ভোটের আর মাত্র দুই দিন বাকি। স্লোভাকিয়ায় তখন নির্বাচনী প্রচারণা প্রায় শেষ পর্যায়ে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে। ভোটারদের সামনে প্রার্থীদের নানা প্রতিশ্রুতি, অভিযোগ আর পালটা অভিযোগ।
এর মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লো একটি অডিও রেকর্ডিং। শোনা গেল, বিরোধী দল প্রগ্রেসিভ স্লোভাকিয়ার নেতা মিখাল শিমেচকা এবং দেশটির সাংবাদিক মোনিকা টোডোভা নির্বাচনে কারচুপি ও ভোট কেনাবেচা নিয়ে কথা বলছেন।
অডিওটি শুনলে সেটিকে সত্যি বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু সমস্যা ছিলো অন্য জায়গায়।
এটি ছিলো এআই দিয়ে তৈরি একটি 'ডিপফেইক'।
রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিভিল সোসাইটি ও ফ্যাক্ট-চেকাররা দ্রুত অডিওটিকে ডিপফেক হিসেবে শনাক্ত করেন। কিন্তু এর মধ্যেই সেটি টেলিগ্রাম, ইন্সটাগ্রাম, টিকটক, ফেইসবুক ও ইউটিউবে-এ ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত এটি পুরো নির্বাচনী প্রচারণার সবচেয়ে ভাইরাল পোস্টে পরিণত হয়।
ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে।
একটি অডিও যে ভুয়া, তা প্রমাণ হতে হয়তো কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু তার আগেই যদি হাজার হাজার মানুষ সেটি শুনে ফেলেন, তাহলে প্রার্থী সম্পর্কে তাদের মনে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়ে যেতে পারে।
এখন ভাবুন, এআই দিয়ে শুধু একটি অডিও নয়, যদি একই সময়ে হাজার হাজার ভুয়া অডিও, ছবি, ভিডিও বা পোস্ট তৈরি করা যায়?
তখন বিষয়টি শুধু কোনটা আসল আর কোনটা ভুয়া, সেটুকুতে আটকে থাকে না। তখন আরও বড় প্রশ্ন সামনে আসে। তা হলো, ভোট দেওয়ার আগে ভোটার যে তথ্যগুলো দেখে ও শোনে, এআই কি সেই তথ্যের মাধ্যমে ভোটারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে?
গণতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভে আঘাত
এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক অপতথ্য যে শুধু একটি ভুয়া ছবি, ভিডিও বা অডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, স্লোভাকিয়ার নির্বাচনের ঘটনাটি তার একটি উদাহরণ। নির্বাচনের ঠিক আগে বিরোধী দল প্রগ্রেসিভ স্লোভাকিয়ার নেতা মিখাল শিমেচকার নামে দুটি ভুয়া অডিও ছড়িয়ে পড়ে। একটিতে তাকে বিয়ারের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিতে এবং অন্যটিতে রোমা সংখ্যালঘুদের ভোট কিনে নির্বাচনে কারচুপির পরিকল্পনা করতে শোনা যায়। বাস্তবে তিনি এমন কোনো কথা বলেননি। অডিও দুটি ছিলো এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেইক।
অডিও দুটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও, এগুলোর কারণে কতজন ভোটার সিদ্ধান্ত বদলেছেন বা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি দেখিয়েছে, নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কোনো ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়লে সেটি যাচাই হওয়ার আগেই অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক কনটেন্ট মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
সারা ক্রেপস ও ডাগ ক্রাইনারের একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজারের বেশি রাজ্য আইনপ্রণেতার কাছে ৩২ হাজারের বেশি ইমেইল পাঠানো হয়। কিছু ইমেইল মানুষ লিখেছিলেন, আর কিছু জিপিটি-৩ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো। দেখা যায়, দুই ধরনের ইমেইলের জবাব পাওয়ার হার প্রায় একই ছিলো।
অর্থাৎ, শুধু লেখার ধরন দেখে সবসময় বোঝা নাও যেতে পারে সেটি মানুষ লিখেছে, নাকি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
এর মানে এই নয় যে মানুষ এআই দিয়ে তৈরি যেকোনো রাজনৈতিক লেখা দেখলেই তা বিশ্বাস করবে। বরং গবেষণা এটা বলছে যে, এআই মানুষের কাছে সহজে বিশ্বাসযোগ্য হয় এমন রাজনৈতিক কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। আর এআই-এর কারণে এই ধরনের কনটেন্ট খুব দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়াও সম্ভব।
এখানেই গণতন্ত্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ঝুঁকি তৈরি হয়। রেপ্রেজেন্টেশন বা প্রতিনিধিত্ব, অ্যাকাউন্টেবিলিটি বা জবাবদিহিতা এবং ট্রাস্ট বা আস্থা।
গবেষক সারা ক্রেপস ও ডগ ক্রাইনার তাদের জার্নাল অব ডেমোক্রেসি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই তিনটি ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন।
প্রথমত, জনপ্রতিনিধি সত্যিই জনগনগনের কথা শুনছেন কিনা।
গণতন্ত্রে একজন জনপ্রতিনিধির জন্য তার এলাকার মানুষের চাহিদা এবং মতামত জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু জনগনের জায়গায় যদি এআই দিয়ে মানুষের মতো করে বার্তা বা ইমেইল তৈরি করে পাঠানো হয়, তাহলেই তৈরি হবে সমস্যা। একজন জনপ্রতিনিধি হয়তো ভাবতে পারেন, কোনো একটি বিষয়ে তার এলাকার মানুষ প্রতিবাদ করছেন বা সমর্থন জানাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই মানুষগুলোর অনেকেই হয়তো কোনো বার্তাই পাঠাননি, হয়তো তা পাঠনো হয়েছে এআই দিয়ে তৈরি করে।
অর্থাৎ, এআই দিয়ে বানানো বার্তা দেখে জনপ্রতিনিধির পক্ষে বোঝা কঠিন হতে পারে যে এসব আসলেই তার এলাকার জনগনের আসল চাহিদা কি না।
দ্বিতীয়ত, ভোটার কীসের ভিত্তিতে নেতাদের বিচার করবেন?
গণতন্ত্রে ভোটাররা শুধু একজন নেতাকে নির্বাচিত করেন না; আগের কাজও দেখেন। একজন নেতা আগে কী করেছেন, কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তার কাজের ফল কী হয়েছে, এসব দেখে মানুষ পরবর্তী নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণ করেন।
কিন্তু যদি এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও বা লেখা সেই তথ্যের জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একজন ভোটার এমন কোনো ঘটনা সত্যি বলে বিশ্বাস করতে পারেন, যা আসলে ঘটেইনি।
ফলে একজন ভোটার যে তথ্যের ভিত্তিতে একজন নেতার কাজের বিচার করছেন, সেই তথ্যই যদি ভুল হয়, তাহলে ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির যে ব্যবস্থা থাকার কথা, সেটি দুর্বল হতে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, মানুষ যদি সত্য তথ্যও বিশ্বাস না করে?
