হাতিয়ায় একটি ধর্ষণ অভিযোগ ঘিরে ধূম্রজাল, কী জানা যাচ্ছে

নোয়াখালীর হাতিয়ায় এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। 

ভুক্তভোগী নারীর দাবি, শুক্রবার রাতে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

অভিযুক্ত বলছেন, তিনি নিজেই সে সময় আরেকটি ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন আর পুলিশ ঘটনাকে দেখছে অতিরঞ্জিত হিসাবে।

একদিকে ঘটনাকে ভোট পরবর্তী সহিংসতা হিসেবে দাবি করে রাজধানীতে প্রতিবাদ সভা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির স্থানীয় নেতারা এটাকে তারেক রহমানের ফ্যাসিবাদ বলে মন্তব্য করেছেন।

অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিএনপির কর্মী নয় দাবি করে এটা বিএনপির সম্মান ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।

অভিযোগকারী এবং হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার জানান, শনিবার দুপুরে নোয়াখালীর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে আসেন হামলার শিকার ওই  তিন সন্তানের জননী। 

প্রথমে তিনি মারধরের ঘটনায় চিকিৎসা নিলেও পরবর্তীতে চিকিৎসকের কাছে তিনি ধর্ষণের অভিযোগ করেন। এরপর তাকে জরুরি বিভাগ থেকে গাইনি ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।

ধর্ষণের অভিযোগ

ঘটনার বর্ণনায় অভিযোগকারী নারী জানান, শুক্রবার রাত এগারোটার দিকে তিনি ও তার স্বামী ঝালমুড়ি খাচ্ছিলেন। এমন সময় চারজন ব্যক্তি লাথি দিয়ে দরজা খুলে বাড়িতে প্রবেশ করে। এরপর তারা প্রথমে তার স্বামীকে চেপে ধরে। পরে তাকে আক্রমণ করে।

এক পর্যায়ে আক্রমণকারীদের একজন তাকে টেনে গোসল খানায় নিয়ে গিয়ে যৌন হামলা করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় বাকি তিনজন পাহারা দিয়েছে বলেও তার অভিযোগ।

তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে হামলাকারীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। 

তিনি বলেন, “এনসিপিতে কেন ভোট দিলাম, কেন শাপলাকলিতে ভোট দিলাম এ জন্য আমাকে নির্যাতনও করল আমারে মারল, আমার স্বামীকে মারল।”

সকালে যখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন তখন কেন ধর্ষণের অভিযোগ করেননি? এমন প্রশ্নের জবাবে অভিযোগকারী নারী জানান, ‘লজ্জায়’ তিনি বলতে পারেননি।

অভিযুক্ত নিজেই হামলার শিকার

অভিযুক্ত জানান, তিনি নিজেই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে হামলার শিকার হন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

তিনি বলেন, “শুক্রবার এশার নাজামের পর বাসা থেকে বের হয়ে বাজারে যাওয়ার পথে আমার ওপরে এনসিপির সাত-আটজন লোক আক্রমণ করে। তারা এ সময় আমার কপালে কোপ দেয়।”

ঘটনার পরের বর্ণনায় তিনি জানান, প্রথমে তিনি পার্শ্ববর্তী একটি ফার্মেসিতে চিকিৎসা নিলেও পরে নোয়াখালীর মাইজদী সাধারণ হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। 

“সেখানে আমি রাত সাড়ে ১০টায় চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। তাহলে আমি কীভাবে এই কাজ করতে পারি?” বলেন তিনি।

নিজেকে বিএনপির কর্মী দাবি করে তিনি অভিযোগ করেন, এনসিপিতে যোগ না দেওয়ায় তার নামে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

কী বলছে পুলিশ ও ডাক্তার

নোয়াখালীর হাতিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ নুরুল আনোয়ার বলেন, “ঘটনাটি আসলে অতিরঞ্জিত। প্রাথমিক তদন্তে আমরা ধর্ষণের কিছু পাইনি।”

ডাক্তারি রিপোর্ট এখনও হাতে এসে পৌঁছায়নি বলে জানান তিনি।

ওই এলাকায় হওয়া কয়েকটি সংঘর্ষ থেকে ঘটনা ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে জানিয়ে তিনি আলাপকে বলেন, “তবে এর আগে ওই এলাকায় জমিজমা সংক্রান্ত কয়েকটি সংঘর্ষ সংগঠিত হয়েছে, সেটাকে অন্য দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।”

নোয়াখালী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “প্রথমে এই রোগী দুপুরে একবার শারীরিক আক্রমণ হয়েছেন জানিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। এরপর বিকেল বেলা এসে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেন। প্রথমবার তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। পরের অভিযোগের ভিত্তিতে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরিক্ষার জন্য আমরা তাকে ভর্তি করিয়ে দেই।”

পুলিশের কাছ থেকে ধর্ষণ পরীক্ষার জন্য কোনো আবেদন করা হয়নি বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক দোষারোপ

এই ঘটনাকে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও নিজেদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে শনিবার রাতেই রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করে এনসিপি।

এদিকে এ ঘটনায় বিএনপির পাশাপাশি পুলিশ এবং চিকিৎসকরা তাদের কাজ ঠিক ভাবে করেননি বলে অভিযোগ করেছেন নোয়াখালী-৬ বা হাতিয়া আসনের সংসদ সদস্য, হান্নান মাসউদ।  

তিনি বলেছেন, “ওনার (অভিযোগকারী নারী) ঘর বাড়ি হামলা ও লুটপাট করা হয়েছে। ওনার স্বামী সন্তানকে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়েছে।”

এ ঘটনায় তিনি বিএনপিকে দোষারোপ করে বলেন, “তারেক রহমান কি আরেক ধরনের ফ্যাসিবাদ কায়েম করবেন, নাকি নতুন গণতন্ত্র উপহার দিবেন এটা তিনি ভালো জানেন। এ ধরনের অত্যাচার থেকে বাংলাদেশ ও হাতিয়ার মানুষকে রক্ষা করতে হবে।”

অন্যদিকে নোয়াখালী জেলা বিএনপি নেতা আলাউদ্দিনের দাবি অভিযুক্ত ব্যক্তি বিএনপির কর্মী না।

তিনি বলেন, “একটা মহল রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য অভিযুক্তকে বিএনপির কর্মী হিসাবে প্রচার করছে।”

অভিযোগ সত্য হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে আর মিথ্যা হলে যারা অভিযোগ করছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।