ঢাকা শহরের পাবলিক বাসের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৮ সালে। পড়ালেখার সুবাদে আসা। ছোট একটা মফস্বল শহরে জন্মেছি, যেখানে রিকশাতেই শহরের এ-মাথা থেকে ও-মাথায় চলে যাওয়া যায়। ঢাকার মেইন রোডে পা রেখেই রীতিমতো হকচকিয়ে গেলাম। কত বাস! কত রুট! ভুলভাল রুটের বাসে উঠে এক মাসে ঘরের পথ হারালাম নয়বার!
সবচেয়ে বেশি সমস্যা হতো নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডে নামতে। কারণ ভিড় ঠেলে বাসের দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই গাড়ি ছেড়ে দিতো। এখন মরদ-জোয়ানের মতো চেঁচাতেও পারি না, আবার দরজার সামনে জটলা করে থাকা মানুষদেরও ধাক্কা দিয়ে সরাতে পারি না। চিৎকার, ভিড়, ঘামে ভেজা বস্তার মতো শরীরগুলো ঠেলে নামার সময়ে সবসময় মনে হতো, এই বুঝি কেউ জামায় ব্লেড চালিয়ে দিলো, নইলে ওড়না আটকে গেলো, ব্যাগ ধরে টান দিলো অথবা ফোন-ওয়ালেট নিয়ে গেলো। অথবা সবচেয়ে বড় আতংক; গায়ে হাত দিলো, কিংবা কানের কাছে হঠাৎ গা গুলিয়ে ওঠার মতো এক লাইন বলে দিলো।
আরেকটা ইস্যু হতো সিট নিয়ে। পাবলিক বাসে মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট সিটগুলো সাধারণত ফিট করা ড্রাইভারের পাশে, ইঞ্জিনের ওপরে। সারাক্ষণ বিকট শব্দ, ধুলো আর ধোঁয়া। দেখলেই আমার কেন যেন আম্মার রান্নাঘরের কথা মনে পড়ে যেতো। কী একটা অবস্থা! ঘরে থাকলেও বদ্ধ রান্নাঘরে হাজিরা দাও, নিজের স্বাধীনতার জন্য বাইরে কাজ করতে যাবে, আর সেই স্বাধীনতার বাহনেও রান্নাঘরের মতো গরম ও বদ্ধ জায়গাতেই জীবন স্যাক্রিফাইস করো। স্যাক্রিফাইসই তো। কোনোভাবে একটা দুর্ঘটনা হলে, ইঞ্জিনে কোনো সমস্যা হলে, বনেটের ওপরে বসা যাত্রীদের ঝুঁকিটা কি একটু বেশি নয়?
কিছু বাসে ‘মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধী’ সিট বরাদ্দ থাকতো। তবে সেটা নামকাওয়াস্তে বললে ভুল হবে না। সেগুলো ভরা থাকলে যখনই অন্য কোনো সিটে বসতাম, কেউ না কেউ বলতোই, “এখানেই যখন বসবেন, তাহলে মহিলাদের জন্য আলাদা সিট চান কেন? পুরুষদের কি কোনো অধিকার নাই?” শুনে কয়েকজন হাসতো। এটা এত রিপিটেডলি হতো যে মাঝে মাঝে সন্দেহ হতো, সম্ভবত এসব কথা বলার জন্যই কেউ কেউ বাসে ওঠেন!
ঢাকার রাস্তায় পিংক বাস নামার খবরটা দেখে আমার সত্যিই ভালো লেগেছে। বাসে তো কমবেশি উঠতেই হয়, অফিসে যাওয়ার বা অন্য কোনোখানে যেতে হলেও। মধ্যবিত্তের জীবনে তো গাড়ি ডেকে চলাফেরার বিলাসিতাটা খুব একটা করার উপায় নেই। অবশ্য এই স্বস্তির সাথে বিপত্তি দৃশ্যমান হয়ে উঠতেও সময় লাগেনি। দেখছি, ফেসবুক ফিড ভরে গেছে সার্কাস্টিক পোস্টে। কোন বাস ধাক্কা দিলো, কোন বাস পিছু নিয়েছে, কী গান বাজছে, “গোলাপি এখন নিজেই বাস” এই ধরনের পোস্ট ও মন্তব্যে। এবং বিতর্কেও। আমার মনে হয়, নারীদের জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে একটা প্রশ্ন করা দরকার- আমাদের সাধারণ গণপরিবহন কি নারীদের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ? যদি উত্তরটা ‘না’ হয়, তাহলে পিংক বাসের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ খুব কম।
পিংক বাস নামে আর চেহারায় এখন মোটামুটি ‘টক অব দ্য টাউন’। তবে নারীদের জন্য আলাদাভাবে বাসের বা পরিবহনের এই কিন্তু শুরু নয়। এর আগেও তবে নারীদের জন্য বিশেষ পরিবহন সেবার উদ্যোগ হয়েছিল, তবে সেটি খুব ভালো কোনো অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারেনি। বছর কুড়িরও আগে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ নাম দিয়ে এক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০১ সালের শেষদিকে রাস্তায় নামা সেই বাসগুলোর সেভাবে দেখাই পেতেন না যাত্রীরা। সব রুটে বারোটি বাসের কথা থাকলেও চার-পাঁচটির বেশি দেখা মিলতো না। বাসে উঠে গন্তব্যে ঝটপট পৌঁছে যাওয়ার বদলে বাসের অপেক্ষায় ঘণ্টা পার করে দেওয়া নাকি ছিলো নিত্যিদিনের ঘটনা। পরে সেটি বন্ধও হয়ে যায়। অনেকের এ বিষয়ে বক্তব্য ছিলো এমন, অফিস টাইম ছাড়া রেগুলার সময়ে যাত্রী পাওয়া যায় না। ফলে ব্যাপারটায় লোকসানই বেশি ছিলো। ২০০৯ সালেও আবার একটু চেষ্টা হয়েছিল, ফলাফল সেই একই। সব মিলিয়ে আড়াই দশক পেরিয়ে এবারে পরিস্থিতি কেমন হবে, সেটি দেখার রয়েছে। পত্রপত্রিকায় পড়লাম, প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরের ১৩টি পথে মোট ১৪টি বাস চলাচল করবে। ঢাকায় ১০টি, বগুড়া ও চট্টগ্রাম শহরে দুটি করে বাস চলবে। ঢাকায় ১০৬টি, চট্টগ্রামে ১২টি ও বগুড়ার ১৬টি মিলিয়ে মোট ১৩৪টি জায়গা থেকে যাত্রীসেবা দেওয়া হবে। নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকবে, ই-টিকেটের ব্যবস্থাও থাকবে। প্রতিটি বাসে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) সংযোজন করা হয়েছে। আগামী মাস তিনেকের মধ্যে নাকি আরও ৫০টি বাসের পথে নামার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে বলতেই হয়, দুই দশক আগের ব্যবস্থাপনা আর এবারে বেশ পার্থক্য রয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে আধুনিকায়ন হয়েছে, সাথে ব্যবস্থাপনাও নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে উন্নত। এবারে ফলাফলটা দেখার জন্য অপেক্ষা।
সময় বদলেছে, প্রযুক্তি আধুনিক হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে। তবে মানুষের মানসিকতা বদলেছে কিনা সেটা বড় প্রশ্ন। মনে পড়ে, মেট্রোরেলে নারী কোচ চালুর সময়ও নানান প্রশ্ন উঠেছিল। নারীদের আলাদা কোচ কেন? পুরুষ সেখানে উঠতে পারবে না কেন? সাধারণ বগিতে নারী উঠবে কেন? এটা কি লিঙ্গভেদে বিভাজন নয়? পরে আমরা দেখেছি, শুধু আলাদা একটা কোচ রাখলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সেখানে ক্যাপাসিটি, ক্রাউডিং এবং এনফোর্সমেন্ট সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি এখনো তো রেগুলার বগিতে নারীরা উঠতে গেলে কারও না কারও থেকে—‘লেডিস বগিতে গিয়া ওঠেন’, ‘এইটায় কেন উঠসেন’—এসব শুনতেই হয়। পিংক বাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কয়েকটা বাস মিলে এই সব প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠতে পারে না। আর আসল প্রশ্নটাও ঠাহর করে উঠতে পারা জরুরি।
আমি চাই না এমন একটা ঢাকা, যেখানে নারীরা নিরাপদে চলাচল করতে হলে অবশ্যই পিংক বাস খুঁজবেন। আমি চাই এমন একটা ঢাকা, যেখানে সাধারণ বাসেও একজন নারী নিশ্চিন্তে উঠতে পারবেন। বিষয়টা নারী-পুরুষের সুবিধার বৈষম্যের নয়। বিষয়টা নিরাপত্তার। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক নিরাপত্তার। তাহলে এই বিষয়টা নিয়ে এত কথা হওয়ার কারণটা কী? চাকরির টানাটানির এই বাজারে ‘পুরুষদের কাজও মেয়েরা নিয়ে নিচ্ছে’ এই আতংক? নাকি তথাকথিত ‘পুরুষদের কাজ’ মেয়েরা করলে আর তারা ‘বাধ্য মেয়ে’ থাকবে না এই শংকা? নাকি পিংক বাস আমাদের ইগোতে খুব ধাক্কা দিয়ে ফেলছে যে, আমরা নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারিনি? নাকি আফসোস হচ্ছে এই ভেবে যে, সব মেয়ে পিংক বাসে উঠে গেলে হ্যারাস করবো কাকে? সমস্যাটা ঠিক কোথায় হচ্ছে?
সে যাইহোক। পিংক বাসের একটা দিক আমাকে বিশেষভাবে আশাবাদী করছে। সেটা হলো যে,
নারীরা বাস চালাচ্ছেন। এটা আমাদের দেশে এখনও খবর। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশে নারী বাস চালক হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। যুক্তরাষ্ট্রে স্কুল বাস চালকদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়েও বেশি। সেখানে স্কুলবাসের চালকের আসনে একজন নারীকে দেখা অস্বাভাবিক নয়। অথচ আমাদের এখানে এখনো একজন নারী বাস চালাচ্ছেন এটা আলাদা করে বলার মতো ঘটনা। শুধু বাস কেন, ঢাকা শহরে এখনো একজন মেয়েকে নিজের প্রাইভেট গাড়ি চালাতে দেখলেও সেটা অনেকের কাছে বিস্ময় জাগায়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ তাকিয়ে থাকে, কেউ মন্তব্য করে, কেউ আবার এমনভাবে দেখে যেন সে কোনো অসম্ভব কাজ করে ফেলেছে।
তাই পাবলিক বাসের স্টিয়ারিংয়ে একজন নারী বসা আমাদের জন্য আরও বড় সামাজিক পরিবর্তনের দৃশ্য।
আমার মনে হয়, এই জায়গাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জেন্ডার ইক্যুয়িটি শুধু নারীদের নিরাপদ যাত্রী বানানোর বিষয় নয়। নারীকে ড্রাইভারের সিটে বসানোও জেন্ডার ইক্যুয়িটির অংশ। একজন মেয়ে যখন প্রতিদিন রাস্তায় দেখে একজন নারী বাস চালাচ্ছেন, তখন সে শুধু একটা বাস দেখছে না। সে একটা সম্ভাবনাও দেখছে যে, মেয়েরাও বাস চালাতে পারে। মেয়েরাও বড় গাড়ি চালাতে পারে। মেয়েরাও পরিবহন খাতে কাজ করতে পারে। এগুলো খুব ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু সমাজের জেন্ডার স্টেরিওটাইপ ভাঙে এভাবেই, একটা একটা দৃশ্যকে স্বাভাবিক করে। একজন নারী বাস চালাচ্ছেন, এই দৃশ্যটা যত বেশি দেখা যাবে, তত মানুষ সেটাকে ‘মেয়েদের কাজ’ বা ‘মেয়েদের কাজ নয়’ এই চশমায় কম দেখবে। একসময় হয়তো চালক দেখলে শুধু চালকই মনে হবে। তার নারী বা পুরুষ পরিচয়টা আলাদা করে চোখে পড়বে না।
