'প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ’ ছাড়া দ্রুত অ্যাকশন হবে না কেন

সাত বছর আগে এক পর্যবেক্ষণে উচ্চ আদালত প্রশ্ন তুলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে যদি সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করতে হয়, তাহলে সচিবেরা আছেন কেন?” 

প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে হাইকোর্টের সেই মন্তব্য প্রতীকী সতর্কবার্তা ছিল বলে মনে করা হয়। 

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই প্রশ্ন যেন আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। 

মঙ্গলবার এক স্কুলছাত্র অপহরণের পর ‘প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে উদ্ধার’-ঘটনাটি এই ভাষ্যে প্রচারিত হওয়ার পর পুরোনো বিতর্ক আবারো নতুন করে সামনে এসেছে। 

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়ে দেড় ঘণ্টার মধ্যে শিশুটিকে উদ্ধার করে। 

আর এই বয়ান ছড়িয়ে পড়তেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে প্রশাসনের ‘স্বতঃস্ফূর্ত সক্ষমতা’র পুরোনো সেই প্রশ্ন।

অপহরণ ঘটনার স্বস্তিদায়ক পরিণতি দেখে অনেকে প্রশংসা করেন। তবে প্রশ্ন উঠছে যে, রাষ্ট্রীয় অঙ্গগুলোর স্বাভাবিক কর্মপ্রবাহ কি কেবল শীর্ষ নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে? 

অপহরণের মতো ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের নিজস্ব দায়িত্ববোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তিতেই কি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা নয়?

আরেকটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে, তা হলো- বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভূমিকা। 

ক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তিত্বকে ‘মহিমান্বিত’ করে তোলার যে রেওয়াজ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, তা কি আদৌ বদলাবে? 

স্বাভাবিকভাবেই, স্কুল ছাত্র আপহরণের ওই ঘটনায় কেবল উদ্ধার অভিযানের বিবরণই সামনে আসেনি; রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গণমাধ্যমের ভাষ্য-সবকিছুকেই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অপহৃত স্কুলছাত্র উদ্ধার

তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী খন্দকার শামীম সচিবালয়ে থাকাকালে ছেলে অপহৃত হওয়ার খবর পান এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি জানান।

ঘটনাটি মঙ্গলবার বিকেলের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ের নিজ দপ্তর থেকে বের হচ্ছিলেন। 

সেসময় তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী খন্দকার শামীম ছেলে অপহৃত হওয়ার খবর শুনে কাঁদতে কাঁদতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ঢুকে পড়েন।

গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে খিলগাঁওয়ের নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে অপহৃত স্কুলছাত্রকে উদ্ধার করে পুলিশ। 

বেলা আড়াইটায় স্কুল ছুটির পর কয়েকজন অপহরণকারী তাকে খিলগাঁওয়ের জোড়পুকুর এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে গিয়ে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।

পুলিশ জানায়, তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী খন্দকার শামীম সচিবালয়ে থাকাকালে ছেলে অপহৃত হওয়ার খবর পান এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রী পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ আলমকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।

বিকেল পৌনে চারটার দিকে নির্দেশ পাওয়ার পর পুলিশ অভিযান শুরু করে। মুক্তিপণ নিয়ে যোগাযোগের সূত্র ধরে অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ।

পরিস্থিতি টের পেয়ে অপহরণকারীরা পালিয়ে গেলে বিকেল পাঁচটার দিকে অভিযান চালিয়ে ছাত্রটিকে উদ্ধার করা হয়।

এই ঘটনা বিভিন্ন সংবাদে প্রচার হয়। প্রথম আলোর শিরোনাম, ‘প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ঢাকায় অপহরণের সোয়া এক ঘণ্টার মধ্যে স্কুলছাত্র উদ্ধার’। 

বাংলাদেশ প্রতিদিন লিখেছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে উদ্ধার হলো অপহৃত স্কুলছাত্র।’ যমুনা টেলিভিশনের শিরোনাম, ‘প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে অপহরণের এক ঘণ্টার মধ্যে স্কুলছাত্র উদ্ধার’। 

সমকাল লিখেছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে অপহরণের এক ঘণ্টার মধ্যে স্কুলছাত্র উদ্ধার’। কালের কণ্ঠের শিরোনাম, ‘প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে অপহৃত স্কুলছাত্র উদ্ধার’। 

এই ঘটনা নিয়ে প্রচার হওয়ার পর বিভিন্ন রকমের প্রতিক্রিয়া দেখান নেটিজেনরা। 

তারা প্রধানমন্ত্রীর কর্মতৎপরতার প্রশংসা করেছেন। পাশাপাশি প্রশাসনের এই ধরনের তৎপর কর্মক্ষমতা সবখানেই দেখানো উচিৎ বলে মনে করছেন। 

শেখ শাকিম নামে একজন ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এখানে পিতার সাহস, প্রধানমন্ত্রীর উদারতা এবং পুলিশি তৎপরতা তিনটি বিষয়ই মানবিক, সুন্দর।”

“কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে কেন ফোন করতে হবে? আমরা এমন রাষ্ট্র চাই যেখানে ভিক্টিমের পরিবারের ফোনই যথেষ্ট হবে।” 

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যে তৎপরতায় কাজ হয়েছে, একইভাবে অন্য ঘটনায় কাজ হচ্ছে না বলেও পোস্টে দাবি করেছেন তিনি।  

“যখন ১ ঘণ্টায় আজ উদ্ধার হয়েছে অপহৃত কিশোর। তখন নিখোঁজের ৪৬ দিন পর নারীর অর্ধগলিত মরদেহ দুর্গন্ধ পাওয়ায় উদ্ধার হয়েছে ময়মনসিংহে।”

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে শেখ শাকিম লিখেছেন, “প্রধানমন্ত্রী, আপনি যদি তা করতে পারেন, কেবল মাত্র তাহলেই আপনি সফল। দেশের সব পিতা সচিবালয়ে চাকরি করে না! সবার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাবার সাহস নাই।”

“আমরা এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে যার কাজ সেই যেন তা করে। যেন সচিবালয় জীবনে না দেখা মানুষটির সন্তানও অপহৃত হলে, অথবা পথশিশুও আইনের দৃষ্টিতে সমান সুরক্ষা ও সুবিধা পায়।” 

‘সব কিছুতেই প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়’

High-Court

প্রধানমন্ত্রী ‘নির্দেশে’ বা ‘হস্তক্ষেপ’ করার পর সেই কাজ হয়েছেন অতীতেও এমন অনেক নজির আছে।

এমনকি গুগলে সার্চ দিলে প্রশ্নোত্তর প্ল্যাটফর্ম ‘কোরা’তেও এমন অনেক লেখা দেখা যায়। 

‘সবাই কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চায় কিংবা সবকিছুতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চায়?,’ ওই প্ল্যাটফর্মে থাকা একটি প্রশ্নে অনেকেই মত দিয়েছেন।   

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ নিয়ে সেই রকমই একটি ঘটনায় পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল হাইকোর্ট। 

ঘটনাটি ২০১৯ সালে। রোজার মাসের শেষ দিকে একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরে অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের একজন উপপরিচালক। পরে তাকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

ওই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল সমালোচনার শুরু হলে, তখনকার প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তার বদলি স্থগিত করা হয় বলে গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

এরপর এক রিটের ওপর শুনানির সময় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন হাইকোর্টের তখনকার বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। 

আদালত বলেন, “সবকিছুতে প্রধানমন্ত্রীর কেন ডাইরেকশন (নির্দেশনা) দিতে হবে? সেক্রেটারিরা কি তাঁদের পকেটে ঢুকে গেছেন? বন্ধের সময় বদলির আদেশ দিয়েছে। লজ্জা নাই।

“কি বলব, প্রধানমন্ত্রীকে যদি সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করতে হয়, তাহলে সচিবেরা আছেন কেন?” 

যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পৌঁছে না, সেখানে কী হবে

Quote_Cards (1)

বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর ধরনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বময় ক্ষমতা নিয়ে এর আগে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। 

তাই সরকারপ্রধান কোনো আদেশ দিলে তা মুহূর্তেই বাস্তবায়ন হয়ে যায়। কিন্তু যারা ‘ভাগ্যে’ এই আদেশ জোটে না তাদের কী হবে? 

সাংবাদিকতার শিক্ষক আর রাজী আলাপ-কে বলেন, “আমাদের এখন পর্যন্ত যে সাংবিধানিক কাঠামো আছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রীই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। বিপুলভাবে শক্তিশালী একটা মানুষ। 

“তার কাছে যদি কেউ পৌঁছে যায়, তাহলে তার সমস্যার সমাধান হওয়ার সুযোগ অনেক বেশি থাকে।” 

স্বাভাবিকভাবেই খিলগাঁওয়ের অপহৃত শিশুর বাবা প্রধানমন্ত্রীর সন্নিকটে পৌঁছাতে পারার কারণে তিনি ‘সরাসরি হস্তক্ষেপ’ করেছেন। 

“এটা হওয়া উচিৎ কি না, সেটা যদি আমরা বলি; যদি কেউ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলো, তাহলে তারটা তো হলোই। কিন্তু তা ছাড়াও এটা হওয়া উচিৎ ছিল।” 

এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর ‘তাৎক্ষণিক সাড়া’ দেওয়াকে প্রশংসা করছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। 

আলাপ-কে তিনি বলেন, “ভুক্তভোগী সৌভাগ্যক্রমে প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থিত হতে পেরেছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তার সমস্যার সমাধান মানে বাচ্চাটা উদ্ধার হয়ে গেছে।” 

“প্রধানমন্ত্রীর সামনে যদি কোনো অন্যায়, অপরাধ দেখেন, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে উনিতো অর্ডার দেবেনই। উনি সঠিক কাজটাই করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটা উদ্ধার হয়ে গেছে।”  

প্রশাসন সবার ক্ষেত্রে সমান তৎপরতা দেখায় না বলে বহু মানুষের অভিযোগ। তাই যারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে পৌঁছাতে পারছেন না তাদের কী হবে? 

“সব ঘটনা তো প্রধানমন্ত্রীর সামনে আসবে না। ১৮ কোটি মানুষের দেশ। প্রতিদিন কত ধরনের অপরাধ হচ্ছে। সেগুলো তো প্রধানমন্ত্রীর কাছে আসা বাস্তবে সম্ভব নয়। কোনোটা যদি সৌভাগ্যক্রমে প্রধানমন্ত্রী সামনে নিয়ে আসতে পারে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে বিচার হয়,” বলেন তিনি। 

তাহলে যেসব ঘটনা সরকারপ্রধানের সামনে আসছে না, সেগুলোর বিষয়েও কি সমান তৎপর থাকার দরকার না? 

“অবশ্যই। সব ক্ষেত্রে সব কেইস সমানভাবে ও আইন অনুযায়ী গুরুত্ব দিতে এবং ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রত্যেকটা কাজই একই স্পিডে আইনগতভাবে সমাধান করতে হবে,” বলেন মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান। 

তিনি আরো বলেন, “আমরা প্রত্যাশা করি, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যেভাবে বাচ্চাটা উদ্ধার করা হলো- প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে যেন এইভাবেই হয়। কেউ যেন বলতে না পারে যে, বিচার কেঁদে কেঁদে মরছে।”  

মিডিয়া কেন এভাবে দেখে 

ar raji

সরকারপ্রধান বা ক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তিকে ’মহিমান্বিত’ করে দেখানোর রেওয়াজ পুরোনো রয়েছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে। 

এর আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এজন্য অনেক সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকে ‘সমালোচনার’ শিকার হতে হয়েছে।  

“মিডিয়া যেভাবে কাভার দেয় এই ধরনের ঘটনাগুলোকে, একটু তো ত্রুটি থাকেই। প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপ, প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাধারণ মানুষের সংযোগ- এইসব তুলে ধরবার একটা চেষ্টা থাকে,” বলেন সাংবাদিকতার শিক্ষক আর রাজী। 

“কিন্তু মিডিয়া যেটা করতে পারত, এট লিস্ট এই ক্ষেত্রে যেটা, দেখেন প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেওয়ার পর একজনও আসামি ধরা পড়ে নাই। যারা অপহরণ করেছিল তারা ধরা পড়ে নাই। তার মানে কী? প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেওয়ার পরও পুলিশ আসামি শনাক্ত করতে পারে নাই।” 

এই দিকটাও মিডিয়াতে ‘বড় করে’ উঠে আসতে পারত বলে মনে করেন আর রাজী। 

“যেটাকে আমরা হয়ত গঠনমূলকভাবে দেখতে পারতাম যে, প্রধানমন্ত্রী বলার পরও অপহরণকারীরা ধরা পড়ল না। এটা হতে পারত প্রধান নিউজ।” 

আর রাজী বলেন, “অথচ ছোট নিউজটাই বড় হয়ে গেছে। আমরা সাধারণত সাংবাদিকতায় যেটা বলি যে, ব্লিড করতেছে। আসামি পালিয়ে যাওয়া, তো সেইটা দিয়ে করতে পারত। 

“আমাদের মিডিয়ার একটা প্রবণতা আছে যে, তৈরিই হয়েছিল তেলাঞ্জলি সাংবাদিকতা। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। অবশ্যই এটার বদলে খামতির দিকটা, ব্যর্থতার দিকটা তুলে ধরা সম্ভব ছিল,” যোগ করেন তিনি।