সাক্ষাৎকার

বাইরে থেকে সমালোচনা সহজ, সরকারের ভেতরে থেকে পলিসি সেট করা ভীষণ কঠিন

আপনি একজন চিকিৎসক। ইন্টার্নশিপের পর বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন পেলেন। কিন্তু ফিল্মের পোকা ছিলো মাথার মধ্যে। ফিল্মের প্রতি আগ্রহের কারণেই কি চিকিৎসা পেশায় মন দিলেন না? 

আমি মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় আমাদের ডিএমসিতে (ঢাকা মেডিকেল কলেজ) একটা ফিল্ম সোসাইটি ছিলো। রাশ ফিল্ম সোসাইটি। এখন ফিল্ম যত ইজিলি দেখা যায়, তখন এত সহজে দেখা যেত না। কিছু ভালো সিনেমা দেখার জন্য ফেস্টিভালের দিকে অপেক্ষা করে থাকতে হতো। ঢাকা শহরে দুয়েকটা জায়গায় সিডি পাওয়া যেত ভালো। তো বড় পর্দায় দেখার জন্যই ওইটার সাথে ইনভলভ হওয়া। তারপর বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভালে কাজ করা, ফিল্ম দেখতে দেখতে একটা আগ্রহ তৈরি হওয়া। কখনো কখনো হয় না যে, আমিও ফিল্ম বানাতে চাই এবং মনে হলো সম্ভবত আমি কাজটা পারবো। তো এই সিদ্ধান্ত নিতে নিতে আমি ফোর্থ ইয়ারে চলে এসেছি। ফার্স্ট ইয়ারে ডিসিশনটা যদি নিয়ে ফেলতে পারতাম, তাহলে হয়তো মেডিকেল থেকে ফিল্মে চলে যেতে হতো। কিন্তু তখন আর সুযোগ ছিল না। মেডিকেল শেষ করে ফিল্মে পড়াশোনা করেছি। যখন পড়েছি তখন খানিকটা বানানোও হয়েছে। তবে পাস করে বেরিয়ে লম্বা একটা সময়, দেড় দশকের মতো আমি দুটো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ফিল্ম পড়িয়েছি। ইনফ্যাক্ট, এই দায়িত্বে আসার আগ পর্যন্ত মোটামুটি আমি কন্টিনিউ করেছি ইউল্যাব এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে।

রাজনীতির প্রতি আগ্রহটা কীভাবে জন্ম নিল। স্টুডেন্ট লাইফে রাজনীতি করেছেন?

একেবারেই না। আমাদের সময় ব্লগের খুব ক্রেইজ ছিল। সোসাইটি এবং পলিটিক্সে আগ্রহ ছিল (আমার)। সেখানে লেখালেখি করতাম। আস্তে আস্তে পত্রিকায় কলাম লিখতে শুরু করি। তখনও ইনফ্যাক্ট টিভিতে যাওয়া শুরু করিনি। কিন্তু প্রচুর লিখছিলাম। তারপর জনাব মাহমুদুর রহমান মান্নার সাথে আমার পরিচয় হলো। খুবই ঘনিষ্ঠতা হলো। আমি তার দলে জয়েনও করেছিলাম, নাগরিক ঐক্য। কয়েক বছর আমি ওখানে ছিলাম। পরে ইনফ্যাক্ট আমি আর থাকিনি। কারণ আমি বুঝলাম একেবারে রুট রাজনীতি যেটা, সেটা আমার যে টাইপ তার সাথে ঠিক যায় না। লেখালেখির সূত্রে একটা সময় টেলিভিশনের টকশোতে যেতে শুরু করলাম। তারপর দেখলাম যে আমি যা বলতে চাই, যা লিখতে চাই, সম্ভব হয়ে উঠছে না। তারপর নিজেই ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে কথা বলতে শুরু করলাম। এভাবেই ঢুকে যাওয়া। মানুষের রেসপন্সে মনে হলো, অন্তত সাংগঠনিক রাজনীতি করে সেখানে খুব ভালো করার যে অ্যাপটিটিউড, সেটা হয়তো আমার নেই। কিন্তু রাজনীতির যে বোঝাপড়া, রাজনীতি যে বিশ্লেষণ করতে পারা, সেই ক্ষমতা সম্ভবত খানিকটা আছে। তো তখন ওই জায়গাতেই আসলে থেকে যাওয়া হলো। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড দেখলে অনেকে বুঝবেন যেটা আমার করতে ভালো লেগেছে এবং সেটা যদি অন্যায় না হয়ে থাকে, সেটা করেছি। আমার মতো মিডল ক্লাস ফ্যামিলির একটা ছেলে যে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছিলো, সে ডাক্তার হবে, আমি খারাপ ডাক্তার ছিলাম না, ভালোই ছিলাম। কিন্তু পরের কোর্স অফ অ্যাকশন ছিল যে আমি একজন স্পেশালিস্ট হবো, আমি আমার ক্যারিয়ার কন্টিনিউ করে যাব। সেটা করিনি, ভালো লাগেনি, চেইঞ্জ করেছি। যে কাজটা ভালো লাগছে, সেটা করেছি।

এখন আপনি সরাসরি সরকারের পলিসি এবং স্ট্র্যাটেজি নিয়ে সাথে কাজ করছেন। ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে থাকেন। বাইরে থেকে সরকারকে দেখতেন, ক্রিটিক করতেন, আমরা আওয়ামী লীগের পুরো সময়টাতে দেখেছি আপনাকে অবিরত কথা বলতে। এখন ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে গিয়ে কীভাবে দেখেন? আগের যে দৃষ্টিভঙ্গি বোঝাপড়ায় কি কোনো পরিবর্তন এলো?

নিশ্চয়ই এসেছে। আমি এটা প্রায়ই বলি। এখানেও অন রেকর্ড বলছি। আমি জানি না আমি কতদিন এখানে থাকবো, আমার কতদিন আগ্রহ হবে। উল্টো, যিনি আমাকে অ্যাপয়েন্ট করেছেন তিনি আমাকে কতদিন রাখতে পারবেন। কিন্তু এটা আমার একটা বড় উপকার করেছে। ক্ষমতা কাঠামোকে কাছ থেকে দেখা। ক্ষমতা কাঠামো সম্পর্কে একটা ধারণা একটা কনশাস মানুষের কিন্তু থাকে। আমরা তো পড়ি, জানি, কথা বলি। যারা ক্ষমতা কাঠামোতে ছিলেন তাদের সাথে আলাপ হয়। যেমন ধরুন ইন্টেরিমের যে সরকারটা ছিল, প্রায় সব মানুষই আমাদের খুবই পরিচিত মানুষ। সরকারের মধ্যে তারা যখন ছিলেন তাদের সাথে আলাপ হয়েছে। তার আগে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, কোনো না কোনো ফর্মে কথাবার্তা হয়। এক ধরনের থিওরিটিক্যাল ডিসকাশনও আপনি পাবেন। সো এটা একটা পারসেপশন। আর এখন একদম কাছ থেকে দেখা। অবশ্যই, যতটা জানা ছিল তার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসছে। একটা সরকারের একটা স্থায়ী অংশ আছে, ব্যুরোক্রেসি আছে। একটা সরকারের পলিটিকাল অংশ আছে। পলিটিকাল যে অংশটা আসছে, সেটারও ক্ষমতা কাঠামোর নানান বিন্যাস থাকে। এগুলোর মধ্যে ইন্টারেকশন হয়ে একটা আল্টিমেট রেজাল্ট সামনে দেখা, এটা একেবারেই নতুন এক্সপেরিয়েন্স। এটা আমাকে খুবই সমৃদ্ধ করছে এবং এটা আমার কাছে একটা সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে হয়।

“আমি একটা ডেটার কথা বলেছি। সেই ডেটায় আমি সরকারের অংশ হয়েও স্বীকার করছি, হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে।”

সরকার চালানোর যে পলিসি এবং স্ট্র্যাটেজি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাস্তবতা, সরকারের বাইরে থেকে সমালোচনা করা যত সহজ, সরকারের ভেতরে থেকে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া, পলিসি সেট করা কি ততটা সহজ এখন মনে হয়?

মোটেও না, এটা ভীষণ কঠিন। আমি সরকারের তুলোধুনো করে সমালোচনা করতাম। তবে ওইটা চালিয়ে যাব আমি এই দায়িত্ব থেকে চলে যাবার পর। তবে আমি সরকারকে এত কঠোরভাবে সমালোচনা করবো না, যদি সেটা গণতান্ত্রিক সরকার হয়। দ্যাট ইজ ভেরি ইম্পরটেন্ট। শেখ হাসিনার সময় একটা অবৈধ সরকারকে আমি আর সরকার মানতাম না। নির্বাচন ম্যানিপুলেট করে, কখনো প্রতিপক্ষকে আসতে না দিয়ে, কখনো রাতের বেলা সিল মেরে, গায়ের জোরে ক্ষমতায় ছিল। সুতরাং তাকে আমরা সেভাবে ক্রিটিক করেছি। কিন্তু ফেয়ার নির্বাচনে যখন কেউ ক্ষমতায় আসে, তাকে কিন্তু আমি ওউন করি। একটা ফেয়ার গেম। ফেয়ার গেমে আমি হেরেছি। কিন্তু আবার একই সাথে বলছি, কোনো একটা সরকার সে যদি হাসিনার মতো স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে, তার বিরুদ্ধে শক্ত ক্রিটিকটাই থাকবে। কারণ আমরা যখন তার লেজিটিমেসি নিয়েই প্রশ্ন করি, তখন তার অন্যান্য ভুলভ্রান্তি কোনোভাবে ছাড় দিতে প্রস্তুত নই।

কিন্তু একটা লেজিটিমেট সরকার কি ভুল করতে পারে না? কিংবা অন্যায় করতে পারে না? তখন তার পদত্যাগ চাইতে পারবেন না?

চাওয়া যাবেও না, তা বলছি না। কিন্তু আমি আমাদের কাছের দেশের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি। ইন্ডিয়াতে কিছুদিন আগে ককরোচ জনতা পার্টি একটা ম্যাসিভ মুভমেন্ট তৈরি করল। যেখানে সমস্যাটা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কেন্দ্র করে। প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছেন। আরো এক্সট্রিম একটা এক্সাম্পল দিতে চাই। সম্ভবত ২০২০ সালে, বিজেপি সরকার বলেছিলো তারা নতুন কৃষি আইন করবে। ভারতে ২০২টা খাদ্যপণ্য সরকার নিজে কেনে। ফলে চাষীর দামের নিশ্চয়তা থাকে। তারা বলেছিলো এটা বাজারের হাতে ছেড়ে দেবে। ওই আইনের বিরুদ্ধে মারাত্মক আন্দোলন হয়েছিল। দিল্লি ব্লকেড হয়েছিল। হরিয়ানা, পাঞ্জাব যেসব জায়গায় কৃষি প্রধান, কৃষকরা সব রাস্তায় হেঁটে হেঁটে এসেছিলেন। দিল্লি ঘিরে ফেলেছিলেন। ২০ জনের বেশি কৃষক মারা গিয়েছিলেন। কেউ বলেন নাই যে বিজেপি সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। তারা বলেছেন এই আইন পাল্টাতে হবে। এই চাপের মুখে নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েছেন। ওখান থেকে সরে এসেছেন। আমি যেটা বলতে চাইছি, আসলে মূল জায়গাটা হাসিনার সময় আমরা যেভাবে কথাগুলো বলতাম, কারণ ওর প্রতিটা দিন আমরা সহ্য করিনি। কারণ তুমি অবৈধ তোমাকে যেতে হবে। কিন্তু একটা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত, ফেয়ারলি নির্বাচিত সরকার পাঁচ বছর থাকবে, মাইন্ডসেটটা আমাদের তৈরি করতে হবে।

মানে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হলে সুনির্দিষ্টভাবে?