আর এখানে আরেকটা বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, গণপরিবহন শুধু মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায় না। গণপরিবহন ঠিক করে দেয়, একজন মানুষ এই শহরে কতটা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবেন। একজন পুরুষ চাকরি, ক্লাস, ব্যবসা বা কোনো কাজের জন্য শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাবেন এটা আমরা খুব স্বাভাবিকভাবে নিই। কিন্তু একজন নারী যদি বাসে ওঠার আগে ভাবেন, “এই বাসে উঠলে নিরাপদ তো?”, “কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে?”, “সন্ধ্যার পর এই রুটে যাওয়া ঠিক হবে?”, “বাসে জায়গা না পেলে কী করবো?”, “কেউ বিরক্ত করলে কীভাবে নামবো?” তাহলে তার যাতায়াতের সিদ্ধান্ত আর নিছক যাতায়াত থাকে না। প্রতিটি যাত্রার সঙ্গে একটা বাড়তি মানসিক হিসাব জুড়ে যায়।
এই হিসাবটারও একটা খরচ আছে। কেউ হয়তো চাকরিটা নেন না, কারণ অফিস ফেরার সময়ের গণপরিবহন নিরাপদ নয়। কেউ হয়তো দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। কেউ নিয়মিত রাইড শেয়ারিং বা রিকশা ব্যবহার করেন, কারণ বাসে ওঠার অভিজ্ঞতা তার কাছে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ হয়তো কাজ শেষ হওয়ার আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে যান, শুধু অন্ধকার হওয়ার আগে বাড়ি ফিরবেন বলে। অর্থাৎ নিরাপদ গণপরিবহন নারীর জন্য শুধু একটা নিরাপদ যাত্রা তৈরি করে না; এটা তার শিক্ষা, চাকরি, আয়, সময় এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসরও বাড়ায়।
তাই পিংক বাসকে শুধু ‘মহিলাদের জন্য আলাদা বাস’ হিসেবে দেখলে হয়তো এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটাও চোখ এড়িয়ে যাবে। এটা যদি ঠিকভাবে পরিচালিত হয়, নিয়মিত চলে, পর্যাপ্ত সংখ্যায় বাড়ে এবং সত্যিই নিরাপদ হয়, তাহলে এর সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে একজন নারীকে শহরের ভেতর আরও স্বাধীনভাবে চলার সুযোগ করে দেওয়া। কারণ এই জাদুর শহরটা সবার। কিন্তু শহরের প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি সময়ে, সবার চলাচলের স্বাধীনতা যদি সমান না হয়, তাহলে শহরটা আসলে সবার হয়ে ওঠে না।
যদিও আমার মনে হয়, শেষ লক্ষ্যটা আরও বড় হওয়া উচিত। একদিন যেন ‘নারী বাস চালাচ্ছেন’ এটা খবর না হয়। একদিন যেন কোনো নারীকে সাধারণ বাসে উঠতে দেখে আমাদের মনে না হয়, তাকে আলাদা করে নিরাপদ রাখতে হবে। বরং মনে হয়, উনিও একজন যাত্রী। এই শহরের অন্য সবার মতোই তারও নিরাপদে চলাচলের অধিকার আছে। কারণ একটা শহর সত্যিকার অর্থে নারীবান্ধব তখনই হবে, যখন নারীর নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হবে না। যখন নিরাপদ গণপরিবহন নারীর জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নয়, বরং গণপরিবহনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হবে। সেদিন হয়তো পিংক বাসের প্রয়োজনও কমে যাবে।
কিন্তু সেই দিনটা আসা পর্যন্ত আমি চাই পিংক বাস নামুক। নারী চালকরা আরও বেশি আসুক। নারী কন্ডাক্টর, কর্মী এবং পরিবহনকর্মীর সংখ্যাও বাড়ুক। আর ঢাকার সব বাসই ধীরে ধীরে এমন হোক, যেখানে নারীদের জন্য আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা নয়, নিরাপত্তাটাই স্বাভাবিক ব্যবস্থা হয়ে ওঠে।
লেখক: কনটেন্ট এবং কমিউনিকেশন বিষয়ক পেশায় কাজ করছেন