আলোচনার মাঝে ইরানে হঠাৎ হামলার কারণ কী

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে তেহরানের আকাশে। বিস্ফোরণের শব্দ কাতারে ও আবুধাবিতে, কুয়েতের আকাশে ভূপাতিত হয়েছে মিসাইল, বাহরাইনে আগুন জ্বলছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে, তেল আভিভে উড়ে গিয়ে পড়ছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। 

শনিবার ইরানে যৌথভাবে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা ও ইসরায়েল। এরপরই পাল্টা আঘাত হেনেছে ইরান। এতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধাবস্থা। 

দু’দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠকের পর ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি বলেছিলেন, “শান্তি হাতের নাগালেই আছে।” 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্র ও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ এড়ানোর মতো চুক্তির আরো কাছাকাছি এসেছে। 

এই আশার বাণীর দুইদিন পরই কেন আগুন জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্যে? ২০২৫ সালের জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধের সাত মাস পরই কেন আবার ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল? 

গত ১৫ই জানুয়ারি থেকে ২৫এ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইরানের ওপর ছয়বার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী চারটি ছিল ইরানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারি বাহিনীর দমনপীড়ন থামাতে; একটি নিষেধাজ্ঞা ইরানের “অবৈধ” তেল সরবরাহ বন্ধ করতে এবং বাকিটি পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা নির্মূল করতে।

এই পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনই এবারের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু বলে দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও গত বছর জুনে যুদ্ধের শেষে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে, ইরানের ‘নিউক্লিয়ার এনরিচমেন্ট সেন্টার’ পুরোপুরি ভস্ম করা হয়েছে। 

তবে জানুয়ারিতে আবারও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি নিয়ে চঞ্চল হতে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রকে। 

২৬এ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “ইরানের কাছে অনেকগুলো ব্যালিস্টিক মিসাইল আছে, যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ করতে পারবে।”  

এর একদিন আগেই ওয়াশিংটনে এক বক্তব্যে ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের সাথে কূটনীতিক উপায়ে সমাধানে যেতে চান। 

“তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, আমি কোনোদিন বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষকের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আসতে দেব না।”

ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দিনা এসফানিদিয়ারি আল জাজিরাকে বলেন, ইরান বর্তমানে যা করছে তাকে বলা হয় ‘হেজিং’। এর অর্থ হলো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত ও মজুত করে রাখা, যাতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র অস্ত্র তৈরির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়।

তবে তার মতে, ইরান এই মুহূর্তে অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

এদিকে, প্রায় দেড় দশক ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু বিশ্বকে সতর্ক করে আসছেন, যেকোনো মুহূর্তে ইরানের হাতে চলে আসবে পারমাণবিক বোমা। 

২০১২ সালে তিনি বলেছিলেন, ইরানের হাতে আর “এক মাস, বা এক সপ্তাহের মধ্যেই” পারমাণবিক অস্ত্র চলে আসবে। তবে তার চৌদ্দ বছর পরও এর কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আব্দির মতে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে যুদ্ধের অযুহাত হিসাবে ব্যবহার করছে, ঠিক যেভাবে বিশ বছর আগে ইরাকের ওপর আক্রমণের অযুহাত হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে ইরাক যুদ্ধের শেষে তৎকালীন ইরাকি সরকারকে অপসারণ করার পর এমন অস্ত্রের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

যদি এই ব্যক্তিদের সন্দেহ সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আসে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা “ভস্ম” করে দেওয়ার দাবি করার সাত মাস পরই কেন আবার এই একই অস্ত্রের সম্ভাবনার কথা বলে যুদ্ধ শুরু হলো? 

অনেকে আঙুল তুলছেন, কুখ্যাত এপস্টিন ফাইলসের দিকে।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ থেকে এপস্টিন ফাইলস উন্মুক্ত হবার পরই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে আঙুল তুলছে যুক্তরাষ্ট্র।

এরফলে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের মনোযোগ ইরানের দিকে গেলেও, ইরানের গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছিল, এপস্টিন ফাইলসে ফাঁস হওয়া যত তথ্য এবং সেখানে ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্পৃক্ততার কথা। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেইনি এক বক্তব্যে বলেন, এপস্টিন ফাইলসের কেলেঙ্কারি “পশ্চিমা সভ্যতা ও মুক্তমনা গণতন্ত্রের আসল প্রকৃতি”র দিকে ইঙ্গিত করে। 

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ এবং আরেকদিকে ইরানি গণমাধ্যমে এপস্টিন ফাইলসকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের ওপর নৈতিক অবক্ষয়ের অভিযোগের মাঝে দুটি দেশের প্রতিনিধিরা কূটনৈতিক বৈঠক শুরু করেন। 

এইসব বৈঠকের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রে ভিড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ও অন্যান্য রণতরি।

২৬এ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় দফার বৈঠকে ইরান ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কথায় ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

তবে পরেরদিনই মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনে আলাপের মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘অতিরঞ্জিত দাবি’ ফেলে না দিলে শান্তি সম্ভব নয়।

ডনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যেও পাওয়া যায় একইরকম স্বর। তিনি জানান, ইরান যে কায়দায় দরকষাকষি করছে, তাতে খুশি নয় যুক্তরাষ্ট্র।  

এরই মধ্যে মঙ্গলবার তেহরানে হামলা শুরু হয়। পাল্টা আঘাত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে। 

প্রথম আক্রমণ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানে আয়াতোল্লা খামেইনির কার্যালয়ের কাছাকাছি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। 

মনে করা হচ্ছে, তারা ইরানের রাষ্ট্রের মাথা কাটার উদ্দেশ্যেই যুদ্ধে নেমেছে। 

খামেইনিকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। 

ইসরায়েলের দিকে উড়েছে ইরানের পালটা মিসাইল ও ড্রোন। কাতার, কুয়েত, আবুধাবি, বাহরাইনও আক্রমণের শিকার হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বাংলাদেশ থেকে সব ফ্লাইট বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। 

তবে এখন ইরানের ভাগ্য কী হবে? আগের বারের মতো কি তারা অসম যুদ্ধ শেষে বেঁচে বের হতে পারবে? নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, ইরানের সরকারের ভাগ্য হবে ইরাক কিংবা লিবিয়ার মতো?