নর্থ আটলানটিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা নেটোতে ইউক্রেনের যোগদানের সম্ভাবনা এবং নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ২০২২ সালের ২৪এ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে বড় ধরনের সামরিক আক্রমণ শুরু করেছিল রাশিয়া। যার প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের জ্বালানি থেকে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
সে সময় অতিরিক্ত দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে একদিকে কমেছিল ডলারের রিজার্ভ অন্যদিকে ডলারের দাম বৃদ্ধিতে বেড়েছিল মূল্যস্ফীতি। যা এখনো কমানো যায়নি। এমনকি সংকট মোকাবেলায় তৎকালীন সরকারকে বড় অংকের ঋণের জন্য দ্বারস্থ হতে হয়েছিল আইএমএফের।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে বৈশ্বিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে ক্রমেই আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি এবং সরবরাহ।
কারণ দেশের গ্যাস চাহিদার একটি বড় অংশ এখন আমদানিনির্ভর। আরও সহজ করে বললে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ডলারের বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
জ্বালানির এই চাপ শুধু পাম্পের তেল সংকট নয় প্রভাব ফেলবে ডলারে, বাজেট এবং মূল্যস্ফীতিতে - জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
“রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যখন শুরু হয়েছিল তখন তার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছিল আমাদের অর্থনীতিতে। সেই সংকট মোকাবেলায় আমরা যে পথে হেঁটেছি, এতে সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশে মূল্যস্ফীতি কমেনি,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
দ্বিগুণ দামে এলএনজি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে।
যেখানে আগে একটি কার্গো কিনতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খরচ হতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকায় অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান আলাপকে বলেন, “জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দুটি এলএনজি কার্গো কেনা হয়েছে। একটি কার্গো প্রায় দ্বিগুণ দামে এবং অন্যটি দ্বিগুণেরও বেশি দামে কিনতে হয়েছে।”
“স্পট মার্কেট থেকে কেনা দুটি কার্গোর জন্য গত মাসে যেখানে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল, সেখানে বর্তমানে একই পরিমাণ এলএনজি কিনতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ফলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।”
স্পট মার্কেট থেকে কেনা দুটি কার্গোর মধ্যে একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গানভোর গ্রুপ থেকে এবং অন্যটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ভিটোল থেকে কেনা হয়েছে।
এর মধ্যে একটি কার্গো আগামী ১৫ অথবা ১৬ মার্চ এবং আরেকটি ১৮ মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে, বলে জানিয়েছেন তিনি।
গ্যাস চাহিদা ও সরবরাহের ফাঁক
সরকার আপাতত যে ব্যবস্থা নিয়েছে তাতে চলতি মাসে কোনো সমস্যা হবে না বলেই জানিয়েছেন, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এর মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মোঃ শফিকুল ইসলাম।
“আমাদের যে পরিমাণ এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) মজুত রয়েছে এবং যে সব জাহাজ পথে রয়েছে তাতে চলতি মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমাদের মজুত নিয়ে সমস্যা নেই,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
সরকার গ্যাস আমদানির চেষ্টা করে গেলেও চাহিদা মেটানো সামনে কঠিন হবে বলেই মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম।
তার ভাষ্য, “কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি না এলে গ্যাস সংকটে পড়বে পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতি।”
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট।
এই সরবরাহের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে প্রায় ১৭১ কোটি ঘনফুট গ্যাস। বাকি ৮৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট আসে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে।
সরবরাহ হওয়া গ্যাসের মধ্যে প্রায় ১৬০ কোটি ঘনফুট ব্যবহার হয় শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে। তবে এর মধ্যেও শিল্পখাত প্রায়ই ঘাটতির মুখে পড়ছে।
অন্যদিকে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান জরিপ এবং কূপ খননে চলতি ও নতুন প্রকল্পে এডিপিতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান জরিপ ও কূপ খননে বরাদ্দের ৫১ গুণ।
ডলারে বাজারে চাপ
উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানির প্রভাব সরাসরি পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
“জ্বালানির এই চাপ ডলারে পড়বে, বাজেটে পড়বে, মূল্যস্ফীতিতে পড়বে। ইতোমধ্যেই ডলারের দাম বাড়তে শুরু করেছে,” বলছেন জাহিদ হোসেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩ মার্চের পর থেকে প্রতিদিনই বেড়েছে ডলারের দাম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বুধবারের তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম বেড়ে ১২২ টাকা ৭০ পয়সা পর্যন্ত উঠেছে।
যা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে শেষ কর্ম দিবসে ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
তবে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে এর দর মঙ্গলবার ছিল ১২২ টাকা ৯০ পয়সা।
ব্যাংকগুলো বলছে, বেড়েছে এলসি খোলার খরচ। আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের এই দাম প্রায় ১২৩ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
এক সপ্তাহ আগেও আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের দাম ছিল প্রায় ১২২ টাকা ৫০ পয়সা।
সব মিলিয়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং এতে ডলার, রিজার্ভসহ মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়বে।
তবে ইরান সরকার আশ্বস্ত করেছে যে, বাংলাদেশি পতাকাবাহী জ্বালানি জাহাজগুলোকে নিরাপদ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে। যদিও এই প্রক্রিয়া জটিল এবং আগে থেকেই ইরানি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
তাই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে এই চাপ হয়ে উঠবে আরও প্রকট।