এই মাইন্ডসেট রাখতে হবে সরকার পাঁচ বছর থাকবে। এর ভুলভ্রান্তি নিয়ে আমি জনগণকে সচেতন করি, তার সাথে কানেক্ট করি। তারপর আগামী পাঁচ বছর পর তাকে আমি ক্ষমতা থেকে দূর করতে চেষ্টা করি। আমি এভাবেও বলেছি, সামনে তো লোকাল গভর্মেন্ট ইলেকশন। সেখানে ব্যবহার করুন, আমাদের কোথায় কোথায় ব্যর্থতা আছে, ভুল আছে জনগণকে বোঝান। এতগুলো লোকাল গভর্মেন্টের কন্ট্রোল তারা পেয়ে যেতে পারেন।

সুনির্দিষ্ট জায়গায় কথা বলার মাইন্ডসেট তৈরি করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আপনি কীভাবে দেখেন? রিসেন্টলি রাড্ডার ঘটনা, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, অসংখ্য মারামারির ঘটনা প্রতিদিন হচ্ছে। ডেইলি নিউ এইজ একটা খবর করেছে যেখানে বলা হয়েছে ৯০০ মরদেহ উদ্ধার হয়েছে নদী থেকে। এরকম অসংখ্য ঘটনা আপনারও নিশ্চয়ই চোখে পড়ে।

আমরা এটাকে যদি সাবজেক্টিভ পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে দেখি, সেটা হচ্ছে আমরা তো তুলনা করে বলব। এখন আমরা আইনশৃঙ্খলাকে কোন সময়ের সাথে তুলনা করব? যদি শেখ হাসিনা পরবর্তী সময়ের সাথে, ইন্টেরিমের সাথে তুলনা করি, আমি মনে করি আমরা খুবই ভালো অবস্থায় আছি। আমি আপনাকে তথ্য দিয়ে বলি। এই সরকারের ছয় মাস পূর্তিতে, তার আগের ছয় মাসের ডেটার সাথে একটা কম্পারিজন মিডিয়াতেই এসেছিল। সেখানে দেখা গেছে খুনের সংখ্যা বেড়েছে। খুন সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম অপরাধ। এটা বেড়েছে, এটা ভালো কথা না। কিন্তু চুরি, ডাকাতি বা এই ধরনের অপরাধের প্রবণতা কিন্তু কমেছে। ইন্টেরিমের সময়ের সাথে তুলনা করলে একটা ব্যাপক আইনশৃঙ্খলার পরিবর্তন হয়েছে। ইন্টেরিমের সময় অপরাধের বাইরেও বাংলাদেশের একটা এনার্কি ছিল। আপনার ইচ্ছে হলো রাস্তা ব্লক করে বসে যাবেন, উদ্ভট দাবি দেবেন। আপনার ইচ্ছা হলো গিয়ে একটা মাজার ভাঙবেন, ১০০-২০০ মাজার ভাঙ্গা হয়েছে। আপনি জোর করে একটা কারখানা থেকে একজনকে বের করে মেরে রাস্তার গাছে ঝুলিয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে লিডিং দুটো পত্রিকায় ঘোষণা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধ হয়ে গেছে। নাটক, যাত্রাপালা, মেলা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের সময়ে দুই-তিনটা ঘটনা এরকম নেই তা বলছি না, কিন্তু এগুলো অনেক কম। একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি, একটা স্টেট যে এক্সিস্ট করে না, এই যে একটা অবস্থা ছিল, সেই অবস্থাতো অ্যাট লিস্ট এখন নেই।

আপনি ইন্টেরিমের সময় মেয়েদের ফুটবলের কথা বললেন। সম্প্রতি ঢাকায় একজন অ্যাথলেট সাজ্জাদ স্নিগ্ধ, তাকে হাফ প্যান্ট পরে মেট্রোরেল স্টেশনে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাকে প্রায় ৪০ মিনিট আটকে রাখা হয়েছে।

এখানে একটু ডিফারেন্স আছে। আমি রাড্ডার ঘটনাটার কথা বলি। আমি আপনার সাথে দ্বিমত করছি না। এই অপরাধটা, অত্যন্ত বাজে অপরাধ। এটা সরকারের ইমেজের জন্য ক্ষতিকর। জানা যায় ঘটনাটা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে হয়েছে। পুলিশের থানা আছে সবকিছু আছে এর মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে। সেটার সাথে পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নেক্সাস থেকে থাকতে পারে। অলরেডি কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তদন্ত করে। এগুলো ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলেই আমি মনে করি। কারণ আমি আপনার সাথে দ্বিমত করছি না। এখানে খুবই যোগাযোগে থাকা মানুষ যদি না থাকে, ক্ষমতাসীন মানুষ যদি না থাকে এই ঘটনা ঘটতে পারে না। দেখার ব্যাপার হচ্ছে, সরকার এটাকে কগনিজেন্সে নিয়ে ব্যবস্থাটা নিল কি-না। দ্যাট ইজ ভেরি ইম্পরট্যান্ট। আর আপনি মেট্রোর যে ঘটনার কথা বলেন, একটু ডিফারেন্স আছে। সেটা হলো, ধরুন বাংলাদেশে কোনো একটা জায়গায় একজন পুলিশ এরকম একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছেন, এটা খুবই অন্যায় ঘটনা বা বাজে ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো এটা সিস্টেমেটিকলি হচ্ছে কি-না, দ্যাট ইজ ইম্পরট্যান্ট। যেমন ধরুন নাটক বা নৌকা বাইচ করা যাবে না, এমন একটা দুটো ঘটনা আছে। কিন্তু এটা সিস্টেমেটিক না। ইন্টেরিমের সময় এটা সিস্টেমেটিক হয়েছে। একটা প্যাটার্ন ছিল। ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এইটুকুই বলতে চাইছি। আমি আপনার সাথে দ্বিমত করবো না, একমত প্রকাশ করব, সেটা হচ্ছে রাড্ডার যে হামলা বা এমন ঘটনা একটাও ঘটা উচিত না। কিন্তু যদি সারা পৃথিবীর কথা আবার চিন্তা করেন, অপরাধ ঘটে। স্টেটের যে কাজটা করা দরকার, জনগণকে এই আশ্বাসটা দিতে হবে, জনগণ কনভিন্সড হতে হবে যে সরকার ক্রাইমকে কোনোভাবেই একসেপ্ট করেনি। বরং এটার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়।

“আমি আপনার সাথে একমত। এটা নিয়ে আমি আগেও কথা বলেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার কাজ কোনো পলিটিকাল পার্টির না।”

আপনার সাথে একমত পোষণ করে ধরে নিলাম প্যাটার্নটা হয়তো নাই। কিন্তু ছোট্ট একটা জিনিস ছিনতাই। এই ছিনতাই যে অনেক বেড়েছে আগের চেয়ে, এইটা কি আপনি দ্বিমত করবেন? এখন ফেইসবুকের যুগ, সিসিটিভির যুগ, প্রচুর ভিডিও পাওয়া যায়। ধরেন আমার নিজের সাহস নাই, আমি রাত ১২ টায় আমার ফোনটা হাতে নিয়ে মতিঝিল দিয়ে হেঁটে আমার পুরান ঢাকার বাসায় যাব। এই সাহসটা বাংলাদেশে কোনোদিনই আমার হয় নাই। একটা নির্বাচিত সরকার যখন আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বলে যে আমরা ভালো আছি আগের চেয়ে, তাইলে এই সাহসটা অন্তত ব্যক্তি হিসেবে আমার মধ্যে এখনো তৈরি করতে পারলো না কেন সরকার?

খুবই জরুরি প্রশ্ন। তার আগে বলি, ছিনতাই আসলে অনেক বেড়েছে এটাও সঠিক না। আমি একটা ডেটার কথা বলেছি। সেই ডেটায় আমি সরকারের অংশ হয়েও স্বীকার করছি, হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে। তার মানে যে ডেটাটা বলছি, ডেটাটা মিথ্যা না। সেই ডেটার ভিতরে হত্যাকাণ্ডের সকল ঘটনা নথিভুক্ত হয়, ছিনতাইয়ের অর্ধেকের বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয় না।

ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় গেলে কেউ ছিনতাইয়ের মামলা নিতে চায় না...

আগেও নথিভুক্ত হতো না। আমি আগের সাথেই তুলনা করে বলছি। আমাদের ছয় মাস, তার আগের ছয় মাসের তুলনা করছি। নথিভুক্ত হওয়ার প্রবণতা কম, আমি এটাও মানি। আগেও কম নথিভুক্ত হতো, এখনো কম নথিভুক্ত। এটা কিন্তু বেসড অন ডেটা। কিন্তু আমি আপনার সাথে দ্বিমত একেবারেই করি না, আপনি যে কথাটা বলছিলেন পারসেপশনটা কি? পারসেপশন ম্যাটার করে। জনগণ বা নাগরিকদের মধ্যে যদি নিরাপত্তাহীনতার পারসেপশন থাকে, একজন নাগরিক হিসেবে আপনি যে কথাটা বললেন, যেভাবে ভিডিও আসছে বা সবকিছু মিলে দু-একটা ঘটনারও কিন্তু ইমপ্যাক্ট অনেক বড় হতে পারে। এই প্রসঙ্গে বলি, যেমন সালমান মুক্তাদিরের ঘটনাটা। তিনি একেবারে ভুলভাবে প্রেজেন্ট করেছেন। আমরা তার প্রতি সহানুভূতি রেখে কথা বলি, তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু প্রাথমিকভাবে যখন ওইটা এলো, তখন অনেকের মনে হতে পারে, সালমান মুক্তাদিরের উপরে যদি এটা হতে পারে, তাহলে আমার উপরে কেন হতে পারবে না? এগুলো কিন্তু পারসেপশন তৈরি করে। কিন্তু এটা চাঁদাবাজির ঘটনা ছিল না। উনি পরে নিজে বলছেন সেটা। একাধিক ভিডিওতে তার বয়ানে ফ্লাকচুয়েশন ছিল। উনি নিজেই এটা পরে এস্টাবলিশ করেছেন যে, উনার কাছে কেউ চাঁদা চায়নি। এমনকি বাড়িওয়ালার কাছে চাঁদা চেয়েছিল কি-না নিশ্চিত না। এই হামলা ভাঙচুর ওনাকে টার্গেট করে হয়নি, এগুলো উনি সব নিজে বলেছেন। কিন্তু আবার জেনুইন কিছু ঘটনাও পারসেপশন মানুষের তৈরি করে। এই যে রাড্ডা হসপিটালে যে ঘটনা ঘটলো, এটা পারসেপশন তৈরি করে। আমাদের সরকারকে অবশ্যই পারসেপশনের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে আমি এটা মনে করি।

সালমান মুক্তাদিরের কথায় ফ্লাকচুয়েশন ছিল। কিন্তু আবার বিএনপির কেউ কেউ যে চাঁদাবাজির সাথে কিংবা এই ধরনের অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত না, এইটাও কি বলা যাবে?

না, তা বলছি না। আমি প্রায়ই একটা কথা বলি। স্বৈরাচারী সরকারের সাথে গণতান্ত্রিক সরকারের একটা বেসিক ডিফারেন্স হচ্ছে, গণতান্ত্রিক সরকার নিজেকে নিখুঁত মনে করে না। সে তার ভুল সংশোধন করে। স্বৈরাচারের মধ্যে কিন্তু একটা প্রবণতা থাকে যে, আমার কোনো ভুল হয় না। আমি যা যা করেছি সব ঠিক করছি। আমরা তা মনে করি না। আমাদের দলের কোনো কোনো সদস্যের এই ধরনের অন্যায়ের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা নেই, এটা আমরা বলব না। এটা আছে। মানুষ সব মিথ্যা বলছে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এটা আমি আপনার সাথে দ্বিমত করছি না। সরকার হিসেবে বা দল হিসেবে এই ঘটনাগুলো গ্র্যাজুয়ালি কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে।

আগে বলা হতো যে পুলিশে যারা চাকরি করেন তারা ছাত্রলীগের ক্যাডার। তারা পুলিশের ড্রেসটা পরে বিসিএস দিয়ে পুলিশের ক্যাডার হয়েছেন। তারা বিএনপি-জামায়াতের উপর অত্যাচার-নিপীড়ন করছেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, জাসদ কার্যালয়ে যে অভিযানটা হলো পুলিশের, সেখানে পুলিশের ড্রেসটাও চাপাতে হয়নি। যুবদলের একজন নেতা পুলিশকে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছেন। জিজ্ঞেস করছেন 'আপনারা স্ট্রং তো?’, ‘আপনি ব্যারিকেড দেন’, এই ভিডিওগুলোতো পাবলিক ডোমেইনে আছে।

আমি আপনার সাথে একমত। এটা নিয়ে আমি আগেও কথা বলেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার কাজ কোনো পলিটিকাল পার্টির না। এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে করতে হবে। সেটা তাদের জায়গা থেকে করা উচিত এবং সেটা তারা প্রফেশনালি করবেন, এটাই হওয়া দরকার। আমি আপনার সাথে এই ব্যাপারে একমত যে এটা আসলে তাদেরই দায়িত্ব, সেটা তাদের দিক থেকে হওয়া দরকার।

আপনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বাস্তবতাটা এখন কেমন দেখেন? আপনাকে আমরা দেড় দশক অবিরত লিখে যেতে দেখেছি, কথা বলতে দেখেছি। আপনাকে কেমন চাপ সামলাতে হয়েছিল তখন?

একটা ইন্টারেস্টিং এক্সপেরিয়েন্স বলি। আওয়ামী লীগের লোকজনের সাথে তো প্রচুর টকশো করেছি। আমাকে একদিন একজন অন রেকর্ড বললেন যে, "আপনি তো এত কথা বলছেন, আপনি লেখেন, আপনি টকশোতে আসেন। নিজে ইউটিউব চ্যানেল খুলে কথা বলছেন ইচ্ছেমতো।" আমি একটা কথা বলেছিলাম যে, "আপনাদের পতন কোনো একদিন হবে, সেদিন আমি একটা বই লিখতে শুরু করব যে আমি আসলে কী কী বলি নাই।" একটা সেলফ সেন্সরশিপ ছিলই। যেমন ধরুন, শেখ হাসিনাকে পয়েন্ট করে কিছু বলা যাবে না। একবার-দুবার বললে এরপর আপনি আসলে আর যেতে পারবেন না। তখন আপনাকে কোনো না কোনো ফর্মে কৌশল বের করতে হবে। তার এবং তার ফ্যামিলিকে সরাসরি না বলে 'সরকার' বা কিছু একটা বলে আপনি বলবেন। যাবতীয় ঘটনা ঘটিয়েছেন কে? হাসিনা ও তার ফ্যামিলি। লুটপাট করেছেন কে? তার ফ্যামিলি, লিড করেছেন তার বোন। এসব আমরা তখনও জানতাম। খুব ভালোভাবে জানতাম। যেহেতু এই সেক্টরে ছিলাম, এই ব্যাপারে কথা বলেছি আওয়ামী লীগের লোকজনের সাথে। আমাদের হাতে প্রচুর ডেটা ছিল। অনেক কথাই আসলে তখন এভাবে বলা যায় নাই। কিছু সেলফ সেন্সরশিপ তো ছিলই।

আবার ধরেন এমনভাবেওতো বলা হয় যা অত্যন্ত অন্যায়। মানুষের মতপ্রকাশ নিয়ে চিন্তাটা কোন জায়গায় পৌঁছেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো টর্চারড হয়েছিলেন। আমাদের তার প্রতি এমপ্যাথি ফিল করা উচিত। কিন্তু এনসিপির একজন নেতা সেটা নিয়ে বিদ্রুপ করে কথা বলেছেন না? এটা অত্যন্ত বাজে কাজ করেছেন। কিন্তু তিনি তো সিকিউর ফিল করেন যে, আমি এটা বলতে পারি। বললে আমার কোনো সমস্যা হবে না।

তারপর, খুবই সিগনিফিকেন্ট একজন বিরোধীদলীয় নেতা বলছেন জনাব তারেক রহমানকে, ক্ষমতায় থাকার জন্য কত টাকা চাঁদা দিতে হয়। এই যে কথাগুলো আপনি বলছেন এখন একেবারে আমাদের সর্বোচ্চ প্রধান মানুষটাকে কেন্দ্র করে, বলা যাচ্ছে তো। আমি এটাই বোঝাতে চাইছি যে, সরকারের দিক থেকে মানে মতপ্রকাশ নিয়ে এতটা নির্ভয় আমি আর কখনো দেখিনি। কয়েকজন আছে, আমি নাম বলছি না, সিগনিফিকেন্ট নেতা, পার্লামেন্ট ইলেকশন করেছেন, তারা কী ভাষায় কথা বলে দেখবেন।

চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন করি। হাসনাত আব্দুল্লাহ একটা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন 'গণভিক্ষা কর্মসূচি'। এটাকে কি আপনি বিরোধী দলের এক ধরনের স্যাটায়ারিকাল রাজনীতি বলবেন?

হ্যাঁ, রাজনীতিতে সেটা থাকবে। এই কর্মসূচি তারা নিতেই পারেন। রাজনীতির কাজ কী? রাজনীতির কাজ হচ্ছে ইউ হ্যাভ টু সেল আইডিয়া, ইয়োর অপিনিয়ন, ইয়োর পারসেপশন। বিএনপি চাঁদাবাজ, বিএনপি চাঁদাবাজি করে, একটা ফ্রেমিংয়ের চেষ্টা দীর্ঘদিন থেকে হয়েছে। বিএনপির কোনো লোকজন চাঁদাবাজির সাথে জড়িত না, বিএনপির নামে চাঁদাবাজি লোকজন করেন, আমি তা বলছি না। কিন্তু এটা শুধু তারাই করেন, ব্যাপারটা এরকম না। কিন্তু একটা ফ্রেমিং আছে। রাজনীতি এভাবেই কাজ করে। আমি এতে সমস্যার কিছু দেখি না এবং আমাকে এটা কমব্যাট করতে পারতে হবে। আমি কীভাবে ফাইট করব, আমার স্ট্র্যাটেজি লাগবে। রাজনীতিতে এগুলো চলুক, আমি এগুলোতে প্রবলেম দেখি না।

এই কমব্যাট করার কৌশলে, অনলাইনের যুগে, বিএনপি কি একটু দুর্বল? আওয়ামী লীগের সময় বলা হতো তাদের কালচারাল ফ্যাসিজম আছে। শিবির-জামায়াতেরও একটা বিশাল অনলাইন উপস্থিতি আছে। সেই বিচারে বিএনপি খানিকটা দুর্বল, এরকম একটা পারসেপশন আছে।

হাসিনা ফ্যাসিস্ট হতে চেয়েছেন, পরে মাফিয়া হয়েছেন, তার এটা দরকার ছিল। আমি জামায়াতের অ্যাটিচিউড, আচরণ, তাদের গঠনতন্ত্র থেকে সবকিছুর মধ্যে যথেষ্ট ফ্যাসিস্ট উপাদান আছে বলে বিশ্বাস করি। তাই তারও এটা ওই কারণেই হয়তো প্রয়োজন। বিএনপি একটা মধ্যপন্থি দল। মধ্যপন্থি দলগুলোতে একটা ঘটনা ঘটে। যেহেতু এখানে খুব সুনির্দিষ্ট আদর্শকে কেন্দ্র না করে, বরং জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে রাজনীতি হয়। তখন এই বয়ান তৈরি, বয়ানের যুদ্ধ, এই ধরনের প্রবণতা তুলনামূলক কমই থাকে। তবে আমি একেবারেই একমত, অনলাইন যেহেতু মানুষের পারসেপশন তৈরি করে, সেগুলোকে যুক্তির মাধ্যমে, তথ্যের মাধ্যমে ফাইট বিএনপিকে করতে হবে, সরকারকে করতে হবে।

তবে এখানে একটা ক্লিয়ার ডিস্টিংগুইশিং লাইন আছে। অপতথ্য, বিশেষ করে মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন, ম্যালইনফরমেশন আমাদের এখানে প্রচুর আছে। সো কলড ন্যারেটিভ তৈরি করার জন্য ডিসইনফরমেশন নিয়ে কাজ করা যাবে না। এটা একটা ফৌজদারি অপরাধ। সুতরাং একটা হলো আমরা ন্যারেটিভ ফাইট ন্যারেটিভ দিয়ে করব। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস আমরা লিগালি ফাইট করতে চাই।

যেমন ধরুন, চাঁদাবাজির জন্য সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর হয়েছে লিখে টপ বিরোধীদলীয় লিডাররা স্ট্যাটাস দিয়ে দিয়েছে। এটি ডিসইনফরমেশন। অ্যাট লিস্ট মিসইনফরমেশন বলব। আমি যদি ধরেও নেই যে সালমান মুক্তাদিরের কোনো ইনটেনশন ছিল না, উনি ক্ষোভে বলে ফেলেছেন, স্টিল এটা একটা ভুল তথ্য। একইভাবে নানারকম মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন আছে। আমাদের বিরোধী দল যেন দায়িত্বশীল হন। তারা মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন বা ম্যালইনফরমেশন নিয়ে ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা না করেন। সরকারের ভুলভ্রান্তি প্রচুর আছে। দলের ভুলভ্রান্তি আছে। এগুলো নিয়ে যদি আপনি যৌক্তিকভাবে ফাইট করতে চান, খুবই সম্ভব। এটাই করলেই একটা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

বিএনপি কি সরকার এবং দল, এই দুইটার মধ্যে ফাইন লাইন ড্র করতে পারলো?

আমার মনে হয় ফাইন লাইনটা আছে। তবে দলকে অতটা ভাইব্রেন্ট এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না। এই কারণে মনে হচ্ছে এটা মিশে গেছে। আপনি যে প্রশ্ন করেছেন তার ভেতরে একরকম উত্তরও আছে। আসলে মানে দলকে আমরা সেই অর্থে এখন খুব ভিজিবল দেখছি না। এটা ফ্যাক্ট। আমি বিএনপির অফিসগুলোর সামনে দিয়ে যখন যাই, তখন দেখি যে অফিসগুলো খুব সরগরম না। আমি যেটা মনে করি, বিএনপির এখন দলের একটা নতুন অ্যালাইনমেন্ট তৈরি হতে হবে। দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের ওদিকে ব্যস্ততা আছে। আমি দলের কোনো সিগনিফিকেন্ট পজিশনে নেই। বিশ্লেষক হিসেবে বলছি, দলের একটা কাউন্সিল হবে। সেই কাউন্সিলে নতুন নেতৃত্ব আসবে। সেই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই এটা বিবেচনা করা হবে।

ধরুন আমি বলছি, যিনি ক্যাবিনেটে অনেক বেশি ব্যস্ত, তিনি হয়তো দলের অত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে না থেকে অন্য কোনো দায়িত্বে থাকবেন। যখন এইভাবে কাজগুলো করা যাবে, আমরা দলকে আবার খুবই ভাইব্রেন্ট অবস্থায় দেখা যাবে। তখন মনে হবে সরকার এবং দলের মধ্যে একটা ডিস্টিংগুইশিং লাইন আসলেই আছে।

এটা না করতে পারলে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয় বলে মনে হয় কি?

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। একটা পলিটিকাল সরকারের দল সবসময় স্ট্রং থাকতে হয়। এটাই তার শক্তির জায়গা। যেমন শেখ হাসিনা। একটা সময় আর দলের উপরে ডিপেন্ড করেন নাই। তার দল প্রয়োজন ছিল না। দল প্রয়োজন ছিল শুধুমাত্র রাস্তায় বিরোধী দলকে ঠ্যাঙ্গানোর জন্য। একটা দলের তো অনেক কাজ আছে সরকারের হয়েই। যেমন ধরুন জ্বালানি নিয়ে আমি একটা উদাহরণ দিলাম, প্রচুর ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে, সরকারকে ব্লেইম করা হয়েছে। এখন আমরা অনেক সময় যেটা বুঝি, বোঝানোর চেষ্টা করেছি, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই কাজটা করার চেষ্টা করা হয়েছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে করার চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে আমরা দেখানোর চেষ্টা করেছি আসলে এই দোষটা সরকারের না। সরকার এটার সমাধানের চেষ্টা করছে। এই যে কেন সরকারের না, এই মেসেজটা তো আসলে সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া দরকার। এখানে কিন্তু দল খুব ভালো রোল প্লে করতে পারতো।

প্রত্যেকটা গণতান্ত্রিক সরকারের দল প্রয়োজন হয়। আওয়ামী লীগের সময় কী হয়েছিল? ওনার দল ছিল না সেই অর্থে, দলের কিছু লাঠিয়াল ছিল। কোথাও কোনো রকম এদিক সেদিক করছে কিনা পেটাতে হবে। ওর দল লাগতো না, কারণ হচ্ছে ওকে তো নির্বাচিত হতে হবে না। তখন খেয়াল করবেন, আমি আওয়ামী লীগের প্রচুর নেতার কাছ থেকে ইনফর্মালি শুনেছি যে, তাদের দল শেষ হয়ে বরং প্রশাসন, পুলিশ সেগুলো অনেক বেশি পাওয়ারফুল হয়ে উঠছে কারণ তাদেরকে দিয়ে ক্ষমতায় থাকছে। সে কারণে আমি বলি যে দলটা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে এবং আবারও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হতে চায়, তার তো এই কাজগুলো জনগণ, মানে দল করবে। দল সরকারের কর্মসূচি জনগণকে বোঝাবে। সরকারের কোনো ভুলভ্রান্তি থাকলে সেটা কেন হয়েছে, সেটার জন্য জনগণকে বোঝাবে। তার আশাটা কী হবে? সান্ত্বনাটা কী হবে? সেগুলো কিন্তু দল করবে। সো, দল যদি ঠিক না থাকে, সরকার ভালো থাকবে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় স্ট্র্যাটেজি, পলিসির বাস্তবতায় যে ইকোসিস্টেমের মধ্যে বাংলাদেশ চলে, একটা রাজনৈতিক দল চাইলেই কি হুট করে আমলাতন্ত্র থেকে বের হয়ে জনগণনির্ভর হয়ে উঠতে পারবে। এটা কি এত সহজ?

আমি মনে করি সম্ভব। আপনার প্রশ্নটা খুবই লজিকাল। ব্যুরোক্রেসি যেভাবে কাজ করে সেটা থেকে খুব দ্রুত বের হওয়া যাবে না, কিন্তু বের হওয়া সম্ভব। আমার এই কয়েক মাসের এক্সপেরিয়েন্স থেকে বলতে পারি। ব্যুরোক্রেসি দীর্ঘদিন একটা নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করেনি। সে হাসিনার সাথে কাজ করেছে। ব্যুরোক্রেসি থাকবে। তারা যে সরকারের সাথে কাজ করেছেন, ওই সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার ছিল না। সেই সরকার আবার ক্ষমতায় থাকার জন্য পার্টিসিপেটরি, কম্পিটিটিভ ইলেকশন করারও দরকার মনে করেনি। সুতরাং সে কী করবে না করবে, সেটা নিয়ে জনগণের কাছে কমিটমেন্ট নেই। একটা ইশতেহার হাসিনাও দিতেন। বাস্তবে তা হলো কি হলো না, তাতে কিছু আসে যায় না। জনগণকে তো ভোট দিতে হবে না, আমি আমার ভোট আমার মতো করে ফেলবো।

আর এখন একটা নির্বাচিত সরকারের সাথে কীভাবে কাজ করতে হবে, নির্বাচিত সরকার তার দেয়া কমিটমেন্ট যে জনগণের কাছে টাইম ধরে ধরে বাস্তবায়ন হচ্ছে দেখাতে চায়, এগুলো ব্যুরোক্রেসিকে বুঝতে হবে। আমি তাদেরকে ব্লেইম করছি না। কিন্তু আমি শুরুতে এটার কিছুটা ঘাটতি দেখেছি। আমি মনে করি, যেহেতু তারা কাজ করতে শুরু করেছেন, তারা এটা বুঝবেন। কারণ, জনগণকে দেয়া কমিটমেন্ট যদি সরকার বাস্তবায়ন করতে না পারে, এটার জন্য সাফার সরকার করবে। সরকার বলতে আমি পলিটিকাল অংশের কথা বলছি। ব্যুরোক্রেসিও সরকারের অংশ। কিন্তু পলিটিকাল অংশ সাফার করবে। তারা করবেন না। এটা তো আসলে হবে না। তাদেরকে এটা বুঝতে হবে যে সরকারের সাথে এভাবে কাজ করতে হয়।

একটা গল্প শুনতেই চাই। সবাই শুনেছি, জেনেছি। আপনার দিল্লি যাওয়ার সময় যে অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ঘটনাটি ঘটেছিল, আপনার ফার্স্ট হ্যান্ড রিঅ্যাকশন কী ছিল? একজন অ্যাডভাইজার আপনি একটি দেশে যাচ্ছেন, যারা বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে, বাংলাদেশও তাদেরকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে ট্রিট করে। সেই দেশের এয়ারপোর্টে আপনাকে ঢুকতে দেওয়া নিয়ে এমন ঘটনায় রিঅ্যাকশন কী ছিল?

আমি তো প্রথম অপেক্ষা করলাম। আমাকে অপেক্ষা করতে বলা হলো এবং খুবই নেগলিজেন্সের সাথে। আমাদের হাইকমিশনার কিন্তু আমি যাওয়ার আগে থেকে অপেক্ষা করছিলেন। আমি তার সাথে নেমে এসে কাউন্টারে গেছি। হাইকমিশনার তার পরিচয় দিয়েছেন, আমার পরিচয় দিয়েছেন। অ্যান্ড দে ফাউন্ড সাম প্রবলেম। একটা ট্রাভেল বার ছিল আমার বিরুদ্ধে। আগে থেকেই ছিল। লজিকাল কারণে। আমরা ইন্ডিয়ার রোল বাংলাদেশে যা ছিল সেটাকে ক্রিটিক করেছি। সমস্যা হচ্ছে নেগলিজেন্স। তাদের এই প্রবণতা আমি খেয়াল করলাম।

যখন অনেকটা সময় হয়ে গেল আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি ভারতে আর ঢুকছি না। মজার ব্যাপার হচ্ছে তখন দে গট ক্রেজি। তারা আমার সবকিছু ঠিক করে দিচ্ছেন, আমাকে যেতে হবে। যেটা বুঝতে পারলাম, তারা আমাকে আসলে ছেড়ে দিতেন। কিন্তু আমাকে একটা মেসেজ হয়তো দিতে চেয়েছেন। অন্তত আমি অ্যাজ এ হোল ইন্ডিয়ার কথা বলছি না, ইন্ডিয়ার অন্তত কোনো একটা সেগমেন্ট। ইন্ডিয়ার হাইকমিশন আমার সাথে কিন্তু যোগাযোগ করছিল। যখন আমি 'না' করেছি, তখন তারাও আমাকে কিন্তু খুবই রিকোয়েস্ট করছিলেন যেন আমি যাই। কিন্তু আমার কাছে যে ফার্স্ট হ্যান্ড রিঅ্যাকশন যেটা ছিল, হাসিনার বাংলাদেশকে তারা যেভাবে দেখতো, আমার মনে হয়েছিল এই মেসেজটা তাদের কাছে থাকা দরকার। ইট ইজ আ ডিফারেন্ট স্টেট, একটা সভারেন স্টেট যে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায়। আমার সাথে আত্মমর্যাদা নিয়েই ভারতকে এনগেজ হতে হবে। এই মেসেজটা আমার মনে হয়েছিল দেয়া দরকার, দেন আই ডিড।

রিসেন্টলি তো ইন্ডিয়ান হাইকমিশনার আপনার সাথে দেখা করেছেন, এই বিষয়টা নিয়ে কি আলাপ হয়েছে?

আলাপ হয়েছে। কথাটা উঠেছিল। এরকম কিছু ঘটবে, সেটা তারাও ভাবেননি। যখন এটা ঘটে তখন কিন্তু তিনি (দীনেশ ত্রিবেদী) বাংলাদেশে ছিলেন, কিন্তু দায়িত্ব নেননি। তাদের দিক থেকে আন্তরিকতা আমি আগেও দেখেছি। ওই ঘটনার পরও তারা চেয়েছেন আমি আমার কোনো কনভেনিয়েন্ট টাইমে ইন্ডিয়াতে যেন ট্যুর করতে যাই। তারা আমাদের জন্য, আমার জন্য সেখানে যাদের সাথে এনগেজমেন্টের প্রয়োজন আছে, তারা সেগুলো করবেন। তারা তাদের জায়গা থেকে সেই চেষ্টা করেছে।

এ কাজটা যে তাদের দিক থেকে ঠিক হয়নি, সেই ধরনের একটা পারসেপশন আমি পেয়েছি। দে আর ভেরি কর্ডিয়াল। অন্তত বর্তমান হাইকমিশনার যিনি আছেন। এটা আসলে অনেক বড় দেশ, সেখানে পাওয়ার সেন্টার অনেক। অন্তত আমি তাকে দেখছি যে তাদের দিক থেকে সেই আন্তরিকতা আছে। আমার সাথে যা হয়েছে সেটার ব্যাপারে তো আছেই। একই সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যাওয়া এবং বাংলাদেশের সাথে রি-অ্যালাইনমেন্ট, আমি তাকে ইনফ্যাক্ট এটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। আমি বলার চেষ্টা করেছি, আমাদের কিছু কিছু সেনসিটিভিটির জায়গা আছে। শেখ হাসিনা ওখানে বসে বাংলাদেশকে হুমকি দেবেন, গণঅভ্যুত্থান নিয়ে, গণঅভ্যুত্থানে যারা ইনভলভ ছিলেন তাদেরকে নিয়ে বাজে কথা বলবেন, বাংলাদেশে ভায়োলেন্স উসকে দেয়ার চেষ্টা করবেন, এই জিনিসগুলো বাংলাদেশের মানুষ একসেপ্ট করবে না। সো আমি আমার জায়গা থেকে বলেছি। মোটা দাগে আমার কাছে মনে হয়েছে তারা আন্তরিক।

আপনার কি মনে হয় যে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কটা নরমালাইজ হবে?

আমি এভাবে বলি, এটা হতে হবে। এবং এই দায় আমি বলছি শতভাগ ইন্ডিয়ার। জনগণের যে পারসেপশন তৈরি হয়েছে, সেটার জন্য আমরা দায়ী ছিলাম না। তারা শেখ হাসিনা রেজিমকে যেভাবে সাপোর্ট করেছেন, সেই কারণে এই পারসেপশনটা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডক্টর ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর থেকে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একেবারে ডিসএনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। নতুন করে এই জিনিসটা আসলে তাদের দিক থেকে আসতে হবে। তাদের শুধু কেন্দ্রীয় সরকার না, তাদের বিভিন্ন প্রদেশ আছে, তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেও বাংলাদেশকে নিয়ে যে ধরনের কথা বলা হয়, মন্তব্য করা হয়, সেসব ব্যাপারেও তাদেরকে সতর্ক হতে হবে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি হতে হবে। আমি আবারও বলছি, এটা বাইল্যাটারাল ইন্টারেস্টের প্রশ্ন।

আমাদেরকে ভিসা না দিয়ে ইন্টেরিমের সময় যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি ফিনান্সিয়ালি তাদের হয়েছে, তারা নিশ্চয়ই সেটা বোঝেন। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করলেও নিজের নাক কিন্তু কাটা যায়। সো দে উইল রিয়ালাইজ দ্যাট। আমার কোনো সন্দেহ নাই।

আমরা ছোট দেশ বলে আমাদেরকে খুব বলা হতো। আমরা যখন ইন্ডিয়ার এই ধরনের অ্যাটিচিউড নিয়ে প্রশ্ন করতাম যে, 'দেখো তুমি তো ওইখানেই থাকতে হবে, প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না, বন্ধু পাল্টানো যায়', খুব শুনতাম না? ঠিক কথাটা উল্টোভাবেও তো সত্য। তারা কি আমাদেরকে চেঞ্জ করতে পারবে? তারা তাদের বন্ধু পাল্টাতে পারে, কিন্তু আমরাও তার প্রতিবেশী। এই দুই দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক, এনগেজমেন্ট, দুই দেশ তার ইন্টারেস্টের ভিত্তিতে, ফিনান্সিয়াল, সিকিউরিটি সব ইন্টারেস্টের ভিত্তিতে আলোচনা করবে। রেসপেক্ট রেখে দুটো সভারেন কান্ট্রি এনগেজ হবে। আমি মনে করি এটা হবে, আশা করি খুব বেশি দেরি হবে না।

আপনি এখন সরকারের উপদেষ্টা, আপনার কি মনে হয় ধীরে ধীরে আপনি রাজনীতিবিদ হয়ে উঠলেন এবং ভবিষ্যতে কোনোদিন কি সংসদে যাওয়ার ইচ্ছা রাখেন?

রাজনীতি বলতে প্রথাগত যে রাজনীতি বোঝায়, এই মুহূর্তে যদি বলি, সেই রাজনীতিটা আমি পারবো না। আমার সেটা কিন্তু ভীষণ কঠিন কাজ মনে হয়। ভীষণ জটিল কাজ। যারা কনস্টিটিউয়েন্সি পলিটিক্স করেন, যারা এলাকায় যান, মানুষের সবকিছুতে এনগেজ থাকেন, খোঁজখবর রাখেন, তাদের জন্য নানান কিছু করতে হয়, প্রচুর কথা বলতে হয়, দেখা করতে হয়। আমি কিছুদিন রাজনীতি করতে গিয়ে দেখলাম আমার অ্যাপটিটিউড ওরকম না। সুতরাং আমি এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা রাখছি না। আমি ভবিষ্যতের কথা জানি না।

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য।

আপনাকেও ধন্যবাদ আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।