ভেনেজুয়েলায় উদ্ধার অভিযান নিয়ে ক্ষোভ, ধ্বংসস্তূপে প্রাণের খোঁজে স্থানীয়রা

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষদের খোঁজে চলছে উদ্ধার অভিযান। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে ক্ষোভ আর হতাশা। অনেক জায়গায় সরকারি উদ্ধার দল দেরিতে পৌঁছানোর অভিযোগ উঠেছে, ফলে প্রথমদিকে স্থানীয় মানুষরাই খালি হাতে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। এখনো বহু পরিবার প্রিয়জনের অপেক্ষায় ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আর উদ্ধার কার্যক্রমের ধীরগতিকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে সরকারের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

গত বুধবার ঘটে যাওয়া দুই দফা ভূমিকম্পে অন্তত ১ হাজার ৯০০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ, আর অনেক পরিবার প্রিয়জনের খোঁজে ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষা করছে।

মঙ্গলবার উপকূলীয় শহর লা গুয়েরায় একটি ধসে পড়া ১২ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারকারীরা যখন কাজ করছিলেন, তখন তারা হঠাৎ সবাইকে নীরব হতে বলেন। 

“সিলেনসিও” বলে চারপাশ থামিয়ে দেওয়া হয়। রাস্তার গাড়ি থেমে যায়, মানুষ কথা বলা বন্ধ করে, এমনকি ভারী যন্ত্রের শব্দও থেমে যায়। উদ্ধারকারীরা কংক্রিটের নিচে তৈরি করা ছোট একটি গর্তে কান পেতে শুনতে চেষ্টা করেন, কোনো জীবিত মানুষের সাড়া পাওয়া যায় কি-না।

তবে কোনো শব্দ পাওয়া যায় না। কিছুক্ষণ পর আবার উদ্ধার কাজ শুরু হয়। এভাবেই চলছে প্রাণের খোঁজ। 

ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের মধ্যে একজন মিগেল অস্কার নুনিয়েজ। সেই ভবনেই ছিলেন তার ৩৪ বছর বয়সী ছেলে অ্যাঞ্জেল। 

তার ধারণা, ছেলে হয়তো এখনো জীবিত থাকতে পারে, কিন্তু কর্তৃপক্ষের ধীরগতির কারণে উদ্ধার কাজ দেরি হলে সব আশা শেষ হয়ে যেতে পারে।

মিগেল অস্কার বলেন, “আরও শত শত মানুষের মতোই আমার সন্তান হয়তো ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছে। তাকে উদ্ধার করতে এখনই আমাদের ধ্বংসাবশেষ সরাতে হবে। হয়তো ভূমিকম্পে তার মৃত্যু হয়নি। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলাতেই তার মৃত্যু হতে পারে।” 

আরেক বাসিন্দা কেভিন মন্টিলার স্ত্রী ও ১৬ বছরের মেয়ে ভবন ধসে আটকে পড়েন। তিনি অভিযোগ করেন, উদ্ধার কাজ শুরুই হয়েছে অনেক দেরিতে। প্রথমে শুধু স্থানীয় মানুষই সাহায্য করেছে, পরে পুলিশ এলেও তারা খুব একটা কাজ করেনি। 

উদ্ধার নিয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

ভূমিকম্পের অনেকক্ষণ পর ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার উদ্ধার দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়ে গেছে, আর অনেক জায়গায় উদ্ধার দল এখনো পৌঁছায়নি।

হাসপাতালে গিয়ে নিখোঁজ দুই মেয়েকে খুঁজছিলেন এক মা, ডেইলিসবেথ হেরেইরা। তার দুই মেয়ে ১২ ও ১৩ বছর বয়সী। তিনি বলেন, কোনো সাহায্য ছাড়াই তিনি একাই খুঁজে চলেছেন, কেউ তাকে সহায়তা করেনি। তার চোখে-মুখে কেবল হতাশা আর কান্না।

সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ মানুষ

আরেক বাসিন্দা উইলিয়াম রদ্রিগেজ জানান, দুর্গন্ধে পরিবেশ ভারী হয়ে আছে, তবুও তিনি তার চাচাকে খুঁজছেন। তার অভিযোগ, অনেক জায়গায় উদ্ধার দল খুব দেরিতে পৌঁছেছে বা এখনো পৌঁছায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিলো। কিন্তু উদ্ধার অভিযান শুরুই হয়নি সময়মতো। 

তাই নিজেরাই খালি হাতে উদ্ধারে নেমে যান  সাধারণ মানুষ। 

কেভিন বলেন, উদ্ধার অভিযান অনেক দেরি করে শুরু হয়েছে। আমরা এলাকাবাসীই কাজ করতে শুরু করি। পুলিশ অনেক পরে এসে শুধু চেক করে গেছে। কোনো কাজ করেনি। সরকারের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। 

হতাহতদের স্বজনদের অভিযোগ উদ্ধার অভিযান এত দেরি করে শুরু হয়েছে যে তার আগেই আশা শেষ। 

মিগেল বলেন, আমি আশা হারাইনি। কিন্তু হতাশ হয়ে পড়েছি। প্রকৃতির নিয়ম হচ্ছে বাবাই আগে মারা যান। কিন্তু আমাকে সন্তানের মৃত্যু দেখতে হচ্ছে।

বিবিসি জানায়, ঘটনাস্থলের কাছেই পুলিশ ছিলো। কিন্তু তারা উদ্ধার অভিযানে কোনো সাহায্য করেনি। 

৬০ বছর বয়সী জুয়ান আভেন্দো বলেন, “আমরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে চিৎকার শুনতে পারছিলাম। নিজেরাই খালি হাতে তাদের উদ্ধার শুরু করি।”

তিনি ও তার ভাতিজা এনইর মিউজিকস জানান যে কীভাবে তারা একজন নারীকে জীবিত উদ্ধার করে। 

তিনি বলেন, রাতে আমরা একজনের চিৎকার শুনতে পাই। কিন্তু তখন অন্ধকারে আমরা কিছুই করতে পারিনি। পরদিন সকালেই আমরা তাকে খুঁজে বের করি। প্রথমে তাকে এক বোতল পানি দেই। তারপর নিজেরাই খুঁজে বের করি।”

গত বুধবার মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুইটি ভূমিকম্প আঘাত হানে দেশটিতে। এতে বহু শহরের ভবন ধসে পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন।  

প্রতিদিন ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মর্গগুলো। 

আহত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ, ফলে হাসপাতালগুলোতেও পরিস্থিতি খুবই প্রতিকূল। 

এর মধ্যে এখন দেশজুড়ে আরেকটি বড় মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ খোলা আকাশের নিচে বা অস্বাস্থ্যকর, ভিড়ভাট্টা আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন। এতে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

নাসার স্যাটেলাইট ইমেজের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৯ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে কয়েক লাখ মানুষ সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

ইউনিসেফ জানিয়েছে, দেশজুড়ে প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার শিশু এখন জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে।

অন্তবর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই ভূমিকম্পকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে আখ্যা দিয়েছেন। 

তবে বিবিসির প্রতিবেদনে অনুযায়ী,  ভূমিকম্পের দুইদিন পর শুক্রবার প্রথম ভেনেজুয়েলার দমকলকর্মীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও এল সালভেদরের কর্মীরাও আসেন। 

কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তারপর রবিবার আবার উদ্ধার অভিযান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। 

ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলায় চলছে উদ্ধার অভিযান

স্থানীয়দের ধারণা, এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে শত শত মানুষ চাপা পড়ে আছেন। কিন্তু ধীর উদ্ধার অভিযান এবং সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে অনেককে হয়তো আর জীবিত পাওয়া যাবে না।

সেই কথাই যেন প্রমাণ হয়েছে মঙ্গলবার। ভূমিকম্পের ছয়দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছে তিন বছরের এক শিশু। 

একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, লা গুয়াইরার ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুটিকে বের করে আনছেন উদ্ধারকারীরা। 

ডেলসি রদ্রিগেজ শিশুটির নাম ‘ক্লিয়েবার মোরান’ বলে জানিয়েছেন। তিনি  বলেছেন, ‘ক্লিয়েবার’কে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে, জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার আশা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। 

ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষের দাবি, বড় আকারে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক দলগুলো এখনো ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।

দেশটির সরকারি হিসেব অনুযায়ী ২৪টি দেশ তাদের সহায়তায় পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা ৫০০ টনের বেশি সরঞ্জাম এবং ২৭০০ জন উদ্ধারকারী সদস্য পাঠিয়েছে।  উদ্ধার অভিযানে কাজ করছে ৮৬টি উদ্ধারকারী টিম। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ও ভারী সরঞ্জাম নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে তারা। 

(বিবিসি, গার্ডিয়ান, রয়টার্স অবলম্বনে)