দের’ জন্য রায়হান রাফীর নতুন ছবি প্রেশার কুকার । ‘মেয়েদের সব দোষ’ নিজের গড়া এই বৃত্ত ভাঙ্গার এক সাহসী ছবি প্রেশার কুকার । আর রাফীর নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক ছবিও প্রেশার কুকার

পরাণ, সুড়ঙ্গ, তুফানতাণ্ডব-কে মনে করিয়ে দিয়ে নারীময় এক ছবি। নাচ, গান, মারপিট ছাড়াও যে নারী সংগ্রামের সাবলীল গল্প বলা যায় তেমনই এক ছবি। সামাজিক জাঁতাকলে নারীরা যেখানে প্রেশার কুকারে সিদ্ধ হয়, সেখানে নির্বাচনের প্রতীকও প্রেশার কুকার

সব ছাড়িয়ে বাবা-মা থেকে দূরে থাকা এক শিশুর অন্তঃহীন কষ্টের এক ছবি। প্রেম, প্রতারণা, ক্রোধ, কাম কিংবা পুলিশি রাষ্ট্রের এক অন্যরকম গল্পও প্রেশার কুকার

চার নারীর জীবন সংগ্রামের এক সমান্তরাল গল্প আছে এই ছবিতে। বিশ্বাস আর সংসারে স্বামীর প্রতারণা পাওয়া এক পিকুর মা বেঁচে থাকার জন্য কাজ নেয় মাসাজ পার্লারে। সেই পার্লারে রাজনীতিবিদ যেমন আসে, আসে ব্যবসায়ী কিংবা পুলিশও। পিকুর মা যেমন এই ছবিতে ক্রমশ ‘পাখি’ হয়ে ওঠে ঠিক তেমনি বড় ব্যবসায়ী কিংবা রাজনীতিবিদ, এমনকি পুলিশ কীভাবে পেতে চায় পাখিকে সেটা নিয়েই এই ছবির গল্প বিন্যাস।

সবকিছুর আড়ালে দূরগ্রামের এক মাদ্রাসায় পড়া ছোট পিকুর সব হারানোর গল্প যেন এই ছবির ডিটেইলিংয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ছবির শুরু আর শেষটা তাই এমন। দিগন্ত বিস্তৃত এক সরিষা ক্ষেতে পিকু তার কালো বোরকা পরা অগনিত মাকে যেন দেখতে পায়। অসংখ্য কর্মজীবী নারীর জীবন বাস্তবতা এমনই।

শুধু রেশমার পাখি হয়ে ওঠার গল্পটা থাকলেও ছবির গড়ন ক্ষুণ্ন হতো না।

প্রেশার কুকার ছবির প্রথম ও শেষ দৃশ্য পরিচালক তারেক মাসুদের কথা মনে করিয়ে দেয়। রায়হান রাফী তার এই ছবিটি উৎসর্গ করেছেন পরিচালক তারেক মাসুদ ও শহীদুল ইসলাম খোকনকে। মাসাজ পার্লার নিয়ে ছবি করা এখনও এদেশে সাহসের বিষয়। 

ছবিতে ভিন্টেজের ব্যবহার আছে কালার প্লেটে। এনাফরমিক আর ওয়াইড লেন্সে গল্পের ডিটেইলিং করেছেন পরিচালক। ওয়ান টেক এর কিছু দৃষ্টিনন্দন শট দেখা যায় ছবিতে।

রেশমা থেকে পাখি হয়ে ওঠার গল্পটাই আসল। মনে রাখার মতো অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি। এছাড়া ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুজ্জামান সেলিম, গাজী রাকায়েত, শবনম বুবলি, মারিয়া শান্ত, স্নিন্ধা চৌধুরী ভালো অভিনয় করেছেন। 

ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুজ্জামান সেলিম, গাজী রাকায়েত এর সাথে রিজভী রিজুও সমান তালে অভিনয় করেছেন। রিজুর জন্য শুভকামনা রইলো।