এআই-এর সমস্যা শুধু মানুষকে মিথ্যা কথা বিশ্বাস করানো নয়। আরও বড় সমস্যা হতে পারে মানুষ যদি শেষ পর্যন্ত কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা, সেটাই বুঝতে না পারে।
ধরুন, একটি ভিডিও দেখে মনে হলো সেটি সত্যি। পরে জানা গেল ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি। এরপর কেউ সত্যিকারের একটি ভিডিও প্রকাশ করল। তখনও কেউ বলতে পারে, ‘এটাও তো এআই দিয়ে বানানো হতে পারে।’
এভাবেই সত্যি তথ্য নিয়েও সন্দেহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এআই দিয়ে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়া হলে মানুষের সংবাদমাধ্যম, সরকার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। আর গণতন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করার জন্য মানুষের এই আস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক উদ্বেগের বাইরে নয় বাংলাদেশ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে এআই দিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও, অডিও এবং রাজনৈতিক কনটেন্ট নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে।
ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্লোভাকিয়ার নির্বাচনের পর বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ভারতসহ আরও অনেক দেশের নির্বাচনেও ডিপফেক-এর উপস্থিতি দেখা গিয়েছে।
জার্মান প্রতিষ্ঠান কনরাড আডেনাউয়ার ফাউন্ডেশন ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডিপফেকের প্রভাব নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনেও যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, স্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, তাইওয়ান, জাম্বিয়া ও ফ্রান্সের পাশাপাশি বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গাইবান্ধা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল্লাহ নাহিদ নিগারের নামে একটি ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখানো হয় তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এবং অন্য একজন প্রার্থীকে ভোট দিতে বলছেন। পরে যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি আসল নয়; এআই দিয়ে তৈরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি দেখে অনেকে এটি সত্যি মনে করেছিলেন। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ভিডিওটি বহু ভোটারকে বিভ্রান্ত করেছিলো।
একই নির্বাচনে বগুড়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিউটি বেগমকেও একইভাবে ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলা হয়েছে বলে দেখানো হয় এনগেজমিডিয়ার একটি প্রতিবেদনে।
সমস্যাটা শুধু বিরোধী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে ছিলো না। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেও সরকারপন্থী কিছু গণমাধ্যম ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এআই ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিওসহ বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়েছিলো বলে ফাইনান্সিয়াল টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে উঠে আসে। এসব কনটেন্ট তৈরিতে কম খরচের এআই টুলও ব্যবহার করা হয়েছিলো।
এনগেজমিডিয়ার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ডিসমিসল্যাবের একাধিক অনুসন্ধানে নির্বাচনের আগে-পরে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের মিথ্যা দাবি এবং নির্বাচনকে সফল বা কারচুপি হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা পাওয়া গেছে।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনেও এআই ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের টার্গেট করেও জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করা হয়েছে। অ্যাক্টিভেট রাইটসের এক গবেষণা বলছে, নির্বাচনে মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশ নারী হলেও তারা অনলাইনে তুলনামূলকভাবে বেশি হয়রানি ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন। ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থী তাসনিম জারা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের বিজয়ী প্রার্থী রুমিন ফারহানাকে নিয়ে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি অনলাইনে ছড়ানো হয়।
বাংলাদেশ এআই নিয়ে কোন অবস্থানে আছে
এনগেজমিডিয়ার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো নির্দিষ্ট কোনো এআই আইন নেই। বিদ্যমান কপিরাইট আইনও এই প্রযুক্তির সব ধরনের ব্যবহারকে কভার করে না। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনও এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চে সরকার এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলো। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জেনারেটিভ এআইয়ের ব্যবহার সামগ্রিকভাবে সীমিত ছিলো বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের খসড়া জাতীয় এআই নীতি (২০২৬-২০৩০) নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু বিধানের প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন এআই-জেনারেটেড ডিপফেক ও নির্বাচনী বিভ্রান্তিমূলক কনটেন্ট তৈরি নিষিদ্ধ করা, প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য এআই-কনটেন্ট লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা, এবং আদালতের নির্দেশ ছাড়া রাজনৈতিক বক্তব্য ব্লক করা যাবে না নিশ্চিত করা। তবে এই নীতি এখনো খসড়া পর্যায়ে, এবং বাস্তবে এটি কতটা কার্যকর এবং প্রয়োগযোগ্য হবে তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
