সরকার চাইলে ‘সম্মানজনকভাবে’ সরে যাবেন রাষ্ট্রপতি

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নাটকীয় প্রেক্ষাপট, জরুরি অবস্থা জারির চাপ, ‘প্রতিবিপ্লবের’ শঙ্কা এবং প্রধান উপদেষ্টা কে হবে তার সমীকরণ, সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবার তুলে ধরেছেন ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের বঙ্গভবনের অন্দরমহলের চিত্র।

দৈনিক কালের কণ্ঠ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে তিনি বলেন, “যখন বিক্ষোভকারীরা গণভবন অভিমুখে, তখন আমাকে জানানো হলো, যেকোনো মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসবেন। 

“১২টার সময় আমাকে জানানো হলো, উনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বঙ্গভবনে আসার। এর আগে আমরা আঁচই করতে পারিনি যে আসলে ঘটনা কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে উনি যখন এখানে আসবেন বলছেন এবং হেলিকপ্টারও রেডি, তখন আমরা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা করতে পারি।”

রাষ্ট্রপতি বলেছেন তিনি দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জানতে পারেন শেখ হাসিনা আর আসছেন না। কিছুক্ষণ পরেই নিশ্চিত হন তিনি দেশ ছেড়ে গেছেন।

বিকাল তিনটার দিকে সেনাপ্রধান রাষ্ট্রপতিকে ফোনে পরিস্থিতি জানান। পরে তিন বাহিনীর প্রধান বঙ্গভবনে বৈঠক করেন। প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের ডেকে একটি সর্বসম্মত পথ বের করা হবে।

ওই সময় জরুরি অবস্থা জারি কিংবা সামরিক শাসনের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, উল্টো তার ওপরই জরুরি অবস্থা জারির চাপ ছিল। 

বিভিন্ন দেশি-বিদেশি পক্ষ পরিস্থিতিকে জটিল করার চেষ্টা করেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে তিন বাহিনীর প্রধানরা জরুরি অবস্থা, সামরিক আইন কিংবা জাতীয় সরকার সবকিছুর বিপক্ষে ছিলেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষায়, “সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধান এটার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। সামরিক আইন জারি করার ব্যাপারে বিরোধী, জাতীয় সরকার গঠন করার ব্যাপারে বিরোধী এবং ইমার্জেন্সি দেওয়ার ব্যাপারেও তাঁরা বিরোধী ছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, এভাবেই কন্টিনিউ করে নিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত যাওয়া যায় কি না। এ কারণে আমি সেসব শক্ত হাতে দমন করতে পেরেছি।”

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, সংবিধানে এমন কোনো ব্যবস্থাই নেই। রাষ্ট্রপতি জানান, ২০২৪ সালের ৮ই আগস্ট তিনি তৎকালীন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলেন এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে আপিল বিভাগের মতামত চান।

রাষ্ট্রপতি বলেন, “পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সেদিন শুনানি হয়। তারপর তারা আমাকে মতামত দিয়ে দেন যে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দিতে পারেন। এক বা একাধিক উপদেষ্টা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। আর সেটি রাষ্ট্রপতি গঠন করে দেবেন মর্মে সিদ্ধান্ত দিলেন তাঁরা। তাঁদের ওই মতামত আমার জন্য রক্ষাকবচ হয়ে উঠল। আমার সামনে আর কোনো বাধা থাকল না। এই মতামতের ওপর ভিত্তি করেই আমি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। সেখানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সম্পূর্ণ রকম সমর্থন ছিল।”

প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন এই আলোচনায় ছাত্রদের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম চূড়ান্ত ছিল বলে জানান রাষ্ট্রপতি। সে সময় ইউনূসের ফ্রান্সে চিকিৎসাধীন থাকায় যোগাযোগে সমস্যা হচ্ছিল। বিকল্প হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচনায় এলেও ছাত্রনেতারা ইউনূসের ব্যাপারে অনড় থাকেন।

রাষ্ট্রপতি জানান, বিকল্প আলোচনায় সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদের নামও আসে। পরে তাকে অর্থ উপদেষ্টা করা হয়।

ড. ইউনূস দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরের লাউঞ্জেই সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে উপদেষ্টাদের তালিকা চূড়ান্ত হয়।

রাষ্ট্রপতির বলেন, “আমরা আগে থেকে একটি খসড়া তালিকা করে রেখেছিলাম। সেখান থেকে ড. ইউনূস কিছু বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের কয়েকটি নাম যুক্ত করেন। তারপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।”

সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির মূল্যায়ন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল।

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাথে স্বল্প সময়ের আলাপে তার মধ্যে রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলি দেখেছেন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী, বলে সাক্ষাৎকারে জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

 রাষ্ট্রপতি বলেন, নতুন সরকার আসার পর তিনি এখন পুরোপুরি চাপমুক্ত। দেড় বছর ধরে তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা ও বঙ্গভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

রাষ্ট্রপতি পদে থাকা নিয়ে সাম্প্রতিক গুঞ্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেছিলেন, দীর্ঘ মানসিক চাপের কারণে তখন তার মনে হয়েছিল আর রাষ্ট্রপতি থাকা যায় না।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, সাংবিধানিকভাবে তার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। নির্বাচিত সরকার চাইলে তিনি সম্মানজনকভাবে সরে যেতে প্রস্তুত বলেও জানান।

সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাকে দুটি ঈদে জাতীয় ঈদগাহে যেতে দেওয়া হয়নি, বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা উপস্থিত হননি এবং চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর ও লন্ডনে যাওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়নি।

রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, এসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে স্বেচ্ছায় পদত্যাগে বাধ্য করা, যাতে পছন্দের কাউকে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি করা যায় এবং নির্বাচন বিলম্বিত করা সম্ভব হয়।

আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গঠিত ব্যতিক্রমী সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পথে গেলে সংকট আরও বাড়তে পারত, এই বিবেচনাতেই তিনি নীরব থেকেছেন।

অবসর পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি বলেন, দীর্ঘ চার দশকের আইনি জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে একজন আইন পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে চান।