মার্কিন অস্ত্র ভাণ্ডারে টান, ভরসা এখন স্টার্টআপে

গত ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই আমেরিকার অস্ত্র ভাণ্ডার নিয়ে কপালে ভাঁজ পড়েছে দেশটির নীতি নির্ধারকদের।

একদিকে উক্রেইন ফ্রন্টে ‘প্রক্সি ওয়ারে’ অস্ত্রের জোগান দেওয়া, আরেকদিকে সরাসরি ইরানে হামলা– এই দুই ঘটনায় মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা এবং নিখুঁত নিশানাভেদী অস্ত্রের মজুত কমিয়ে এনেছে আশঙ্কাজনকভাবে। 

আর এই সংকটকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা এবং পেন্টাগনের কৌশলবিদরা। 

আকাশ প্রতিরক্ষায় মার্কিনিদের অস্ত্রের গৌরব হলো, ‘প্যাট্রিয়ট’ ও ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র। কিন্তু ইরানের সঙ্গে কয়েকদিনের যুদ্ধে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত এক তৃতীয়াংশ এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী থাড মিসাইলের মজুত নেমেছে প্রায় অর্ধেকে। 

‘টমাহক ক্রুজ মিসাইল’ এবং কাঁধে রেখে ব্যবহারযোগ্য ‘স্টিঙ্গার মিসাইলের’ মজুতও এখন বেশ সীমিত। 

কমে যাওয়া মজুত কতটা আশঙ্কাজনক তা ফুটে উঠেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ ক্ষমতার এই অস্ত্র ভাণ্ডার ইরান যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে লেগে যেতে পারে তিন বছর বা তারও বেশি সময়। 

আর এই প্রেক্ষাপটে হন্যে হয়ে সমাধানের উপায় খুঁজছেন মার্কিন নীতি নির্ধারকেরা।

তাদের ভাবনায় এখন সিলিকন ভ্যালি ঘিরে গড়ে ওঠা স্টার্টআপ বা ছোট ছোট অস্ত্র নির্মাতাদের দিকে। 

লকহিড মার্টিন, বোয়িং বা আরটিএক্সের মতো ঐতিহ্যবাহী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বড় ঠিকাদারদের উপর নির্ভরতা কমাতে চাচ্ছে মার্কিন সরকার। 

দামে সস্তা ও দ্রুত সরবরাহ করতে পারে, এমন নতুন নতুন কোম্পানির ওপরই নির্ভরতা বাড়াতে চাচ্ছে মার্কিন সরকার। 

কিন্তু নতুন এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠছে। আর ইরান ও উক্রেইনে চলমান যুদ্ধের মধ্যে এই সমাধান মিলবে কিনা, তাও এখন ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন সরকারের। 

সংকট কতটা গভীর এবং চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকিগুলো কী কী?

মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর তথ্যে বলা হচ্ছে, অস্ত্রের প্রয়োজনীয় মজুত ক্রমাগত কমে আসতে থাকায় দুর্বল হয়ে পড়ছে মার্কিন স্থাপনা ও সামরিক অবস্থানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই কারণে বহুগুণ ঝুঁকি বেড়ে গেছে বিদেশে কর্মরত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানি এবং সামরিক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির।

কেন এমন হলো? এই প্রশ্নের উত্তরের অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের আক্রমণাত্মক অস্ত্রের তুলনায় মার্কিন প্রতিরক্ষামূলক এবং আক্রমণাত্মক মিসাইলের উৎপাদন ও পরিচালনা খরচ বহুগুণ বেশি। 

এই খরচ কতটা বেশি তাও উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। 

ইরানের হামলাকারী ‘শাহেদ’ ড্রোনের প্রতিটির উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার।

 ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন, যেগুলোর দাম ২০ হাজার ডলারের মতো। কিন্তু এই ড্রোন ধ্বংস করতে আমেরিকার ব্যয় হচ্ছে বহুগুণ বেশি।

স্বল্পপাল্লার ‘ফাতেহ-১১০’ ব্যালিস্টিক মিসাইলের খরচ কয়েক লাখ ডলার। 

মাঝারি পাল্লার ‘শাহাব-৩’ মিসাইলের খরচ ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলার।

আর এসব অস্ত্র ঠেকাতে এবং ইরানে হামলা করতে আমেরিকা যেসব অস্ত্র ব্যবহার করেছে, সেসবের দাম তার থেকে অনেক বেশি। 

ইরান লক্ষ্য করে মার্কিন নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী যে টমাহক ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করেছে, সেগুলোর প্রতিটির খরচ ২০ লাখ থেকে ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার। 

জেএএসএসএম-ইআর মিসাইলের প্রতিটির খরচ প্রায় ১১ লাখ ডলার। 

ইরান ও তার প্রক্সি বাহিনীর ড্রোন-মিসাইল ভূপাতিত করতে ব্যবহার করা প্রতিটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট এবং থাড ইন্টারসেপ্টরগুলোর একেকটির পেছনে খরচ হয় ৪০ লাখ থেকে ৬০ লাখ ডলার। 

তার মানে ইরানের মাত্র ২০ হাজার ডলারের একটি ড্রোন ধ্বংস করতে আমেরিকাকে প্রায় ৪০ লাখ ডলার মূল্যের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ফায়ার করতে হচ্ছে। 

এই তীব্র খরচের ব্যবধানের কারণেই, সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপগুলোর সহায়তায় ৫ লাখ ডলারের মধ্যে ‘কম খরচের ক্রুজ ও হাইপারসনিক মিসাইল' তৈরির দিকে পেন্টাগন এখন ঝুঁকছে বলে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। 

প্রশ্ন হলো, ইরান যুদ্ধে কী পরিমাণ মিসাইল ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র?

পেন্টাগন এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান সংঘাত চলাকালীন মার্কিন বাহিনী বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। 

সংঘাতের শুরু থেকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে সর্বমোট ১৩ হাজার ৬২৯টি যুদ্ধাস্ত্র বা গোলাবারুদ নিক্ষেপ করেছে।

ইরান যুদ্ধের প্রথম মাসেই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনগুলো থেকে ৮৫০টিরও বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে সিএসআইএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

আর যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত এই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। 

ইরানের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে মার্কিন বিমানবাহিনী আকাশ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য প্রায় ১,১০০টি জেএএসএসএম মিসাইল ব্যবহার করেছে। 

ইরানের শত শত ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে মার্কিন বাহিনী ১৪০০টি প্যাট্রিয়ট মিসাইল ছুঁড়েছে। তাদের কাছে মজুত ছিলো ২,২০০টি। 

পাশাপাশি ৪৫২টি থাড মিসাইলের মজুত থেকে প্রায় ১৭৫টি ফায়ার করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

এই বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের কারণে যুদ্ধ শুরুর প্রথম মাত্র ছয় দিনেই শুধু মাত্র মিসাইল ও গোলাবারুদ বাবদ খরচ হয়েছে মার্কিন করদাতাদের ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতের সামগ্রিক সামরিক ব্যয় ইতোমধ্যে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। 

দামি অস্ত্রের ‘উচ্চ ব্যবহার’

জাহাজ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য হাইপারসনিক গতির এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টর মহাকাশে স্বল্প থেকে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

জুনের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর, সিএসআইএস অনুমান করছে যে, ওই যুদ্ধে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২৬ বিলিয়ন ডলারই ব্যয় হয়েছে উচ্চমানের ও ব্যয়বহুল যুদ্ধাস্ত্রের পেছনে।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সম্পদ রক্ষা করতে নির্ভর করা হয় অত্যাধুনিক ইন্টারসেপ্টরগুলোর ওপর। ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুই ছিলো ওইসব মার্কিন স্থাপনা ও সম্পদগুলো। 

ইরানের সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিরোধ করতে গিয়ে প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টরের মতো সরঞ্জামগুলোর ক্ষয় বা কমে যাওয়ার হার নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। 

এর পাশাপাশি ইরানে হামলা চালাতে টমাহক ও জয়েন্ট এয়ার-টু-সারফেস স্ট্যান্ডঅফ মিসাইল (জেএএসএসএম)-এর মতো বিপুল পরিমাণ দূরপাল্লার স্থল-আক্রমণকারী যুদ্ধাস্ত্রও ব্যবহার করছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই মডেলের প্রত্যেক ক্ষেপণাস্ত্র ১,০০০টিরও বেশি নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। যার প্রতিটির খরচ প্রায় দেড় থেকে তিন মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।

বিশ্বব্যাপী টমাহকের ক্ষেপণাস্ত্রের বিপুল চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমেরিকা বছরে এগুলো উৎপাদন করতে পারে মাত্র কয়েকশো। 

প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রকে বিবেচনা করা হয় মার্কিন সামরিক ভাণ্ডারের অন্যতম উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে। ভূপৃষ্ঠের ভ্রাম্যমাণ অবস্থা থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি বিমান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ চলাকালীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া সস্তা ইরানি ড্রোনগুলো প্রতিহত করতেও প্যাট্রিয়ট ব্যবহার করা হয়েছে।

উক্রেইনসহ বিশ্বের ১৮টি দেশ প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে, যা রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বর্তমানে আরও বেশি ইন্টারসেপ্টরের জন্য মরিয়া হয়ে আছে।

থাড মোবাইল বা ভ্রাম্যমাণ ব্যবস্থাটি বিশেষভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিলো। এটি ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

ব্যাপকভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত । তারাও উচ্চ সফলতার জন্য থাড ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর প্রায় ১০০টি থাড ইন্টারসেপ্টর তৈরি করে।

জাহাজ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য হাইপারসনিক গতির এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টর মহাকাশে স্বল্প থেকে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

আর জাহাজ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এসএম-৬-এর প্রতি ইউনিটের খরচ প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার। এটিও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ঝাঁকের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং শাহেদ ড্রোনের মজুত ব্যবহার করে ইরান। 

তাদের একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোনগুলোর খরচ ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে।

কিছু বিশ্লেষক অনুমান করেন যে, ইরানের স্বল্প-পাল্লার ফাতেহ-১১০ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রতিটির খরচ মাত্র কয়েক লক্ষ ডলার হতে পারে। মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শাহাব-৩ -এর মূল্য ১ থেকে ৩ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।

ইরানের হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমেরিকার ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টরগুলোই একমাত্র কার্যকর বিকল্প হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

সিএসআইএসের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, "হ্রাস পাওয়া সামরিক মজুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার জোটের অংশীদারদের হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে আরও বেশি ঝুঁকি নিতে বাধ্য করতে পারে।"

অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বিষয়ক সিনিয়র বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস বলেছেন, “আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষুধার্ত বা অতি দ্রুতহারে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছে।”  

তিনি বলছেন যে, গুণগত মান মানেই যে আমাদের প্রচুর পরিমাণে অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, এটা ভুল ধারণা। 

সিএসআইএসের বিশ্লেষকদের মতে, চিহ্নিত হওয়া একটি প্রধান সমস্যা হলো- অস্ত্রের এই মজুত ফুরিয়ে যাওয়া পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মার্কিন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আর এখানেই শঙ্কা তৈরি হয়েছে আমেরিকার জন্য। এটা প্রতিরোধে নিত্যনতুন কৌশল খুঁজছে দেশটি। 

অস্ত্রের মজুত বাড়াতে আমেরিকার নতুন কৌশল

অস্ত্রের ঘাটতি মেটাতে নতুন প্রতিরক্ষা কোম্পানিতে ভরসা পেন্টাগনের

অস্ত্রের মজুত বাড়াতে সম্প্রতি লকহিড মার্টিনের সঙ্গে রেকর্ড ৫৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের চুক্তি করেছে মার্কিন সরকার। 

এছাড়া থাড ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন চার গুণ বাড়ানোর জন্যও লকহিডকে ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের আরেকটি চুক্তিও দেওয়া হয়েছে। 

তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, গুরুত্বপূর্ণ বা সংকটকালীন অস্ত্রশস্ত্রের উৎপাদন শুরু থেকে শেষ হতে (যেটাকে বলা হয় ম্যানুফ্যাকচারিং লিড টাইম) সময় লাগে প্রায় দুই থেকে চার বছরেরও বেশি। 

তাই গবেষক ডেভিস মনে করেন, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশের সামরিক বাহিনীকে এমন স্বল্পমূল্যের ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী সক্ষমতার পেছনে বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, যাতে স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা সম্ভব।

ওই গবেষক বলেন, "আমাদের চিন্তাভাবনা আবর্তিত হচ্ছে অত্যন্ত নিখুঁত, বিশেষায়িত এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল সব সমাধানকে ঘিরে। এটা কেবলই প্রযোজ্য খুব অল্পসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র জোগাড়ের জন্য। কিন্তু আমরা যদি পরবর্তী যুদ্ধে জয়ী হতে চাই, তবে এই ধারা বা গতিপথ আমরা বজায় রাখতে পারি না। আমাদের মৌলিকভাবে দিক পরিবর্তন করতে হবে।"

আর এই ধারণা থেকেই উৎপাদনের পরিমাণ ও সরবরাহ বাড়াতে আসছে স্টার্ট-আপগুলোর কথা। 

ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের মধ্যে অস্ত্রের মজুত আবার গড়ে তুলতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপগুলোর ওপর ভরসা করছে। এখন এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা সামরিক প্রয়োজনের বিশাল স্কেলে অস্ত্র উৎপাদন করতে সক্ষম।

নতুন যেসব স্টার্টআপগুলোর কথা ভাবা হচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছে,এআই-চালিত বিমান সফটওয়্যার কোম্পানি 'শিল্ড এআই', স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'অ্যান্ডুরিল', ক্রুজ মিসাইল স্টার্ট-আপ 'কোঅ্যাসপায়ার' এবং কম খরচে গোলাবারুদ প্রস্তুতকারক কোম্পানি 'ক্যাসটেলিওন'। 

সিলিকন ভ্যালির প্রতিরক্ষা খাতের এসব উদ্যোক্তারা বহু বিলিয়ন ডলারের ঐতিহ্যবাহী বড় বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের তুলনায় মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজনের সময় আরও সস্তায়, দ্রুত সময়ে এবং চটজলদি সাড়া দেওয়াও জন্য প্রস্তুত ছিলো বলে দাবি করে আসছিলেন তারা। 

নতুন এই কোম্পানিগুলো প্রথাগত ও প্রতিষ্ঠিত বড় বড় কোম্পানির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের। 

তবে পুরোনো কোম্পানিগুলোর রয়েছে আমলাতান্ত্রিক ও জটিল সরকারি অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়া পরিচালনা করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি, বিপুল পরিমাণে অস্ত্র উৎপাদনের জন্য এবং আইনপ্রণেতাদের লবিং করতে তাদের কাছে শত কোটি ডলারের পুঁজিও রয়েছে বলে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।  

তবে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর কাজের গতি বেশ ধীর, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জাম তৈরির ক্ষেত্রে।

সিএসআইএসের 'সেন্টার ফর দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস'-এর পরিচালক জেরি ম্যাকগিন ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, “একটি জিনিস তৈরি করা... আর সেটি বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তারা কি আসলেই সরবরাহ করতে পারবে?”

দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে পেন্টাগন ক্রমেই স্পষ্ট করে তুলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকৌশল পুনর্গঠনে সস্তা, স্মার্ট এবং ছোট আকারের অস্ত্র তৈরিতে সিলিকন ভ্যালি অপরিহার্য হয়ে উঠবে।

সিএসআইএস’র জুলাই মাসের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে এই পর্যন্ত প্রায় ১০,০০০ নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাজারে প্রবেশ করেছে। 

প্রথাগত বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের বাইরে থাকা এই অপ্রাতিষ্ঠানিক কোম্পানিগুলো ২০২৫ অর্থবছর নাগাদ চুক্তির বাধ্যবাধকতা হিসেবে ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল পেয়েছে।

আর এই ছোট ছোট কোম্পানিগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ার আরও একটি কারণ রয়েছে। পেন্টাগনের ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে তাদের মোট গোলাবারুদের প্রায় অর্ধেকই কম খরচে করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা ২০৩১ অর্থবছর নাগাদ ৭০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ওয়াটিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চিন্তাভাবনার প্রতিফলন বর্তমান চুক্তিগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। মে মাসে পেন্টাগন মার্কিন সামরিক বাহিনীর আক্রমণাত্মক সক্ষমতা "আক্রমণাত্মকভাবে সম্প্রসারণ" এবং কম খরচের মিসাইল কেনার জন্য অ্যান্ডুরিল, ক্যাসটেলিওন, কোঅ্যাসপায়ার, লিডোস এবং জোন-ফাইভসহ বেশ কয়েকটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে।

এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ২০২৭ সাল থেকে শুরু করে তিন বছরের মধ্যে ১০ হাজার ক্রুজ মিসাইল সংগ্রহ করা। 

মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে যে, ক্যাসটেলিওন-এর কাছ থেকে প্রতি বছর ন্যূনতম ৫ হাজার হাইপারসনিক মিসাইল কেনার জন্য একটি চুক্তি করবে। যার নাম 'ব্ল্যাকবিয়ার্ড'। প্রযুক্তিটি যথাযথ পরীক্ষায় স্বীকৃতি পেলে পাঁচ বছরে ১২ হাজারটি পর্যন্ত মিসাইল কেনা হতে পারে। 

সিএসআইএস’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বিপুল চাহিদা এই শিল্প খাতকে বাস্তব সময়ে অস্ত্র তৈরির কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাবে। স্টার্টআপগুলো কম খরচে এই প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে তা দেখিয়েছে। কিন্তু এখন তাদের প্রমাণ করতে হবে যে, তাদের পণ্যগুলো পেন্টাগনের মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কম খরচে প্রযুক্তি তৈরি করতে পারলেও, সামরিক চাহিদার বিশাল স্কেলে সরবরাহ করতে পারবে কি না? এছাড়া তাড়াহুড়ো করে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী সাব-কন্ট্রাক্টরদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে কিনা, তাও ভাবনার বিষয় দাঁড়িয়েছে। 

কারণ, পেন্টাগনের ধীরগতির চুক্তি প্রক্রিয়া এবং মার্কিন কংগ্রেসের বাজেট পাসের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানো নতুন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।