যাদের কাছে মানুষ নিরাপত্তা খোঁজে তারাই যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে সাধারণ মানুষ কার ওপর ভরসা করবে। রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে মাদক কারবারি ও দাগি আসামি, সবার হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, কোথাও তারা নিরাপদ নন।
তল্লাশি চৌকিতে হামলা হচ্ছে। থানার ভেতরে মারধর করা হচ্ছে তাদের। আসামি গ্রেপ্তার করতে গেলে ছুরিকাঘাত করা হচ্ছে। প্রকাশ্য দিবালোকেই আসামি ছিনিয়ে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। রাজনৈতিক দলের নেতার ছেলের পরিচয় না জানার কারণে মারধর করা হচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানেও আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশ। এমনকি ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সবকিছু খোয়াচ্ছেনও তারা।
হামলা করছে মাদকসেবী ও বিক্রেতা, ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা, বিরোধী দলের নেতা, দাগি আসামি ও তাদের স্বজনরা। আক্রমণ হচ্ছে ‘মব’ করে। ওঁত পেতে থেকে। সঙ্গবদ্ধভাবে। আরো নানা উপায়ে।
এ যেন গুলি, বোমা, ছুরি ও অন্যান্য সব অবৈধ অস্ত্রই পুলিশের উপর হামলার জন্য মজুত রাখা হয়েছে।
সবশেষ বৃহষ্পতিবার খুলনার খানজাহান আলী রোডে কলেজিয়েট স্কুলের সামনে পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা যেন পুরোনো ঘটনারই পুনরাবৃত্তি মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই ঘটনার পর খুলনা জেলা পুলিশ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সচেতনতা বাড়াতে নির্দেশনা জারি করেছে। রাতে একা চলাচল না করতে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে অগাস্ট মাসে দু’দফায় সম্ভাব্য নাশকতা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে সারা দেশে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করেছিলো বাংলাদেশ পুলিশ। ১লা অগাস্ট প্রথম দফার পর ৭ই অগাস্ট দ্বিতীয় দফায় দেওয়া ওই জরুরি নির্দেশনায় রাতের টহল, মোবাইল ডিউটি ও চেকপোস্টে দায়িত্বরত সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপরও হামলা হতে পারে বলে সেই সময়ের সতর্কতায় উল্লেখ করা হয়েছিলো।
তবে এসব সতর্কবার্তায় পুলিশের উপর আক্রমণ কমেনি। বরং অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সার্বিক দায়িত্বে যারা তারাই যখন সুরক্ষিত থাকতে পারছেন না, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতোটা অরক্ষিত তা সহজেই বোঝা যায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে পুলিশ ৩৮৭টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে এপ্রিলে সর্বোচ্চ ৬৬টি হামলা হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৮২ জন, মার্চে ৬৩ জন, এপ্রিলে ৬৬ জন, মে মাসে ৫৫ জন, জুনে ৫১ জন, জুলাইয়ে ৪২ জন, অগাস্টে ১০ জন, সেপ্টেম্বরে ১৮ জন ও চলতি মাসে এ পর্যন্ত ৪ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হন।
সংখ্যাগুলোই বলে দিচ্ছে, কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ।
এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই যারা উদ্বিগ্ন তাদের পক্ষে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব?
খুলনায় পুলিশের উপর হামলা ও পুলিশের নির্দেশনা
বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে খুলনা নগরের খানজাহান আলী রোডে কলেজিয়েট স্কুলের সামনে পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন। তিন ছিনতাইকারী তার গতিরোধ করে। টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়।
বাধা দিলে ছিনতাইকারীরা ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দুই হাতের কবজিতে কোপ দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।
এ ঘটনার পর শুক্রবার রাতে খুলনা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পুলিশ সুপার স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে চলাফেরা সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নির্দেশনাপত্রে বলা হয়, “চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জেলার রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চলছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাও পরিলক্ষিত হচ্ছে।”
“সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দেওয়া হলো।”
নির্দেশ ফাঁসে তদন্ত কমিটি
খুলনা পুলিশের নির্দেশনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে খুলনা জেলা পুলিশ বলেছে, “অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সচেতনতা বাড়াতে জারি করা নির্দেশনাটি জনসমক্ষে প্রকাশিত হওয়ায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তদন্তে নির্দেশনাটি প্রকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও দায়িত্বহীনতা বা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, “সম্প্রতি পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহ আলম দায়িত্ব পালন শেষে গভীর রাতে সাদা পোশাকে রূপসা ফেরি পার হয়ে রিকশায় খুলনা মহানগরীর পুলিশ ক্লাবে যাচ্ছিলেন। পথে কলেজিয়েট স্কুলের কাছে তিনজন ছিনতাইকারী তার ওপর হামলা করে। তারা তার মানিব্যাগ ও দুটি মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়। বাধা দিতে গেলে একজন ছিনতাইকারী চাপাতি দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কোপায়। এতে তার দুই হাত গুরুতর জখম হয়।”
উল্লেখযোগ্য কিছু হামলার চিত্র
গত ২২এ জানুয়ারি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের পাগলপাড়া এলাকায় মোটরসাইকেল তল্লাশির সময় পুলিশ সদস্য ইজাউল হক ভূঁইয়াকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রুহুল আমিনের ছেলে মো. শাহরিয়ার আহমেদ।
২১এ ফেব্রুয়ারি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পকেট গেট এলাকায় পুলিশের নিয়মিত তল্লাশি চৌকিতে হামলার ঘটনা ঘটে। তল্লাশির সময় একদল যুবক দায়িত্বরত এক পুলিশ কনস্টেবলকে ছুরিকাঘাত করে এবং ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়।
২৫এ মার্চ গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা জামায়াতের যুব বিভাগের নেতা মাহমুদ হাসান পলাশের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী একটি অভিযোগপত্র নিয়ে পলাশবাড়ী থানায় যান এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) চাপ দেন। ওসির সঙ্গে কথাবার্তা ও তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে জামায়াত নেতাকর্মীরা ওসিসহ পুলিশ সদস্যদের মারধর করেন। এতে ৮ পুলিশ সদস্য আহত হন।
৩০এ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় মোবাইল ও টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ তদন্তে গিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সোহেল রানা এবং কনস্টেবল ফয়সাল হোসেন। ছিনিয়ে নেওয়া হয় পুলিশের একটি শটগান।
৬ই মে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাশিপুরের হাশেমবাগ এলাকায় অভিযানে গিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পুলিশের একটি টিম। এসময় পুলিশের হাতে আটক পাঁচ আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
৯ই জুন ঢাকার সাভারের বক্তারপুর এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এসএম শামীম ও এএসআই মশিউর রহমান খান।
১৬ই জুন ঢাকার শেখেরটেক এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন আদাবর থানার ওসি ও এক এসআই।
২৫এ জুলাই চট্টগ্রামের আমবাগান এলাকায় মাদক মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন ডাবলমুরিং থানার এসআই মবিনুল ইসলাম।
১৫ই অগাস্ট নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ওয়াপদা কলোনি এলাকায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত এক আসামিকে ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন এএসআইসহ ৩ পুলিশ সদস্য।
২রা সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার দামোধরদপী পয়েন্টে একাধিক মামলার আসামি আসির মিয়াকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
৪ঠা সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের খুলশীতে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। এ সময় খুলশী থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুর রহিম ও তার বডিগার্ডসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়ি।
৫ই সেপ্টেম্বর ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এসআই আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করে একদল দুর্বৃত্ত।
প্রতিটি ঘটনার তদন্ত চলমান। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা গ্রেপ্তারও হয়েছে। তবে কোনো ঘটনারই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
সতর্কবার্তা এবং নির্দেশনা দিয়ে যে পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ ঠেকানো যায়নি, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। সরকারি বা বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, মাদক কারবারি অথবা দাগি আসামি, হামলাকারী যে-ই হোক না কেন, দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে না।
তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা যতদিন থাকবে, ততদিন পুলিশের মনোবল নষ্ট হতে থাকবে আর অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হতে থাকবে। তাই পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম শর্ত হলো ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা।