সুয়েজে ব্রিটেনের পতন, হরমুজে কি আমেরিকার পালা

সুয়েজ সংকটে ব্রিটেন সামরিকভাবে সফল হলেও অর্থনৈতিক চাপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কারণে পিছু হটে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব হারায়। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ঘিরে একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিশ্ব ধীরে ধীরে একক আধিপত্যের পরিবর্তে বহুকেন্দ্রিক শক্তি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে একাধিক শক্তি বিশ্বব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে।

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৬ এএম

সুয়েজ খাল থেকে হরমুজ প্রণালি। অর্ধ শতক পর আবারও প্রায় একইরকম রাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে বিশ্ব। সুয়েজ খাল যেভাবে ডেকে এনেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন, একইভাবে হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠেছে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট।

সেই রুটেই যেন আটকে গেছে মহাপরাক্রমশালী আমেরিকা। ইরান যুদ্ধে তেহরানের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হরমুজ প্রণালিতে বিশ্বজুড়ে চাপের মুখে পড়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। 

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন এ যেন ‘দেজা ভ্যু’ অর্থাৎ এটি যেন আগের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। শুধু সময় আর চরিত্রগুলো বদলে গেছে।

ইতিহাস বলে যখন কোনো সাম্রাজ্য রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে সামরিক শক্তির ওপর বেশি নির্ভর করে তখন তার অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। যারা দমনচেষ্টার শিকার হয়, তারাই বরং ঘুরে দাঁড়ায়। পতনের দিকে যেতে থাকে সাম্রাজ্য।

মিশর যখন ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করে সেটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য এমনই একটি বড় মোড় ছিল। সেসময় বের হয়ে আসে ব্রিটেন কতটা আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডের দর পড়ে যায় আর শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনকে পিছু হটতে হয়। 

প্রায় ৭০ বছর পর, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা বাড়ছে, তা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাবের জন্য একই রকম একটি মুহূর্ত হতে পারে।

ঘটনা দুটি আলাদা হলেও, এর প্রভাব হয়তো একই ফল নিয়ে আসতে পারে বলে বলছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দুই ক্ষেত্রেই একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য এমন একটি আঞ্চলিক শক্তির মুখোমুখি হয়েছে, যারা মাথা নত করতে রাজি নয়।

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র পালটে দেওয়া সুয়েজ সংকট

হরমুজ প্রণালি সংকটের সাথে সুয়েজ খালের ঘটনার মিল দেখার আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। 

মিশরের ভেতর দিয়ে বিস্তৃত প্রায় ১৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সুয়েজ খাল লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। 

সাড়ে সাতশ ফিটেরও কম প্রস্থের এই খাল ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজগুলি আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ‘কেপ অফ গুড হোপ’ ঘুরে না এসে সহজে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ করতে পারে। 

ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্যমতে, সুয়েজ খাল দিয়ে যাত্রা করতে একটি জাহাজের প্রায় ১৯ দিন সময় লাগে। কিন্তু ‘কেপ অফ গুড হোপ’ বা উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে সময় লাগে প্রায় ৩৪ দিন। আর তাই সুয়েজ খাল বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

ব্রিটিশদের জন্য সুয়েজ খাল ছিল ‘লাইফলাইন’। তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল ভারত। এই খাল ব্যবহার করে তারা ভারতে দ্রুত সৈন্য, পণ্য ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারত। তাই ধীরে ধীরে ব্রিটেন এই খালের ওপর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

সুয়েজ খালের খনন শুরু হয় ১৮৫৯ সালে। তখন মিশর ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে এবং অর্থনৈতিক অবস্থাও ছিল দুর্বল। 

মিশরের শ্রম ও অর্থ ব্যবহার হলেও পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয় একটি ফরাসি কোম্পানির হাতে, দ্য সুয়েজ ক্যানাল কোম্পানি । অর্থাৎ, সুয়েজের উপর মিশরের নিয়ন্ত্রণ ছিল না কখনোই।

সুয়েজ খালের কারণে ঋণে ডুবে যায় মিশর। সেই সংকট মোকাবিলা করতে ১৮৭৫ সালে মিশরের শাসক খেদিভ ইসমাইল পাশা সুয়েজের ৪৪ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করেন। 

সেই সুযোগ হাতছাড়া করেনি ব্রিটিশরা। সুয়েজের বিশাল সেই অংশ কিনে নেয় তারা। আর সেখান থেকেই ব্রিটেনের প্রভাব বিস্তারের শুরু। 

১৮৮২ সালের ‘উরাবী আন্দোলনে’ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদ্রোহ সৃষ্টি হলে, যুক্তরাজ্য সেনা পাঠিয়ে মিশর দখল করে। পুরো অঞ্চলই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নামে স্বাধীন থাকলেও মিশরের সকল নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশদের হাতেই।  

ব্রিটেন তখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য। আর কৌশলগত কারণেই সুয়েজ খাল ছিল তাদের জন্য অমূল্য।

সুয়েজের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ মানে শুধুই নিজেদের উপনিবেশগুলোর সাথে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সহজ উপায় না। বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখার জন্যও একটা বড় হাতিয়ার। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর পঞ্চাশের দশক থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে বদল দেখা দিতে শুরু করে। বিভিন্ন উপনিবেশগুলো একে একে স্বাধীন হচ্ছিল। সেসময় আরব জাতীয়তাবাদী নেতা ও মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দেল নাসের নিজ দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। 

১৯৫৬ সালে নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দেন অর্থাৎ ব্রিটিশ ও ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে তা মিশরের হাতে চলে যাবে।

এই সিদ্ধান্ত সরাসরি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে আঘাত হানে। ব্রিটেন ও ফ্রান্স সুয়েজ খাল থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পেত, তাছাড়া এটি হাতছাড়া হওয়া মানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব কমে যাওয়া ।

খাল পুনরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইসরায়েল গোপনে একটি পরিকল্পনা করে; প্রথমে ইসরায়েল মিশর আক্রমণ করবে। এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্স ‘শান্তিরক্ষার’ অজুহাতে হস্তক্ষেপ করবে। শেষ পর্যন্ত তারা সুয়েজ দখল করে নেবে। সে অনুযায়ী আক্রমণ শুরু হয় যা ‘সুয়েজ সংকট’ নামে পরিচিত।

ব্রিটিশ আধিপত্যের পতন

১৯৫৬ সালের জুলাইয়ে নাসের যখন সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন, তখন তিনি শুধু মিশরের সার্বভৌমত্বই প্রতিষ্ঠা করেননি। বরং মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধকলে দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিটেন ও ফ্রান্স, ইসরায়েলের সাথে মিলে মিশরে আক্রমণ করে। শুরুতে সামরিকভাবে সফলও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়। 

তিন দেশ মিলে হামলা চালানোর উদ্দেশ্য ছিল সুয়েজ খালের জাতীয়করণ বন্ধ করে নাসেরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা। 

সামরিক দিক থেকে অভিযানটি সফল ছিল। ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয় আর ইসরায়েল দখল নেয় সিনাই উপত্যকার। কিন্তু এই সামরিক সাফল্য রাজনৈতিক জয় বয়ে আনতে পারে নাই। 

মিশরীয় সেনাবাহিনী ও দেশটির সাধারণ মানুষের প্রতিরোধতো ছিলই তবে তার থেকেও গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ। 

এই দুই পরাশক্তি তখন বিশ্বব্যবস্থার মূল কেন্দ্রে ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার এই যুদ্ধের ঝুঁকি অনুমান করে ব্রিটেনকে সতর্ক করে, যুদ্ধ থেক বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন। 

কিন্তু তাতে কান দেয়নি যুক্তরাজ্য। আর তখন ওয়াশিংটন লন্ডনকে চাপে রাখার জন্য একটু ভিন্ন কৌশল নেয়। 

আইএমএফ-এর সাহায্য কমিয়ে দেওয়া হয়, চাপ সৃষ্টি হয় ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডের উপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় এমনিতে ধুঁকছিল যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি; আমদানির খরচ মেটাতে হিমশিম খাওয়া ব্রিটিশদের জন্য এই বাড়তি চাপ ছিল গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত। 

ব্রিটেন বাধ্য হয় পিছু হটতে, আক্রমণ ব্যর্থ হয়ে যায়। আর মিশরের নেতা নাসের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরও প্রভাবশালী আর প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। 

মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেনের প্রভাবের ইতি হয়। তার জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। 

তখন ব্রিটেন, এখন আমেরিকা

১৯৫৬ সালের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আর এখনকার যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশই আশেপাশের দেশগুলোর তুলনায় সামরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। তবুও তাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। যেমন, ১৯৫৬ সালে ব্রিটেন প্রচুর ঋণে ডুবে ছিল—২৭ বিলিয়ন পাউন্ড, আজকের দিনে যা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির শিল্পখাতও পিছিয়ে পড়ছিল আর বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতা বাড়ছিল। 

ঊনচল্লিশ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জাতীয় ঋণ আর আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় নিয়ে আজকের যুক্তরাষ্ট্রও একই সমস্যায়। 

অর্থনীতির এই অবস্থা নিঃসন্দেহে সারা পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে খর্ব করছে, বলে মিডল ইস্ট আই-তে এক নিবন্ধে লিখেছেন ফিলিস্তিনি লেখক সামি আল-আরিয়ান।

পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি ব্রিটেনের মতই, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এত জায়গায় ভাগ হয়ে থাকায়, শক্তি থাকলেও তারা সব জায়গায় নিজের মতো ফল আনতে পারছে না, বলে মনে করেন আল-আরিয়ান। 

তার মতে, রাজনৈতিক দিক থেকে ব্রিটেন তখনকার আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি এবং ভেবেছিল তারা সহজেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। 

“ব্যাপারটা শুধু তখন মিশর ছিল না, তার বাইরে থাকা বিভিন্ন শক্তি, আঞ্চলিক শক্তি এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী কাজ করছিল, তাই আর আগের মতো মিশরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না ব্রিটিশরা,” আল-আরিয়ান তার নিবন্ধে লিখেছেন।

সুয়েজ থেকে হরমুজ

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। তাই এখানে কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।

আল-আরিয়ানের মতে, ইরান এই পথকে বন্ধ করে রাখার হুমকি বা বন্ধ রাখতে পারে তার ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক শক্তি এবং কৌশলগত ক্ষমতার কারণে। তবে মিশরের মতো শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রভাব না, ইরানের আছে সামরিক শক্তিও। 

“ইরানের লক্ষ্য সবকিছু জেতা নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাকে হারাতে, সরকার বদলাতে বা দুর্বল করতে না পারে, তাহলে ইরানের প্রধান লক্ষ্য ‘টিকে থাকা’ যা তারা আগেই পূরণ করে ফেলেছে,” বলেন সামি আল আরিয়ান। 

রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক লেক্সি রিডের মতে, হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতিকে সুয়েজ সংকটের সঙ্গে তুলনা করা যায়। 

মডার্ন ডিপ্লোমেসিতে লেখা এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতির সাথে  সুয়েজ সংকটের মিল রয়েছে। তবে সামরিক পরাজয়ের দিক থেকে নয়, বরং বৈধতার সংকটের দিক থেকে। 

এই ধরনের সংকট পুরোনো ধারণা ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিতে বাধ্য করে, বলে মনে করেন রিড, যিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে পিএইচডি করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে। 

“এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীলতা এখন শুধু আঞ্চলিক বিষয় নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। যে পক্ষ এটি স্থিতিশীল রাখতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে বড় ভূমিকা নেবে,” তিনি বলেন। 

আমেরিকার সীমাবদ্ধতা

মিডল ইস্ট আই-এ লেখা তার প্রবন্ধে সামি আল আরিয়ান বলেছেন, আমেরিকা এখন এক কঠিন অবস্থায় আছে। যদি তারা সংঘর্ষ বাড়ায়, তাহলে তেলের দাম বাড়বে, বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি পিছিয়ে যায়, তাহলে তাদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

বিশ্ব রাজনীতিতে যদি আমেরিকার প্রভাব কমে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোও প্রভাব বাড়াতে পারে, কিন্তু এককভাবে কেউ পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না। যেমনটা হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পতনের সময়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে পরাশক্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু এবার আর তা হবে না।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। ইরান এখন পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ, বলে মনে করছেন ড. শেশাদ্রি কুমার, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক।

“তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পরাশক্তিকেও মোকাবিলা করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে,” মিডিয়াম-এ লেখা এক নিবন্ধে বলেছেন ড. কুমার।

তার মতে, যুদ্ধের কারণে যদি এই অঞ্চলের জ্বালানি সম্পদ নষ্টও হয়ে যায়, তবুও ইরান আবার তা গড়ে তুলতে পারবে। কিন্তু ইসরায়েল ও জিসিসি’র (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের) দেশগুলো লবণমুক্ত পানি তৈরির কারখানা ছাড়া টিকে থাকতে পারবে না।

ইউনিভার্সিটি অফ ইউটাহ এর এই অধ্যাপক মনে করছেন, ৫০-এর দশকে ব্রিটিশদের মতো, আমেরিকারও যদি এবার পরাজয় ঘটে, তাহলে ইউক্রেইনের দখল চলে যাবে রাশিয়ার কাছে অর্থাৎ এই যুদ্ধের ফয়সালা হয়ে যাবে। আর বলাই বাহুল্য বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি লাভ রাশিয়ার।

তার মতে, পৃথিবী এখন ইতিহাসের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে যখন একটি বড় সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে চলেছে। যেমন ৪৭৬ সালে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন, ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপলের পতন, অথবা  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন। তেমনই এখন আমেরিকার প্রভাব কমে যাওয়ার সময় চলছে।

 

মিডল ইস্ট আই, মর্ডান ডিপ্লোমেসি ও প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অবলম্বনে