গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ জিতেছে। তার মানে কি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হয়ে যাচ্ছে?
উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন হবে কিসের ভিত্তিতে? পিআর পদ্ধতিতে নাকি নিম্নকক্ষের আসনের সংখ্যানুপাতিক হারে?
উচ্চকক্ষের কি সংবিধান সংশোধন অনুমোদনের এখতিয়ার থাকবে? তারেক রহমান কি প্রধানমন্ত্রী আর দলীয় প্রধান একইসাথে থাকবেন? নোট অব ডিসেন্টের ভবিষ্যত কী?
এইসব প্রশ্নই ঘুরেফিরে আসছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে নিশ্চিতভাবেই জটিলতা তৈরি হবে। এমনকি গণভোটের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। অবশ্য ভিন্নমতও আছে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে বলে মনে করেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ।
তিনি বলছেন, “সাধারণভাবে চিন্তা করলে তারা (বিএনপি) ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে যা বলে আসছে, সেই জায়গায় স্থির থাকবে। এখন যদি বিরোধী দল, এটা নিয়ে রাজনীতি করতে চায় সেটারও সুযোগ আছে।”
জুলাই সনদের গেজেট নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুযা। তার মতে ওই গেজেটেই গোঁজামিলটা রয়ে গেছে।
তিনি বলছেন, “দেখবেন ১৩ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২০২৫, এভাবে সনদ বাস্তবায়ন আদেশ গেজেট হয়েছে। রাষ্ট্রপতি আদেশ দিলেন কীভাবে? রাষ্ট্রপতি অর্ডিন্যান্স দেবেন। অর্ডিন্যান্স রেটিফিকেশনের প্রশ্ন আছে। রেটিফিকেশন না হয়ে আদেশ হিসেবে উনি দিলেন। আদেশ দেয়ারইতো এখতিয়ার নাই।”
তবে সিনিয়র আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী মনে করেন এটা গৃহীত সিদ্ধান্ত। তিনি বলছেন, “পারেন কি পারেন না এখন এই প্রশ্নগুলো আসবে কেন? কারণ আমরা মেনে নিয়েছি সবাই। যখন জনগণ মেনে নেয় তখনতো আর প্রশ্ন নেই। এটা গৃহীত সিদ্ধান্ত।”
অনৈক্য নিয়েই ঐকমত্য কমিশন
প্রায় নয় মাস ধরে চলেছে ঐকমত্য কমিশন। তিন দফায় সময় বাড়িয়ে ৩০টি রাজনৈতিক দলের বৈঠকে হয়েছে তর্ক-বিতর্ক।
এর ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছে জুলাই সনদ। যদিও সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে কার্যত একমত হয়নি অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো।
অধিকাংশ প্রস্তাব বা সুপারিশেই আছে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি। জুলাই সনদ সই হয়েছে আপত্তিসহই। কিন্তু গণভোটের প্রশ্নে সেসবের অস্তিত্ব নেই।
প্রশ্ন উঠছে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের ভবিষ্যত কী? সনদ নাকি ইশতেহার- কোনটা গুরুত্ব পাবে বিএনপির কাছে?
জুলাই সনদে ‘নোট’ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেইমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’
জুলাই সনদের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রস্তাব করা হয়েছে বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে। যা নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট) সমন্বয়ে গঠিত হবে।
এই প্রস্তাবে বিএনপির আপত্তি নেই। তবে এর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে জুলাই সনদের প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতে আসা দলটি।
উচ্চকক্ষের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে জুলাই সনদের প্রস্তাবে আছে নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ যে দল নির্বাচনে মোট যত শতাংশ ভোট পাবে, উচ্চকক্ষেও ততো শতাংশ আসন পাবে।
এই প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বিএনপির প্রস্তাব হলো, নিম্নকক্ষের আসনের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। অর্থাৎ যে রাজনৈতিক দল যতগুলো আসনে জিতেছে একইহারে উচ্চকক্ষে আসন পাবে।
ইশতেহারেও বিএনপি বলেছে, রাজনৈতিক দলসমূহ নিম্নকক্ষের অর্জিত আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবে।
আবার গণভোটের চারটি প্রশ্নের দ্বিতীয়টি অর্থাৎ ‘খ’-তে ছিল, “আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।”
একদিকে গণভোটে নোট অব ডিসেন্ট উল্লেখ না থাকা, অন্যদিকে জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট আমলে নেওয়ার সুযোগ রাখায়, বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার মতে ঐকমত্য কমিশন কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, “যেগুলো নিয়ে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো নিয়েই চার্টার করা উচিত ছিল। বাকিগুলো নির্বাচিত সংসদের উপরে ছেড়ে দেয়া উচিত ছিল।”
তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতে যাওয়ায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই বলে মনে করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী। তিনি বলেন, “আপনি আগে নোট অব ডিসেন্ট কি দিয়েছেন না দিয়েছেন এগুলোতো এখন আর বিষয় হবে না। আমার কাছে মনে হয় দলীয়ভাবে এটা নিয়ে আর কোনো বিতর্ক হবে না বা উচিত নয়।”
জুলাই সনদ নাকি ইশতেহার
এখন বিএনপি কোন পথে হাঁটবে সেটাই ‘কোটি টাকার প্রশ্ন’।
গবেষক আলতাফ পারভেজ বলছেন, “গণভোটে যেটা উপস্থাপন করা হয়েছে সেটা পাস হয়েছে। আবার বিএনপিতো বলবে আমরা ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে ওইটা বলে আসছি। তার মানে এখানে একটা বিরোধিতার জায়গা আছে।”
“গণভোট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিরোধীতার জায়গাটা তৈরি করা হয়েছে। আমি বলব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘অবদান’ এটা”, যোগ করেন আলতাফ পারভেজ।
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছেন, “সংসদ নির্বাচনে যে জনসাধারণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছে, সে তার মতো করে সংসদে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না? তাকে কি বাধ্য করা যাবে?”
সংসদকে বাধ্য করার সুযোগ নেই মত দিয়ে তিনি বলেন, “এখন বিএনপি’র গুড সেন্সের উপরে ডিপেন্ড করবে যে উনারা কতটুকু নেবেন, নেবেন না। বাধ্য করার সুযোগ আসলে খুব একটা নেই।”
তবে অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, “সবশেষ যে সিদ্ধান্ত হয় সেটা অলওয়েজ ফাইনাল। নোট অব ডিসেন্ট থাকার কারণেইতো ঐকমত্য কমিশনে ঐকমত্য হয়নি। হলেতো গণভোটে যাওয়া লাগত না। সিদ্ধান্ত হয়েই যেতো। যেহেতু ঐকমত্য হয়নি, তাই গণভোটে পাঠানো হয়েছে।”
সংবিধান সংস্কার পরিষদের কী হবে?
বহাল সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পেলে সংবিধান সংশোধন করা যায়। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কারের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কথা বলা হয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সংস্কার পরিষদের পক্ষে থাকলেও বিএনপি এর বিপক্ষে ছিল।
এমনকি সনদ বাস্তবায়নে অধ্যাদেশ নয়, আদেশ জারির প্রস্তাব দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল। বিএনপি বলেছিল, এ ধরনের আদেশ জারির কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।
তবে শেষ পর্যন্ত আদেশ জারি হয়েছে। সেইমতে সংসদ সদস্যদের শপথের সাথেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ হওয়ার কথা।
এটি নিয়েও জটিলতার আশঙ্কা করছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলছেন, “সংবিধান সংস্কার পরিষদ মৌলিক পরিবর্তন করবে তাদেরকে দিয়ে, যারা বিদ্যমান সংবিধানে জিতে গিয়ে সংসদে গেলো। এটা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হয়ে গেল না?”
“যদি কাউন্সিল গঠন হয় এবং সেই কাউন্সিল যদি আবার সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করে, তাদের এই মৌলিক পরিবর্তন করার এখতিয়ার আছে কি-না সেটা নিয়েইতো চ্যালেঞ্জ হবে পরবর্তীতে”, যোগ করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
তবে অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকীর মতে, তারেক রহমান হ্যাঁ ভোট দিতে বলায় এত ভোট পড়েছে। এখন এটা বিএনপির নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, “টু-থার্ড মেজরিটি সংসদে তারা পেয়েছেন। তারা যদি না করেন সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু গণভোটেতো হ্যাঁ জিতেছে বিপুল ভোটে, সেক্ষেত্রে সবকিছুতো গণভোটের আদলেই সবকিছু করতে হবে।”
প্রসঙ্গ গণভোট
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, “গণভোট প্রক্রিয়াটাইতো প্রশ্নবিদ্ধ নানাভাবে। এটা অভিনব গণভোট। গণভোট হয় সংসদ থেকে যাওয়া বিষয়ের উপর জনগণের মতামত চেয়ে। এইটা তো ওই প্রক্রিয়ায় হয়নি।”
তিনি বলছেন, “এই প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে আমার ধারণা বিএনপির বাইরেও অনেকে প্রশ্ন তুলবে। আদালত এখানে একটা অপশন হতে পারে।”
তবে আশা রাখতে চান ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলছেন, “জুলাই সনদের যে মৌলিক বিষয়গুলোতে আলাপ আলোচনা আছে এবং যেগুলো যৌক্তিকভাবে সংস্কার হওয়া প্রয়োজন, সেটাতো সব দলই একই রকমের মতামত দিয়েছে।”
গণভোট বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি বিরূপ হতে পারে বলে আশঙ্কা সিনিয়র আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকীর। তিনি বলেন, “টু-থার্ড মেজরিটি নিয়ে যদি তারা (বিএনপি) তাদের চিন্তা-ভাবনা মোতাবেক করেন, করতে পারেন। করলে সেটা দেশবাসী মানবে কি-না, কী পরিস্থিতি হবে, তা আমরা জানি না।”
বিএনপির যত ‘নোট অব ডিসেন্ট’
জুলাই সনদে ৮৪টি প্রস্তাব বা সুপারিশ আছে। তার মধ্যে ৪৭টি বিষয়কে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’ আর বাকি ৩৭টি বিষয়কে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে ঐকমত্য কমিশন।
সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কারের ৪৭টি প্রস্তাবের ২৪টিতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপি। আর ওই বিষয়গুলোতে তাদের দলীয় অবস্থান নির্বাচনি ইশতেহারে স্পষ্ট করেছে।
সংবিধান সংশোধন
জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। কিছু ক্ষেত্রে লাগবে গণভোট।
নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে বিএনপির প্রস্তাব হলো, সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কোনো এখতিয়ার উচ্চকক্ষের থাকবে না।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য
জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য সদস্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কারো পরামর্শ ছাড়াই নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বিইআরসি’র নিয়োগ রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারে দেওয়া নিয়ে আপত্তি আছে বিএনপির। তবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি আছে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ
জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দশ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। এই প্রস্তাবে আপত্তি নেই বিএনপির।
তবে সনদের ১৫তম দফা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হতে পারবেন না। এই প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বিএনপি বলেছে, একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হতে পারবেন।
নির্বাচনি ইশতেহারেও বিষয়টি ফের উল্লেখ করেছে দলটি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের জন্য সংসদ থেকেই পাঁচ সদস্যের কমিটি করার কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদের ১৬তম দফায়। নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে প্রক্রিয়াও।
তবে ১৬(৯) দফায় কমিটিতে বিচার বিভাগের সম্পৃক্ততা নিয়ে আপত্তি আছে বিএনপির। এমনকি ওই সাত সদস্যের গোপন ব্যালটে ‘র্যাংকড চয়েস’ পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা বাছাই নিয়েও নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে এই স্তরটি জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে বিএনপি।
ইশতেহারেও বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখার কথা স্পষ্ট করেছে বিএনপি।
উচ্চকক্ষ গঠন
উচ্চকক্ষের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে জুলাই সনদের প্রস্তাবে আছে নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ যে দল নির্বাচনে মোট যত শতাংশ ভোট পাবে, উচ্চকক্ষেও ততো শতাংশ আসন পাবে।
এই প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে বিএনপির প্রস্তাব হলো, নিম্নকক্ষের আসনের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। অর্থাৎ যে রাজনৈতিক দল যতগুলো আসনে জিতেছে একই হারে উচ্চকক্ষে আসন পাবে।
উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ও ভূমিকা
জুলাই সনদের ১৯তম দফা অনুযায়ী উচ্চকক্ষ, নিম্নকক্ষের প্রস্তাবিত আইন পর্যালোচনা করবে। অর্থবিল এবং আস্থা ভোট ছাড়া সব বিল অনুমোদনের জন্য উচ্চকক্ষে পাঠাতে হবে।
এই দফায় বিএনপি’র অবস্থান, সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, আস্থা ভোট এবং জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি) ইত্যাদি বিল পাসে উচ্চকক্ষের এখতিয়ার থাকবে না। একই কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের ইশতেহারে।
৭০ অনুচ্ছেদ
দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া ইস্যুতে সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করে জুলাই সনদের প্রস্তাব হলো, সংসদের সদস্যগণ কেবল অর্থবিল এবং আস্থা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকবেন। অন্য যেকোনো বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
তবে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বলেছে ‘সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি) বিষয়েও দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবে না সংসদ সদস্যরা।
বিচার বিভাগ
জুলাই সনদের ২৯তম দফার প্রস্তাব হলো, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি হবেন প্রধান বিচারপতি। তবে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বলেছে, জ্যেষ্ঠতম দুইজন বিচারপতির যে কাউকে প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে জুলাই সনদ প্রস্তাবে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে।
তবে ‘নোট অব ডিসেন্ট' দিয়ে বিএনপি বলেছে সুপ্রীম কোর্টের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে আইন তৈরি করা হবে।
জুলাই সনদের ৩৪তম দফায় রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে প্রতি বিভাগে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।
তবে এ নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের সাথে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে বিএনপি।
জুলাই সনদের ৩৭ দফায় স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে যুক্ত করার প্রস্তাব আছে। তবে বিএনপি বলছে, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না করে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ
ন্যায়পাল, তিনটি আলাদা সরকারি কর্ম কমিশন, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগের বিষয় সংবিধানে যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে চারটি প্রস্তাবেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ জানিয়ে বিএনপি জানিয়েছে, এসব নিয়োগের প্রক্রিয়া নির্ধারণে আইন প্রণয়ন করা হবে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাধারণ (অন্য সকল সেক্টরে) নিয়োগের জন্য যথোপযুক্ত শক্তিশালী কাঠামোতে রূপান্তর করা হবে।
স্থানীয় সরকার
জুলাই সনদের 88তম দফায় বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি সংবিধানে যুক্ত করা হবে।
এ প্রস্তাবে একমত বিএনপি। তবে সংবিধানে যুক্ত করার প্রস্তাবে দ্বিমত জানিয়ে দলটি বলেছে- এটি আইনের মাধ্যমে করা উত্তম।
সনদের ৪৭ ধারায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল সংগ্রহ নিয়ে নীতিগতভাবে একমত বিএনপি, তবে সংবিধান সংযোজনে দ্বিমত আছে। একইসাথে বাজেট সংক্রান্ত কোনো বিষয় উচ্চকক্ষের কোনো সংশ্লিষতা নেই বলে নোট অব ডিসেন্ট আছে দলটির।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
উপায় কী?
এই পরিস্থিতিতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার উপর সবকিছু নির্ভর করছে বলে মনে করেন আলতাফ পারভেজ।
তিনি বলেন, “বিএনপি চাইলেতো সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাস করিয়ে নিতে পারে অথবা কোর্টে যেতে পারে। আবার বিরোধী দল চাইলে ছাড় দিতে পারে।”
তবে হাল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন হওয়ার প্রত্যাশা খুব একটা রাখছেন না গবেষক আলতাফ পারভেজ।
তিনি বলছেন, “বাংলাদেশেতো এমন হয় না যে এরকম উদার উইন- উইন সিচুয়েশনে যাবে। বরং দুই পক্ষই লস- লস সিচুয়েশনে চলে যেতে পারে।”
তিনি মনে করেন, “গণভোটের যারা উদ্যোক্তা তারা এখানে সংঘাতের সুযোগ রেখে গেছেন। কিন্তু এই সংঘাত যখন বাধবে তখন তারা পর্দার আড়ালে থাকবেন, তাদেরকে দোষারোপের ভাগীদার হতে হবে না।”
আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বিএনপির সামনে দুইটি রাস্তা খোলা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সব পাস করা। অথবা আদালতের উপর ছেড়ে দেওয়া।
“এটি নিয়ে একটা রাজনৈতিক বাহাস হবে তা নিশ্চিত”, যোগ করেন আলতাফ পারভেজ।
গণভোটের ভবিষ্যত নিয়ে অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলছেন, “তারা (বিএনপি) যদি এটাকে মূল্যায়ন না করেন সেটার কনসিকোয়েন্স কি হবে, টাইম ইজ দ্য বেস্ট জাজ।”