থানা লুটের ১৩২৬ অস্ত্র কোথায়, কার হাতে? আইনশৃঙ্খলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত

কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে যেন সাপ বেরিয়ে আসা। চব্বিশের ৫ই অগাস্টের পর পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়টি ঠিক তেমনই। 

রাজধানী ঢাকার পল্লবী এলাকা কাঁপিয়ে রাখতো হ্যাঁচকা আরমান, রিপন কেনি ও বাবা আরমানের মতো দুর্বৃত্তদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। মারামারি, অস্ত্রের মহড়া আর দিনদুপুরে চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করলেও, আতঙ্ক ও ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে টু-শব্দ করার সাহস পাননি স্থানীয়রা।

আইনশৃঙ্খলার অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে এলাকাজুড়ে ভয়ের অপসংস্কৃতি গড়ে তোলে তারা। 

তবে ২০২৬ সালের ৬ই জানুয়ারি ভোরে একটি নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে র‍্যাব-৪। আর এরপরই চমকে ওঠেন খোদ অভিযানকারী দলের সদস্যরাও।

অভিযুক্তদের কাছ থেকে যে পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়, তা ছিলো আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে থানায় জমা দেওয়া একজনের ব্যক্তিগত বৈধ অস্ত্র। থানা লুটের সময় পুলিশের অস্ত্রের সঙ্গে লুট করা হয় ব্যক্তিগত অস্ত্রও। 

আর এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ না। দেশের অন্যতম ব্যস্ত শহর চট্টগ্রামেও একটা ঘটনা ফিরে দেখা যাক। 

প্রায় দুই বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের উত্তাল সময়ে ডাবলমুরিং থানায় হামলা ও লুটপাটে অংশ নেন মতিঝরনা এলাকার মিনহাজ উদ্দিন রাহিম। থানা থেকে পুলিশের একটি সার্ভিস পিস্তল লুটে নিয়ে, পরে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন লালখান বাজারের ‘চিহ্নিত অপরাধী’ আমিরের কাছে। 

গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে মিনহাজ গ্রেপ্তারের লুট হওয়া অস্ত্রটি উদ্ধার হয়। কিন্তু থেকে যান আমির। 

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখনও বেহাত হয়ে আছে পুলিশেরই ১,৩২৬টি অস্ত্র। এর সঙ্গে রয়েছে তখন লুট হওয়া ব্যক্তিগত ও বৈধ অস্ত্রও।

কর্মকর্তাদের মতে, ওইসব অস্ত্রের বড় একটি অংশ এখন ঘুরছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাত থেকে হাতে, ব্যবহৃত হচ্ছে নিত্যনতুন অপরাধ ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার কাজে। 

লুট হওয়া অস্ত্র হাতবদল হচ্ছে, তৈরি হয়েছে অস্ত্রের কালোবাজার। 

যদিও খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চলছে বলে দাবি করা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে। 

অবৈধ হাতে সরকারি অস্ত্র

২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ওই দিন এবং এর আগের দিন থেকে সারাদেশে পুলিশের ৪৬০টি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। লুট হয়ে যায় বাহিনীর ৫ হাজার ৮২৯টি অস্ত্র।

পরে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনও বেহাত ১৩২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র। সঙ্গে রয়েছে বিপুল গোলাবারুদ। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সরকারি অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে গেছে। কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে কম দামে। ব্যবহৃত হচ্ছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নানা অপরাধে।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পুলিশ সদর দপ্তর। গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অস্ত্র উদ্ধারে জোরদার অভিযান চালানো হচ্ছে।

মাত্র ৩৬ দিনের ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে।

এরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীসহ সারা দেশে পুলিশের থানা ও ফাঁড়িতে হামলা চালানো হয়।

ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি: ১১৪টি থানার মধ্যে ৫৬টিতে দেওয়া হয় আগুন, ৫৮টিতে চলে ব্যাপক ভাঙচুর।

যানবাহন ধ্বংস: পুলিশের ১০২৪টি গাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়ে যায়।

রাজধানীর চিত্র: ডিএমপির ৫০টি থানার মধ্যে ২১টিতে আগুন দেওয়া হয়। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, বাড্ডা, ভাটারা, পল্টন, খিলক্ষেত ও যাত্রাবাড়ী থানা।

পুড়ে ছাই বিচারের নথি ও আলামত

অস্ত্রের পাশাপাশি ছাই হয়ে গেছে অজস্র বিচারিক তথ্য। শুধু রাজধানীর ক্ষতিগ্রস্ত ৬টি থানাতে পুড়ে গেছে ১ হাজার ২২৬টি মামলার নথি।

মিরপুর মডেল থানায় ৬৬০টি মামলার নথি এবং মালখানায় থাকা ২৩০টি আলামত পুড়ে ছাই হয়। 

যাত্রাবাড়ী থানায় পুড়ে যাওয়া ফাইল ও জব্ধ করা আলামতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব আজও বের করা সম্ভব হয়নি। সারাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোর হিসাব ধরলে এই ক্ষতির ব্যাপকতা গভীর। 

থানা আক্রমণ ও পুলিশ সদস্য নিহতের ঘটনায় মামলা

জুলাই অগাস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে পুলিশের ৪৪ জন সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। 

পুলিশ সদস্যদের হত্যা, থানায় অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর আর অস্ত্রলুটের প্রতিটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। 

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নিহত পুলিশ পরিবারের দুজন নিকটাত্মীয় দাবি করেন, সেদিন তারা কাছাকাছি থেকে ঘটনার ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছেন। তারা মনে করেন পুলিশ সদস্য নিহতের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।

৪ঠা অগাস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানাতেই হত্যা করা হয় ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে। এছাড়াও ডিএমপি, ঢাকা জেলা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুরেও পুলিশ হত্যার ঘটনা ঘটে। 

দুই বছর পর পুলিশ কী বলছে

২০২৪ সালের ৫ই অগাষ্ট ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ৩টি থানার মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মোহাম্মদপুর থানায়। থানা কম্পাউন্ডে থাকা একাধিক সরকারি বাহনও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

ওই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরা এক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সেদিনের কথা মনে হলে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। চোখের সামনে সেই চিত্র ভেসে উঠলে এখনো নিজের অজান্তেই আঁতকে উঠি।”

দুই বছর পর মোহাম্মদপুর থানায় ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, কাজকর্ম চলছে আগের মতোই স্বাভাবিক গতিতে। 

তবে কিছু ঘাটতি বা টানাপোড়েন রয়ে গেছে বলে জানান ওই থানার একাধিক পুলিশ সদস্য। ঊনআশিটি নথিপত্র পুড়ে যায়। কিন্তু কপি আদালতসহ বিভিন্নভাবে সংরক্ষণ থাকায় মামলা তদন্তে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে জানান মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেসবাহ উদ্দিন।

তিনি আরো বলেন, আমাদের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে।

পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মিডিয়া এএইচএম শাহদাত হোসাইন আলাপ-কে বলেন, “উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আর যেগুলো এখনো গায়েব আছে, সেগুলো উদ্ধারে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান চলছে।” 

তবে এখনো এতো পরিমাণ লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়াটা উদ্বেগজনক মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজাউল করিম সোহাগ।

“পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র এখন অপরাধীচক্রের হাতে থাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। দ্রুত এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হলে হয়তো আরো বেশি মিস ইউজ হতে থাকবে।” 

লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ রাষ্ট্রের জন্য হুমকি বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।