সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইউরোপে তখন যুদ্ধের আগুন। আটলান্টিক মহাসাগরে একের পর এক জাহাজ ডুবিয়ে দিচ্ছে জার্মান সাবমেরিন। যুদ্ধ জিততে তখন শুধু সৈন্য আর অস্ত্রই যথেষ্ট নয়,দরকার প্রচুর জ্বালানি।
আর ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রশক্তির জন্য ভরসা হয়ে ওঠলো ভেনেজুয়েলার তেল।
১৯৪২ সালে মার্কিন পূর্ব উপকূলে (ইস্ট কোস্ট) ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ হওয়া তেলের বড় অংশই আসতো ভেনেজুয়েলা থেকে। সেখান থেকে ছোট ছোট জাহাজে করে অপরিশোধিত তেল আনা হতো ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত আরুবা এবং কুরাসাও দ্বীপের রিফাইনারিগুলোতে। সেখান থেকে সমুদ্রগামী বড় ট্যাঙ্কারে করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পাঠানো হতো পেট্রোল, ডিজেল, এভিয়েশন ফুয়েলসহ নানা ধরনের জ্বালানি তেল।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের একটি গবেষণা বলছে, ১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের যুদ্ধকালীন তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আসতো ভেনেজুয়েলা থেকে।
অর্থাৎ, সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে না থেকেও যুদ্ধে ছিলো ভেনেজুয়েলা, দেশটির অস্ত্র ছিলো মাটির নিচে থাকা তেল।
কিন্তু ভেনেজুয়েলার তেলের এই গুরুত্ব তখনই হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। গল্পটা শুরু হয়েছিলো আরও অনেক আগে।
১৯১৪ সাল। ভেনেজুয়েলার জুলিয়া প্রদেশের মেনে গ্রান্দে শহর। সেখানে ‘জুমাকে ওয়ান’ কূপে আবিস্কার হলো তেল। খবর দ্রুত পৌঁছে গেলো বিশ্বের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলোর কাছেও। বদলাতে শুরু করলো ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি।
একে একে ভেনেজুয়েলায় ঢুকতে শুরু করলো যুক্তরাজ্যের শেল, মার্কিন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ও গালফ অয়েল-এর মতো কোম্পানি। ১৯২০-এর দশকে তেল উত্তোলন বাড়তে থাকলো দ্রুতগতিতে। ভেনেজুয়েলা হয়ে উঠলো বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক।
তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, এই তেলই একদিন হয়ে উঠবে ভেনেজুয়েলা আর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হলো। যুক্তরাষ্ট্র পেলো নির্ভরযোগ্য তেলের উৎস আর ভেনেজুয়েলা করলো বিপুল আয়।
সম্পর্কে ভাঙন
তেলের কারণে যে সম্পর্ক গভীর হয়েছিলো, সেই তেলই একসমইয় ধীরে ধীরে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরাতে শুরু করলো।
ষাটের দশকে, বিশ্বজুড়ে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও বুঝতে শুরু এই সম্পদের ওপর তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবে তেলের উৎপাদন, দাম আর মুনাফার ভাগ।
সেই চিন্তা থেকে ১৯৬০ সালে গঠিত হলো অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ, ওপেক। ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনেজুয়েলা মিলে প্রতিষ্ঠা করলো এই সংস্থা। লক্ষ্য ছিলো বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
এরপর, ১৯৭৫ সালে জাতীয়করণ আইন পাস করলো ভেনেজুয়েলা। গঠন হলো রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ। ১৯৭৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে দেশটির তেলশিল্প রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলো। তবে তখনও বিদেশি তেল কোম্পানিগুলো মুনাফায় দুই দেশের সম্পর্ক ভেঙে পড়ার মতো টান পড়েনি।
দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা চলেছে, তেলও যুক্তরাষ্ট্রে গেছে। কিন্তু সম্পর্কের চরিত্র বদলে গেলো ১৯৯৮ সাল। যা ভবিষ্যতের বড় সংঘাতের বীজ বুনে দিলো।
ভেনেজুয়েলা তখন অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক হতাশায় ভুগছে। তেলের দেশ হয়েও সাধারণ মানুষের জীবন বদলায়নি। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছিলো।
ঠিক এই সময় সামনে এলেন এক সাবেক সেনা কর্মকর্তা হুগো চাভেজ। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় বসেন চাভেজ। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দেশের বিপুল তেলসম্পদকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, সিএফআর-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চাভেজের হাতে তেলের টাকা ছিলো, আর সেই টাকা দিয়েই তিনি শুরু করলেন তার ‘বলিভারিয়ান বিপ্লব’— দরিদ্র মানুষের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও নানা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি।
সেসময় তেলের দাম বাড়ায় ভেনেজুয়েলার আয়ও দ্রুত বাড়তে থাকে। চাভেজের কাছে তেল রপ্তানি শুধু আয়ের উৎস ছিলো না, ছিলো রাজনৈতিক শক্তিও।
ক্ষমতায় এসে তিনি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএকে আরও বেশি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরু করলেন। তার লক্ষ্য ছিলো তেলশিল্প থেকে যে বিপুল অর্থ আসে, সেই অর্থের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং তা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করা।
কিন্তু এখানেই শুরু হলো নতুন সমস্যা। চাভেজের নীতি শুধু ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই বদলাচ্ছিলো না, বদলে দিচ্ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও।
চাভেজ প্রকাশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করতে শুরু করেন। একই সময়ে কিউবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন এবং রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াতে থাকেন।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। রাজনৈতিকভাবে ওয়াশিংটন ও কারাকাসের দূরত্ব বাড়লেও ভেনেজুয়েলার তেল তখনও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। অর্থাৎ দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই খারাপ হোক, তেলের কারণে তাদের অর্থনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তারপর এলো ২০০২ সাল। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকার এবং বিরোধীদের মধ্যে বিভেদ শুরু হলো। চাভেজ সরকার পিডিভিএসএর পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চাইলে কোম্পানির একদল কর্মকর্তা ও কর্মী এর বিরোধিতা করেন। তারা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন।
২০০২ সালের এপ্রিলে চাভেজকে একটি সামরিক ক্যু-এর পর ক্ষমতা থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র দুই দিনের মধ্যেই তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন আর বলেন সেই ক্যু ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র।
২০০৭ সালে চাভেজ অরিনোকো বেল্টের তেল প্রকল্পগুলোতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তার সরকারের শর্ত ছিলো, এসব প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, তখন এক্সনমোবিল, কনোকোফিলিপস ও শেভরনের মতো বিদেশি কোম্পানি সেখানে কাজ করছিলো। কিন্তু নতুন শর্তে এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপস রাজি না হওয়ায় তাদের প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ ভেনেজুয়েলা সরকারের হাতে চলে যায়।
ফলে তেলশিল্পে বিদেশি কোম্পানির প্রভাব কমিয়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন চাভেজ। অর্থাৎ, একসময় যেসব মার্কিন কোম্পানি ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রে সরাসরি ব্যবসা করতো, তাদের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেলো।
যে তেল একসময় দুই দেশকে কাছাকাছি এনেছিলো, সেই তেলই এবার তাদের রাজনৈতিক দূরত্বের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হয়ে উঠলো।
মাদুরোর উত্থান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
চাভেজের সময়ে তেল ছিলো ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই তেলই ধীরে ধীরে দেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে শুরু করলো।
২০১৩ সালে হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট হলেন নিকোলাস মাদুরো। চাভেজের মতো তিনিও তেলের ওপর নির্ভর করেই অর্থনীতি চালিয়ে যেতে থাকলেন। কিন্তু সমস্যা ছিলো, অর্থনীতির অনান্য খাতগুলো ততোটা শক্তিশালী হয়নি।
এরপর এলো বড় ধাক্কা। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করলো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আইএমএফ বলছে, ২০১৪ সালের জুন থেকে কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়।
ভেনেজুয়েলার জন্য এই পতন ছিলো ভয়াবহ।
দেশটির অর্থনীতি তখন প্রায় পুরোপুরিই তেলের ওপর নির্ভরশীল। সিএফআর’র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৪ সালে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি থেকে ২০১৬ সালের শুরুতে ৩০ ডলারের নিচে নেমে যায়।
তেলের দাম কমে যাওয়ার অর্থ ছিলো সরকারের হাতে ডলার কমে যাওয়া। মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ভেনেজুয়েলা।
তবে সংকটের পুরো দায় শুধু তেলের দাম পড়ে যাওয়ার ওপর ছিলো না।
সিএফআর-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তেলের দাম কমার আগেই ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং তেলশিল্পে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে।
মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলন বাড়তে থাকলো। অন্যদিকে, মাদুরো অভিযোগ করছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের পর মাদুরো আবার ক্ষমতায় বসেন। এর প্রতিবাদে বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদো নিজেকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ তাকে স্বীকৃতিও দেয়।
২০১৯ সালের ২৮এ জানুয়ারি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। উদ্দেশ্য ছিলো তেল থেকে মাদুরো সরকারের আয় বন্ধ করা।
তবে নিষেধাজ্ঞার পরও তেল বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চীন, রাশিয়া, কিউবা ও ইরানের সহযোগিতায় মাদুরো সরকার বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে।
এর মধ্যেই ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ও বিনিয়োগ কমছিলো। ফলে বিপুল তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও দেশটি আগের মতো আয় করতে পারছিলো না।
বিকল্প বাজার হলো চীন
মাদুরোর সময়ে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো তেল। ভেনেজুয়েলার রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুত, আর চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক। ফলে দুই দেশের স্বার্থ অনেকটাই মিলে যায়।
চীন শুধু ভেনেজুয়েলার তেলের ক্রেতাই ছিলো না, বড় ঋণদাতাও ছিলো। ২০০৭ সাল থেকে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলাকে ৬ হাজার কোটি ডলারের বেশি ঋণ দেওয়া হয়। ঋণের একটি বড় অংশের বিনিময়ে ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে তেল নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। অর্থাৎ, চীন টাকা দিলো, আর ভেনেজুয়েলা সেই ঋণ পরিশোধ করলো তেল দিয়ে। যেই ব্যবস্থাকে বলা হয়েছে ‘লোন ফর অয়েল’ অর্থাৎ তেলের বিনিময়ে ঋণ।
২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিলো চীন। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেসময় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল যেতো চীনে।
মাদুরোর পতন
২০২৫ সালের ২০এ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন ডনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয়বার হোয়াট হাউসে আসার পর ভেনেজুয়েলার উপর তার নীতি আরও কঠোর হয়ে ওঠে। মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অপরাধী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলে ট্রাম্প প্রশাসন।
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে মাদুরো সরকার।
২০২০ সালে মাদুরোকে ধরিয়ে দিতে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো যুক্তরাষ্ট্র। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার করা হয়। একই বছরের অগাস্টে মাদুরোকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারের পরিমাণ আরও দ্বিগুণ করে ৫ কোটি ডলার করা হয়।
এরপর শুধু রাজনৈতিক চাপ নয়, সামরিক চাপও বাড়তে থাকে। ক্যারিবীয় সাগরে কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযান শুরু হয়। একই সময়ে ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ জব্দ এবং দেশটির আশপাশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়।
২০২৬ সালের ৩রা জানুয়ারি ভোরে মার্কিন বাহিনী রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। পরে নিউ ইয়র্কের আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগে মামলা শুরু হয়। মাদুরো আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং তাকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর তার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের সম্পর্কের ধরনও দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে।
নতুন তেল চুক্তি, ১০০ বছরের মার্কিন নিয়ন্ত্রণ
২০২৬ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেলো।
মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকারের সঙ্গে নতুন তেল চুক্তি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। গেলো ২৮এ অগাস্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে, যার আওতায় ভেনেজুয়েলার ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল মজুতের ওপর “সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ” পাবে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প একে “বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি” হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত বাড়বে এবং মার্কিন জনগণের জন্য জ্বালানির দামও কমতে পারে।"
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে অবশ্য এই চুক্তিকে ‘সার্বিকভাবে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, ১৭টি তেলক্ষেত্র থেকে জ্বালানি উত্তোলনে ১০০ বছর ছাড় পাবে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে চুক্তিটি নিয়ে ভেনেজুয়েলায় সমালোচনাও কম নয়। বিরোধীদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখেই রদ্রিগেজ সরকার এত বড় চুক্তিতে রাজি হয়েছে। বিশেষ করে, তেলক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
জানুয়ারিতে দ্য আটলান্টিকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বলেছিলেন রদ্রিগেজ যদি সঠিকভাবে কাজ করতে না পারেন, তবে তাকে খুব বড় মূল্য চোকাতে হবে। সম্ভবত সেটা মাদুরোর চেয়েও বড় হবে।
রদ্রিগেজ অবশ্য বলছেন, ভেনেজুয়েলা নিজেদের তেলসম্পদের মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব হারাচ্ছে না। তার যুক্তি, এতো তেল মাটির নিচে পড়ে থাকলে কোনো লাভ নেই। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো দরকার। আর এই চুক্তির মাধ্যমে সেগুলো পাওয়া যাবে।
রদ্রিগেজ সরকারের দাবি, চুক্তি থেকে ভেনেজুয়েলা বিপুল রাজস্ব পাবে এবং তেল উৎপাদন বাড়বে।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ডেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অনুরোধে তিনি এ উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। রদ্রিগেজ সরকারের হিসাবে, নতুন চুক্তির কারণে থেকে ভেনেজুয়েলা ২০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার কর পাবে। পাশাপাশি ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ আসবে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাঙা করার অংশ হিসেবে ট্রাম্প জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য পরিমাণকে বড় করে দেখিয়েছেন।
১৯৮২ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের মজুত এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি ব্যারেল। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে করা চুক্তি মার্কিন জ্বালানি তেলের মজুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।
জ্বালানি তেলের বাজারবিষয়ক গবেষক রোরি জনস্টন সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে বলেছেন, “৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেলের সংখ্যাটি বিভ্রান্তিকর। চুক্তির আসল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো প্রায় পুরোপুরি অজানা।”
এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তেল। এই তেলই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুই দেশকে ঘনিষ্ঠ করেছিলো। পরে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প জাতীয়করণ, চাভেজের উত্থান এবং মাদুরোর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ক বদলে যায়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভেনেজুয়েলাকে চীনসহ বিকল্প বাজারের দিকে ঠেলে দেয়।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি আবার বদলে গেছে। মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক সমঝোতার কেন্দ্রে আবারও সেই তেল। তবে, দুই দেশ কি সমানভাবে লাভবান হবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রই বেশি সুবিধা পাবে তা বোঝা যাবে চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর।