মতামত

অ্যালবিনো মহিষ: কুরবানির হাট থেকে কূটনীতির টেবিলে

ঈদ মানে আনন্দ হলেও, প্রতিবছর বাঙালির জন্য ঈদ আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর মতো বেদনার বার্তা নিয়ে আসে। অন্যদিকে কুরবানির ঈদ মানেই ত্যাগের বদলে যেন ‘পশুর প্রদর্শনী’। এসব আলোচনার ফাঁক গলে সূর্যের আলোর মতো সবার নজর কেড়েছে এক বিরল প্রজাতির মহিষ। বিরল প্রজাতির চেয়েও বড় বিষয় হলো তার নাম রাখা হয়েছে “ডনাল্ড ট্রাম্প”।

নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক জিয়া উদ্দিন গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে বলেছেন, মহিষটি গোলাপি ঢেউ খেলানো চুল ও চোখ দেখতে অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতো বলেই তার নাম রাখা হয়েছে “ডনাল্ড ট্রাম্প”।

অ্যালবিনো প্রজাতির এই মহিষটি কেবল দেশের সংবাদমাধ্যমে নয়, শিরোনাম হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। মজার বিষয় হলো, মহিষ ডনাল্ড ট্রাম্পকে কুরবানির জন্য লালন-পালন করা হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের হস্তক্ষেপে তাকে চিড়িয়াখানায় রাখা হয়েছে। যার হয়তো আমিষ হিসেবে ক্রেতার খাওয়ার টেবিলে হাজির হওয়ার কথা, সে চলে গেলো কূটনীতির টেবিলে আর সৌভাগ্যক্রমে পেলো এক নতুন জীবন। বিশ্ব দেখলো, একটি নাম কীভাবে একটি প্রাণীকে সেলিব্রিটিতে পরিণত করতে পারে।

সরকার জানিয়েছে, পাবলিক সেন্টিমেন্ট এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মহিষ ডনাল্ড ট্রাম্পকে কুরবানি দেওয়া থেকে রক্ষা করা হয়েছে। যদিও আমার মতে, অ্যালবিনোর মতো বিরল প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণের পক্ষে এটি অত্যন্ত খোড়া এবং দুর্বল যুক্তি। 

রাষ্ট্রের এ ধরনের বক্তব্য বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচকই ধারণা প্রকাশ করে। যেমন, সিবিএস নিউজ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মহিষটির চেহারার মিল রয়েছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, তার জেরেই বিরল অ্যালবিনো মহিষটি শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেলো।” অন্যদিকে এনবিস উল্লেখ করেছে, এমন ঘটনা বিশ্বে প্রথম নয়। এর আগেও ট্রাম্পের সঙ্গে অন্য প্রাণীর মিল দেখা গেছে। যার মধ্যে আছে চীনে একটি গোল্ডেন ফিজেন্ট এবং ইংল্যান্ডে একটি ফ্রগফিশ। 

বিষয়টি এমন যে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ‘মহিষ ট্রাম্পে’র চেহারার সাদৃশ্য না থাকলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকতো না। অথচ বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশ হলে এই বিরল প্রজাতির মহিষকে নিজেদের গৌরবের অংশ মনে করতো। সংরক্ষণ করতো এবং বিশ্বকে বার্তা দিতো যে বাংলাদেশ জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে কমিটেড।

সামাজিক মানুষের জীবনে প্রাণীর ভূমিকা কেবল জৈবিক বা ব্যবহারিক নয়; এর একটি গভীর বিমূর্ত ও প্রতীকী উপস্থিতিও রয়েছে। অনেক সময়ই বিভিন্ন প্রাণীর সুন্দর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কিংবা প্রকৃতিতে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বস্তুর উপমা ব্যবহার করে মানুষে মানুষের শারীরিক এবং মানসিক কাঠামো বর্ণনা করা হয়। কোনো ব্যক্তির প্রশংসা করার জন্য অনেক সময় অমনুষ্য প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। যেমন, কারও শক্তি এবং সামর্থ্যের প্রশংসা করতে বাঘ বা সিংহের সঙ্গে তুলনা করা হয়, কোনো নারীর সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে চাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হয়, চুলের কালো রঙের গভীরতা বোঝাতে রাতের অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কোনো ব্যক্তির প্রশংসা করার জন্যও অনেক সময় অমনুষ্য প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হয়।

একইভাবে জড় বস্তু, আরটিফ্যাক্ট, স্থান, কিংবা আবস্ট্রাক্ট বস্তুর নামেও বাবা-মা তাদের সন্তানের নাম রাখেন। এমনকি হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র Cast Away-এ নায়ক চাক নোল্যান্ড, চরিত্রে অভিনীত টম হ্যাঙ্কস, নির্জন দ্বীপে একটি ভলিবলের ওপর মানুষের মুখাকৃতি আঁকেন এবং নাম দেন “উইলসন”। ধীরে ধীরে এই জড় বস্তু উইলসন তার নিত্যদিনের কথা বলার সঙ্গী হয়ে ওঠে। নামকরণের মাধ্যমে একটি নিষ্প্রাণ বস্তু খুঁজে পায় এক মানবীয় অস্তিত্ব এবং পরিচয়।

নির্জন দ্বীপে টম হ্যাঙ্কসের সঙ্গী উইলসনের মতো ডনাল্ড ট্রাম্পও হয়তো সবার অলক্ষ্যে রয়ে যেতো, কিংবা যে উদ্দেশ্যে তাকে লালন-পালন করা হয়েছে, সে উদ্দেশ্য সফল হতে পারতো, যদি তার নাম কোনো অপরিচিত ব্যক্তির নামে রাখা হতো। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে, রাজকীয় গড়ন ও রঙের এই মহিষ নামও পেয়েছে সমগ্র বিশ্বে পরিচিত এক পরাক্রমশালী প্রেসিডেন্টের নামে। সেটি আবার এমন সময়ে সবার নজরে এসেছে, যখন বিশ্ব এক অস্থির সময় অতিক্রম করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নিয়ে উত্তেজনা, অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক চুক্তি নিয়ে দেশজুড়ে চলছে সমালোচনা, চুক্তি বাতিলের চাপ এবং বিপরীতক্রমে, চুক্তি স্বাক্ষর করা অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টাদের দায়মুক্তির উৎসব।  

এমন এক নাজুক ও স্পর্শকাতর সময়ে সৃষ্টিকর্তার নামে একটি পশু কুরবানির মতো বিষয় দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও, শেষ মুহূর্তে তা আর ব্যক্তি বা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। একইসঙ্গে প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক উদ্বেগের কারণ।

আশংকা করা হয়েছিল ‘ট্রাম্প’ নামের মহিষকে প্রকাশ্যে ‘জবাই’ করা হলে তা সম্ভবত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার হতো এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। আমরা অতীতে দেখেছি, প্রতীকী কর্মকাণ্ড—যেমন কোনো দেশের পতাকা পোড়ানো বা কোনো নেতার ছবিতে জুতা নিক্ষেপ—কীভাবে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অস্বস্তি ও সংকট তৈরি করে।

কোনো প্রাণীর নামকরণ সেখানে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই ঘটনার মাধ্যমে নামকরণের রাজনীতির বাইরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ক্ষমতার অসমতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ একই ঘটনাকে আমরা যদি উল্টোভাবে কল্পনা করি—অর্থাৎ এই বিশেষ মহিষ যদি যুক্তরাষ্ট্রে লালিত-পালিত হতো এবং তার নাম বিশ্বের অন্য কোনো দুর্বল দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নামে রাখা হতো—তাহলে হয়তো বিষয়টি এতটা গুরুত্বের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হতো না। কিংবা তার নাম যদি দেশের কোনো নেতার নামে নামকরণ হতো তাহলেও সরকার হয়তো বিষয়টি নিয়ে এতটা বিচলিত হতো না।

