বাজেটের আগে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি, মধ্যবিত্তের স্বস্তি ফেরানোই চ্যালেঞ্জ

বাজারে ঢুকলেই টাকা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। মাসের শুরুতে যে বেতন যোগ হয় অ্যাকাউন্টে, মাস শেষ হওয়ার আগেই তা ফুরিয়ে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে।

চার বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে। ঠিক এমন সময়ে ১৬ মাসের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির রেকর্ড নিয়ে নতুন বাজেট দিতে যাচ্ছে সরকার। 

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, বাজেট কী পারবে স্বস্তি ফেরাতে? নাকি জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে?

বিশ্লেষকদের বলছেন, এবারের বাজেটে সরকারের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা এবং মূল চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা।

বিশেষ করে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে টানা দুই মাস ঊর্ধ্বমুখী আছে মূল্যস্ফীতির পারদ।

এ জন্য মধ্যপ্রাচ্য সংকট, তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি প্রভাব রেখেছে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর মূল্যস্ফীতির চাপ শিগগিরই যে কমছে না, সেই ইঙ্গিতও দিচ্ছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

রেকর্ড মূল্যস্ফীতির মূল্য

বৃহস্পতিবার নতুন অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। এটি বর্তমান সরকারের নতুন বাজেট।

নীতিগত প্রস্তুতির শেষ লগ্নে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি।

সহজ ভাষায় মূল্যস্ফীতি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা, যেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক দাম বেড়ে যায়, ফলে কমে যায় টাকার ক্রয়ক্ষমতা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মূল্যস্ফীতিরমূল্য চুকাচ্ছে চার বছর ধরেই।

কোভিড পরবর্তী বৈশ্বিক সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার কারণে ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

এরপর থেকে চলছে রেকর্ড ভাঙা গড়ার খেলা। পরিসংখ্যানের এই শুষ্ক সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস, সঞ্চয় ভাঙার শব্দ আর ধারদেনার হিসাব।

সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী টেবিল, সবখানেই দুশ্চিন্তা বেড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, “২০২২ সালের শুরু থেকেই টানা মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছে বাংলাদেশের মানুষ। উচ্চ সুদের হার চালু রেখে কিছুটা মূল্যস্ফীতি কমানোর ইঙ্গিত মিলেছিল, কিন্তু গত কয়েক মাসে তা আবারে বেড়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি করছে।”

আয় ব্যয়ের উল্টো চিত্র

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে জাতীয় গড় মজুরিহার কখনোই মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। মে মাসে জাতীয় মজুরিহার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ।

অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি (৯ দশমিক ৪২ শতাংশ) মজুরি বৃদ্ধিকে অনেকটাই পেছনে ফেলেছে। এর সহজ অর্থ হলো, মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে।

দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা প্রায় ৬ কোটি মানুষ, যারা মোট কর্মজীবীর ৮৬ শতাংশ, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অনিশ্চিতায় পড়েছে।

পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি। গত দুই মাসে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে এলপিজি’র দাম। সবশেষ বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দামও।

অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান আলাপ-কে বলেন, “মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যাচ্ছে না, এর পেছনে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা অন্যতম কারণ হতে পারে। বাজার তদারকিতে যারা আছেন তাদের পদক্ষেপ কাজে আসছে না। এদিকে তেল-গ্যাসের পর এ মাসে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।”

বাজেট ও সরকারের চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ সবচেয়ে সংকটে ফেলবে নিম্নমধ্যবিত্ত ও স্থির আয়ের পরিবারগুলোকে। আয়ের তুলনায় দ্রুত ব্যয় বাড়লেও সেই হারে বাড়ছে না মজুরি। এটাই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, “মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বাজারকে রাখতে হলে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজেটে এ নিয়ে পরিকল্পনা থাকতে হবে। আর এটা এবারের বাজেটে সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে।”

বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।

“বিনিয়োগ না এলে মানুষের হাতে টাকা আসবে না। আবার সুরক্ষা কর্মসূচি না নিলে নিম্নবিত্তরা আয়ের সুযোগ পাবে না। তাই এসব জায়গায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে,” বলেছেন তিনি।

নতুন অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হতে পারে।

কিন্তু বাস্তবে মানুষ বাজারে গিয়ে যদি নিত্যপণ্যের দামে স্বস্তি না পায়, তাহলে সেই লক্ষ্য কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। যা হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক ইস্যু এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

তাই আসন্ন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ সরকারের জন্য শুধু অর্থনৈতিক ইস্যুই নয়, বরং রাজনৈতিক পরীক্ষাও।

সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্যের চাপ যখন সাধারণ মানুষের বড় উদ্বেগ, তখন বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।