গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম গুমের অভিযোগ বাংলাদেশে, তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ

গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো গুমের অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশে। এই ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলার জয়মণি গ্রামে মিরাজ শেখের বাড়ি। পেশায় জেলে। গত ১০ই এপ্রিল থেকে তাকে নিখোঁজ দাবি করছে তার পরিবার।

নিখোঁজের ১৩ দিন পর ২৩এ এপ্রিল মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ৮ই মে মোংলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পরিবারের সদস্যরা মিরাজের সন্ধান দাবি করেন।

পরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হলেও মিরাজের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

গত ১২ই জুলাই হাইকোর্টও একটি হেবিয়াস করপাস রিটের শুনানির পর ১৫ দিনের মধ্যে মিরাজ শেখকে আদালতে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের বিবৃতিতে আদালতের নির্দেশ কার্যকরের দাবি জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, মিরাজ শেখকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল কোস্টগার্ডের হেফাজতে। এখান থেকে প্রমাণ হয় এ ঘটনাটি গত দুই বছরে বাংলাদেশে প্রথম গুমের কোনো ঘটনা হতে পারে।

এইচআরডব্লিউর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, গুম প্রতিরোধের লক্ষ্যে যে সংস্কার প্রস্তাব হয়েছিল– তা বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। সেখানে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আগের সরকারের আমলে ‘গুম’ ব্যাপক আকার নিয়েছিল।  সেখান থেকেই ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশ শাসন করা অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে।

ওই অধ্যাদেশে গুমের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং আদালতের আদেশ ছাড়াই যেকোনো বন্দিশালা পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তবে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার ওই অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দিয়েছে। এর বদলে নতুন আইনের প্রস্তাব করেছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে মানবাধিকার কমিশনকে সেই ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, “এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে এ ধরনের চর্চা গভীরভাবে গেঁথে গেছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের (নাগরিকদের) সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।”

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের ১০ই এপ্রিল রাতে মোংলার সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্টগার্ডের সদস্যরা জেলে মিরাজ শেখকে আটক করে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান। পরদিন তার পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ডের কার্যালয়ে গেলে প্রথমে বলা হয়, মিরাজ একটি ‘অভিযানে’ আছেন এবং তাদের বিকেলে আসতে বলা হয়। কিন্তু বিকেলে গেলে কোস্টগার্ড জানায়, মিরাজ কখনোই সেখানে ছিলেন না।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘নতুন সরকারের উচিত তাদের প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনের ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করা এবং কমিশনকে গুমের ঘটনা তদন্তের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়া।”

“পুলিশকে দিয়ে গুমের ঘটনার তদন্ত করালে কোনো জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে না এবং এই চর্চা বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও তৈরি হবে না”, মন্তব্য এইচআরডব্লিয়ের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালকের।