সালমান আলোচনায়, রাড্ডা আড়ালে: নিরাপত্তার মূল্য কি সবার সমান?

গত কয়েক দিনে ঢাকায় দুটি বড় ধরনের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে। দ্বিতীয়টি কনেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে, ঢাকার ইসিবি চত্বর এলাকায়। দুটি ঘটনার স্থান ও পটভূমি আলাদা হলেও দুই ক্ষেত্রেই সংগঠিতভাবে একটি স্থাপনায় প্রবেশ, ভাঙচুর এবং সম্পদের ক্ষতির অভিযোগ এসেছে।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার মিরপুর-১ এলাকার একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৪ সালে মিরপুরের নিম্ন আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরু করে।

ঘটনাটি ঘটে ২৪এ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে। মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে প্রবেশ করে। সেখানে থাকা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করার পর হামলাকারীরা ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে স্থাপনাটির বড় অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গায় একটি নতুন সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। সাইনবোর্ডে জমিটির মালিক হিসেবে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নাম লেখা ছিলো। পরে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় পুলিশের ‘নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ’ পাওয়া গেছে। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ২৬এ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার ইসিবি চত্বর এলাকায়। সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও নিউ গিনি প্রপার্টিজ নামের একটি ভবনের একটি অংশে ছিলো। সালমান ওই জায়গাটি ভাড়া নিয়ে স্টুডিও পরিচালনা করছিলেন। হামলার পর সালমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন।

সেই ভিডিওতে সালমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন, ‘প্লিজ ডু নট টেক এনি টেনশন, দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ’। একই ভিডিওতে তিনি বলেন, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য সম্ভবত ভবন বা জমির মালিক ছিলেন এবং কোনো ধরনের চাঁদার দাবিও থাকতে পারে। তার বক্তব্য ছিলো, অন্য কারও সম্পত্তির ওপর আক্রমণ করতে গিয়ে তার স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পুলিশ অবশ্য ঘটনার প্রাথমিক কারণ হিসেবে জমিসংক্রান্ত বিরোধের কথা বলেছে। নিউ গিনি প্রপার্টিজ এবং এলাকার অন্য জমির মালিকদের মধ্যে বিরোধ থেকেই হামলার সূত্রপাত হয়েছে। সালমান যে ভবনে স্টুডিও করেছিলেন, সেটি নিউ গিনি প্রপার্টিজের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া ছিলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একই ধরনের ব্যাখ্যা দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৫ কাঠা জমিকে কেন্দ্র করে নিউ গিনি প্রপার্টিজ এবং অন্য একটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ ছিলো। সেই বিরোধের ধারাবাহিকতায় একপক্ষ রাতে জমির নিয়ন্ত্রণ নিতে গেলে আশপাশের স্থাপনার সঙ্গে সালমানের স্টুডিওতেও হামলা ও ভাঙচুর হয়।

এই ব্যাখ্যা এবং সালমানের প্রাথমিক বক্তব্য একেবারে একই নয়। সালমান চাঁদাবাজির সম্ভাবনার কথা বলেন এবং ঘটনাটিকে দেশের চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করেন। পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রাথমিক বক্তব্যে ঘটনার মূল কারণ হিসেবে জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনার পর সাংবাদিকদের বলেন, সালমান মুক্তাদির চাঁদাবাজি নিয়ে যে অভিযোগ করেছেন সেটি সাধারণ বা ঢালাও অভিযোগ এবং নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা তদন্ত করবে। একই ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, সালমান মামলা করেননি। এর পর সালমান মুক্তাদির বলেন, তিনি ঘটনার রাতেই ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেছেন। ফলে এখানে একটি সরাসরি তথ্যগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। একদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন সালমান মামলা করেননি, অন্যদিকে সালমান বলেছেন তিনি ঘটনার রাতেই মামলা করেছেন।

মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওর ঘটনাগুলোকে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি ভয়ঙ্কর চিত্র সামনে আসে। রাজধানীতে সংঘবদ্ধভাবে একটি স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে, এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেটি ঘটার আগেই ঠেকাতে পারেনি।

দুই ঘটনার মধ্যে মনোযোগের পার্থক্যও চোখে পড়ার মতো। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার পরপরই বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সালমান নিজেই তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে ধ্বংস হওয়া স্টুডিও দেখিয়ে ভিডিও দেন। এর বিপরীতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ঘটনাটি ছিলো পরিমাণে আরও বড়, কিন্তু বৃহত্তর আলোচনার কেন্দ্রে আসতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লেগেছে।

এর একটি সম্ভাব্য কারণ সালমানের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। তিনি সরাসরি নিজের বক্তব্য ও ঘটনার দৃশ্য বিপুল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। রাড্ডার ক্ষেত্রে এমন কোনো পরিচিত জনমুখী ব্যক্তি সামনে ছিলেন না। এই পার্থক্য দেখায়, একই ধরনের গুরুতর ঘটনার মনোযোগ অনেক সময় ঘটনার মাত্রার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতি ও যোগাযোগক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে।

প্রশ্ন হলো, এই মাত্রার দুটি ঘটনা রাজধানীতে ঘটতে পারল কীভাবে? রাড্ডার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুতর, কারণ সেখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুধু অভিযোগ ওঠেনি, সরকারও প্রাথমিকভাবে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশের ‘নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ’ পাওয়া গেছে। শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বিভাগীয় ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। এই স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ হলো, রাড্ডার ঘটনাকে কেবল কিছু অপরাধীর বিচ্ছিন্ন সহিংসতা বলে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। অন্তত প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, রাষ্ট্রের যে সংস্থার দায়িত্ব এমন ঘটনা ঠেকানো, সেই সংস্থার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও সমস্যা ছিলো।

রাড্ডার ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতির সম্পর্কের প্রশ্নটিও তুলনামূলকভাবে সরাসরি সামনে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে স্থানীয় রাজনৈতিক পক্ষের জমিটি নিয়ে দখলের অভিযোগ এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। কার রাজনৈতিক নির্দেশে হামলা হয়েছে বা কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি সরাসরি জড়িত ছিলেন কি-না, সেটি তদন্ত করে দেখা দরকার।

সালমান মুক্তাদিরের ঘটনায় রাজনৈতিক যোগসূত্রের প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম পরিষ্কার। এই মুহূর্তে সালমানের স্টুডিওতে হামলাকে সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের চাঁদাবাজির ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করার মতো প্রমাণ নেই। আবার শুধু ‘জমি নিয়ে বিরোধ’ বলে বিষয়টিকে শেষ করে দেওয়ারও সুযোগ নেই। তদন্তে তাই কারা হামলাকারী সংগঠিত করেছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বা আশ্রয় ছিলো কি-না এবং জমি নিয়ে বিরোধের মধ্যে চাঁদাবাজি বা স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক কাজ করেছে কি-না, সেগুলো পরিষ্কার করা দরকার।

এই দুটি ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই সবচেয়ে বেশি। সরকার চাইলে প্রতিটি ঘটনাকে আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। একটি জমি দখলের ঘটনা, আরেকটি জমি নিয়ে বিরোধ। আইনগতভাবে সেই ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত সঠিকও হতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে শুধু প্রতিটি ঘটনার আলাদা কারণ নয়, ঘটনাগুলো মিলিয়ে জনমনে যে প্যাটার্ন তৈরি হয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

রাড্ডার ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এসেছে। সালমান সরাসরি চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ তুলেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও দুই ঘটনাকে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করছেন। ফলে সরকারের সামনে এখন কেবল দুটি ক্রিমিনাল কেইস নেই। একটি রাজনৈতিক ন্যারেটিভও তৈরি হচ্ছে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিরা চাঁদাবাজি, দখল বা বলপ্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব ক্ষেত্রে যথাসময়ে তাদের ঠেকাতে পারছে না। এই ন্যারেটিভ সত্য কি-না, সেটি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে তদন্তের ফল, আদালতে প্রমাণ এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। কিন্তু ন্যারেটিভটি যে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে, সেটি অস্বীকার করা কঠিন।

সরকারের জন্য পরীক্ষাটাও সহজ। অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন দলের, কার ঘনিষ্ঠ বা কোন পরিচয়ের মানুষ, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে তদন্ত ও বিচার করা যায় কি-না। রাড্ডায় পুলিশের গাফিলতির তদন্ত কোথায় গিয়ে শেষ হয়, হামলার পরিকল্পনাকারীদের পরিচয় প্রকাশ করা হয় কি-না, এবং সালমানের ঘটনায় জমির বিরোধের আড়ালে অন্য কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিলো কি-না, সেটি তদন্তে বেরিয়ে আসে কি-না, এগুলোই নির্ধারণ করবে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে থেকে যায়, নাকি আরও বড় রাজনৈতিক সমস্যার উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়।