সিজেপির বিজয় নাকি বিজেপির কূল রক্ষা, ভারতের শিক্ষার্থী আন্দোলন কী বার্তা দিচ্ছে?

ভারতের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের জের ধরে শুরু হয়েছিলো ককরোচ জনতা পার্টি অনলাইন আন্দোলন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভার্চুয়াল জগত থেকে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশের কয়েকটি মহানগরে।  

ব্যঙ্গাত্মক মিমস, রিলস ও কার্টুন বানানো জেন-জিরা ঘরে ছেড়ে যোগ দেয় বিক্ষোভ ও অনশনে। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় তরুণদের লাঠিপেটা করে পুলিশ, কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া হয় এবং ছেটানো হয় গরম পানি। 

আন্দোনলন শুরু হযেছিলো ভারতের ন্যাশনাল এন্ট্র্যান্স কাম এলিজিবিলিটি টেস্টের প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষা বাতিল হওয়ার ক্ষোভ থেকে। 

আন্দোলনকারীদের দাবি ছিলো - শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা। 

তরুণ বিক্ষোভকারীদের সাথে সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নামে ভারতের সুশীল সমাজ, বিরোধী দল ও সেলিব্রিটি জগতের অসংখ্য মানুষ। 

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যে শনিবার পদত্যাগ করেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, অন্যান্য দাবিও মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেয় সরকার। 

মন্ত্রীর পদত্যাগ ও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মানার ঘোষণা আসার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে তরুণরা। 

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দিপকে বলেছেন, “উই হ্যাভ ডান ইট”।

আনন্দে অনেককেই চকলেট ও মিষ্টি বিতরণ করতে দেখা যায়। স্লোগান ওঠে, “ওয়ান উইকেট ডাউন।” 

দাবি পূরণ হওয়ায় আন্দোলন সমাপ্ত করেছে সিজেপি। তবে আন্দোলন চলার সময়ে অনেকেই এই আন্দোলনকে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের গণঅভ্যুত্থানের সাথে তুলনা করেন।

যদিও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে সিজেপি তাদের বিজয় হিসেবে দেখছে। অনেকেই বলছেন, এটি গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবে পরিণত না হওয়ায় নরেন্দ মোদি ও ক্ষমতাসীন বিজেপি বেঁচে গেছে।

সিজেপির আন্দোলন কেন ভিন্ন

ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে রাজনৈতিক পরিবর্তন এই প্রথম না। ১৯৭০ এর দশকে ভারতের গুজরাতে ‘নবনির্মাণ’ আন্দোলনের ফলে সেখানকার স্থানীয় সরকারের পতন হয় এবং দেশজুড়ে দূর্নীতি ও মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের দলে ১৯৭৫ সালে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন দেশটির তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

এরপরের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর পরাজয় হয়।

তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথমবার ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বড় পরিসরের শিক্ষার্থী আন্দোলন দেখা যায়নি। 

নাগরিকত্ব আইন ও কৃষি আইন নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলনে বিভিন্ন পরিসরে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ থাকলেও সেখান থেকে এই ধরনের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আসতে দেখা যায়নি।

সিজেপির এই আন্দোলন কেন আগের আন্দোলনগুলোর চেয়ে ভিন্ন তা নিয়ে বিভিন্ন মতামত দেন বিশেষজ্ঞরা। 

যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো ইয়ামিনি আইয়ার মনে করেন, “এবারের আন্দোলনের বিষয়বস্তু সব ধরনের সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকাটাই এর ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে যাওয়ার কারণ।” 

বিবিসিকে তিনি বলেন, “পরীক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিষয়টি বর্ণ, শ্রেণী বা লিঙ্গের অনেক ঊর্ধ্বে। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের সদস্য না।”

ইয়ামিনি আইয়ার আরও বলেন, “এই কারণে এটি ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের যেকোনো আন্দোলনের চেয়ে ভিন্ন।”

লন্ডনের এসওএএস (স্কুল অফ অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ) ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক সঞ্জয় শ্রীবাস্তব রয়টার্সকে বলেন, “আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অনেকে হয়তো তার (নরেন্দ্র মোদীর) সমর্থকও ছিলেন।” 

“ভারতে এখন অনেক সংখ্যক মানুষ সরকারের ব্যাপারে সন্দীহান। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মনে এখন প্রশ্ন আসছে যে ক্ষমতাসীন দল আসলে দেশের জন্য ভালো কিনা,” মন্তব্য করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিত তিওয়ারির মতে, প্রশ্নফাঁস থেকে আন্দোলন শুরু হলেও, তার এমন ব্যাপ্তি পাওয়ার পেছনের কারণ ভিন্ন।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, “প্রশ্নফাঁস একটি ট্রিগারিং পয়েন্ট ছিলো। তবে আন্দোলনটি যুবসমাজের মধ্যে বেড়ে ওঠা উদ্বেগ, অসন্তোষ ও হতাশার প্রতিফলন।”

রাজনীতির নতুন ময়দান ইনস্টাগ্রাম

বিভিন্ন জনপ্রিয় মিম, সিনেমা কিংবা কার্টুনের দৃশ্যের সাথে নরেন্দ্র মোদী ও ধর্মেন্দ্র প্রধানের  চেহারা জুড়ে ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড দেখা যায় আন্দোলনকারীদের হাতে।

“ডিজিটাল বিশ্বে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্র সবসময়ই এক্স (টুইটার) এর মতো প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সাধারণত রাজনৈতিক আলোচনাগুলো হয়ে থাকে। তবে এই আলোচনাগুলো এখন ইনস্টাগ্রামে সরে এসেছে, বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে,” রয়টার্সকে একথা বলেন ভারতীয় লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অনুরাগ মাইনাস ভার্মা।

সিজেপির আন্দোলনের ক্ষেত্রে এমন বাস্তবতাই দেখা যায়। এক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্মে গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক আলোচনার জায়গায় ইনস্টাগ্রামে রিলস ও মিমস দ্বারা হাস্যরসাত্মক রাজনৈতিক মতবিনিময়ই বেছে নেয় সিজেপি ও তার সমর্থকরা।

সিজেপির শুরুই হয় এ ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা দিয়ে। প্রধান বিচারপতি সুরিয়া কান্ত বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ বলে সম্বোধন করার পরই অভিজিত দিপকে ইনস্টাগ্রাম পেইজ খুলে প্রতিষ্ঠা করেন ককরোচ জনতা পার্টি। 

আন্দোলন রাজপথে ছড়িয়ে পড়ার আগে মূলত অনলাইন বিশ্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ও বিজেপিকে নিয়ে বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক মিমস ও রিলসের ভাষায় প্রতিবাদ শুরু হয়। 

সিজেপি প্রতিষ্ঠা হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ফলোয়ারের সংখ্যায় তারা বিজেপিকে ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে ইন্সটাগ্রামে বিজেপির ৯৫ লাখ ফলোয়ারের বিপরীতে সিজেপির ফলোয়ার সংখ্যা ২ কোটির বেশি।

নিউজিল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়া মিডিয়া সেন্টারের এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, “কন্টেন্টগুলো ইচ্ছা করেই হাস্যরসাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়, তবে তার মূল সুর ছিলো গম্ভীর। হাস্যরসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দূর্নীতি, বেকারত্ব ও সরকারের জবাবদিহিতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছে। কেননা এটি এমন একটা ভাষা যা এমন কোটি কোটি তরুণের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়, যারা হয়তো কখনো কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে অংশগ্রহণ করবে না।” 

অনলাইন জগত থেকে রাজপথে সিজেপির আন্দোলন ছড়ানোর পরও একইধরণের ব্যাঙ্গাত্মক ও হাস্যরসাত্মক সুর দেখা যায় আন্দোলনের ভাষায়। প্ল্যাকার্ড ও স্লোগানের মধ্যে সেই মিমসের ভাষাই নিয়ে আসে জেন-জি, প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নেয় স্যাটায়ার।

নরেন্দ্র মোদী এক ভিডিও বার্তায় আন্দোলনকারীদের ‘ফ্রেন্ডস’ বলে সম্বোধন করার পরদিন এক আন্দোলনকারীর প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় “উই এইন্ট ইওর ফ্রেন্ড, লিল ব্রো” (আমরা তোমার ‘ফ্রেন্ড’ না, ছোট ভাই) লেখা। আরেক প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় লেখা “পেন্সিল বোল পেন্সিল, তেরি কুর্সি ক্যান্সেল” (পেন্সিল বলো পেন্সিল, তোমার কুর্সি ক্যান্সেল)।

এছাড়া বিভিন্ন জনপ্রিয় মিম, সিনেমা কিংবা কার্টুনের দৃশ্যের সাথে নরেন্দ্র মোদী ও ধর্মেন্দ্র প্রধানের  চেহারা জুড়ে ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়।

কেন গণঅভ্যুত্থান হলো না

রাজপথে আন্দোলন দিল্লির থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে যাওয়ার পর অনেকেই একে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের সাথে তুলনা করেন। বেকারত্ব ও সরকারি পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে হতাশা এবং কোনো একটি মন্তব্য থেকে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়গুলোকে দু’টি আন্দোলনের মধ্যে সাদৃশ্যপূর্ণ হিসেবে দেখেন অনেকেই।

তবে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো কোনো একটি বিষয় নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়ে এক পর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেওয়ার বিষয়টি ভারতে ঘটেনি। সরকার আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেয়, এবং বিজয় স্বীকার করে আন্দোলনকারীরাও সরে আসে রাজপথ থেকে।

সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় বেশিরভাগ মানুষ এটিকে সিজেপির বিজয় হিসেবে দেখলেও, অনেকে মনে করছেন, গণআন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থান হওয়া থেকে থামিয়ে বিজেপি সরকার নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে। 

তবে অনেকে মনে করছেন আন্দোলনের দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া ভারতের সরকারের আর কোনো উপায় ছিলো না। 

ভারতীয় গণমাধ্যম ফ্রন্টলাইনের এক বিশ্লেষণে লিখা হয়েছে, “আন্দোলনের পরিসর বাড়তে বাড়তে তা সরকারের এজেন্ডা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ছেড়ে দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত করা ছাড়া আর কোনো উপায় বাকী ছিলো না।”

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য সাম্প্রতিক আন্দোলনের সাথে তুলনা টেনে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, “এই আন্দোলনের দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়া দক্ষিণ এশিয়ার একটি বৃহত্তর প্যাটার্নের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে মানুষের ক্ষোভ অনলাইন বিশ্ব থেকে দ্রুতই রাজপথে বড় পরিসরে ছড়িয়ে যায়।”

সেখানে উল্লেখ করা হয়, “আন্দোলনের পরিসর বেড়ে যাওয়া মানে এই না যে সেখান থেকে কোনো বিপ্লব আসবে।”