“তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাস?”
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতির সর্বশেষ এ কথাই শুনেছিলেন তৎকালীন তার ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) মুহিতুল ইসলাম। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, মিজানুর রহমান খান, মহিউদ্দীন আহমদসহ আরও অনেকেই তাদের বইয়ে লিখেছেন, কীভাবে মৃত্যুর মুখেও শেখ মুজিবের কণ্ঠে ভয়ের কোনো রেশ ছিলো না।
১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট সকাল। চারিদিকে থমথমে অবস্থা। ঢাকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক। আশেপাশে দেখা যাচ্ছে কালো পোশাক পড়া সেনাবাহিনীর সদস্যদের। আর রেডিওতে বাজছে, রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে।
সেদিন ছিলো শুক্রবার। ভোর হতে না হতেই শুরু হয়ে যায় কিছু সেনা সদস্যের একটি পরিকল্পিত অভিযান। হত্যার লক্ষ্য ছিল তিনজন। আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনি এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য শেখ মুজিবুর রহমান।
কিন্তু এই অভিযানে শুধু এই তিনজনের প্রাণ যায়নি। হত্যা করা হয় পরিবারের সবাইকে। সেই দিনটির কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন বই ও জবানবন্দিতে।
সেদিন সেই পরিবারের প্রায় ২০ জনকে মেরে ফেলা হয়। এমনকি রেহাই পাননি ১০ বছরের শেখ রাসেলও। দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ মনি এবং তার সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকেও প্রাণ হারাতে হয়েছিলো সেদিন। একইসাথে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির ভগ্নিপতি ও মন্ত্রী সেরনিয়াবাতের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ছোট শিশুসহ অনেককেই হত্যা করা হয়।
সব লেখা ও গবেষণায় এই হত্যাকান্ডের মুল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে বেশ কয়েকজন মধ্যম স্তরের সেনা কর্মকর্তার নাম। যাদের মধ্যে অন্যতম মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান, মেজর খন্দকার রশিদ এবং প্রাক্তন মেজর শরিফুল হক ডালিম।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে বলা হয়েছে, সেনানিবাসে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে এই ইঙ্গিত পেয়েছিলেন শেখ মুজিব। তাই তিনি সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের উপর গোয়েন্দা তৎপরতার নজর বাড়ান। পাকিস্তান আমলের অভিজ্ঞতা থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তবে তিনি জানতেন না, কয়েকজন মেজর গোপনে কী পরিকল্পনা করছে। মাসকারেনহাসের মতে জুনিয়র কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করাই ছিল তার ভুল, যার মূল্য তাকে জীবন দিয়ে দিতে হয়।
যেভাবে শুরু হয়েছিলো ১৫ই অগাস্ট
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ নিয়ে লিখেছেন মহিউদ্দীন আহমদ। তার বই ‘বেলা অবেলা: বাংলাদেশ ১৯৭২-১৯৭৫’ বইটির ‘অভ্যুত্থান’ অধ্যায়ে উঠে এসেছে ১৫ই অগাস্টের সেই দিনটির কথা। বই এর তথ্যমতে, ভোর সোয়া পাঁচটায় ধানমন্ডি ৩২সহ, শেখ মনি ও সেরনিয়াবাতের বাড়ি ঘিরে ফেলে সৈন্যদের ভিন্ন তিনটি দল। ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের মধ্যেই শেখ মুজিব ও তার বাড়ির সবাইকে হত্যা করা হয়।
মহিউদ্দীন আহমদ লিখেছেন, মাসে দুবার বৃহস্পতিবার রাতে বেঙ্গল ল্যান্সার্সের প্রশিক্ষণ মহড়া চলে। ১৪ই অগাস্টও ছিলো বৃহস্পতিবার, সেই রাতে প্রশিক্ষণ মহড়ার আড়ালে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের টারমাকে জড়ো হন মেজর ফারুক ও মেজর রশিদ। রাত ১১টায় সেখানে যোগ দেন প্রাক্তন মেজর শরিফুল হক ডালিম, প্রাক্তন মেজর আজিজ পাশা ও ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা। এরপর ৭৫ থেকে ১৫০ জনের তিনটি দল গঠন করা হয়।
মেজর ডালিমের নেতৃত্বে একটি দল যায় সেরনিয়াবাতের বাড়িতে। শেখ মনির বাড়িতে আক্রমণ করতে সৈন্যদলের নেতৃত্ব দেয় রিসালদার মুসলেহউদ্দিন। আর মেজর মহিউদ্দিন, সাবেক মেজর নূর ও মেজর হুদার নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বাড়ির গেটে পৌঁছায়।
এদিকে ভোর ৪টা ৪০ এর দিকে মেজর ফারুক নিজেই ট্যাঙ্ক বহর নিয়ে রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরের দিকে রওনা হন। মাসকারেনহাসের বইতে বলা হয়েছে, ফারুক প্রায় ২৮টি ট্যাঙ্ক ও ৩৫০ জন সৈন্য জড়ো করেন। ট্যাঙ্কের মেশিনগানগুলোতে গুলি থাকলেও কোনো গোলা বা শেল ছিল না। কিন্তু রক্ষীবাহিনী তা জানতো না। আর একারণেই সেই ট্যাঙ্কবহর রক্ষী বাহিনীর প্রায় ৩ হাজার সৈন্যের সারি অতিক্রম করে যেতে সক্ষম হয়।
এছাড়াও আরও কয়েকটি দলকে বিমানবন্দর, বেতার কেন্দ্র, সেতু ও সেনানিবাস নিয়ন্ত্রণে পাঠানো হয়।
১৫ই অগাস্টের সেই ঘটনাবলী উঠে এসেছে কর্নেল এম এ হামিদের ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ বইটিতে। সেখানে তিনি লিখেছেন, অপারেশান পরবর্তী অবস্থা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিলো মেজর রশিদের উপর। তিনি সরাসরি হামলায় অংশ নেননি। তার ১৮টি কামান গোলা ভর্তি করে রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টার ও ধানমন্ডি ৩২ এর দিকে তাক করে বিমানবন্দরে রাখা হয়েছিলো।
কর্নেল হামিদ লিখেছেন, এসব প্রস্তুতি চলছিলো আর্মি ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মাত্র কয়েকশ গজ দূরে। কিন্তু কেউই কিছু টের পায়নি। তিনি লিখেছেন প্রস্তুতির সময় সৈনিকদের উৎসাহ দিতে গিয়ে মেজর ফারুক বলছিলেন, “এবার হয় করবো, নয় মরবো। সাবাস গোলন্দাজ। সাবাস ট্যাঙ্কার।”
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার বইয়ে দাবি করেছেন, সেনাকর্মকর্তাদের বলা হয়েছিল তিনজন মূল লক্ষ্যকে হত্যা করতে হবে। মুজিবের বড় ছেলেদের বন্দি করতে হবে। অন্য কাউকে স্পর্শ করতে বারণ করা হয়েছিলো তাদের। তবে, কেউ তাদের পথে বাধা দিলে যে কাউকে “মোকাবিলা করার” স্বাধীনতাও দেওয়া হয়েছিলো। বইটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই স্বাধীনতাই পরবর্তী ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের দরজা খুলে দেয়।
১৫ই অগাস্টে ধানমন্ডি বত্রিশ
ডাকসুর তৎকালীন ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ২০২২ সালে বিবিসিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ১৫ই অগাস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কথা ছিলো শেখ মুজিবের। রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি চলছিলো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। কিন্তু ভোর হতেই শোনা যায় গোলাগুলির শব্দ। পরে রেডিওতে জানতে পারলেন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে। সেদিন রেডিওতে এই বার্তা দিয়েছিলেন মেজর ডালিম।
১৫ই অগাস্ট সকালের রেডিওবার্তাটি ছিলো এমন, “মেজর ডালিম বলছি। অদ্য সকাল হতে খন্দকার মোশতাক আহমদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করিয়াছে।” শেখ মুজিবকে হত্যার কথাও বলেন তিনি। একইসাথে সারাদেশে কারফিউ জারির ঘোষণাও দেন।
২০১২ সালে শেখ মুজিবের পিএস মুহিতুল ইসলামের সাক্ষাৎকার নেয় বিবিসি। তার বর্ণনায় উঠে আসে শেখ পরিবারের শেষ কিছু মূহূর্ত। তিনি বলেন, ১৪ই অগাস্ট অন্যান্য দিনের মতোই রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ বাড়ি ফেরেন শেখ মুজিব। খাওয়া দাওয়া সেরে রাত ১২টার দিকে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ৩টার দিকে কাজ শেষে মুহিতুল ইসলামও বাড়ির নিচের একটি কক্ষে শুয়ে পড়েন। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই বাড়ির টেলিফোনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। শেখ মুজিব কথা বলতে চেয়েছিলেন তার সাথে।
মুহিতুল ইসলাম বলেন, “বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণ করেছে, তুই জলদি পুলিশকে (ফোন) লাগা।” তবে টেলিফোনে চেষ্টা করেও কাউকে পাচ্ছিলেন না মুহিতুল ইসলাম। পরে গেঞ্জি ও লুঙ্গি পড়া অবস্থায় শেখ মুজিব নিচে নেমে এসে রিসিভার নিয়ে নেন হাতে। ফোনে বললেন, “হ্যালো, আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি।” এ কথা বলার সাথে সাথে “বৃষ্টির মতো গুলি” ছুড়তে শুরু করে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের দল, বলে জানান মুহিতুল।
গোলাগুলি শুরু হলে, শেখ মুজিব পাহারায় থাকা পুলিশ ও সেনাবাহিনীদের বললেন, “পুলিশ সেন্ট্রি, আর্মি সেন্ট্রি এতো গুলি চলছে তোমরা কী করো?” তারপর তিনি উপরে চলে গেলেন।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, সেদিন রাতে শেখ মুজিব সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ এবং সামরিক গোয়েন্দা পরিচালক কর্নেল জামিলকে ফোন দিয়েছিলেন। কর্নেল জামিল সাহায্য করতে আসার পথে সৈন্যদের গুলিতে নিহত হন।
কর্নেল হামিদ তার বইয়ে লিখেছেন, শফিউল্লাহকে অনেক্ষণ পরে ফোনে পেয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, “শফিউল্লাহ আমার বাসা তোমার ফোর্স অ্যাটাক করেছে। কামালকে হয়তো মেরেই ফেলেছে। তুমি তাড়াতাড়ি ফোর্স পাঠাও।”
এরপর শফিউল্লাহ অনেককেই ফোন করেন, কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে বাঁচাতে কোনো সৈন্য পাঠাতে পারলেন না।
মুহিতুল ইসলাম বলছিলেন, প্রথমে তারা কেউই আঁচ করতে পারেননি কী হতে যাচ্ছে। বাড়ি ঘিরে রাখা সৈন্যদের উদ্দ্যেশ্য স্পষ্ট হয়, যখন বাড়ির নিচ তলায় ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয় শেখ কামালকে। শেখ মুজিব উপরে চলে যাওয়ার পর নিচে নেমে এসেছিলেন তার বড় ছেলে শেখ কামাল। তিনিও পাহারায় থাকা পুলিশ ও সেনা সদস্যদের একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। জিজ্ঞেস করেন, “ভাই, এতো গুলি চলছে, আপনারা নির্বিকার হয়ে তাঁকিয়ে আছেন?” কিন্তু তখন কালো ও খাকি পোশাকে পাচঁ থেকে ছয় জন সৈন্য তার সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন তিনি নিজের পরিচন দেন। পরিচয় শুনেই শেখ কামালের দিকে তাঁক করে ব্রাশ ফায়ার করে সৈন্যরা। মুহিতুল ইসলাম বললেন, “কামাল ভাই তো বুক ঝাঁঝরা হয়ে মুখ থুবরে পড়ে গেলেন আমার পায়ের কাছে।”
শেখ কামালকে হত্যার পর যে সৈন্যরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে উপরে উঠতে থাকে। তারপর মুহিতুল শুনতে পান, “পাইছি, পাইছি”। তারপর শেখ মুজিবের কণ্ঠ শুনতে পান তিনি। মুহিতুল নিচ থেকে শুনতে পান শেখ মুজিব বলছেন, “তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাস?” এটাই ছিলো তার শোনা রাষ্ট্রপতির শেষ কথা।
“অল আর ফিনিশড”
শেখ কামালকে হত্যার পর যে সৈন্যরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে উপরে উঠতে থাকে, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন মেজর মহিউদ্দিন। দোতালায় উঠার সময় সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে শেখ মুজিবের মুখোমুখি হন তিনি। মাসকারেনহাস বলছেন, রাষ্ট্রপতিকে কাছ থেকে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন মহিউদ্দীন। তোতলতে ততলাতে তিনি বলতে থাকেন, “স্যার, আপনি আসুন”। মুজিব তখন তাকে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তারা কি তাকে মারতে এসেছে কি না। রাষ্ট্রপতি বলেন, “তোরা কী চাস? তোরা কি আমাকে মারতে এসেছিস? ভুলে যা, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেটা করতে পারেনি, তোরা কারা যে মনে করছিস তোরা পারবি?”
ঠিক সেই মুহূর্তে মেজর নূর সেখানে পৌঁছান। পেছন থেকে মহিউদ্দিনকে সরিয়ে দেন এবং শেখ মুজিবের দিকে স্টেনগান তাক করে ব্রাশফায়ার করেন। রাষ্ট্রপতির দেহের ডান পাশে বুলেটের আঘাতে বড় গর্ত হয়ে যায় এবং তিনি সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন। মাসকারেনহাস তার বইয়ে লিখেছেন, মৃত্যুর সময়ও শেখ মুজিবের প্রিয় পাইপটি তার ডান হাতে শক্ত করে ধরা ছিল। ঘড়ির কাটায় তখন সময় ভোর ৫টা ৪০ মিনিট।
ধানমন্ডি বত্রিশে গিয়ে শুধু রাষ্ট্রপতিকে হত্যার আদেশ ছিলো। কিন্তু সৈন্যরা সেখানেই থেমে যায়নি। মুজিবকে হত্যার পর তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে একে একে শেখ পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যা করতে থাকে। বেডরুমের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় ফজিলাতুননেসা মুজিবকে। শোবার ঘরে গুলিবিদ্ধ হোন রাষ্ট্রপতির আরেক ছেলে শেখ জামাল। শেখ কামাল ও শেখ জামালের স্ত্রীদেরও হত্যা করা হয়। মুজিবের ভাই শেখ নাসের বাথরুমে লুকিয়ে ছিলেন, তাকেও হত্যা করা হয়।
মাসকারেনহাসের বইতে বলা হয়েছে, একজন সৈন্য যে আগে কখনও মুজিবকে দেখেনি, হত্যার পর মুজিবের মরদেহ বুট দিয়ে উলটে দেখে, যাতে তাকে শনাক্ত করতে পারে। এরপর কয়েক ঘন্টা পর তার ছবি তোলা হয়।
ধানমন্ডির সেই বাড়িতে সর্বশেষ হত্যা করা হয় শেখ মুজিবের ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে। মুহিতুল ইসলাম বলছিলেন, তাদের কয়েকজনকে লাইনে দাঁড় করানোর পর রাসেল দৌঁড়ে এসে তাকে ঝাপটে ধরে। দশ বছর বয়সী রাসেল বলছিলো, “ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?” তারপর একজন সৈন্য এসে রাইফেলের বাট দিয়ে মুহিতুলকে মারা শুরু করেন। তখন রাসেল কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে যেতে চায়। মুহিতুল বলছিলেন, এক সৈন্য এসে তখন রাসেলকে বলে, “চল তোর মায়ের কাছে দিয়ে আসি।” এ বলে তাকে ভেতরে নিয়ে গুলি করে।
মুহিতুলের জবানবন্দীতে উঠে এসেছে, সবশেষে মেজর ফারুক গালিবকে বলছিলেন, “অল আর ফিনিশড।”
একযোগে অন্যান্য হামলা
১৫ই অগাস্ট রাতে আরও দুজন লক্ষ্য ছিলো। শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি ও মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও তার ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি।
সেরনিয়াবাতের বাড়িতে গিয়ে সৈন্যরা প্রথমে গেটের প্রহরীর দিকে গুলি চালায়। সেরনিয়াবাত বুঝতে পেরে সাহায্যের জন্য একটি ফোন করার সুযোগ পান। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকেই তিনি ফোন করেন তখন। এরপরই নিজের শোবার ঘরে গুলিবিদ্ধ হন। তার ছেলে হাসনাত পাল্টা গুলি চালিয়ে লুকিয়ে বেঁচে যান, তবে শিশুসহ পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য ও গৃহকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
অন্যদিকে রিসালদার মোসলেহউদ্দিনের দল শেখ মনি এবং তার সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করে। মনির স্ত্রী স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে এসে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।
হত্যাকান্ডের পর
১৫ই অগাস্ট হত্যাকাণ্ডের পর সেনানিবাসে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রথম আলোয় কলাম লিখেছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি লিখেছেন, সেদিন সকাল পৌনে ছয়টায় ২য় ফিল্ডের সিও মেজর রশিদ এবং সেনাসদরের একজন স্টাফ অফিসার মেজর আমীন আহম্মেদ চৌধুরী তার দরজায় কড়া নারে। দরজা খুলতেই, মেজর রশিদ বলেন, “উই হ্যাভ ডান ইট। শেখ মুজিব হ্যাজ বিন কিলড।” তারপর মেজর হাফিজকে তাদের সাথে কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের সাথে দেখা করতে যেতে হবে। বাইরে গাড়ি ভর্তি আর্টিলারি সৈনিককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেজর হাফিজ বুঝতে পেরেছিলেন তিনি নিরুপায়।
কর্নেল শাফায়াতের বাসায় গিয়ে মেজর রশিদ তাকে বলেন, “স্যার, উই হ্যাভ কিলড প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব। আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অ্যাকশনে যাবেন না। গেলে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে।” এই বলে তিনি চলে যান। সেখানে নিস্তব্ধ হয়ে থেকে যান বাকি তিনজন।
এমন সময় ব্রিগেড কমান্ডারের বেডরুমে ফোন বেজে উঠে। ফোনে কথা বলে ফিরে এসে তিনি মেজর হাফিজ ও মেজর আমীনকে বলেন, চিফ জেনারেল সফিউল্লাহ ফোন করে জানতে চাচ্ছিলেন, ৩২ নম্বরে প্রেসিডেন্টের বাড়িতে কারা হামলা করেছে। প্রেসিডেন্ট তাকে ফোর্স পাঠিয়ে উদ্ধার করতে বলেছেন। মেজর হাফিজের ভাষ্যমতে, কর্নেল শাফায়াতের সাথে সেই ফোনকলে, জেনারেল সফিউল্লাহ কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, প্রেসিডেন্ট তাকে বিশ্বাস করলেন না।
এরপর কর্নেল রশিদ চলে যায় খন্দকার মোশতাক আহমদের বাসায়। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যান রেডিও স্টেশনে।
মাসকারেনহাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খন্দকার মোশতাক বলেন, প্রথমদিকে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে নাকি রাষ্ট্রপতি করা হচ্ছে।
এদিকে মেজর ফারুক রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টার থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে কর্নেল নুর থেকে রাষ্ট্রপতিকে হত্যার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে আবার ৪৬ ব্রিগেডে ফিরে যান। ইতিমধ্যে প্রাক্তন মেজর ডালিম, নির্দেশনা উপেক্ষা করে, বেতারে মুজিবের মৃত্যু ও সামরিক আইন জারির ঘোষণা দিয়ে দেন, যা রশিদকে চিন্তিত করে তোলে, কারণ এতে ঢাকার বাইরের ইউনিটগুলোর কাছে অভ্যুত্থানের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারত। এই ঘোষণার পর সারা দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
কর্নেল হামিদ লিখেছেন, সকাল ৮টার দিকে খবর শুনে ক্যান্টনমেন্টের সব বড় বড় অফিসার আর্মি হেডকোয়ার্টারে জড়ো হতে থাকে। তখন কালো পোশাক পড়া সৈন্যরাও জিপ নিয়ে ফিরে আসছে। তখন কর্নেল মোমেন একটা জিপ থামাতে গেলে সেখান থেকে মেজর ডালিম বের হয়ে তার দিকে স্টেনগান তাক করে। তারপর বাকি সৈন্যরা নেমেও একই কাজ করে। পুরো হেডকোয়ার্টারজুড়ে এক থমথমে অবস্থা। যেকোনো সময় শুরু হতে পারে গুলিবর্ষণ।
