ভোটার কি এখনও প্রতীক দেখে ভোট দেন, নাকি পরিবার ও পরিচয়ের বাইরে গিয়ে প্রার্থীকে বিচার করেন? নির্বাচন ঘিরে এই প্রশ্নটাই ঘুরে ফিরে আসছে রাজনৈতিক আলোচনায়।
মনোবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোট দেওয়া এখন আর কেবল অভ্যাস বা আনুগত্যের বিষয় নয়, এটি ক্রমেই পরিণত হচ্ছে যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার সমন্বয়ে গঠিত এক মানসিক সিদ্ধান্তে। বিশেষ করে, তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এই সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।
তাদের মতে, ভোটারদের মধ্যে এখন একাধিক ‘ফ্যাক্টর’ একসঙ্গে কাজ করছে। বয়স্ক ও দলীয় অনুগত ভোটারদের কাছে প্রতীক ও দল এখনো গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তরুণ ও ‘সুইং’ ভোটাররা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে।
কারও ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিচয় সহানুভূতি তৈরি করতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে ভোটের সিদ্ধান্ত হয়ে উঠছে এক ধরনের ‘কগনিটিভ প্রসেস’- যেখানে আবেগ, যুক্তি, সামাজিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত হিসাব একসঙ্গে কাজ করে।
প্রতীক কতটা গুরুত্বপূর্ণ
ভোটারদের মনস্তত্ত্বে বড় একটা পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. মোহিত কামাল। ভোটে মার্কা বা প্রতীক আলাদা গুরুত্ব বহন করে, কিন্তু সেটা একটু বয়স্কদের ক্ষেত্রে, বলছেন তিনি।
“তরুণ ভোটাররা অত্যন্ত সচেতন। তারা পরিবার বা মার্কা দেখবে না, প্রার্থীর ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব তাদের কাছে গুরুত্ব পাবে,” আলাপ-কে বলেছেন মোহিত কামাল।
এখনকার ভোটার যুক্তি দিয়ে চিন্তা করেন; চিন্তা করেন যে কোন প্রার্থী আসলে কতটা লাভ হবে। প্রার্থী নিয়ে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এখানে কাজ করে বলে মনে করেন তিনি।
তবে ভোটারদের কাছে এখনো প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।
তিনি বলেন, “প্রথমত মানুষ মার্কাই দেখেই ভোট দেয়। ফিক্সড ভোটাররা আর কিছু দেখে না। সুইং ভোটারদের ক্ষেত্রে অনেক কিছু কাজ করে। আর এই সংখ্যাটাও অনেক।”
পরিবারের ভোট
মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল মনে করেন, কোন প্রার্থীর বাবা বা দাদা সংসদ সদস্য থাকলে সেই প্রার্থী অনেক সময় সহানুভূতি ভোট পান। কিন্তু সেটাও নির্ভর করে ভোটারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপরই।
তিনি বলেন, “আমার দাদা রাজনীতি করেছেন, আমার বাবা করতেন, আমি করছি। আমার বাবা যদি কোনো উপকার করে থাকে, জনগণ যদি পেয়ে থাকে, সেটার একটা পজিটিভ ইমপ্যাক্ট পড়বে।”
পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতিও গুরুত্বের এই বিষয়ে একমত ড. সাব্বিরও। তবে তিনি বলেছেন সেটি স্থানীয় পর্যায়ের চেয়ে জাতীয় পর্যায়ে বেশি কাজ করে।
“জাতীয় পর্যায়ে পরিবার বড় ফ্যাক্টর। যেমন শেখ পরিবার, জিয়া পরিবার আলাদা একটা গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনে একজন সাবেক এমপির ছেলে প্রার্থী হলে সেটা খুব বড় পার্থক্য গড়তে পারে না,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
তরুণরা বড় ফ্যাক্টর
এবার বড় অংশের তরুণ ভোটার আর তাদের কাছে ব্যক্তিটাই গুরুত্বপূর্ণ, বলে অভিমত দিয়েছেন মোহিত কামাল।
তিনি বলেন, তরুণদের বিভ্রান্ত করা খুব কঠিন। তারা যেভাবে উপলব্ধি করে সেভাবেই চিন্তা করে।
এবারের নির্বাচন অন্যবারের চেয়ে আলাদা, মন্তব্য করে রাজনীতি পর্যবেক্ষক শুভ কিবরিয়া বলছেন, “এ বারের নির্বাচন এইসব প্যারামিটারের বাইরে এবং কোনো কিছু গেস (আন্দাজ) করা একটু কঠিন।
“এই নির্বাচনে ভোটারদের একটা বড় অংশ তরুণ এবং তারা সংখ্যায় প্রায় সাড়ে চার কোটি। তারা কখনো ভোট দেয় নাই। সুতরাং তারা কী দেখে দেবে এটার কোনো তথ্য আমাদের হাতে নাই।”
নতুন ভোটারদের ক্ষেত্রে প্রতীক নয়, পরিবর্তনের ইশতেহার বড় ফ্যাক্টর হতে পারেও বলে মনে করছেন সাব্বির আহমেদ।
ভোটারের মনস্তত্ত্ব
মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল বলেন, “মানুষ এখন বিচারক, তারা সরকার নির্বাচন করে। তারা দেখে তাদের অ্যাডভেন্টেজটা কী।”
ভোটের প্রার্থী বাছাই একটা ‘কগনিটিভ প্রসেস’ জানিয়ে তিনি যোগ করেন, “কিছু ভোটার জোয়ারে ভাসবে। দলের অন্ধ ভোটাররা সবসময় দলকেই ভোট দেবে। তবে বিবেচনাসম্পন্ন মানুষ অনেক চিন্তাভাবনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।”
তবে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি প্রবণতা কাজ করে তা হচ্ছে, একবার এক দলকে দিলে পরেরবার আরেকটি দলকে দেওয়া, বলছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।
প্রতিটা নির্বাচনে একটি ‘সাধারণ প্রবণতা’ থাকে জানিয়ে দিয়ে শুভ কিবরিয়া বলেন, “নব্বইয়ের দশকে আন্দোলনে একটা জাতীয়তাবাদের জাগরণ ছিল। এবার ইসলামি ভাবাপন্ন মনোভাবের উত্থান হয়েছে।”
কিন্তু তারপরও ভোটাররা কী দেখে ভোট দেবেন তা এখনো বলা যায় না, বলছেন শুভ কিবরিয়া।
তিনি বলেন, “এই জেনারেশন অনেক শক্তিশালী, অনেক সাহসী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং অনেক ইন্ডিপেন্ডেন্ট। তাদের একটা স্বাধীন সত্ত্বা আছে।”
পরিবার দেখে বা প্রতীক দেখে ভোট দেওয়ার একটা প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকলেও এই তরুণ ভোটাররা এভাবে চিন্তা করে না বলে মনে করেন এই রাজনীতি পর্যববেক্ষক। তার মতে, তরুণরা আট-দশ জনকে দেখে একজনকে ভোট দিবে।
এবারের ভোটারদের মনস্তত্ব বোঝা কঠিন বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমেদও।
“সাধারণত ভোটারদের মধ্যে সরকার পরিবর্তনের প্রবণতা থাকে। অ্যান্টি গভার্নমেন্ট সেন্টিমেন্ট বৃদ্ধি পায় ও বিরোধী দলের প্রতি সমর্থন তৈরি হয়,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
তবে এবার সেই সুযোগ না থাকায় ভোটারদের প্রবণতা বোঝা যাচ্ছে না জানিয়ে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “পাঁচ বছর পর পর ভোট হলে এই গ্রাফটা বোঝা যায়। কিন্তু গত ১৫ বছর তো ভোটই হয়নি।”