সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আমাদের জীবনের খুব সাধারণ একটি অংশ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব, স্ন্যাপচ্যাট — সবই যোগাযোগ, বিনোদন ও খবর পাওয়ার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা শুরু হচ্ছে যখন এসব প্ল্যাটফর্মে মানুষ, বিশেষ করে শিশু-কিশোররা, প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছে।
এখন এই বিষয়টি নিয়ে শুধু বাবা-মা বা শিক্ষকরাই চিন্তিত নন। আদালত, সরকার ও বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তিকর ব্যবহার নিয়ে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অসংখ্য মামলা
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় আইনি লড়াই চলছে যুক্তরাষ্ট্রে।
মেটা, গুগল, টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের বিরুদ্ধে ৩ হাজারের বেশি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, কোম্পানিগুলো এমনভাবে তাদের প্ল্যাটফর্মগুলো তৈরি করেছে, যাতে শিশু-কিশোররা বারবার অ্যাপে ফিরে আসে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করে।
মামলাগুলোতে আরও অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
মেটা ও টিকটক অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
২০২৩ সালে মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের করা একটি বড় মামলার বিচার ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
ঐ মামলার অভিযোগ ছিলো, মেটা শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামকে এমনভাবে তৈরি করেছে, যাতে তরুণরা সহজে সেখান থেকে বের হতে না চায়।
এই বিচারটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলা মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
আদালতে মেটার বড় জরিমানা
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রায় এসেছে।
২০২৬ সালের অগাস্টে, নিউ মেক্সিকোর একটি মামলায় মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত মনে করেছে, মেটার কার্যক্রম তরুণদের জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এর আগে ২০২৬ সালের মার্চে, ক্যালিফোর্নিয়ার একটি মামলায় মেটা ও গুগলকে তরুণদের ক্ষতি করতে পারে এমনভাবে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার জন্য দায়ী করা হয়। ওই মামলায় একজন তরুণীকে ৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ইউরোপেও নজরদারি বাড়ছে
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ডিজাইন নিয়ে তদন্ত করছে।
ইউরোপীয় কমিশন রয়টার্সকে জানিয়েছে, তাদের প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কিছু ডিজাইন ইউরোপের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট - এর নিয়ম ভঙ্গ করতে পারে।
তদন্তে বিশেষভাবে নজরে এসেছে, স্ক্রল করতে থাকলে নতুন নতুন পোস্ট আসতেই থাকে, একটি ভিডিও শেষ হলে নিজে থেকেই আরেকটি ভিডিও চালু হয়, বারবার নোটিফিকেশন পাঠানো, একজন ব্যবহারকারী কী দেখতে পছন্দ করে, তা বুঝে তাকে একই ধরনের আরও কনটেন্ট দেখানো।
সহজভাবে বললে, এসব ফিচারের কারণে একজন মানুষ ভাবতে পারেন, “আরেকটা ভিডিও দেখি কিইবা হবে” — কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেক বেশি সময় কেটে যায়।
ইউরোপীয় কমিশনের মতে, এসব ডিজাইন ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্য ও ভালো থাকার ওপর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে।
অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য কঠোর নিয়ম
শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কমাতে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
১০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে দেশটিতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের নির্দিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট রাখা বা নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ বন্ধ করতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। বিষয়টি অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ইসেইফটি কমিশনার রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে।
এই নিয়মের আওতায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব, স্ন্যাপচ্যাট, রেডিট, এক্সসহ বেশ কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের যুক্তি হলো, শিশুদের এমন অনলাইন পরিবেশ থেকে কিছুটা দূরে রাখা, যেখানে বিভিন্ন ডিজাইনের কারণে তারা বেশি সময় স্ক্রিনে থাকতে পারে এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হতে পারে।
তাহলে কি শুধু বেশি সময় ব্যবহার করাই আসক্তি?
বিষয়টি এত সহজ নয়। কেউ হয়তো পড়াশোনা, কাজ বা যোগাযোগের জন্য দিনে কয়েক ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। আবার কেউ অল্প সময় ব্যবহার করেও বারবার ফোন চেক করতে পারেন।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, সমস্যার জায়গা হতে পারে যখন কেউ প্রয়োজন না থাকলেও বারবার অ্যাপ খুলছেন; রাতে ঘুমানোর সময়ও ফোন দেখছেন; পড়াশোনা বা কাজের সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না; ফোন না থাকলে অস্বস্তি বোধ করছেন; একটি ভিডিও দেখার পর আরেকটি দেখতে থাকছেন ও সময় কতটা চলে যাচ্ছে, তা বুঝতে পারছেন না।
এ কারণেই এখন আলোচনাটি শুধু “শিশুরা কত ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করবে” — এখানে সীমাবদ্ধ নেই।
প্রশ্ন উঠছে, অ্যাপগুলো কীভাবে মানুষকে আরও বেশি সময় ধরে রাখছে?
কেন শিশু-কিশোরদের নিয়ে এত চিন্তা?
শিশু-কিশোরদের বয়সে অভ্যাস ও আচরণ দ্রুত তৈরি হয়। তাই তাদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বেশি।
বিশেষ করে লাইক, কমেন্ট, ফলোয়ার, জনপ্রিয়তা এবং অন্যদের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার বিষয়গুলো অনেক তরুণের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মামলাগুলোতেও তরুণদের হতাশা, উদ্বেগ ও শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণার মতো বিষয় উঠে এসেছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক থাকলেই যে সোশ্যাল মিডিয়াই এসব সমস্যার একমাত্র কারণ, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের এক জরিপে প্রায় ২৯ হাজার তরুণ-তরুণী অংশ নেয়। জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর ও ভুল তথ্যকে মানসিক চাপের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বুলিং, নেতিবাচক মন্তব্য এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছে তারা।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও হয়তো শিশুদের বয়স যাচাই, অনলাইন নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তিকর ডিজাইন নিয়ে আরও আলোচনা হবে।
কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। এটি এখন শিক্ষা, ব্যবসা, যোগাযোগ ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তাই প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করা যায়, যেখানে মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তি মানুষের সময় ও মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।
বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তাতে একটি বিষয় পরিষ্কার, এটি আর শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়। এখন এটি স্বাস্থ্য, শিশু সুরক্ষা, আইন ও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের বিষয়ও।
যুক্তরাষ্ট্রের হাজারো মামলা, ইউরোপের তদন্ত এবং অস্ট্রেলিয়ার বয়সভিত্তিক নিয়ম সবকিছু মিলিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
আগামী দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ডিজাইন, অ্যালগরিদম, নোটিফিকেশন এবং শিশুদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আরও কঠোর নিয়ম আসতে পারে।