ভেনিসের অধিকাংশ রাস্তায় ট্রাফিক বাতি নেই। আপনি জেব্রা ক্রসিংয়ে হাঁটা শুরু করবেন চালকের দায়িত্ব গাড়ি থামিয়ে আপনাকে যেতে দেওয়া। এমনকি আপনি রাস্তা পারাপারের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন, চালক সেটা দেখে নিজে থেকেই আপনাকে আগে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে। লন্ডন, প্যারিস বা বার্লিনের মতো লাল-সবুজ বাতির কড়াকড়ি এখানে দেখিনি। যেখানে বাতি আছে, সেখানে নিয়ম মেনেই সবাই চলাচল করে। তবে এখানে পথচারীর গুরুত্ব সবার আগে। আমাদের দেশে হলে গাড়ির চালক পারলে পথচারীর ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিতে চায়। এক বাসচালক তো ইচ্ছা করেই চাপা দিয়ে মানুষ মেরে ফেলেছিল। প্রতিবাদে সড়ক আন্দোলন হলো। তাতে দেশের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? আমাদের দেশের মানুষ এমন কেন? আমি দিনরাত এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। উগ্র, অসভ্য আর যুক্তি বোঝে না। এর কারণ অনুসন্ধানে আমি কিছু বিষয় পেয়েছি, তবে তা নিয়ে এখানে আর আলাপ করবো না। বরং বলি উৎসবের সপ্তম দিনের কথা।
এদিন সকাল ৯টায় আমার দেখার কথা রয়েছে জাপানের বিশ্বখ্যাত পরিচালক হিরোকাজু কোরিয়েদা পরিচালিত ‘লুক ব্যাক’ ছবিটি। এটি মূল প্রতিযোগিতায় থাকা ছবি। এই ছবি দেখানো হবে ‘পালাবিয়েনালে’তে, এটি মূল ভেনুর বাইরে, ছয়-সাত মিনিটের হাঁটা পথ। ফেস্টিভালের বাস যেখানে থামায় সেখান থেকে হেঁটে যেতে মোটামুটি কুড়ি মিনিটের বেশি লাগে যায়। একে তো সকালবেলার স্ক্রিনিং, তার উপর কাল বাস ও লঞ্চ দুটোই দেরি করেছে, উপরন্তু অনেকখানি হেঁটে যেতে হয়, সব মিলিয়ে আমার কয়েক মিনিট দেরি হয়ে যায়। তবে ঢুকে ছবি দেখা শুরু করে বুঝলাম বেশি দূর যায়নি ছবি। কোরিয়েদার ছবি আমি আগেও দেখেছি, ‘নোবডি নোউজ’, ‘শপলিফটার্স’ ইত্যাদি, তার কাজ আমার ভালো লাগে। মানবিক সম্পর্কের গল্প তিনি বেশ মৃদুস্বরে বলতে পারেন।
ভেনিস ’৮৩ প্রতিযোগিতায় থাকা ‘লুক ব্যাক’ ছবিটি দুই কিশোরীর সত্যিকারের জীবন নিয়ে। একজন ফুজিনো, যে স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে সে বিখ্যাত মাঙ্গা আর্টিস্ট হবে। আরেকজন কিয়োমতো, তার ইচ্ছা বড় শিল্পী হওয়ার। তো এই দুই মেধাবী কিশোরী একসাথে মাঙ্গা আঁকা শুরু করে। কিয়োমতো ব্যাকগ্রাউন্ড আঁকে, আর ফুজিনো নিজের গল্পের ছকে আঁকে চরিত্রগুলোকে। এরা এক দারুণ জুটি। প্রায় এক বছর ধরে একটি মাঙ্গা এঁকে ও লিখে তারা বড় শহরে পাবলিশিং হাউজের কাছে যায় এবং সেখানে শুধু ইতিবাচক সাড়া নয়, পরবর্তী মাঙ্গা সংগ্রহে স্থানও পেয়ে যায় তারা। ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা দুই শিল্পীর নামডাক ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এর ভেতর কিয়োমতো আরো শেখার জন্য আর্টস্কুলে চলে যায়। ফুজিনো এতে কিছুটা মর্মাহত হয়। কিন্তু সে একাই চালিয়ে নিয়ে যায় মাঙ্গার বিভিন্ন সিরিজ। জনপ্রিয়তা সে পায়, কিন্তু কিয়োমতোর সঙ্গ তার খুব মনে পড়ে।
একই নামের মাঙ্গা থেকে নির্মিত এই চলচ্চিত্র মূলত বন্ধুত্বের কথা বলে, দুই কিশোরীর এক যৌথ শিল্পচর্চার কথা বলে। চলচ্চিত্রে তাদের ছবি আঁকার মুহূর্তকে আলোর রেখা দিয়ে, পেন্সিলের দাগ টানার শব্দ দিয়ে যেভাবে ধরা হয়েছে তা অপূর্ব।
কোরিয়েদার ছবি শেষ করলাম, পরবর্তী ছবি আরেকজন বিখ্যাত পরিচালকের। চিত্রনাট্যের জন্য অস্কার পাওয়া ফ্লোরিয়ান জিলারের ছবি ‘বাঙ্কার’। ছবিতে অভিনয় করেছেন হাভিয়ার বারডেম, পেনিলোপে ক্রুজ সহ আরো অনেকে। হাভিয়ার আর পেনিলোপের জুটি এমনিতেই বেশ বিখ্যাত। তো তাদেরকে এবার দেখা যায় সাইকোলজিকাল থ্রিলারে। হাভিয়ারের চরিত্রটির নাম মিগুয়েল, আর পেনিলোপের চরিত্রের নাম সোফিয়া। মিগুয়েল পুরস্কারজয়ী স্থপতি এবং তার স্ত্রী সোফিয়া বই প্রকাশনা শিল্পের সাথে জড়িত, অনুবাদ বিশেষজ্ঞ। তাদের ১৭ বছরের দাম্পত্য জীবন বন্ধুমহলে সমাদৃত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক সাগর দূরত্ব। মিগুয়েল কাজ নিয়ে ব্যস্ত, সোফিয়া নিজের অস্তিত্বের কাছে বন্দী। সোফিয়া স্বামী মিগুয়েলের ভেতর সেই আগের মানুষটির খোঁজ করে। মিগুয়েল শঙ্কায় থাকে সোফিয়া আর তাকে ভালোবাসছে কি না, তা নিয়ে।
গোটা ছবিতে একটা বিষয় খুব মজার লেগেছে, ভুল থেকে ভালো কিছু হতে পারে, সেটা ঘুরেফিরে এসেছে। প্রথমেই দর্শক জানতে পারে মিগুয়েল ও সোফিয়ার প্রেমের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল সেই গল্প। তরুণ বয়সে সোফিয়ার কথা শুনে মিগুয়েল নাকি কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিল। সোফিয়া ভেবেছে মানুষটা কত সংবেদনশীল হতে পারে। আসলে মিগুয়েলের বিড়ালে এলার্জি রয়েছে। সোফিয়ার বিড়াল ছিল। সেই বিড়াল বারবার মিগুয়েলের গায়ে গা ঘষছিল বলে এলার্জি থেকে চোখ থেকে পানি পড়ছিল। এটা শুনে বন্ধুরা তো সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে। কিন্তু পরক্ষণেই মিগুয়েল যে বলে বিয়ের পর তাদের বাসায় তিনটি বিড়াল ছিল, সেখান থেকেই বোঝা যায় দাম্পত্যজীবন কী। শুধু তাই নয়, মিগুয়েলের কারণে সোফিয়াও মাদ্রিদের ক্যারিয়ার ছেড়ে চলে আসে লন্ডনে। অত্যন্ত সুলিখিত চিত্রনাট্য, অনেকটা জ্যামিতিক ছকের মতো। তবে বেশিরভাগ সময়েই বোঝা যাচ্ছিল গল্প কোনদিকে যাবে। তারপরও একটি চমৎকার দাম্পত্যের গল্প রয়েছে এখানে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্থাপনের গল্প রয়েছে। মিগুয়েল তো স্থপতি, তো তার ভাষায় বাঙ্কার বানানোর জন্য মাটি না খুঁড়ে, উপরের স্থাপনায় জানালা বানাও। এতে সম্পর্ক সুস্থ থাকবে। ছবির ছোট একটি প্লটে মিগুয়েলের কাছে এক কোটিপতি লোক আসে তাকে বাঙ্কার বানিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে। পরে মিগুয়েল তাকে বলে, এই বাঙ্কার বানালেই কী আর না বানালেই কী। আমরা কেউই তো থাকবো না। এত আয়োজন আসলে শেষ পর্যন্ত মিছা মায়া।
মুগ্ধতা নিয়ে বেরিয়ে এলাম। এই ছবিটিও ভেনিসের মূল প্রতিযোগিতায় আছে। মানে এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগে যে কী হবে! একটির সাথে আরেকটি পাল্লা দিচ্ছে, সমানে সমান। দারুণ দারুণ সব কাজ এবার কিউরেট করেছে উৎসব কর্তৃপক্ষ। যাক, দুপুরের খাওয়াদাওয়া সারলাম। এরপর যে ছবিটি দেখলাম, সেটিও এক অসাধারণ ছবি।
বাংলাদেশের ছবি যে বিভাগে, সেই ওরিৎজন্তিতে থাকা ছবিটা দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। এতটাই সুনিপুণ করে গল্পটা বুনেছেন পরিচালক তমাসসো লানদুচি। ইতালীয় ছবিটির নাম ‘চিলড্রেন অব দ্য মাংকি’। এটি একজন বাবার গল্প। যে আবার একই সাথে কারো স্বামী, কারো ছোট ভাই। যার নিজেরও ছিলো ইচ্ছাপূরণের কিছু স্বপ্ন।
মূল চরিত্রের নাম দারিও। তার সন্তান প্রতিবন্ধী। বিকলাঙ্গ পুত্রটি পুরোপুরি নির্ভরশীল বাবা-মায়ের ওপর। গোসল করানো থেকে শুরু করে সাঁতারের ক্লাসে নিয়ে যাওয়া প্রায় সবটাই করে বাবা দারিও। কিন্তু আমরা এও দেখি দারিওর বড় ভাইয়ের কিশোর ছেলে, ভাস্তের সাথে পিতৃসুলভ সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। সুস্থ, সবল ও মেধাবী ভ্রাতষ্পুত্রের ভেতর দারিও যেন নিজের সন্তানকে খুঁজে পেতে চায়। তার সন্তানও যদি এমন স্বাভাবিক হতো! দারিও অসম্ভব স্নেহ করে এই কিশোরটিকে। তাকে পিতৃস্নেহ শুধু নয়, বন্ধুর মতো সঙ্গ দেয়। ভাস্তের প্রতি পিতৃত্ব আরোপ করতে গিয়ে নিজের প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রতি কিছুটা মনোযোগ হারিয়ে ফেলে দারিও। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার অনুশোচনা হয়। নিজের বাচ্চার কাছে সে দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু প্রতিবন্ধী বাচ্চাটা কি আর সেটি বোঝে? সে নির্মল চোখে হাসতে থাকে। দারিওর চোখ থেকে নেমে আসে অশ্রুধারা। কী সহজ-সরল, কিন্তু কি শক্তিশালী চলচ্চিত্র!
