একদল কসাই বিমানে চড়ে ঢাকায় আসছেন- কুরবানির কয়েকদিন আগে থেকে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় এই তুমুল আলোচনা। কসাই, অর্থাৎ যারা গরু-মহিষ-ভেড়া-ছাগল ইত্যকার পশু জবাই করেন, মাংস কাটাকুটি করেন এবং একটি আস্ত পশুকে আমাদের রান্না করার উপযোগী করে তৈরি করে দেন- তারা কেন বিমানে চড়বেন? গরিব কসাইদের বিমানে চড়ার সামর্থ্য হলো কোথা থেকে? আসলে কি তাই? আপনার কি কোনো ধারণা আছে বাংলাদেশের কসাই অর্থনীতির আকার কত বড়?
প্রতিবছর ঈদ-উল-আজহায় বাংলাদেশে কমবেশি এক কোটি পশু কুরবানি হয় বলে একটা প্রচলিত ধারণা আছে। গত বছর বাংলাদেশে শুধু গরুই কুরবানি করা হয়েছে প্রায় অর্ধকোটি- এই হিসেব দিয়েছে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর। সবচেয়ে বেশি কুরবানি হয় ঢাকায়। আর এই কুরবানির সময় ঢাকায় তৈরি হয় ‘জাত কসাই’য়ের সংকট। এই সুযোগে বাড়তি আয়ও করে নেন অপেশাদার কসাইরা।
যারা পেশাদার কসাই তারা প্রতিটি গরুর দাম অনুযায়ী হাজার প্রতি দুই থেকে তিনশো টাকা মজুরি নেন। অর্থাৎ একটি এক লাখ টাকা দামের গরু জবাই করে কসাই পাবেন কুড়ি থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত। এরাই সেই ‘জাত কসাই’। ঢাকায় বছরভর মাংসের দোকানগুলোতে কাজ করেন এরা। কুরবানির মৌসুমে এদের সাথে ঢাকার বাইরের ‘জাত কসাই’রা এসেও যোগ দেন।
কুরবানির মৌসুমে আরেকদল কসাইয়ের দেখা মেলে - এরা ‘হঠাৎ কসাই’। মূলত ঢাকার রিকশাওয়ালা, সবজিওয়ালা, গার্মেন্টস শ্রমিক, ড্রাইভার - এ ধরনের মানুষেরা কিছু এক্সট্রা রোজগারের আশায় ছোট ছোট দল তৈরি করেন। এরা অপেশাদার। এই ‘হঠাৎ কসাই’রা একটি একটি এক লাখ টাকা দামের গরু জবাই করতে দশ থেকে পনের হাজার টাকা নেবেন। প্রতি হাজারে তাদের রেট এক থেকে দেড়শো টাকা।
‘জাত কসাই’রা দ্রুত সব কাজ শেষ করে ফেলেন। তাদের কাজ হয় নিখুঁত। হঠাৎ কসাইদের সময় লাগবে অনেক। কাজে অনেক খুঁত থাকবে। কাজ শেষে প্রায়ই দেখা যাবে কাজের মান নিয়ে গরুর মালিকদের সাথে তাদের ঝগড়া লেগে যাচ্ছে।
ঢাকার বাইরে থেকে যারা আসেন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুরবানির মৌসুমে কসাইদের বিমানে চড়ে ঢাকায় আসা নিয়ে এক ধরনের আলোচনা চলতে দেখা যায়। এমনকি ঈদের তিন দিন আগেও বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলোকে রিপোর্ট করতে দেখা গেছে যে - ‘সৈয়দপুর থেকে বিমানে চড়ে ঢাকায় আসছেন কসাইরা’।
ঢাকার একজন সুপরিচিত কসাই খলিলুর রহমান। বাজারমূল্যের চাইতে কমদামে গরুর মাংস বিক্রি করে তিনি বাংলাদেশে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। খলিলুর ঢাকার একজন তারকা কসাই।
আলাপকে তিনি বলেন, “সৈয়দপুরে অনেক মাংসের দোকান আছে। সেখানকার কসাইরা নিজের এলাকায় হয়তো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতে পারবেন। সেখানে ঢাকায় এসে আয় হবে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।”
এই পরিমাণ টাকা যিনি রোজগার করবেন, তিনি ছয় হাজার টাকা বিমানভাড়া দিয়ে ঢাকায় আসতেই পারেন - এখানেতো তার ক্ষতির কিছু নেই, বলেন খলিলুর রহমান।
মহাখালী টি অ্যান্ড টি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা শাহজালালও জানান ঢাকার কসাই সংকটে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন আসেন। তিনি আলাপ-কে বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে চাঁদ রাতে অনেক কসাই এসে মাদ্রাসায় রাতে ঘুমান। সকালে পশু জবাইয়ের কাজে নামে।
“এর মধ্যে কেউ কেউ গরু নিয়ে আসে গ্রাম থেকে, হাটে গরু বিক্রি করে। ঈদের দিন কসাইয়ের কাজ করেন। আর অনেকে শুধু কসাইয়ের কাজ করতেই আসেন”, বলেন মাওলানা শাহজালাল।
মূলত উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও দিনাজপুর থেকে বাসে কিংবা ট্রাকে করে কসাইরা ঢাকায় আসেন বলে জানিয়েছেন মাওলানা শাহজালাল। ২০-২৫ জনের দল এসে মাদ্রাসায় এবং ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে বলেও জানান তিনি। ঈদের পরের দিন তারা ঢাকার বাইরে কিংবা নিজেদের এলাকায় ফিরে গিয়ে সেখানে কুরবানির কাজ করেন।
উত্তরায় রাজউক আবাসিক প্রকল্পের একটি ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মেহেরুল্লাহও নিশ্চিত করেন ঢাকার বাইরে থেকে অনেকেই প্রকল্পে আসেন কসাই হিসেবে। তিনি বলেন, গত বছর এলাকার একজন বাসিন্দা রংপুর থেকে কসাইয়ের একটি দল নিয়ে আসেন। তারা রাতে ভবনের নিচে অবস্থান করেন। সকালে কাজ করে আবার নিজ গন্তব্যে ফিরে যান।
‘তারা এসেই আরো কিছু গরুর কাজ নেন। যেন আরও বেশি লাভ হয়। দেখা যায় একটা গরু হয়তো তিনজন বানাচ্ছেন। কিন্তু আসে ১৫-২০ জন,’ বলেন মেহেরুল্লাহ।
এছাড়াও তিনি বলেন, বিরুলিয়া থেকে ১০-১৫ জনের একটি দলও আসে। তারা বিভিন্ন ভবনে কসাইয়ের কাজ নেন। দেখা যায় ৫ থেকে ১২টা গরুর কাজ হাতে নেন।
কার কেমন মজুরি
কুরবানি পশু জবাই ও কসাইয়ের কাজে ঈদের মৌসুমকে ঘিরেই বাড়তি উপার্জনের সুযোগ হয় বলে জানান মোহাম্মদপুরে বিহারি এলাকার কসাই মাসুদ। তিনি এক সময় কসাইয়ের পেশায় থাকলেও এখন অন্য পেশায় জড়িত। তবে ঈদ এলে তিনি এই সময়টায় বাড়তি উপার্জন করেন।
‘এটা তো সুযোগ। কাজ যেহেতু জানি তাই অনেকের গরুর কাজ হাতে নেই’ জানান মাসুদ।
কত অর্থ উপার্জন হয়, এমন প্রশ্নের উত্তরে মাসুদ আলাপ-কে বলেন, এটা নির্ভর করবে কখন আপনার গরুর কাজ করবো। সকালে নামাজের পরপর যে গরুর কাজ করি তার কাছে হাজারে ২০০ টাকা করে নেই। অনেক সময় সেটা ২৫০ টাকাও নিয়েছি।‘
তবে কোভিডের পর এখন আর কেউ ২৫০ টাকা দিতে চান না বলে জানান।
তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় গরু থেকে দাম কিছুটা কমে আসে। ১৫০ কিংবা ১২০ টাকা হাজারে নিয়ে থাকি। তবে ঈদের পরদিন হলে হাজারে ১০০ টাকা করে নেই।
তার মতে এই সময়ে দেড় লাখ থেকে ২ লাখ টাকা তার বাড়তি আয় হয়। যেটা দলের অন্যান্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন।
ঢাকার পেশাদার কসাইদের নিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, তারা দল নিয়ে জবাইয়ের কাজে নেমে ঈদের প্রথম দিন মজুরি নেন পশুর দাম অনুযায়ী হাজারে এক থেকে দেড় শ টাকা।
এতে তাদের ঈদের দিনে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় হয় বলে জানান খলিলুর রহমান।
তিনি আরও বলেন, “ঈদের পরের দুইদিন ঢাকার পেশাদার কসাইদের আয় হয় ২০-২৫ হাজার টাকা। সুতরাং, সব মিলে ঈদে ঢাকার পেশাদার কসাইদের আয় হয় লাখ খানেক।”
বনানী কাঁচা বাজারের কসাই নূর ইসলাম আলাপকে বলেন, তিনি কুরবানি ঈদের দিন তিন থেকে চারজনের একটি দল নিয়ে কাজ করেন। সকাল বেলা পশু জবাই ও মাংস কাটার মজুরি হিসেবে নেন পশুর দাম অনুযায়ী প্রতি হাজারে ৩০০ টাকা। দুপুর ১২টার পর থেকে মজুরি নেন প্রতি হাজারে টাকায় ২০০ টাকা।
ঈদের দিন ও ঈদের পরের দুই দিন নূর ইসলাম ও তার দল দিনে গড়ে দুই থেকে তিনটা গরু জবাই ও মাংস কাটার কাজ করতে পারেন বলে জানিয়েছেন।
ঢাকার কসাইরা ভালো অর্থ উপার্জন করতে পারলেও বাইরে থেকে যারা আসেন তারা খুব একটা দক্ষ নন বলে জানান নূর ইসলাম।
তার দাবি, ঢাকার বাইরে থেকে আসা কসাইরা ঢাকার কসাইদের মতো দক্ষ না বলে মজুরিও কম।
কড়াইলের মোশাররফ বাজারের পরিচিত কসাই মনির হোসেন। তিনিও চারজনের দল নিয়ে কাজ করেন ঈদের দিন। মনির হোসেন আলাপকে বলেন, ঈদের দিন একেকটি পশু কুরবানির জন্য তিনি মজুরি নেন পশুর দাম অনুযায়ী হাজারে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
মনির হোসেনের ভাষ্যে, খরচ শেষে তার আয় থাকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
এছাড়া তিনি ও তার দল বিভিন্ন মাদ্রাসায় পশু কুরবানি দেওয়ার কাজ করে থাকেন বলেও জানান। এক্ষেত্রে প্রতি পশুর জন্য পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পান তিনি।
মহাখালীর টি অ্যান্ড টি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা শাহজালাল বলছেন, বিভিন্ন দাতারা ব্যক্তিগতভাবে কুরবানি না দিয়ে মাদ্রাসায় কুরবানি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেক্ষেত্রে দাতারা কসাইদের খরচ দিয়ে থাকেন এবং মাংসের একাংশ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য দান করেন।
মাদ্রাসায় পশু কুরবানি ও মাংস কাটার জন্য কসাইদের প্রতি পশুর জন্য পাঁচ হাজার টাকা, এবং পশুর দাম এক লাখের বেশি হলে ছয় হাজার টাকা মজুরি দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
অপেশাদার কসাইরা কেন এত সুযোগ পান
পেশাদার কসাইয়ের সংকটই প্রধান কারণ নয়, অতিরিক্ত মজুরির কারণেও অপেশাদার কসাইয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয় বলে মনে করেন মাওলানা শাহজালাল।
তিনি বলেন, ঢাকায় কসাইদের মজুরি ও কুরবানির পশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় কসাই সংকট দেখা দেয়। এছাড়াও পেশাদার কসাইরা বেশি মজুরি নেন। এই সুযোগেই কুরবানি ঈদের দিন রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও সবজি বিক্রেতারা কসাই হিসেবে নেমে যান।
এমনকি ঢাকার বাইরে থেকে কসাইরাও এজন্যই আসেন বলে তিনি মনে করেন।
“আমাদের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ছুরি-দা ধার দেওয়ার কাজ করে। কয়েকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে ভ্যানওয়ালা ও সবজিওয়ালা লাইন ধরে আছে ধার দিচ্ছে”, বলেন মাওলানা শাহজালাল।
তিনি আরও বলেন, পেশাদার কসাইকে দেখা যায় হয়তো ১৫ হাজার টাকা দিতে হবে, সেখানে অপেশাদার কসাইরা ৫ হাজার টাকাতেই সেটা করে দেবেন।
উত্তরা রাজউক প্রকল্পের মেহেরুল্লাহর বলছেন, তিনি দেখেছেন, একটি ১০ জনের দল ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দুই দিনে আয় করে বাড়ি ফেরেন।
তিনি আরও জানান, অনেক সময় একজন পেশাদার কসাই আসেন। তার সঙ্গে লোক থাকে ২০ জন। তারা হয়তো ১০টা গরুর কাজ নেন। এই ২০ জনের মধ্যে হয়তো কাজ জানে ৫ জন। বাকি সবাই অপেশাদার। দেখা যায় কারোটা ১২০ টাকায় করে দিচ্ছে, কারোটা হয়তো ১০০ টাকায়।
মোহাম্মদপুরের একসময়ের পেশাদার কসাই মাসুদও এমন তথ্য জানালেন। তিনি বললেন, অনেকে হাজারে টাকা নেন না। দেখা যায় যারা জাত কসাই না, তারা একটা গরুর জন্য ৫ হাজার টাকা নেয়। তাদের কাজ ভালো না। গরুর মালিক কম দামে সারতে চান। তাই আমাদের ডাকেন না।
কসাইয়ের এই বাড়তি আয় নিয়ে খলিলুর রহমান আলাপকে বলেন, “কুরবানি ঈদের পর এক মাসের মতো সময় মাংসের দোকান বন্ধ থাকে, বা চলে না, কারণ কেউ তখন মাংস কিনতে আসে না। তাই এই সময়ে কুরবানির আয় দিয়ে কসাইরা চলে, ঘর চালায়, ধার-দেনা শোধ করে।”
মাসুদও বলেন, “কে জাত কসাই আর কে সিজনাল এগুলো দেখার দরকার কী? কিছু মানুষ টাকা আয় করতে পারছে। ঈদের আনন্দ তাদের আছে না?”