এক মুহূর্তের গণ্ডগোল। আর তাতেই বিপাকে লাখো মানুষ। থমকে গেলো ব্যবসা। এমনকি ব্যাহত হলো আদালতের অনলাইন শুনানিও।
টেক জায়ান্ট গুগল ক্লাউডের একটি ডেটা সেন্টারে ক্ষণিকের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে থমকে গেলো একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সেবা কার্যক্রম।
ঘটনা যুক্তরাজ্যে। গুগল ক্লাউডের একটি ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎসংক্রান্ত সমস্যায় ফের সামনে আনলো আধুনিক ডিজিটাল দুনিয়ার দুর্বলতা।
অ্যাকাউন্টের অর্থ থাকা পরও কেনাকাটার বিল দিতে পারছিলো না সাধারণ মানুষ। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ভার্চ্যুয়াল আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া। সরবরাহ ব্যবস্থার অচলাবস্থার জন্য ক্ষতির মুখে পড়েছিল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
প্রতিদিনকার ব্যাংকিং অ্যাপ, অনলাইন সেবা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর যে নির্ভরতা, তার অনেকগুলোই চলে হাতেগোনা কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোয়। এই ব্যবস্থায় সামান্য ত্রুটি কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তারই প্রমাণ যুক্তরাজ্যের এই ঘটনা।
একটি ডেটা সেন্টারের কারিগরি ত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যত হাতে গোনা কয়েকটি ক্লাউড প্রোভাইডারের অবকাঠামোর ওপর কতটা এককভাবে নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি, বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং টেকনোলজি বিষয়ক পোর্টাল দ্য রেজিস্টারের প্রতিবেদনগুলো বলছে, লন্ডনে থাকা গুগল ক্লাউডের ডেটা সেন্টার রিজিয়ন ‘ইউরোপ ওয়েস্ট টু’ এর একটি সাবজোনে আচমকা বিদ্যুৎবিভ্রাট হয়।
এতে বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারের কানেক্টিভিটি নেটওয়ার্ক আকস্মিক থমকে যায়। যুক্তরাজ্যের দৈনন্দিন নাগরিক ও আর্থিক সেবা কার্যত থমকে যায়।
দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল ব্যাংক ‘রেভোলুট’, ঐতিহ্যবাহী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপ’ (যার অন্তর্ভুক্ত লয়েডস ব্যাংক, হ্যালিফ্যাক্স ও ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড) এবং ‘এইচএসবিসি’ ব্যাংকের অনলাইন লেনদেন সেবা দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ ছিলো।
বিদেশে থাকা ব্যবহারকারীরাও ব্যবহার করতে পারেননি এসব সেবা। বিল পরিশোধ করতে না পারা, অনলাইন ফান্ড ট্রান্সফার আটকে যাওয়া এমনকি আবাসন খাতের বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন করতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েন।
আউটেজ ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ডাউনডিটেক্টর’-এ কয়েক হাজার গ্রাহক মুহূর্তের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা বিপর্যয়ের রিপোর্ট করেন। রেভোলুট কর্তৃপক্ষ পরে গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ থাকার আশ্বাস দিয়ে বিবৃতিতে দুঃখ প্রকাশ করে।
শুধু ব্যাংকিং নয়, সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামোতেও প্রভাব পড়ে। যুক্তরাজ্যের ‘দ্য এইচএম কোর্টস অ্যান্ড ট্রাইব্যুনালস সার্ভিস’ জানায়, ভার্চুয়াল শুনানির কাজে ব্যবহার করা ভিডিও প্ল্যাটফর্ম অচল হয়ে পড়েছিল।
জাতীয় ডাকসেবা ‘রয়্যাল মেইল’ এবং অন্যতম শীর্ষ কুরিয়ার সেবা ‘ডিপিডি’র পার্সেল ট্র্যাকিং ও বুকিং সিস্টেম বিকল ছিল।
লন্ডনের জনপ্রিয় ই-বাইক সেবা ‘ফরেস্ট’ সাময়িকভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাজা ফলমূল ও পচনশীল পণ্য সরবরাহকারী ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ থমকে যাওয়ায় তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
ঘটনার পর গুগল ক্লাউডের সার্ভিস হেলথ ড্যাশবোর্ডে একের পর এক ‘পাওয়ার আপডেট’ দেওয়া হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গুগল ক্লাউডের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স জানায়, থার্ড পার্টি ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তৈরি হওয়া নেটওয়ার্ক ত্রুটি সমাধান করা সম্ভব হয়েছে।
গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে গুগল জানিয়েছে, তারা খুব দ্রুত এই ঘটনার বিস্তারিত প্রযুক্তিগত কারণ ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করবে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি সাময়িক ডেটা সেন্টার বিপর্যয় নয়, বরং আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা তুলে ধরেছে।
ডিজিটাল দুনিয়া মূলত তিনটি প্রধান ক্লাউড প্রোভাইডার, আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস, মাইক্রোসফট অ্যাজিউর এবং গুগল ক্লাউডের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল।
যুক্তরাজ্যের বেয়েস বিজনেস স্কুলের গবেষণা ডিন প্রফেসর ফেং লি বলেন, "গুগল ক্লাউডের এই বিভ্রাট স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিলো যে আমাদের পুরো অর্থনীতি কীভাবে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি টেক ডেটা সেন্টারের ওপর জিম্মি হয়ে আছে। এগুলো যতই শক্তিশালী হোক না কেন, এসবে ত্রুটি হলে তা বড় বিপর্যয় এনে দিতে পারে।”
২০২৫ সালে আমাজন ওয়েব সার্ভিসের সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টারে বিভ্রাটের কারণে বিশ্বের হাজার হাজার ওয়েবসাইট ও ব্যাংক অচল হয়ে পড়েছিল।
একের পর এক শীর্ষ ক্লাউড জায়ান্টদের এমন বড় ধরনের বিভ্রাট বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যাকআপ ডেটা স্ট্র্যাটেজি এবং মাল্টিক্লাউড প্রসেসিং অনুসরণের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে নিয়ে এলো।