বাংলার টেসলায় চড়ে যাচ্ছিলাম মতিঝিল থেকে নারিন্দার দিকে। চালকের নাম সুরুজ। বাড়ি রংপুরের গাইবান্ধা। বয়স ত্রিশের কোঠায়।
জিজ্ঞেস করলাম ভোট দিতে বাড়ি যাবেন না? বললো, “যাইতেতো চাই মামা”।
তো কবে যাবেন?
যামুগা দুয়েকদিন আগে। জীবনে ভোট দেওয়ার চান্স পাইনাই। এইবার দিমু। যদি ভোটটা হয়।
সুরুজের এই ‘যদি’ শব্দ খুব কানে লাগলো। দেড় বছর ধরে এতোসব কথার ফুলঝুরি, গণ্ডায় দিস্তায় কমিশন বৈঠক, সবইতো কার্যত একটি ভালো নির্বাচনের জন্য।
‘আলাপ’-এর ফ্ল্যাগশিপ পডকাস্ট ‘কথা চলুক’-এ গত দুই সপ্তাহে বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্যপ্রার্থীর সাথে কথা বলেছি।
সবাইকেই এই প্রশ্নটা করেছিলাম, ‘নির্বাচন কি হবে?’। সবারই প্রত্যাশার পারদ তু্ঙ্গে। কিন্তু বাস্তবতায় শঙ্কা যেন আরো বেশি।
সবার মধ্যেই এক ধরনের দ্বিধা আছে। নির্বাচন কি হবে? হলেওবা কেমন হবে? জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে গণআকাঙ্খা তৈরি হয়েছিল তার ধারেকাছেও কি পৌঁছানো গেল?
অধিকাংশের শঙ্কাই আইনশৃঙ্খলা নিয়ে। ভোটের সময় অন্য অনেক বাহিনী দায়িত্ব পালন করলেও মূল দায়িত্ব পুলিশের।
কিন্তু পুলিশ ঠিকমতো কাজ করছে না বা ভেঙে পড়া বাহিনীকে ঠিকঠাক রিফর্ম করা যায়নি এখনও, এমন মত সবারই।
মাস কয়েক আগে খোদ পুলিশও নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নির্বাচনকালীন অবস্থা নিয়ে দ্বিধার কথা জানিয়েছে।
পুলিশ সুপারদের সাথে ইসি’র মত বিনিময়ের সময় অনেক কর্মকর্তাই ঠিকমতো কাজ করতে পারা নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছেন।
আমারও গত কয়েক মাসে একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হয়েছে। বাহিনীর শৃঙ্খলা নিয়ে তাদের নিজেদেরই অসন্তোষ আছে।
মাসখানেক আগে আইজিপি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘অর্ডার’ প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে ইসিকে সহযোগিতা করা সম্ভব হবে না।
চব্বিশের লুট হওয়া অস্ত্রের ১৫ শতাংশ এখনও উদ্ধার হয়নি। আর সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ অস্ত্র এসেছে দেদারসে।
প্রধান উপদেষ্টা লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের তাগিদ দিয়েছেন। আর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আশ্বস্ত করেছেন লুট হওয়া অস্ত্র নির্বাচনে ব্যবহার হবে না।
পুলিশের মনোবল নিয়েও প্রশ্ন আছে। গত দেড় বছরে ছয় শতাধিক পুলিশ আহত হয়েছেন। মবের শিকার হয়ে হেনস্তা হয়েছেন অসংখ্য। এক অভিযানে গিয়ে র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
অবশ্য কঠোর বার্তাও দিয়েছেন আইজিপি। বলেছেন, কোনও অপশক্তি নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না।
নির্বাচন সুষ্ঠু করতে পুলিশের পূর্ণ সক্ষমতা থাকার কথাও দৃঢ়ভাবে বলেছেন পুলিশ প্রধান।
কিন্তু যেসব রাজনীতিবিদ, পর্যবেক্ষকদের সাথে কথা হয়েছে বা হচ্ছে, সবাই এখনও অজানা শঙ্কা নিয়ে আছেন, নির্বাচন কি হবে?
দলগুলোর পাল্টাপাল্টি
একটা কথা খুব শোনা যায় ইদানিং, সরকারের ভেতরে সরকার বা স্টেট উইদিন স্টেট। গত বছরের শেষদিকে প্রধান উপদেষ্টার সাথে দেখা করে এমন ভাবনার কথা জানিয়েছিল প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও।
বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সাথে দেখা করে একই ধরনের অভিযোগ জানিয়েছিলেন।
তিন দলেরেই অভিযোগ সরকারের ভেতরে কেউ কেউ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ‘সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন’।
নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হয়েছে পুরোদমে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির কথার লড়াই আর প্রতিশ্রুতির পসরা।
কিন্তু দিন কয়েক আগেই এনসিপি নেতা সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ নির্বাচনে যাওয়া নিয়েই শঙ্কা জানিয়েছেন।
আসিফ মাহমুদের অভিযোগ নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব করছে। তাই বলেছেন, “এনসিপি নির্বাচনে যাবে কি-না তা বিবেচনার সময় হয়েছে”। এরপর অবশ্য এনসিপিও প্রচারের মাঠে আছে পুরোদমে।
তবুও শঙ্কা কেন
পর্দার আড়ালে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চলছে এই অভিযোগও আছে। সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোও বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা হচ্ছে। হুঁশিয়ারিও দিচ্ছে এতে কোনও লাভ নেই, নির্বাচন হতেই হবে।
অবশ্য প্রধান উপদেষ্টা একাধিকবার বলেছেন, নির্ধারিত দিনেই নির্বাচন হবে, এতে কোনো নড়চড় হবে না।
প্রেস সচিব বলেছেন, “নির্বাচন নিয়ে সরকারের অবস্থান একেবারে পরিষ্কার। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখেই নির্বাচন হবে। একদিন আগেও হবে না, একদিন পরেও হবে না।”
নির্বাচন কেমন হবে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন? মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবেতো? রাজনৈতিক নেতাদের মুখে যতোই প্রত্যাশার ফুলঝুরি থাকুক, অফ রেকর্ডের আলোচনায় সবার মধ্যে শঙ্কা দেখা যায়।
ভোটের অঙ্ক একদিকে তবে তার বাইরে আছে আরো হিসাব-নিকাষ।
ঢাকায় হওয়া একটি বৈঠকে এক মার্কিন কূটনীতিকের অডিও রেকর্ডের বরাতে ওয়াশিংটন পোস্ট একটি প্রতিবেদন করেছে। এতে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে বন্ধু হিসাবে দেখতে চায়।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী মার্কিন কূটনীতিক বলেছেন, বাংলাদেশ ইসলামিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে আগের চেয়ে ভালো করবে।
মার্কিন গণমাধ্যমটি লিখেছে, এসব মন্তব্য মার্কিন কূটনীতিকরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত কীভাবে দেখছেন তার একটা চিত্র তুলে ধরে।
বাংলাদেশ নিয়ে দিল্লিতে একাধিক বৈঠক করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। যদিও এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত নয়।
২১এ জানুয়ারি সারাহ কুক ভারতের সাবেক কয়েকজন কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞের সাথে বৈঠক করেছেন। সেখানে একজন মার্কিন কূটনীতিকও ছিলেন।
ওই বৈঠকেও জামায়াতে ইসলামী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কথা হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে।
সারাহ কুক তাদের বলেছেন, বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন ভালো। নির্বাচনকালীন যেগুলো হয় সেগুলো হচ্ছে, তবে সার্বিকভাবে পরিস্থিতি ঠিক আছে।
কিন্তু ক্যানাডার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেভডেক এক গবেষণায় বলছে, রাজনৈতিক অপতথ্য এবং বিস্তৃত উগ্রবাদী, গণতন্ত্রবিরোধী প্রচারের সংমিশ্রণ ২০২৬ সালের নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এই শঙ্কাই দেখা যাচ্ছে সাধারন মানুষের মধ্যে। সবাই নির্বাচনি ট্রেনে আছেন, কিন্তু সেই ট্রেনের গন্তব্য নিয়ে দ্বিধা স্পষ্ট।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মনে করেন নির্বাচন হবে। তবে কতটা ভালো হবে তা নিয়ে শঙ্কা আছে তার।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিনের বক্তব্যও তাই। তিনিও প্রত্যাশা করেন নির্বাচন হবে, তবে ‘কিন্তু’ আছে।
ঢাকায় কাজ করা একাধিক কূটনীতিকও বিভিন্ন আলোচনায় এই শঙ্কার কথা বলেন। কিন্তু তারাও চান নির্বাচন হোক।
আবার একইসাথে নির্বাচন হলেও, তার গুণ ও মান নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন। একজন বলছিলেন, শুধু ভোট গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভোট গণনা গুরুত্বপূর্ণ।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ খান রবিউল আলম বলছিলেন, ঢাকার দৃষ্টিতে সারা দেশ বিবেচনা করলে ভুল হবে। তিনি বলছিলেন, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর রাজনীতির ময়দানে পুরোনো আচরণের পুনরাবৃত্তি মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
অবশ্য আশান্বিত মানুষও আছেন। যেমন গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, এখনও ভোট নিয়ে শঙ্কা জানানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
প্রধান উপদেষ্টা শক্তভাবেই ভোট নিয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারে আছে পুরোদমে।
তাহলে এখনও কেন সুরুজ মিয়াকে ভাবতে হচ্ছে, ‘যদি’ ভোট হয়, তবে তিনি বাড়ি যাবেন, জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে।