ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবি আদায়ে পোশাকশ্রমিকদের চলা আন্দোলনের চতুর্থ দিনে সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, ফতুল্লা ও গাজীপুরের সাইনবোর্ড এলাকায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে।
বুধবার সকালে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুরে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এসময় সাভার মডেল থানার ওসির গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। এমনকি মহাসড়কের একাধিক স্থানে ময়লা ফেলে আগুন জ্বালিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকরা। পরে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে মহাসড়ক থেকে তাদের সরিয়ে দেয়।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন গণমাধ্যমকে জানান, সকালে পদ্মার মোড় এলাকায় একসাথে ৩০-৪০ হাজার শ্রমিক দুই পাশ থেকে জড়ো হয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে পুলিশ তাদের প্রতিরোধ করে। আন্দোলনকারীরা সাভার মডেল থানার ওসির গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের হামলায় ওসি গুরুতর আহত হন, উল্লেখ করেন তিনি।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একইদিন আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের জামগড়া ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায়ও পুলিশের সাথে শ্রমিকদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ চলে।
গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
আন্দোলনে শিল্প অঞ্চলগুলোয় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
যার মধ্যে সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া ও বাইপাইল এলাকায় ৫ প্লাটুন; গাজীপুরের চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস, পোড়াবাড়ি, মাস্টারবাড়ি বিদ্যুৎ এলাকা, তেলিপাড়া, সফিপুর, চন্দ্রা ও কালিয়াকৈর এলাকায় ১৩ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, চাষাঢ়া, ঝালকুড়ি ব্রিজ, বিসিক শিল্প এলাকা ও কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় ৬ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
এদিকে গাজীপুরের সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে পুলিশের সাথে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে।
সকালে শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে শ্রমিকরা তাদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে। পুলিশও ইটপাটকেলের জবাবে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
আন্দোলনে আহত শ্রমিকের মৃত্যু
২রা নভেম্বর গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালে মুঠোফোনে ভাংচুরের ভিডিও ধারণের সময় দুস্কৃতিকারী মারধরে আহত হন তৌফিক নামের এক গার্মেন্টস শ্রমিক। পরেরদিন মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
তৌফিক হোসেনের মৃত্যুতে গায়েবানা জানাজা করার সময় গাজীপুরের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ বলে ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলনের জেরে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সকাল ১১টা নাগাদ ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ব্যাপক কাঁদানে গ্যাস (টিয়ার শেল) নিক্ষেপ করে। পুলিশের টিয়ার শেলের মুখে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কার্যকরের পরিকল্পনা মজুরি বোর্ডের
এই বছরের ডিসেম্বর থেকেই তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন মজুরি কার্যকর করতে যাচ্ছে সরকার। বুধবার ঢাকার সেগুনবাগিচায় নতুনভাবে গঠিত নিম্নতম মজুরির অষ্টম বোর্ডের প্রথম সভায় মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের প্রতিনিধিরাই এই সময়সীমার বিষয়ে একমত হন।
সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের পক্ষে নেওয়া কিছু আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানান বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিআইডাব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
সভায় মালিক-শ্রমিক পক্ষের সম্মতিতে ১লা ডিসেম্বর কার্যকর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া কথা জানান তিনি। এমনকি ২০২৭ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে সেই নতুন মজুরি পরিশোধের বিষয়ও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে নতুন এই মজুরিটির বেতন কাঠামো ঠিক কেমন হবে এ বিষয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্ধারণ করার কথা জানিয়েছেন মজুরি বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী।
এর পাশাপাশি ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধ করা এবং অন্যায়ভাবে ছাঁটাই বন্ধের দাবিও জানিয়েছেন শ্রমিকরা।
শ্রমিকদের এই আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় একিইদিনে ঢাকার মিরপুর ১১ নাম্বারে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিল করতে দেখা যায়। গত কয়েকদিন ধরে দাবি আদায়ে মিরপুর ১০, ১১, সাড়ে ১১ এলাকায় আন্দোলন করতে দেখা যায় সেখানে অবস্থিত বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের। তবে বুধবার মিরপুর এলাকায় সকাল থেকে শ্রমিকদের কোনো অবস্থান দেখা যায়নি।
গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, মিরপুর ১০ নাম্বার মেট্রো স্টেশনের সামনেএকটি সাঁজোয়া যান ও জলকামানসহ পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়।