সুতরাং, নীতিগতভাবে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক উপাদান সার্বভৌমত্ব হলেও, সকল স্বাধীন রাষ্ট্র সমানভাবে সার্বভৌমত্ব চর্চা করতে পারে না। সার্বভৌমত্বের অর্থ এমন নয় যে একটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ কাজ এমনভাবে পরিচালনা করবে, যা অন্য রাষ্ট্রের জন্য অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ বা অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ব্যক্তির স্বাধীনতার ধারণাও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। আমার বাক ও কর্মের স্বাধীনতা ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য, যতক্ষণ তা অন্যের জানমালের নিরাপত্তা কিংবা মর্যাদার জন্য হুমকি সৃষ্টি না করে।  

সুতরাং, একটি নাম “ডনাল্ড ট্রাম্প” কোনো একটি নির্দিষ্ট পশুর নাম হিসেবে তাত্ত্বিকভাবে সীমাবদ্ধ হলেও, বাস্তব জগতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রক্ষমতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, জাতীয়তাবাদ, অভিবাসননীতি এবং বৈশ্বিক কূটনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ফলে এটি নিছক প্রতীকের সীমা পেরিয়ে “বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং একটি কুরবানির পশু” নামক একটি বর্ণনামূলক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কেও একটি বার্তা তুলে ধরে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে পশুর ভাগ্য তার জৈবিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা নির্ধারিত না হয়ে নির্ধারিত হয়েছে নামকরণের মতো অতি সাধারণ একটি ঘটনার মাধ্যমে।

একইসঙ্গে এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। অহেতুক বা অনভিপ্রেত ঘটনার জন্ম দিতে পারে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সিদ্ধান্তের আগাম ফলাফল বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে জাতিকে সাহায্য করবে।

তবে আমি মনে করি, ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’কে চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণের বিষয়টিকে সরকার ইতিবাচকভাবেও উপস্থাপন করতে পারতো। কারণ ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’ শুধু একটি কুরবানির পশু নয়; এটি একটি বিরল অ্যালবিনো মহিষ। সাধারণত “ইন ব্রিডিং (একই বংশের মধ্যে প্রজনন) হলে এমন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে...শরীরে রঞ্জক পদার্থ ম্যালানিন কম থাকলে মহিষের ক্ষেত্রে কালো না হয়ে সাদা হবে। প্রতি ১০ হাজারের মধ্যে একটি এমন হতে পারে”, (প্রথম আলো, ২৮ মে ২০২৬)। স্বাভাবিকভাবেই, এ ধরনের প্রাণী প্রকৃতিতে খুব কম দেখা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা পরিবেশগত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়। ফলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে এদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

তাছাড়া, বিরল প্রাণী সংরক্ষণ শুধু প্রাণীপ্রেমের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যত প্রজনন কর্মসূচির সম্ভাবনা। একটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্য বহনকারী প্রাণী বিজ্ঞানীদের জন্য মূল্যবান তথ্যের উৎস হতে পারে। পাশাপাশি চিড়িয়াখানা ও সংরক্ষণকেন্দ্রগুলো জনসাধারণের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই দৃষ্টি দিয়ে দেখলে, ডনাল্ড ট্রাম্প নামের অ্যালবিনো মহিষটিকে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত কেবল একটি আলোচিত প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যকে ভবিষ্যত গবেষণা, শিক্ষা এবং সংরক্ষণের জন্য রক্ষা করার উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

যদি এই বিবেচনা সিদ্ধান্তটির পেছনে কাজ করে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক প্রশংসা পাবে। তাতে করে এক দিকে যেমন একটি বিরল প্রাণী সংরক্ষিত হবে, গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পাবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; পিএইচডি ক্যান্ডিডেট, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও, কানাডা

nsultana79ju@gmail.com