ডলারের ভরসা কমছে, ভল্টে বাড়ছে সোনা

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে যুদ্ধ, বাড়ছে নিষেধাজ্ঞা। সোজা কথায় বাড়ছে ভূরাজনীতির অনিশ্চয়তা। আর ঠিক সেই সময়েই বিশ্বের সবচেয়ে নীরব কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। 

তবে তারা শেয়ার কিনছে না, ক্রিপ্টো কারেন্সিও না; কিনছে সোনা। শুধু গত কয়েক বছরেই বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনার মজুত পৌঁছেছে প্রায় পাঁচ দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। 

একই সময়ে দেখা যাচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ ধীরে ধীরে কমাতে চাইছে অনেক দেশ। 

প্রশ্ন উঠছে, ডলারের ওপর কি আস্থা কমছে, নাকি বিশ্বের অর্থনীতি নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, যেখানে নিরাপত্তার সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে?

আর তাতে কি ডলারের যুগ শেষ হতে চলেছে? নাকি এটি আসলে ঝুঁকি কমানোর এক নতুন কৌশল?

প্রশ্নগুলো শুধু অর্থনীতিবিদদের নয়, নীতিনির্ধারকদেরও। কারণ বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কী কিনছে, কী বিক্রি করছে, কোন মুদ্রায় রিজার্ভ রাখছেএসব সিদ্ধান্ত শুধু তাদের নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনাকেই প্রভাবিত করে না; বরং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, এমনকি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে।

ইতিহাস বলছে, রিজার্ভ সম্পদের বড় ধরনের পরিবর্তন কখনোই হঠাৎ ঘটে না। বরং এটি ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে দিতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনিটারি অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস ফোরাম (ওএমএফআইএফ), ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি), ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) এবং দ্য কনভার্সেশন- প্রকাশিত বিশ্লেষণ জরিপে এমন পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত মিলেছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা ও প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন এমন এক বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আর শুধু মূল্যস্ফীতি বা সুদের হার নয়; বরং যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যত ভূরাজনীতির মতো বিষয়গুলোও এখন রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডলার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

আজকের আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি- বিশ্বের প্রায় সব কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতদিন ডলারকেই কেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে ডলার আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। সে সময় ডলারের মূল্য সোনার সঙ্গে নির্ধারিত ছিল এবং বিশ্বের অধিকাংশ মুদ্রার মূল্য নির্ধারণ করা হতো ডলারের ভিত্তিতে। 

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সোনার সঙ্গে ডলারের সরাসরি সম্পর্ক ছিন্ন করলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য কমেনি। বরং তেল বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বৈশ্বিক পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে ডলার আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে।

বর্তমানেও বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সবচেয়ে বড় অংশ ডলারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে নিষ্পত্তি হয়। অধিকাংশ পণ্য, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের দামও ডলারে নির্ধারিত হয়। ফলে কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ডলার শুধু একটি মুদ্রা নয়; এটি বৈদেশিক লেনদেনের নিরাপত্তা, আমদানি ব্যয় পরিশোধ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।

তাহলে বিকল্প ভাবনা কেন?

তাহলে এমন কী ঘটলো যে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন বিকল্প নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে?

এই প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর মিলেছে ওএমএফআইএফ-এর ‘গ্লোবাল পাবলিক ইনভেস্টর ২০২৬’ প্রতিবেদনে।

৯০টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল এবং সরকারি পেনশন তহবিলের ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, আগামী ১০ বছরে ডলারের রিজার্ভ কমাতে চাওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংখ্যা প্রথমবারের মতো ডলার বাড়াতে চাওয়া ব্যাংকের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।

এটি একটি প্রতীকী পরিবর্তন। কারণ ২০২৩ সালে ওএমএফআইএফ যখন প্রথম দীর্ঘমেয়াদি রিজার্ভ পরিকল্পনা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে, তখন অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের অবস্থান অপরিবর্তিত রাখার বা বাড়ানোর কথা জানিয়েছিলো। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে সেই চিত্র বদলে গেছে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছেডলারের আধিপত্য শেষ হয়ে যাচ্ছেএমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ নিরাপত্তা, তারল্য এবং বাজারের গভীরতার দিক থেকে ডলারের এখনো কোনো সমকক্ষ বিকল্প নেই।

প্রতিবেদনটির ভাষায়, “রিজার্ভ সম্পদে এখনো ডলারের আধিপত্য রয়েছে এবং নিরাপত্তা তারল্যের দিক থেকে ডলারকে এখনো অতুলনীয় বলে মনে করা হয়।”

তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়?

পরিবর্তনটি হচ্ছে কৌশলে।

অস্থিরতাই যে এখন নতুন বাস্তবতা। ওএমএফআইএফ তাদের এবারের প্রতিবেদনের নাম দিয়েছে ‘রাইডিং দ্য ওয়েভ’। এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পুরো বার্তা।

প্রতিবেদনটির ভূমিকায় বলা হয়েছে, কয়েক বছর আগেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মনে করতো, বৈশ্বিক অস্থিরতা সাময়িক। যুদ্ধ শেষ হবে, সুদের হার স্বাভাবিক হবে, বাজার আবার স্থিতিশীল হবে। তাই তারা অপেক্ষা করতো। কিন্তু এখন সেই ধারণা বদলে গেছে।

ওএমএফআইএফ বলছে, অস্থিরতা এখন আর সাময়িক নয়; বরং সেটিই নতুন বাস্তবতা। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও তাদের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার কৌশল বদলে ফেলছে।

প্রতিবেদনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলোতারা স্থিতিশীলতার অপেক্ষা করছে না; বরং অনিশ্চয়তার মধ্যেই বিনিয়োগের নতুন কৌশল তৈরি করছে।

এই একটি বাক্যই সম্ভবত বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বর্তমান মানসিকতা সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ট্রাম্প জ্বালানি নিরাপত্তা

ওএমএফআইএফ-এর জরিপে অংশ নেওয়া রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো, আগামী দিনে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কী?

গত বছর যেখানে বাণিজ্য সুরক্ষাবাদ বড় উদ্বেগ ছিলো, এবার সেই জায়গা দখল করেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত।

এর পরেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা।

এটি কাকতালীয় নয়।

ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বাণিজ্যিক কূটনৈতিক সংঘাত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধরনের নীতিগত অবস্থান আবারও বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে বলে মনে করছেন অনেক রিজার্ভ ব্যবস্থাপক।

ওএমএফআইএফ বলছে, এই কারণেই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো শুধু সুদের হার নয়, ভূরাজনীতিকেও আর্থিক ঝুঁকির অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

শুরুটা কোথায় ও কেন

বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কেন হঠাৎ এত বেশি সোনা কিনতে শুরু করলোএই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২২ সালে।

রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের মিত্ররা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশে রাখা প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের প্রধান নেটওয়ার্ক সুইফট থেকেও রাশিয়ার অনেক ব্যাংককে বিচ্ছিন্ন করা হয়।

ঘটনা শুধু রাশিয়ার জন্য নয়, বিশ্বের অন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও একটি বড় বার্তা ছিলো। তারা উপলব্ধি করে, বিদেশে রাখা ডলার বা ডলারভিত্তিক সম্পদ কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; প্রয়োজনে তা রাজনৈতিক অস্ত্রেও পরিণত হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার দ্য কনভার্সেশন- প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকেই দেশটি সোনা কেনা বাড়িয়েছিল। 

তবে ২০২২ সালের নিষেধাজ্ঞা এবং বৈদেশিক সম্পদ জব্দ হওয়ার পর শুধু রাশিয়াই নয়, চীন, ভারত, তুরস্কসহ অনেক উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সোনা কেনার গতি আরও বাড়িয়ে দেয়।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সোনা এখন শুধু মূল্যবান ধাতু নয়, বরং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এক ধরনের বীমা।

সোনা কেন নিরাপদ?

ডলার বা ইউরোর মতো কোনো মুদ্রা অন্য দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ড, বিদেশি ব্যাংকে রাখা আমানত বা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা সম্পদসবকিছুই নির্দিষ্ট আইনি রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়।

কিন্তু সোনার হিসাব ভিন্ন। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজ দেশের ভল্টে সোনা সংরক্ষণ করলে, তা অন্য কোনো দেশ সহজে জব্দ করতে পারে না। 

যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক সংঘাতের সময় কারণেই সোনার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।

দ্য কনভার্সেশন-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন শুধু মূল্য সংরক্ষণের জন্য নয়, বরংআর্থিক সার্বভৌমত্ব’ রক্ষার অংশ হিসেবেও সোনা কিনছে।

রেকর্ড দ্রুততায় কেনা হচ্ছে সোনা

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি)-এর সর্বশেষ ‘সেন্ট্রাল ব্যাংকস গোল্ড সার্ভে ২০২৬’-এ।

লন্ডনভিত্তিক এই সংস্থার জরিপে বিশ্বের ৭৬টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক অংশ নেয়।

জরিপে দেখা গেছে, আগামী ১২ মাসে নিজেদের সোনার মজুত বাড়াতে চায় ৪৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৮ সালে জরিপ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ হার।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৮৯ শতাংশ রিজার্ভ ব্যবস্থাপক মনে করেন, আগামী এক বছরে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট সোনার মজুত আরও বাড়বে।

এটি বোঝায়, সোনা কেনা এখন বিচ্ছিন্ন কয়েকটি দেশের সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি বৈশ্বিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।

সোনা এখন 'কৌশলগত সম্পদ'

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের গ্লোবাল হেড অব সেন্ট্রাল ব্যাংকস এবং হেড অব এশিয়া-প্যাসিফিক শাওকাই ফ্যান বলেন, “এই বছরের জরিপ একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে স্বর্ণের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী ধারায় অব্যাহত রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “খুব কম ব্যাংকই এখন এটিকে (সোনা) একটি ঐতিহ্যগত বা পুরোনো সম্পদ হিসেবে দেখছে; বরং ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রিজার্ভের বৈচিত্র্যায়নের এই সময়ে অনেকেই এটিকে একটি সক্রিয়, কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছে।”

অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে সোনা এখন শুধু ইতিহাসের অংশ নয়; বরং বর্তমান ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

সংকটের সময় সোনাই নির্ভরযোগ্য

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জরিপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেন তারা সোনা ধরে রাখতে চায়।

জরিপে ৯০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, সংকটের সময় সোনার পারফরম্যান্সই তাদের সবচেয়ে বেশি আস্থা দেয়।

৮৪ শতাংশ বলেছে, এটি দীর্ঘমেয়াদে মূল্য সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর সম্পদ।

আর ৮২ শতাংশ মনে করে, রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনতে সোনার বিকল্প নেই।

উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৮৫ শতাংশ আবার সোনাকে সরাসরি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করছে।

এটি দেখায়, কয়েক বছর আগেও যেখানে সোনা ছিলো রিজার্ভের একটি ঐতিহ্যগত উপাদান, এখন সেটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল কৌশলে পরিণত হয়েছে।

ট্রেজারি বিল ছাড়িয়ে গেলো সোনা

একসময় বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ রিজার্ভ সম্পদ বলতে বোঝানো হতো মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিত্র বদলে গেছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভ সম্পদের ২৭ শতাংশ ছিলো সোনা।

অন্যদিকে মার্কিন ট্রেজারির অংশ নেমে এসেছে ২২ শতাংশে।

অর্থাৎ বহু দশক পর বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় রিজার্ভ সম্পদ হয়ে উঠেছে সোনা।

অবশ্য এর একটি কারণ হলো গত দুই বছরে সোনার দামের ব্যাপক বৃদ্ধি। তবে শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক ক্রয়ও এই পরিবর্তনের বড় কারণ।

দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে সোনা

ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের অনেক দেশই তাদের সোনার একটি বড় অংশ ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের মতো পশ্চিমা দেশের ভল্টগুলোতে জমা রাখতো। কিন্তু বর্তমান জরিপ বলছে, ৯ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত এক বছরে তাদের নিজ দেশের মাটির ভেতরের ভল্টে সোনা সংরক্ষণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। 

আগের বছর এই হার ছিলো মাত্র ৫ শতাংশ। অর্থাৎ খুব দ্রুতই বিভিন্ন দেশ বিদেশ থেকে নিজেদের সোনা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া জোরদার করছে।

যারা পুরো সোনা দেশে ফিরিয়ে আনছে না, তারাও এখন আর কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করছে না। 

জরিপে দেখা গেছে, ১০ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন তাদের সোনা সংরক্ষণের জন্য কোনো একটি দেশের বদলে একাধিক দেশকে বেছে নিচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, যদি কোনো একটি দেশের সাথে সম্পর্ক খারাপও হয়, তবুও যেন অন্য দেশে রাখা সোনা সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে।

তাহলে কি ডলারের দিনশেষ?

এই প্রশ্নের উত্তরনা

ওএমএফআইএফ, ডব্লিউজিসি ও ইসিবি- তিনটি প্রতিষ্ঠানই একটি বিষয়ে সতর্ক করেছে।

তা হলো- কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলার ফেলে দিচ্ছে না। তারা এখনো ডলারকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু তারা আগের মতো একটি মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে চায় না।

নতুন রিজার্ভ যোগ করার সময় তারা এখন ডলারের পাশাপাশি সোনা, ইউরো, রেনমিনবি, ক্রিপ্টো এবং কিছু ছোট উন্নত অর্থনীতির মুদ্রাও যুক্ত করছে।

অর্থাৎ এটি ডলার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার কৌশল।

বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বুঝতে পেরেছে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, বরং যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, ভূরাজনীতি এবং আর্থিক ব্যবস্থার বিভক্তি। 

আর সেই কারণেই রিজার্ভের ভল্টে আবারও জায়গা করে নিচ্ছে হাজার হাজার টন সোনা।

এতে ডলারের জায়গা অন্য কেউ নিচ্ছে না; বরং ডলারের পাশেই নতুন নতুন সম্পদ জায়গা করে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে।

“উত্থান-পতন বা অস্থিরতা এখন আর পার হয়ে যাওয়ার মতো কোনো সাময়িক বিষয় নয়, বরং এটি এমন এক পরিস্থিতি যা নিয়মিত নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলা করতে হবে,” ওএইএফআইএফ তাদের প্রতিবেদনের শুরুতেই যেটা বলেছে সেটাই আসলে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা।