ইতিহাস গড়লেন তারেক রহমান

“ভিনি, ভিডি, ভিসি”— এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।

সতেরো বছর পর দেশে ফিরে মাত্র ৫০ দিনের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা তারেক রহমান-এর ক্ষেত্রে এই ল্যাটিন উক্তিটি প্রয়োগ করা অযৌক্তিক হবে না।

নিজের জয়, দলের জয়- সব মিলিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন করার ৫০ দিনের মাথায় তিনি নবনির্বাচিত সরকারি দলের প্রধান নেতা, সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী - তার আগে মাত্র দশজন মানুষ এই পদের অধিকারী ছিলেন।

এই পথ মসৃণ ছিল না। ছিল মায়ের মৃত্যুশোক, ছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব। 

নতুন টিম সাজানো, নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণ, দলীয় বিদ্রোহ সামাল, সব মিলিয়ে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

আর শেষ পর্যন্ত যা ঘটেছে, তা ‘ইতিহাস’। দেশ-বিদেশ থেকে অভিনন্দন বার্তাও ইতোমধ্যে আসতে শুরু করেছে।

তারেকের ‘সাত’ ও ‘সতেরো’

দুর্নীতির একটি মামলার আসামি হিসেবে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় ‘সাত’ মার্চ, ২০০৭। এর ঠিক দেড় বছর পর লন্ডনের উদ্দেশে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছিল।

২০২৫ এর ২৫ ডিসেম্বর যখন জন্মভূমির মাটিতে ফিরলেন তখন মাঝে কেটে গেছে ‘সতেরো’ বছর।

এসেই রাজনীতির উত্তপ্ত কড়াই- প্রথম বারের মতো নির্বাচন। নিজের দুইটি আসনের সঙ্গে দলকে পাইয়ে দিয়েছেন এক নিরঙ্কুশ বিজয়ের স্বাদ।

বিএনপি এখন ২০০-এর বেশি আসনে জয় নিয়ে এককভাবে সরকার গঠনের অপেক্ষায়।

সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই শপথ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তারেক রহমানের। 

তা হলে তিন যুগ পর বাংলাদেশ আবার একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাবে। সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে কাজী জাফর আহমেদ প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর আমলে। ১৯৯০-এর পর থেকে বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বই প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

একক নেতৃত্ব 

তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা পারিবারিক ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে। তিনি খালেদা জিয়া-এর পুত্র এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি।

মায়ের ক্ষমতার সময় যুবক বয়সে পরিচিতি পেয়েছিলেন তৃণমূল বিএনপির সংগঠক হিসাবে। 

তখন পেছনে ছিলেন ‘মা’। তবে এবারের প্রেক্ষাপট আলাদা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিকভাবে নিতে হয়েছে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব।

লন্ডনে অবস্থানকালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও দেশে ফেরার পর নেতৃত্ব সরাসরি ও দৃশ্যমান রূপ পায়।

দেশে প্রত্যাবর্তনের কয়েকদিনের মাথায় ৩০এ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া মৃত্যু হয়। তার ঠিক দশদিন পর চলতি বছরের ৯ই জানুয়ারি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের পদে অভিষিক্ত হন তিনি।

মায়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজেকেই হতে হয়েছে নির্ভরতার ছাদ।

লড়তে হয়েছে একটি জাতীয় নির্বাচন। এমন একটি নির্বাচন, যেখানের প্রতিপক্ষ এক সময়ের রাজনৈতিক বন্ধু।

অভিজাত ও ঐতিহ্য

ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬, দুটি আসনের রাজনৈতিক তাৎপর্য ভিন্ন হলেও প্রতীকী গুরুত্ব গভীর।

ঢাকা-১৭ রাজধানীর কূটনৈতিক ও অভিজাত অঞ্চল। যেখানে রয়েছে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তের সঙ্গে রয়েছে বস্তিবাসীও।

অনেকটা একইভাবে ১৯৯১ এর প্রথম নির্বাচনে ঢাকার দুটি আসনে লড়েছিলেন খালেদা জিয়া। ঢাকা বিজয়ের মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব সুসংগঠিত করার পর আর কখনো ঢাকা থেকে নির্বাচন করতে হয়নি তাকে।

অন্যদিকে বগুড়া-৬ তারেক রহমানের পারিবারিক ও রাজনৈতিক ঘাঁটি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর উত্তরাধিকারসূত্রে শক্ত ভিত্তি। যা সব সময়ই ধরে রেখে ছিলেন খালেদা জিয়াও। 

এই দুই প্রান্তিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের বিজয় তাকে জাতীয় ও আঞ্চলিক দুই স্তরেই রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

জামায়াতের সঙ্গে ক্ষমতার সমীকরণ

সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত। সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ তার জন্য উন্মুক্ত। 

তবে ক্ষমতায় আসা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন; কীভাবে তিনি সরকার পরিচালনা করবেন এবং দলীয় ঐক্য বজায় রাখবেন।

ক্ষমতায় গেলে তার প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও সুসংহত করা। 

বিরোধীদলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিতের প্রশ্নে তার অবস্থান গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ হবে।

আওয়ামী লীগহীন সংসদ

একটি বড় বাস্তবতা হলো- সংসদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি।

এতে একদিকে সরকার পরিচালনা সহজ হতে পারে, অন্যদিকে কার্যকর বিরোধীদলের অনুপস্থিতিতে সংসদীয় বিতর্ক ও জবাবদিহিতার কাঠামো দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

সেই শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে- সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

দলীয় ঐক্য ও নতুন প্রজন্মের রাজনীতি

বিএনপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে সরকার পরিচালনা, অন্যদিকে সংগঠনকে আধুনিক ও গতিশীল রাখা।

আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতি থেকে প্রশাসনিক দায়িত্বে রূপান্তর কখনোই সহজ নয়।

তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা, ডিজিটাল যুগের স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা সব বিবেচনায় দলকে নতুন কাঠামোয় ভাবতে হবে।

বিশেষ করে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা তার নেতৃত্বের প্রথম পরীক্ষাগুলোর একটি হবে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’

“সবার আগে বাংলাদেশ”— এই স্লোগান নিয়েই দেশে ফিরে এসেছেন তারেক রহমান।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাসন শেষে প্রত্যাবর্তন করে নেতৃত্বের শীর্ষে ওঠার নজির একেবারে নেই তা নয়, তবে প্রতিটি প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

তারেক রহমানের ক্ষেত্রে এটি কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, বিতর্ক, অনুপস্থিতি এবং প্রত্যাবর্তনের সমন্বয়ে গঠিত এক জটিল বাস্তবতা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

“নির্বাসন থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে” এই যাত্রা যতটা নাটকীয়, সামনে পথ ততটাই কঠিন।

এখন প্রশ্ন, এই তারেক কি পারবেন- তার কথার ব্যবহারের মতো ক্ষমতার ব্যবহারে পরিমিতি দেখাতে? নীতি ও অঙ্গীকারে দৃঢ়তা বজায় রাখতে? রাজনৈতিক সহনশীলতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে? আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের দুর্বল অর্থনীতিকে আইসিইউ থেকে ফেরাতে?

এছাড়া বিএনপির ভেতরের আরেক চ্যালেঞ্জ নতুন উত্তরসূরি তৈরির। 

এই একক নেতৃত্বই আবার তারেক রহমানকে আরেক চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করাচ্ছে। কন্যা জাইমা রহমানকে সেভাবেই সামনে আনছেন তারেক রহমানও। 

বাংলাদেশ এখন ‘ইতিহাস গড়া’ সেই তারেক রহমানের কাছ থেকে এমন সব প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায়।