ছবির গল্প রায়হান রাফীর। তবে চিত্রনাট্য লিখেছেন সিয়াম শামস তুষ্ট, মেহেদী হাসান মুন এবং রাফী মিলে। চিত্রগ্রাহক জোয়াহের মুসাব্বিরও মনে রাখার মতো কাজ করেছেন। 

একশ বাহাত্তর মিনিটের এই ছবির প্রযোজক রায়হান রাফী এবং ফরিদুর রেজা সাগর, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও কানন ফিল্মস। একুশ বছর পর ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ঈদ উৎসবে নতুন সিনেমা নিয়ে আসলো প্রেক্ষাগৃহে।

প্রেশার কুকার ছবিটাকে রায়হান রাফী পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন পরাণ: দ্য লাভ, এই অংশে কিন্তু অনন্যা আছে যিনিপরাণেও ছিলেন। বাবা শহীদুজ্জামান সেলিম। 

আছে সুড়ঙ্গ: দ্য বিট্রেয়াল, যেখানে বিট্রেয়ার বা বিশ্বাসঘাতক হলেন চঞ্চল চৌধুরী। বাধ্য হয়ে যে মেয়েরা এমন পথ বেছে নেয় সেখানে বিশ্বাসঘাতক হয় সাধারণত স্বামী, প্রেমিক কিংবা সৎ মা। 

আছে তুফান: দ্য রাইজ, যেখানে এই ছবির চরিত্রগুলো বদলায়। আছে তাণ্ডব: দ্য কেওস, ফজলুর রহমান বাবু এখানে নির্মম। একইসাথে অভিনয়ে অসাধারণ। সবশেষে প্রেশার কুকার: দ্য কার্মা, যে অংশে ছবি শেষ।

একুশ বছর পর ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ঈদ উৎসবে নতুন সিনেমা নিয়ে আসলো প্রেক্ষাগৃহে।

ছবির সঙ্গীত পরিচালক অদিত রহমান। ‘মন ক্ষয়ে ক্ষয়ে’ ছবির গানটি লিখেছেন তন্ময় পারভেজ এবং সুর করেছেন আরাফাত মহসীন নিধি এবং গেয়েছেন মিথুন চক্র ও মাহদীন সাকিব। ‘বড়াই করে’ গানটি লিখেছেন ও গেয়েছেন অংকন কুমার। খালি গলায় পুরনো ও জনপ্রিয় একটা গান আছে এই ছবিতে যার শিরোনাম ‘ভালোবেসে ঠাঁই দিও চরণে।’

তবে এই ছবি দৈর্ঘ্যে আরও কম হতে পারতো। শুধু রেশমার পাখি হয়ে ওঠার গল্পটা থাকলেও ছবির গড়ন ক্ষুণ্ন হতো না। বড়লোক ব্যবসায়ী কিংবা লাইভ করা মেয়ের চরিত্র বাড়তি মেদ মনে হয়েছে।

জীবনের রঙ দেখাতে অন্ধকার বা ফোকাস কম রাখা হয়েছে নাকি সমস্যা ছিল সেসব এই আলোচনায় না থাক। মারপিট, আইটেম সং, নায়ক-নায়িকার যে গল্প প্রচলিত ছবিতে দেখি আমরা, তার বাইরে বড়দের জন্য নারীপ্রধান গল্পের এই ছবি ভিন্নধারার ইঙ্গিত দেয়। বড়দের ছবি। সতুরাং শিশুদের প্রেক্ষাগৃহে না আনার কথাটা প্রচারণায় রাখা যেতো।

এই ছবির প্রযোজক রায়হান রাফী ও ফরিদুর রেজা সাগর। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার দেওয়ার সাহস সবার থাকে না। গড়ে উঠুক আমাদের চলচ্চিত্রের আলাদা ভাষা। রায়হান রাফীর জন্য নিরন্তর শুভকামনা।

 জয় হোক বাংলা ছবির!