হঠাৎ কোটিপতি বনে যাওয়া কে এই হরিদাস চন্দ্র তরনী দাস

মানি লন্ডারিং আইনের মামলায় হরিদাস চন্দ্র তরনী দাসকে রবিবার গাইবান্ধার পলাশবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মামলায় বলা হয়, বৈধ আয়ের কোনো উৎস না থাকলেও হরিদাস চন্দ্রের ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসাবে জমা ছিলো ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এই টাকা বিভিন্ন সময়ে উত্তোলন করার অভিযোগও আনা হয়েছে মামলায়। 

চারদিনের পুলিশ রিমান্ডে তার জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “এখনো  জিজ্ঞাসাবাদ প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তার কাছ অর্থের সোর্স সম্পর্কে আমরা জানার চেষ্টা করছি।” 

প্রাথমিকভাবে হরিদাস কিছু তথ্য দিয়েছেন বলে জানান মো. মনিরুজ্জামান। 

কে এই হরিদাস চন্দ্র তরনী দাস

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা হরিদাস চন্দ্র তরনী দাস। হঠাৎ রামমন্দির নির্মাণের জন্য বিশাল অংকের টাকা বিনিয়োগ নিয়ে তোলপাড়ের পর আবার আলোচনায় এলেন। এর আগেও ২০২২ সালে র‌্যাবের যৌথ অভিযানে বনানী থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন হরিদাস চন্দ্র।  

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সিআইডির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘তৌহিদ ইসলাম’ নামে পরিচিত হন হরিদাস। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হরিদাস চন্দ্রের ঠিকানা গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্যে রামচন্দ্রপুর গ্রামে। তার বাবা গোপীনাথ তরনীদাস। 

হরিদাস চন্দ্র ২০০৬ সালে হাসবাড়ী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি আর ২০০৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০১০ সালে অবৈধভাবে ভারতে চলে যান এবং একসময় দেশে ফিরে আসেন। 

এক সময় তিনি ছিলেন এসি মেকানিক, বিক্রি করতেন শাক সবজিও। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কয়েক বছরের ব্যবধানে উপার্জন করেন কোটি টাকা, তৈরি করেন বিলাসবহুল রিসোর্ট। 

হরিদাসের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি, বদলি, টেন্ডারসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আছে। 

এছাড়াও তিনি নিজেকে কখনো প্রধানমন্ত্রীর প্রোটোকল অফিসার, কখনো মন্ত্রীর পিএস হিসাবে পরিচয় দিতেন বলে অভিযোগ আছে। 

গোয়েন্দা বিভাগ ২০২২ সালে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রটোকল অফিসার হিসাবে প্রতারণা করে আসছিল একটি প্রতারক চক্র। ওই চক্রের প্রধান ছিলেন হরিদাস।

তারা আরও জানায়, ২০১৪ সাল থেকেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়ে অর্থ উপার্জন কীভাবে করা যায় সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হরিদাস চন্দ্র ব্যবহার করতেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার এডিট করা ছবি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মচারীর বদলি বাতিলে ভুয়া ডিও লেটার ব্যবহারের অভিযোগ থেকেই তদন্তের সূত্রপাত হয় বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

অবশেষে এ চক্রের মূলহোতা হরিদাস চন্দ্রকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে রাজধানীর বনানী থেকে এক সহযোগীসহ ২০২২ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব। 

তার বিরুদ্ধে আরও যা অভিযোগ

হরিদাস চন্দ্রকে ২০২২ সালে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের তৎকালীন পরিচালক (মিডিয়া) খন্দকার আল মঈন গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছিলেন, বিয়ের পর শ্বশুরের পরিচয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় কিছু জমি কেনেন। শ্বশুরের মাধ্যমে এলাকার লোকের কাছে নিজেকে ‘বিত্তশালী’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। 

তিনি আরও জানান, “নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার হিসেবে পরিচয় দিতেন হরিদাস।” 

মাত্র ৬ থেকে ৭ বছরেই প্রায় ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন হরিদাস। গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন কারাগারে ছিলেন। পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে লাপাত্তা হয়ে যান হরিদাস চন্দ্র।  

রাম মূর্তি নির্মাণে অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক

২০২৪ সালে পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামে ফিরে আসেন হরিদাস। এশিয়ার সবচেয়ে বড় রামমন্দির নির্মাণে ৪০ কোটি টাকার অর্থায়ন করেন। এ নিয়ে তোলপাড় হয় পুরো জেলায়। 

একপর্যায়ে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের  প্রতিবাদের মুখে বন্ধ হয়ে যায় মন্দির নির্মাণ কাজ। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের গাইবান্ধা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক চঞ্চল সাহা আলাপ-কে বলেন, “গাইবান্ধা ধর্মীর সম্প্রীতির একটি জেলা। হরিদাস চন্দ্রের অর্থের উৎস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে এখানকার সনাতনীরা বিব্রত।” 

তবে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে হরিদাস চন্দ্র তরনী দাসকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি দাবি করে, উগ্র সাম্প্রদায়িক মহল রাম মূর্তি নির্মাণের বিরোধিতা করে আসছিলো। তাই হরিদাসকে কথিত অর্থপাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

গাইবান্ধা জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. জসিম উদ্দিন আলাপ-কে বলেন, “হরিদাস চন্দ্রের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুরসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির শংকা ছিলো।” 

কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক আছে বলে জানান পুলিশ সুপার। 

গ্রেফতারের পর ১৩ই জুলাই বিকালে হরিদাসকে আদালতে হাজির করে এক সপ্তাহের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।