পাঁচ দেশ উঠলো উচ্চ-মধ্যম আয়ের কাতারে, বাংলাদেশ কেন পারলো না?

গত বছরও বাংলাদেশের সঙ্গে নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতির দেশের কাতারে থাকলেও বিশ্বব্যাংকের নতুন তালিকায় শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, জর্ডান এবং মাইক্রোনেশিয়া ঠাঁই করে নিয়েছে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ‘ইনকাম ক্লাসিফিকেশনস’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। যেখানে বাংলাদেশ রয়ে গেছে সেই নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবেই।

ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- একই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশে এই পাঁচ দেশ কীভাবে বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড অর্জন করলো, আর বাংলাদেশ কেন পারলো না? 

সহজ করে বললে- কোথায় এগিয়ে গেলো এই পাঁচ দেশ, আর কোথায় পিছিয়ে রইলো বাংলাদেশ?

প্রতিবছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। 

১লা জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে বিশ্বব্যাংক তাদের সদস্যভুক্ত ২১৮টি দেশ ও অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছে। 

যেখানে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে দেশগুলোকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো নিম্ন, নিম্নমধ্যম, উচ্চ-মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশ। 

এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঋণের পরিমাণ, শর্তসহ অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণ করবে।

হ্যাঁ, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা লাভ করেছিলো।

এখানে বলে রাখা ভালো বাংলাদেশ জাতিসংঘের তালিকায় স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে থাকলেও সেটি বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে এক নয়। 

অর্থাৎ এলডিসি থেকে উত্তরণ মানেই উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া নয়। বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস পুরোপুরি মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

বিশ্বব্যাংক যেভাবে হিসাব করে

বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে। মনে করা হয়, একটি দেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই সেটি বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে ঠাঁই করে নেয়। 

বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। বিশ্বব্যাংক কোনো দেশের আয়ের শ্রেণি নির্ধারণে মাথাপিছু জিডিপি নয়, বরং মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) ব্যবহার করে। আর এই জিএনআইও সরাসরি নয়, ‘অ্যাটলাস মেথড’ নামে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে ডলারে রূপান্তর করে হিসাব করা হয়।

বিষয়টি সহজ করে বললে, জিডিপি হলো একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে এক বছরে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট বাজারমূল্য। এই মোট জিডিপিকে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় মাথাপিছু জিডিপি। 

অন্যদিকে জিএনআই বা মোট জাতীয় আয় বলতে একটি দেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মোট আয়কে বোঝায়। এখানে শুধু দেশের ভেতরে উৎপাদিত আয়ের হিসাবই নয়, বিদেশ থেকে নাগরিকদের অর্জিত আয়ও যোগ করা হয় এবং দেশের ভেতরে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিজ দেশে নিয়ে যাওয়া আয় বাদ দেওয়া হয়। 

অর্থাৎ, জিএনআই = জিডিপি প্লাস বিদেশ থেকে পাওয়া আয় মাইনাস বিদেশে চলে যাওয়া আয়।

এই জিএনআই-কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় জিএনআই পার ক্যাপিটা, যা একটি দেশের মানুষের গড় জাতীয় আয় সম্পর্কে তুলনামূলক ভালো ধারণা দেয়।

তবে এখানেই শেষ নয়। বিশ্বব্যাংক এই জিএনআই পার ক্যাপিটা-ও সরাসরি ব্যবহার করে না। এখানে ডলারের একটি হিসাবও রয়েছে। ডলারের নানা ধরনের সাময়িক ওঠানামার প্রভাব কমাতে বিশ্বব্যাংক তাই ব্যবহার করে অ্যাটলাস মেথড।

এই মেথডে প্রথমে একটি দেশের শেষ তিন বছরের গড় বিনিময় হারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করা হয়। এরপর স্থানীয় মুদ্রায় হিসাব করা জিএনআই-কে ডলারে রূপান্তর করা হয়।

বিশ্বব্যাংক প্রতি বছরের ১লা জুলাই আগের ক্যালেন্ডার বছরের তথ্য ব্যবহার করে নতুন আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশ করে।

অর্থাৎ, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ করা হয়েছে অ্যাটলাস মেথডে ২০২৫ সালের জিএনআই পার ক্যাপিটার ভিত্তিতে। 

এবার উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য প্রয়োজন হয়েছে অন্তত ৪ হাজার ৬৩৫ মার্কিন ডলার।

সহজ করে বললে, ১ হাজার ১৩৬ থেকে ৪ হাজার ৬৩৫ ডলারের মধ্যে থাকলে দেশটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের শ্রেণিতে থাকে। আর ৪ হাজার ৬৩৬ ডলার অতিক্রম করলেই উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উন্নীত হয়।

বিশ্বব্যাংক শ্রীলঙ্কাকে ‘অ্যা রিকভারি স্টোরি’ বা পুররুত্থানের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

শ্রীলঙ্কা: দেউলিয়াত্ব থেকে ফিরে আসার গল্প

মাত্র তিন বছর আগেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে কার্যত দেউলিয়া হয়ে পড়েছিলো শ্রীলঙ্কা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়া, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা (সোভরেন ডিফল্ট)- সব মিলিয়ে ২০২২ সালে দেশটির অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়ে। সেই শ্রীলঙ্কাকেই এবার আবার উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে শ্রীলঙ্কাকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে পুনরায় উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উন্নীত করা হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, এটি সম্পূর্ণ নতুন অর্জন নয়; বরং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারের স্বীকৃতি। ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করায় এবং মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় নির্ধারিত সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় এই উত্তোরণ হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক শ্রীলঙ্কাকে ‘অ্যা রিকভারি স্টোরি’ বা পুররুত্থানের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। 

শ্রীলঙ্কা ১৯৯৯ সালে নিম্ন আয় থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে ওঠে। ২০১৯ সালে প্রথমবার উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে যায়। তবে পরের বছরই অবস্থান হারায় দেশটি। 

সংস্থাটির মতে, শিল্প খাতের পুনরুদ্ধার, পর্যটন শিল্পের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন, আর্থিক ও অন্যান্য সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পুনর্জাগরণ দেশটির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে অর্থনীতি আবার প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে।

এই পুনরুদ্ধারের পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তায় নেওয়া কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিও বড় ভূমিকা রেখেছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে কর সংস্কার, মুদ্রানীতিতে কড়াকড়ি, বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার মতো পদক্ষেপ দেশটির অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে।

এ ছাড়া পর্যটন খাতের দ্রুত পুনরুজ্জীবন, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক খাতের উন্নতি এবং টানা দুই বছর সংকোচনের পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ফিরে আসাও শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।

তবে সংস্থাটি সতর্কও করেছে। তাদের মতে, শ্রীলঙ্কা অত্যন্ত অল্প ব্যবধানে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে এই অবস্থান ধরে রাখতে হলে অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

২০১৯ সালের ইস্টার সানডে হামলা, ২০২০ সালের করোনা মহামারি এবং পরবর্তী বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) সংকট দেশটির অর্থনীতিকে যে গভীর খাদে ঠেলে দিয়েছিলো, সেখান থেকে মাত্র তিন বছরের মধ্যে আবার উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় ফিরে আসা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

ভিয়েতনাম: উৎপাদন ও রপ্তানির শক্তিতে বড় লাফ

তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকসসহ বৈশ্বিক উৎপাদন ও রফতানি বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতিতে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উঠে গেছে। 

ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং কার্যকর নীতিগত সংস্কারের সুবাদে বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে ভিয়েতনাম।

বিশ্বব্যাংকের নতুন তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম ভিয়েতনাম। গত এক দশকে দেশটি বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। 

চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা, বহুজাতিক কোম্পানির ব্যাপক বিনিয়োগ এবং ধারাবাহিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ভিয়েতনামকে দ্রুত এগিয়ে নিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জিএনআই পার ক্যাপিটা প্রায় ৪ হাজার ৯৭০ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনামের সাফল্যের পেছনে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। প্রথমত, উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন শিল্পে ব্যাপক বিদেশি বিনিয়োগ। দ্বিতীয়ত, ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানিতে বৈশ্বিক বাজার দখল। তৃতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে ৭ থেকে ৮ শতাংশের কাছাকাছি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বীকৃতি নয়, বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। 

প্রসঙ্গত, ভিয়েতনাম ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্ন আয় থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ এই মর্যাদা পায় ২০১৫ সালে। অর্থাৎ ভিয়েতনাম বাংলাদেশের প্রায় ছয় বছর আগে এই ধাপে পৌঁছে গিয়েছিলো।

ফিলিপাইন: ভোক্তা অর্থনীতি ও সেবা খাতের উত্থান

ফিলিপাইনের উন্নয়ন মডেল ভিয়েতনামের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।

দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি হলো অভ্যন্তরীণ ভোগ, সেবা খাত, ব্যবসায়িক প্রসেস আউটসোর্সিং, পর্যটন এবং প্রবাসী আয়। গত পাঁচ বছরে দেশটি গড়ে প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, কোনো একটি খাত নয়; শিল্প, কৃষি, সেবা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির বিস্তৃত প্রবৃদ্ধিই দেশটিকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের কাতারে তুলেছে।

ফিলিপাইনের জিএনআই পার ক্যাপিটা এখন প্রায় ৪ হাজার ৮৫০ ডলার।

জর্ডান: শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, পরিসংখ্যানও বদলেছে

জর্ডানের উন্নয়ন কিছুটা ব্যতিক্রমী।

দেশটি জাতীয় হিসাব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার করেছে। নতুন অর্থনৈতিক জরিপ, অনানুষ্ঠানিক খাতের বড় অংশকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরিসংখ্যানের ভিত্তি হালনাগাদ করার ফলে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আগের তুলনায় ভালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও যোগ হয়েছে।

ফলে জিএনআই পার ক্যাপিটা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ২৬০ ডলারে পৌঁছেছে।

মাইক্রোনেশিয়া: ছোট অর্থনীতি, বড় পরিবর্তন

জনসংখ্যা মাত্র এক লাখের কিছু বেশি হওয়ায় মাইক্রোনেশিয়ার অর্থনীতি বাংলাদেশের মতো দেশের সঙ্গে তুলনাযোগ্য নয়।

তবে বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাসে জনসংখ্যার আকার বিবেচ্য নয়; বিবেচ্য হলো মাথাপিছু জাতীয় আয়।

সরকারি আয়, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে দেশটি এবার উচ্চ-মধ্যম আয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

বাংলাদেশ কোথায় পিছিয়ে?

বাংলাদেশ এখনও বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। যদিও বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হয়েছে। 

মোট জিডিপি বেড়েছে কয়েক গুণ। রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে মাথাপিছু জাতীয় আয় এখনও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের নির্ধারিত সীমায় পৌঁছায়নি।

আর তাই বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাসে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশই রয়ে গেছে।

এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের জিএনআই পার ক্যাপিটা এখনো প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।

বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, অ্যাটলাস মেথডে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় হলো ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার।

এদিকে, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে বিশ্বব্যাংক এবার যে ন্যূনতম সীমা নির্ধারণ করেছে, তা হলো ৪ হাজার ৬৩৬ মার্কিন ডলার।

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশকে মাথাপিছু জাতীয় আয় আরও ১ হাজার ৬১৬ ডলার বাড়াতে হবে, তাহলেই বিশ্বব্যাংকের বর্তমান মানদণ্ড অনুযায়ী উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের সীমা অতিক্রম করবে।

সঠিক নীতি, ধারাবাহিক সংস্কার, দক্ষ মানবসম্পদ, রপ্তানির বৈচিত্র্য এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও দ্রুত উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়ার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে, বলে মনে করেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।

ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি আলাপ-কে বলেন, “ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শেখার মতো অনেক বিষয় রয়েছে। দেশটি তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল না থেকে ইলেকট্রনিক্স, প্রযুক্তিপণ্য এবং অন্যান্য উচ্চ-মূল্য সংযোজিত পণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশের মাধ্যমে বিপুল বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশকেও এখনই রপ্তানি বহুমুখীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”

বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ কতটা

বিশ্বব্যাংকের নতুন তালিকা একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়ার কোনো একক পথ নেই।

ভিয়েতনাম গেছে উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে।

ফিলিপাইন এগিয়েছে সেবা অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ বাজারের শক্তিতে।

শ্রীলঙ্কা ফিরেছে কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে।

জর্ডান এগিয়েছে পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক কাঠামোর উন্নয়নে।

মাইক্রোনেশিয়া এগিয়েছে ছোট অর্থনীতির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে।

বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষা হলো, শুধু অর্থনীতির আকার বড় করাই যথেষ্ট নয়। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ, শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা—সবগুলো ক্ষেত্রেই একসঙ্গে অগ্রগতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা।

কিন্তু বর্তমান ব্যবধান বিবেচনায় অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আগামী কয়েক বছরে শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধি নয়, প্রতি ব্যক্তির জাতীয় আয় দ্রুত বাড়াতে হবে, একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। 

কারণ বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাসে শেষ পর্যন্ত জিডিপির আকার নয়, প্রতি মানুষের জাতীয় আয়ই নির্ধারণ করে একটি দেশ কোন আয়ের শ্রেণিতে থাকবে।