ডিজিটালি রাইট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরীর মতে, এআই-এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। বরং নির্বাচনের সময় এআই-তৈরি কনটেন্ট ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে কি না এবং নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা কমাচ্ছে কি না, সেটি নজরে রাখা জরুরি।
তিনি আলাপকে বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই-নির্মিত ভুয়া তথ্য ঠেকানোর চেষ্টা করলেই হবে না বরং বাংলাদেশে এআই সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান বা এআই লিটারেসি বাড়ানোও জরুরি। কারণ মানুষ যদি এআই দিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও বা অডিও চিনতেই না পারেন, তাহলে ভুয়া তথ্য থেকে নিজেকে রক্ষা করা কঠিন হবে।”
মিরাজ আহমেদ চৌধুরীর মতে, এ জন্য শুধু সরকার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম নয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হবে, রাজনৈতিক প্রচারণায় এর ব্যবহারও তত বাড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন আইন তৈরি করা নয়; একই সঙ্গে এআই-তৈরি কনটেন্ট সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো, প্ল্যাটফর্মগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী সময়ে এর প্রভাব পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা।
সামনের চ্যালেঞ্জ
এআইয়ের ব্যবহার যত বাড়ছে, রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব বাড়ছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নামে ভুয়া ভিডিও, ছবি ও অডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যতে এআই দিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সাইবার স্পেশালিস্ট সুমন আহমেদ সাবির মনে করেন, ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক কনটেন্টের পাশাপাশি এসব কনটেন্টের জনপ্রিয়তাও কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হবে। অর্থাৎ, কোনো রাজনৈতিক পোস্টের লাইক, রিঅ্যাকশন, কমেন্ট বা শেয়ারের কাজও এআই করবে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মতামত ও জনসমর্থনের প্রকৃত চিত্র বোঝা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, “মানুষের মধ্যে এআই লিটারেসি বাড়াতে হবে। এখনো অনেক মানুষ বুঝতে পারেন না কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও এআই দিয়ে তৈরি কি না। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন। ফলে শুধু প্রযুক্তি উন্নত করলেই হবে না, মানুষকেও সেই প্রযুক্তি বোঝার মতো সক্ষম করতে হবে।”
বাংলাদেশে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কিছু আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-এ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে এআই দিয়ে তৈরি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, ছবি, ভিডিও ও অডিও ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল এআই পলিসি বাংলাদেশ ২০২৬-২০৩০ এর খসড়ায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এআই-নির্ভর অপতথ্য, ডিপফেক ঠেকানোর প্রস্তাব রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরীর মতে, শুধু ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার পর সেটিকে মিথ্যা ঘোষণা করলেই হবে না। আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি, রাজনৈতিক কনটেন্টে স্বচ্ছতা এবং মানুষের মিডিয়া ও এআই লিটারেসি বাড়ানো জরুরি।
তার মতে, ফেইসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম ও টিকটকের-এর মতো প্ল্যাটফর্মকে বাংলাদেশে আরও কার্যকর জবাবদিহির মধ্যে আনার পাশাপাশি রাজনৈতিক কনটেন্টে স্বচ্ছতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের স্থানীয় ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে এআই-নির্ভর অপতথ্য শনাক্ত করছে। তবে এ ধরনের কনটেন্টের পরিমাণ বাড়লে শুধু প্রচলিত ফ্যাক্ট- চেকিং যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রয়োজন দ্রুত শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে দ্রুত তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা।
২০২৬ সালের এপ্রিল–জুনের তথ্য বিশ্লেষণে ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, ওই সময়ে যাচাই করা অপতথ্যের মধ্যে এআই-জেনেরেটেড বা এআই-অ্যাসিস্টেড কনটেন্টের অংশ ছিলো ১৪ শতাংশ। একই সময়ে রাজনৈতিক অপতথ্য মোট যাচাই করা কনটেন্টের ৫৭ শতাংশ ছিলো। ডিসমিসল্যাব ও রিউমার স্ক্যানার-এর মতো প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বাংলা ভাষার ভুয়া ছবি, ভিডিও এবং এআই-নির্মিত কনটেন্ট শনাক্ত ও যাচাই করছে।
ড. সাইফুল আলম চৌধুরীর ভাষায়, তাই শর্ট-টার্ম, মিডিয়াম-টার্ম এবং লং-টার্ম, তিন ধরনের উদ্যোগই প্রয়োজন। আর এর পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’-এর মধ্যে আনতে হবে। কারণ এআই যত সহজলভ্য হবে, নির্বাচনী তথ্যের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু নির্বাচন কমিশন বা ফ্যাক্ট-চেকারদের ওপর থাকলে চলবে না; প্ল্যাটফর্ম, সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং ব্যবহারকারী– সব পক্ষকেই এতে ভূমিকা রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা একমত যে সমাধান কোনো একক পদক্ষেপে নেই। জার্নাল অব ডেমোক্রেসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট শনাক্তকরণে মেশিন-লার্নিং টুলের ব্যবহার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্ব-নিয়ন্ত্রণ, এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি করতে হবে।