এরপরই মেজর ডালিম সেনাপ্রধানের রুমে যান। শফিউল্লাহর দিকে বন্দুক তাক করে বলেন, প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলতে যেতে হবে। তখন চিফ জেনারেল বলেন, “তিনি তোমার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। কিন্তু আমার প্রেসিডেন্ট নন।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছাস্বত্ত্বেও ডালিমের সাথে যেতে দেখা যায় সেনাপ্রধানকে। এভাবে তিন বাহিনীর প্রধানকে নিয়ে যাওয়া হয় রেডিও স্টেশনে। সেখানে খন্দকার মোশতাক আহমদ তাদের স্বাগত জানান এবং শর্ত দেন যে তারা আনুগত্য প্রকাশ করলেই তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। অস্ত্রের মুখে অসহায় তিন বাহিনীর প্রধান একে একে রেডিওতে নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। দুপুরে জুমার নামাজের পর বঙ্গভবনে জাঁকজমকপূর্ণ ট্যাঙ্ক-মিছিলসহ মোশতাক শপথ গ্রহণ করেন। তখনও শেখ মুজিবের লাশ বত্রিশ নম্বরের সিঁড়িতে পড়ে ছিল।
দাফন
১৫ই অগাস্ট সন্ধ্যা নামার আগেই নতুন রাষ্ট্র, নতুন রাষ্ট্রপতি, নতুন মন্ত্রিসভা, নতুন প্রশাসন। সন্ধ্যায় দেশবাসীর উদ্দ্যেশ্যে ভাষণ দিলেন নব-নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ। সেনাবাহিনীর উদ্যোগকে বাহবা দিয়ে একসাথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের মরদেহগুলো দাফনের দায়িত্ব দেওয়া হয় কর্নেল হামিদকে। ১৬ই অগাস্ট দিবাগত রাত ৩ টার দিকে ফোন দিয়ে তাকে এই নির্দেশ দেয় মেজর আব্দুল মতিন। তিনি বলেন, ধানমন্ডি বত্রিশ, শেখ মনি ও সেরনিয়াবাতের বাসা থেকে সব লাশ সংগ্রহ করে সূর্য ওঠার আগেই বনানী গোরস্থানে দাফন করতে হবে। শুধু রাষ্ট্রপতির লাশ যেখানে আছে “আপাতত সেখানেই থাকবে”।
কর্নেল হামিদ ধানমন্ডি বত্রিশে পৌঁছানোর আগেই শেখ পরিবারের সকলের লাশ কাফনে মুড়িয়ে সাপ্লাই ব্যাটালিয়নের ট্রাকে তুলে দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মেজর হুদা। শুধু শেখ মুজিবের লাশ কাফনে মুড়িয়ে করে বারান্দার এক কোণে ফেলে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু দেখা গেলো সেটা ছিলো শেখ নাসেরের লাশ। সেখানে তারা শেখ মুজিব ও শেখ নাসেরের লাশ গড়মিল করে ফেলেছিল।
পরে রাতের অন্ধকারে ম্যাচ বক্সের কাঠি জ্বালিয়ে লাশের স্তুপ থেকে শেখ মুজিবের লাশ বের করে আলাদা করে রাখা হয়। তারপর মর্গ থেকে সেরনিয়াবাত ও শেখ মনির পরিবারের সবার লাশসহ শেখ পরিবারের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় বনানী গোরস্থানে। সেখানেই দাফন করা হয়।
১৬ই অগাস্ট সকালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রয়াত রাষ্ট্রপতিকে টুঙ্গিপাড়ায় দাফন করা হবে। দুপুর আড়াইটার দিকে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে শেখ মুজিবের মরদেহটি নিয়ে যাওয়া হয় টুঙ্গিপাড়ায়।
কর্নেল হামিদ লিখেছেন, হেলিকপ্টারের শব্দ শুনে সেখানে গ্রামবাসী আগেই পালিয়ে যায়। মেজর মহিউদ্দীন পুলিশের সহায়তায় ১৫ থেকে ২০ জনকে জড়ো করতে পেরেছিলেন জানাজার জন্য। তিনি বলেছেন, তিনি শেখ মুজিবের মরদেহে ১৮টি বুলেটের ক্ষত দেখেছিলেন।
“...শেষ বিদায় জানাতে যেকোনো কারণেই হোক, টুঙ্গীপাড়ার লোকজন সেদিন ভিড় করেনি,” লিখেছেন কর্নেল এম এ হামিদ।