এপ্রিল ১৯৮০। ইরানের মাটিতে অভিযান চালিয়েছে ডেল্টা ফোর্স। এই ফোর্সের সদস্যরা আমেরিকার সবচাইতে দক্ষ যোদ্ধা। কিন্তু তাদের এই অভিযানটি চরমভাবে ব্যর্থ হয়। অভিযানে গিয়ে প্রান হারায় ডেল্টা ফোর্সের আটজন সদস্য। এই ঘটনা আমেরিকায় এমন তোলপাড় ফেলে দেয় যে একজন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। জিতে যায় ইরান।
শুধু সেবারের সেই যুদ্ধ নয়, আধুনিক ইতিহাসের কোনো যুদ্ধে স্থায়ীভাবে পরাস্ত হয়নি ইরান। শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একবার ইরানকে কিছুদিনের জন্য দখল করে রেখেছিল রাশিয়া ও ব্রিটেন। কিন্তু এক পর্যায়ে সেই দখলও তারা ছেড়ে দেয়।
ইরানকে হারানো কেন দুঃসাধ্য - আপনিও হয়ত এ প্রশ্নে উত্তর খুঁজছেন।
আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেইনি নিহত হয়েছেন, যার একক নিয়ন্ত্রণে ইরান ছিল প্রায় চার দশক। সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে নিহত হয়েছেন শীর্ষ কমান্ডাররা।
যদিও ইরান এরই মধ্যে বেছে নিয়েছে নতুন সর্বোচ্চ নেতা - কিন্তু দেশটির দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব কাঠামো ভেঙে পড়ায় সেখানে নেতৃত্ব সংকট এখন স্পষ্ট। অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও বহিঃশক্তির হামলায় দেশটি পর্যদুস্ত।
তারপরও কি ইরানকে হারানো যাবে? শিয়া অধ্যুষিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যেই বা কী? এবার কি ইরান দখল হয়ে যাবে? খামেইনি পরবর্তী ইরানে কোন দিকে যাবে?
তেহরানের জিম্মি সঙ্কট
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর পহেলা এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে ইরান। তখন থেকে সাড়ে চার দশক ইরান থাকে মূলত দুই নেতার মুষ্টিতে। খোমেনি এবং খামেইনি।
আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশত্যাগ করেন। প্রথমে তিনি যান মিশর। পরে মরক্কো, বাহামা ও মেক্সিকোতে থাকেন কিছুদিন। এরপর ক্যানসার চিকিৎসার জন্য যান আমেরিকায়। আর এতেই ক্ষেপে যায় ইরানের বিপ্লবের সমর্থকেরা। সেখান থেকে তেহরানে শুরু হয় নতুন এক সংকট, যা আজও দুনিয়ার মানুষ জানে জিম্মি সংকট নামে।
১৯৭৯ সালের ৪ঠা নভেম্বর তেহরানে আমেরিকার দূতাবাসে হামলা চালায় বিপ্লবী ছাত্ররা। দূতাবাস দখল করে নেয় তারা। ভবনে ঢুকে নথিপত্র জব্দ করে, অফিস ভেঙে ফেলে এবং ভেতরের কাগজপত্র–ফাইল–ডকুমেন্ট সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। অনেক নথি ছিঁড়ে ফেলা হয়। ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিক ও নাগরিককে তারা জিম্মি করে রাখলে তৈরি হয় এক টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। শুরু হয় এক সুদীর্ঘ জিম্মি পরিস্থিতি - যা চলেছিল প্রায় পনেরো মাস ধরে।
ওই ঘটনা তখন সারা দুনিয়াজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। গভীর সংকটের ছায়া ফেলে ইরান ও আমেরিকার সম্পর্কে। আর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে, তাও নির্ধারিত হয়ে যায় ওই এক ঘটনায়। কূটনীতিক ও নাগরিকদের জিম্মির ঘটনা দেশে-বিদেশে প্রবল চাপে পড়েন তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। তিনি জিম্মি উদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেন। প্রথমে আলোচনা, কিন্তু সেটা ব্যর্থ হওয়ার পর সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন কার্টার।
জিম্মি পরিস্থিতির প্রায় ৫ মাস হয়ে গেছে। ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাস। ইরানের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন এবং ইরানিদের সম্পদ জব্দ করার ঘোষণা দেয় জিমি কার্টার প্রশাসন। এই মাসেই নির্দেশ দেওয়া হয় সামরিক অভিযানের। নাম ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’।
এই অপারেশন ছিল মূলত গোপন সামরিক অভিযান। লক্ষ্য ছিলো- জিম্মিদের উদ্ধার।
পরিকল্পনা করা হয়, ইরানের মরুভূমির একটি গোপন আস্তানায় প্রথমে সি-১৩০ পরিবহন বিমান এসে বিশেষ বাহিনী নামাবে। পরে বিমানবাহী জাহাজ থেকে উড়ে আসবে হেলিকপ্টার। হেলিকপটারগুলো জ্বালানি নেওয়ার পর বিশেষ বাহিনীকে নিয়ে যাবে আরেকটি গোপন স্থানে। সেখানে তারা একদিন লুকিয়ে থাকবে।
রাতে বিশেষ বাহিনী ট্রাকে করে তেহরানে ঢুকে হানা দেবে দূতাবাসে। জিম্মিদের নিয়ে হেলিকপ্টারে করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে আবার বিমানে উঠবে। গোপন ও বিশেষ অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুত রাখা এলিট বাহিনী ডেল্টা ফোর্সকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ পরিচালনার।
আটটি হেলিকপ্টার নিয়ে অভিযান শুরু করে ডেল্টা ফোর্স। কিন্তু অপারেশন শুরুর পরই মরুভূমিতে আঘাত হানে ধূলিঝড়। কয়েকটি হেলিকপ্টার দিকভ্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বালুঝড়ের কারণে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় তিনটি হেলিকপ্টারে। একটি হেলিকপ্টারে সংঘর্ষ হয় নিজেদেরই জ্বালানিবাহী সি-১৩০ বিমানের। এ ঘটনায় ডেল্টা ফোর্সের আটজন সদস্য সদস্য নিহত হন। অভিযান ব্যর্থ হয়। অভিযান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন কমান্ডাররা। জিম্মিরা ইরানেই আটকা পড়ে থাকেন।
সেদিনের সেই অভিযান ব্যর্থ হবার পেছনে ছিল ইরানের দুর্গম ভূ-প্রকৃতি। জটিল গোলকধাঁধার এই ভুবৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাচীনকাল থেকে সুরক্ষা পেয়ে আসছে ইরান। মেসোপটেমিয়া, গ্রিক, রোমান- কোনো সাম্রাজ্যের আগ্রাসনই ইরানে সফল হয়নি শুধু এই এক কারণে।
ইরানের উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর। আর পূর্ব ও পশ্চিমে মরুভূমি ও পর্বতমালায় ঘেরা। এতে প্রকৃতিগতভাবেই ইরান অত্যন্ত সুরক্ষিত। পশ্চিম সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত জাগরোস পর্বতমালা এবং উত্তরের এলবুর্জ পর্বতমালা যে কোনো আগ্রাসী বাহিনীর জন্য বড় বাধা।
ইতিহাসে বহুবার এই পর্বতমালাগুলো অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে আক্রমণকারীরা। কিন্তু বারবারই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। ফলে ইরানে যে কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও তা ব্যর্থ হয়।
অপারেশন ঈগল ক্ল’য়ের ব্যর্থতা জিমি কার্টারের ভাবমূর্তিতে প্রচণ্ড আঘাত হানে। জিম্মি সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় তার জনপ্রিয়তায় ধস নামে। ১৯৮০ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনকে সামনে রেখে ওই ঘটনা বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। ভোটে হেরে বসেন জিমি কার্টার।
ভোটে জিতে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন রোনান্ড রেগান। তার সামনেও সেই একই জিম্মি উদ্ধারের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে পরাস্ত হলে গদি হারাতে হবে তাকেও।
কাজে নেমে পড়েন রেগান। শুরু হয় আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় হওয়া ওই চুক্তির নাম ‘আলজিয়ার্স একর্ডস’।
এই চুক্তির শর্ত মেনে ইরানিদের জব্দ করা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আনফ্রিজ করতে রাজি হয় আমেরিকা। বদলে মুক্তি পাবে জিম্মিরা।
এই শর্ত মেনে ৪৪৪ দিন পর তেহরান থেকে ৫২ জন নাগরিককে মুক্ত করে আনে আমেরিকাে। ব্যাপারটা সেবার অনেকটা নাকে খৎ দেয়ার মতোই হয়েছিল আমেরিকার জন্য।
ইরাক-ইরান যুদ্ধ
বিংশ শতাব্দীতে দুইটি বিশ্বযুদ্ধ ও অসংখ্য যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্যে ইরান বেশিরভাগ সময় নিজেদের সুরক্ষিত ও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ রাখতে পেরেছিল। দুইটি আগ্রাসনের শিকার হয়েছিল দেশটি। তবে কোনো আগ্রাসনই ইরানকে পুরোপুরি পরাস্ত বা দখল করতে পারেনি।
এর একটি ঘটনা ঘটে আমেরিকার জিম্মি মুক্তির কয়েকমাস পরই। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয় ইরান। প্রতিপক্ষ প্রতিবেশী দেশ ইরাক।
সাদ্দাম হোসেন তখন ইরাকের প্রেসিডেন্ট। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। অনেকের চোখে লৌহমানব। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে অনেক মানুষই তাকে ডাকতো বাপের বেটা সাদ্দাম বলে। বাংলাদেশিদের সাদ্দামভক্তি সে সময়ে এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে পিতারা তাদের সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখতেন সাদ্দাম।
সেই সাদ্দাম হোসেন ২৩ বছর টানা প্রেসিডেন্ট থাকার পর আমেরিকার হস্তক্ষেপে ক্ষমতাচ্যুত হন। তাকে ধরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে আমেরিকা। ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই ইরান আক্রমণ করে বসেছিলেন এই সাদ্দাম হোসেন।
শাত আল-আরব মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরত্বপূর্ণ নদী - ইরাক ও ইরানের সীমান্ত দিয়ে বয়ে গিয়ে মিলিত হয়েছে পারস্য উপসাগরে। নদীর সীমান্ত নিয়ে দুইদেশের বিরোধ পুরোনো।
১৯৭৯ সালে ইরানে যখন ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন আয়ােতোল্লা রহমতুল্লাহ খোমেনি, ঠিক তার কাছাকাছি সময়ে ইরাকের প্রেসিডেন্ট হন সাদ্দাম হোসেন।
ইরানের সঙ্গে নদী সীমান্ত বিরোধ ছাড়াও সাদ্দামের ভয় ছিল, প্রতিবেশী দেশের ইসলামি বিপ্লবের প্রভাবে ইরাকের শিয়ারাও উৎসাহিত হয়ে বসতে পারে। আঞ্চলিক নেতৃত্ব নিয়ে খোমেনির সঙ্গে দ্বন্দ্বও দানা বাঁধছিলো সাদ্দাম হোসেনের।
ওদিকে ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান অনেকটা ছন্নছাড়া অবস্থায়। সেই সুযোগ কাজে লাগালেন সাদ্দাম। ১৯৮০ সালের ২২এ সেপ্টেম্বর ইরান আক্রমণ করে বসেন তিনি।
তেল সম্পদে ভরপুর ইরানের একটি প্রদেশের নাম খুজেস্তান। সাদ্দামের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এই খুজেস্তান দখল এবং শাত আল-আরব নদীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। দ্রুত আক্রমণ করে সীমান্তের কিছু এলাকা দখল করে নেয় সাদ্দামের বাহিনী। কিন্তু ইরানের প্রতিরোধ ক্রমেই তীব্র হতে থাকে।
প্রথম দুই বছর আক্রমণাত্মক থাকে ইরাক। কিন্তু এরপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করে ইরান। শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। সাদ্দামের বাহিনী ইরানের জটিল ভূপ্রকৃতির গোলকধাঁধায় তালগোল হারিয়ে ফেলে।
প্রাচীনকাল থেকেই মেসোপটেমিয়ার দিক থেকে ইরানের দিকে আসা আক্রমণগুলো প্রাকৃতিকভাবেই ঠেকাতে সাহায্য করেছেন জাগরোস পর্বতমালা।
ইরানের উত্তর-পশ্চিম অংশ থেকে শুরু হয়ে, ইরাক সীমান্ত বরাবর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে নেমে গেছে এই পর্বতমালা। রোমানরা বহু বছর চেষ্টা করেও জয় করতে পারেনি ইরান।
সাদ্দাম হোসেনও আট বছরের যুদ্ধে কঠিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখেছিলেন যে, এই দেশকে সহজে কবজা করা যাবে না।
দুর্গম জাগরোস পর্বতমালা ইরাকি বাহিনীর অগ্রগতি অসম্ভব করে তোলে। যুদ্ধের শুরুতেই খুজেস্তানের রাজধানী আহভাজ দখল করে ইরাকি বাহিনী।
এরপর জাগরোস পেরিয়ে আরও ভেতরে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আর এগোতে পারেনি। আট বছর ধরে চলা যুদ্ধ অচলাবস্থায় শেষ হয়, যেখানে স্পষ্ট বিজয়ী কেউ ছিল না।
লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ইরাকের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়।
যেবার বেদখল হয় ইরান
ইরানের পূর্ব দিকেও রয়েছে বিশাল ও প্রতিকূল মরুভূমি দাশত-এ লুত ও দাশত-এ কাবির। এই মরুভূমি অতিক্রম করে যেকোনো সামরিক অভিযানই প্রতিপক্ষের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠতে পারে। তাই ইরানের ভূগোল বারবারই বহিঃশক্তির আক্রমণকে কঠিন করে তোলে। একইভাবে এই কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে প্রতিবেশী অঞ্চলেও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায় ইরান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যখন দুই মেরুতে ভাগ হয়ে গেছে বিশ্ব, তখন পারস্য উপসাগর ও ইরানের তেলসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কাছে।
তখনকার ইরানের শাসক রেজা শাহ নিজেকে নিরপেক্ষ ঘোষণা করেন। কিন্তু জার্মানির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। শেষমেষ মিত্ররাই আক্রমণ করে বসে ইরানকে।
ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী রেজা শাহ পাহলভিকে সিংহাসন ত্যাগে বাধ্য করে। এরপর তার যুবক ছেলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ১৯৪১ সালে শাহ বানানো হয়।
ইরানকে দুই ভাগে ভাগ করে নেয় ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। উত্তরাঞ্চল দখল করে সোভিয়েত বাহিনী। আর দক্ষিণাঞ্চল নেয় ব্রিটিশ বাহিনী। উপসাগরীয় জাহাজপথ দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
ইরান পাঁচ বছরের জন্য ‘অ্যালায়েড সামরিক প্রশাসনের অধীনে’ চলে যায়। অর্থাৎ স্বাভাবিক সরকার কার্যক্রম সীমিত, কিন্তু সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি মুছে যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইরান থেকে সরে যায় দখলদার বাহিনী।
হরমুজ প্রণালির খেলা
পর্বত ও মরুভূমির পাশাপাশি বিভিন্ন জলপথও ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। এর অন্যতম হলো- হরমুজ প্রণালি।
পারস্য উপসাগরে এই জলপথটির সবচাইতে সরু অংশটির প্রস্থ মাত্র ৩৪ কিলোমিটার। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর এটি।
বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রবাহিত হয় ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা সরু এই পথ দিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তারই ইরানকে ভূরাজনৈতিক সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত করেছে।
দুটি অভিযান এবং একটি ভুল বিমানে হামলা
ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে পশ্চিমাদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কখনোই মসৃণ হয়নি। আবার ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি হামলার ঘটনাও ঘটেনি। তবে এমন তিনটি ঘটনা ঘটে, যা আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক বিষিয়ে তোলে।
ইরাক-ইরান যুদ্ধের মধ্যে ‘অপারেশন নিম্বল আর্চার’ নামে একটি অভিযান চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততা আরো বাড়িয়ে দেয়।
১৯৮৭ সালের ১৯এ অক্টোবর পারস্য উপসাগরে ইরানের দুটি তেল ক্ষেত্রের উপর হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। এই হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী কুয়েতি একটি তেল ট্যাঙ্কারে হামলা চালায় ইরান।
পরের বছর আমেরিকা অভিযোগ তোলে, ইরানি নৌকা থেকে মাইন দিয়ে একটি মার্কিন ফ্রিগেটে ধ্বংসের চক্রান্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ তুলেই প্রতিশোধ নিতে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। দুইটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ও তিনটি স্পিডবোটে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এতে নিহত হন ৫৬ জন ইরানি। এই অভিযানটির নাম দেয় আমেরিকা ‘অপারেশন প্রেয়িং ম্যানটিস’।
১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আরো একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। যা আজও পরিচিত ‘ইউএসএস ভিনসেন্স’। ২৯০ জন যাত্রী নিয়ে তেহরান থেকে রওনা হয় ইরান এয়ারের ‘ফ্লাইট ৬৫৫’, গন্তব্য দুবাই। এয়ারবাস এ-৩০০ মডেলের বিমানটি তখন পারস্য উপসাগরের উপরে।
মার্কিন রণতরি ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে যাত্রীবাহী বিমানটিকে একটি যুদ্ধবিমান হিসেবে শনাক্ত করা হয়। মিসাইল ছুঁড়ে ধ্বংস করা হয় বিমানটিকে। নিহত হন সব যাত্রী।
আমেরিকার বজ্র আঁটুনি তবুও ফস্কা গেরো
জিম্মি নাটক থেকে ইরাক-ইরান যুদ্ধ। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক গড়িয়েছে এই ধরনের ঘটনার মধ্য দিয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক অবরোধ। ইসলামি বিপ্লবের পর গত ৪৭ বছর ধরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অস্ত্রই হলো সাংঘাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।
প্রথম নিষেধাজ্ঞা শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। মার্কিন দূতাবাস দখল ও জিম্মি সংকটের প্রেক্ষাপটে। ১৯৮০ সালে মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। এরপর ১৯৯৫ সালে পারমাণবিক ও সন্ত্রাসবিরোধী নিষেধাজ্ঞা দেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন।
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের প্রতি কিছুটা নমনীয় হয় আমেরিকা। কারণ সাদ্দামের বিরুদ্ধে শিয়াদের বিদ্রোহী করে তুলতে ভূমিকা রাখে ইরান।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন ২০১০ থেকে ২০১৩ সালে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরো শক্তিশালী করে। ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
তবে ভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটে ২০২০ সালে জানুয়ারিতে। এ সময়ের একটি ঘটনা ইরানের জন্য সতর্কবার্তা বয়ে নিয়ে আসে।
বাগদাদ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরানের কুদস ফোর্সের ক্ষমতাধর প্রধান কাসেম সুলেইমানিকে হত্যা করে আমেরিকা, যা মধ্যপ্রাচ্যে একটি কঠিন রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে।
ডনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদ শেষ করার পর ইরানের ওপর তেমন একটা আঘাত আসেনি। তবে জো বাইডেনের প্রশাসনও নতুন নিষেধাজ্ঞা দেয়। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান বিভিন্ন দেশে সহযোগী বাহিনী গড়ে প্রক্সি যুদ্ধে প্রতিপক্ষদের নাস্তানাবুদ করতে থাকে।
এরই মধ্যে ২০২৪ সালের আরো কয়েকটি ঘটনা ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। দামেস্কে ইরানের দূতাবাসে বোমা হামলা চালিয়ে সাতজনকে হত্যা করে ইসরায়েল। প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি রহস্যজনক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান।
২০২৫ সালে ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তীব্র রাজনৈতিক হতাশার মধ্যে পড়ে ইরান।
পারমাণবিক আলোচনার মধ্যে ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল। ১৯৮০ সালের পর এটিই ছিল ইরানে বিদেশি কোনো শক্তির প্রথম আক্রমণ। হামলায় ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয় আমেরিকাও। ১২ দিনের যুদ্ধে শেষ হয় নানা ক্ষয়ক্ষতির ভেতর দিয়ে।
এরপর ২৮এ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-আমেরিকা যৌথভাবে আক্রমণ শুরু করে ইরানে। কিন্তু ইরানকে এভাবে আকাশপথে আক্রমণ করে কী দখল করা সম্ভব?
ইরানের পতন মানে প্রতিপক্ষের বিজয় নয়
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করে ইরানকে দুর্বল করা সম্ভব নয়। কারণ, ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহু শতকের পুরোনো এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশের ঐক্য ধরে রাখায় কাজ করেছে।
ইরান যতবারই বাইরের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, ততবারই অভ্যন্তরীণ ঐক্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যারা বিভিন্ন সময় বর্তমান রেজিমের বিরুদ্ধে গেছে, আক্রমণ হলে তারাও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
কিন্তু এবারের বাস্তবতা ভিন্ন। সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষ জেনারেলদের মৃত্যু ঘটেছে। যদিও ইরান এরই মধ্যে তাদের নতুন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা বেছে নিয়েছে।
মুজতবা খামেনিই হলেন সেই নতুন নেতা। তিনি সদ্য প্রয়াত সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলী খামেইনির ছেলে।
কিন্তু নতুন এই নিয়োগের পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কার্যত নেতৃত্বশূন্য। তাহলে ইরানের ভবিষ্যৎ কী?
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশল বিষয়ের অধ্যাপক প্যাট্রিক পোর্টার লিখেছেন, “ইরানে এমন কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল বা ছায়া সরকার নেই, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানিদের আনুগত্য পেয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারবে। সুতরাং, রাষ্ট্রীয় পতন মানেই নয় কোটি মানুষকে একটি বিভক্ত জাতিকে পরিণত করবে এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলে দেবে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের শক্তিমত্তার পতন মানেই ইসরায়েলের বিজয় নয়। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে যে জটিল গোলকধাঁধা, সেখানে ইরানের অনুপস্থিতি ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করবে। উত্থান ঘটতে পারে ইরানবিরোধী সুন্নি ইসলামপন্থি জিহাদিদের, যা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য হবে আরেকটি হুমকি।
যে ইরানকে আগে কেউ দখল করতে পারেনি, সেই ইরানের পরিণতি কী হয়, ইরানের মানুষ কীভাবে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঠিক করবে, তা জানতে হয়ত অপেক্ষা করতে হবে।