ছবিটি সম্পর্কে পরিচালক লানদুচি বলেন, “ছবিটির নামকরণ করা হয়েছে ঈশপের একটি নীতিগল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। গল্পটিতে একটি বানরের দুটি শাবক ছিল, কিন্তু সে তার প্রিয় শাবকটিকেই শুধু ভালোবাসত ও খাওয়াত, অন্যটিকে অবহেলা করত। তবে এখানে গল্পটি এমন এক অভিভাবককে নিয়ে, যিনি দুই ‘সন্তানের’ মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত: একজন বাস্তব সন্তান, অন্যজন তার কল্পিত আদর্শ সন্তান। এমন এক দ্বন্দ্বের ভেতর উপস্থিত হয় উদারতা ও স্বার্থপরতা। ভালোবাসা ও আকাঙ্ক্ষা।”
কোনো বাবা-মাই আসলে প্রতিবন্ধী সন্তান চান না। সন্তান আসার আগে বাবা-মা এমন ভাবনাকে রীতিমতো অপরাধ ভাবেন। কিন্তু যে ঘরে প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম নেয়, সেই ঘরে কি তারা বাবা-মায়ের ভালোবাসা পায় না? একশভাগ পায়। বরং আরো বেশি নজর পায়, যত্ন পায়। তবে তার পেছনে থাকে দীর্ঘশ্বাস ও চাপা কষ্ট। তারা যখন অন্যদের সুস্থ বাচ্চা দেখে তখন তাদের বুকের ভেতর শূন্যতা বেজে ওঠে করুণ শঙ্খের মতো। এই ছবিটি একজন বাবার সেই করুণ সুরটাকে ধরার চেষ্টা করেছে।
তিনটা ছবি দেখতে দেখতে বিকাল সাড়ে চারটা বেজে গেছে। প্রেস এরিয়াতে গিয়ে বসলাম। ‘এখন’ টিভি থেকে তুষার আব্দুল্লাহ ভাই যোগাযোগ করলেন, ইন্টারভিউ দিতে হবে লাইভে। কিন্তু সেই লাইভ আর দেওয়া হয়নি। যান্ত্রিক ত্রুটি বা অদক্ষতার কারণে ওরা আমাকে কানেক্ট করতে পারলো না। যাক ভালোই হলো, এদিকে ‘দি ডিফিকাল্ট ব্রাইডে’র মূল চরিত্রে অভিনয় করা জাইনিন চৌধুরী এসে বসে আছেন। তার ইন্টারভিউ করবো আলাপ-এর জন্য। জাইনিনকে দেখে ভালো লাগলো। খুবই প্রাণবন্ত মানুষ। আমরা গল্প করার ভেতরেই ইন্টারভিউ করে নিলাম। এরপর ও বিদায় নিয়ে চলে গেলো, কী একটা ছবি দেখবে। আমিও রওনা দিলাম লিডোর লঞ্চঘাটের দিকে।
লঞ্চের জন্য অপেক্ষা করছি। দেখি দিগন্তে সূর্য ডুবুডুবু। পড়ন্ত বিকেলের কমলা রঙের রোদ ছড়িয়ে পড়ছে হ্রদের মৃদু তরঙ্গ তোলা জলে। আমি গুণগুণ করে গেয়ে উঠলাম গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গান: “সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক বেশ তো/ গোধূলির রঙে হবে এ ধরণী স্বপ্নের দেশ তো।/ তারপরে পৃথিবীতে আঁধারের ধূপছায়া নামবেই/ মৌমাছি ফিরে গেলে জানি তার গুঞ্জন থামবেই;/ সে আঁধার নামুক না, গুঞ্জন থামুক না/ কানে তবু রবে তার রেশ তো।”
আজকের দিনে দেখা চমৎকার সব চলচ্চিত্রের রেশ নিয়ে উঠে বসলাম জলযানে। গ্র্যান্ড ক্যানাল পাড়ি দিবো।