সেরেনিসসিমায় আজ সিনেমার বড়দিন

ভেনিসের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনাতে রেখেই এমন নামে ডাকে সবাই। প্রকৃতির অপরূপ জলবেষ্টিত লিডো দ্বীপে এবার বসতে যাচ্ছে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসর।  

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম

“কহিলাম, ‘ওগো রানী,/ কত কবি এল চরণে তোমার উপহার দিল আনি।”

ইতালিতে আমি কবি হিসেবে আসিনি। এসেছি একজন চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে। আজ থেকে শতবর্ষ আগে ১৯২৫ সালে, প্রথমবারের মতো ইতালি সফরে এসে ‘ইটালিয়া’ কবিতাটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এরপর ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো ইতালি সফরে এসে মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন কবি। পরে সেই সফর নিয়ে অনেক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। কবির সমালোচিত সফরের ঠিক একশ বছর পর আমি এলাম ইতালিতে। যেন বাংলা ভাষার নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথের ইতালি সফরের শতবর্ষ উদযাপন করতেই আরেক বাংলা ভাষার লেখকের আগমন। এসেছি ইতালির অপরূপ শহর ভেনিসে। যার ঐতিহাসিক ডাকনাম ‘সেরেনিসসিমা’, অর্থ অত্যন্ত শান্ত ও নির্ঝঞ্ঝাট। ভেনিসের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনাতে রেখেই এমন নামে ডাকে সবাই। প্রকৃতির অপরূপ জলবেষ্টিত লিডো দ্বীপে এবার বসতে যাচ্ছে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসর।  

২রা সেপ্টেম্বর থেকে ১২ই সেপ্টেম্বর, এই এগারো দিনের উৎসবে এরই ভেতর অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা, কলাকুশলী, দর্শক, চলচ্চিত্র সমালোচক ও সাংবাদিক আসা শুরু করেছে। আমি সেপ্টেম্বরের পয়লা দিন মার্কো পোলো বিমান বন্দর থেকে বেরিয়ে একটি শাটল বাসে উঠেই সেটা বুঝতে পারলাম। যাবো মেস্ত্রে স্টেশন এলাকায়। সেখান থেকে সাত নাম্বার বাস ধরে আমার ভাড়া করা বাসায়। তো বিমান বন্দর থেকে বাসে ওঠার পরই দেখলাম এক যুবক, আমার মতোই লাগেজ ও ব্যাগ নিয়ে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে আছে বাসে। আমার অবস্থা দেখে যুবকটিই জায়গা করে দিলো আমাকে। আলাপে আলাপে জানা গেলো তিনি ‘টু মাচ সুগার’ ছবির সহকারী পরিচালক। এসেছেন সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। টুকটাক আলাপ হলো। এত ভিড়। বাকসো-পেটরা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুদ্ধের সামিল। ঘর্মাক্ত শরীরে সকলেই বাসের গতিজড়তা সামলাতে ব্যস্ত। প্রায় কুড়ি মিনিট পর বাসটি আমাদের মেস্ত্রে স্টেশনে নামিয়ে দিলে সেখান থেকে আমি হেঁটে চলে আসি শহরের ছোট আরেক বাসস্ট্যান্ডে। সাত নম্বর অথবা দশ নাম্বার বাসে উঠবো। যাবো পিয়েমন্তে এলাকায়। তবে বাসে উঠে দেখলাম বাস স্টপেজের নামের চেয়ে সবাই বেশি চেনে সেখানে থাকা কাদোরো সুপারমার্কেটকে। অনেক বাংলাদেশি। বাসে, রাস্তাঘাটে। এখানকার জাহাজ কারখানা ও বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় প্রচুর বাংলাদেশি কাজ করে। দুবাই থেকে ভেনিসে আসার পথেও আমার পাশের সহযাত্রী ছিলেন বাংলাদেশি প্রবাসী, যিনি ভেনিসের পাশে পাদুয়ায় থাকেন প্রায় একত্রিশ বছর ধরে। কারখানার শ্রমিক। সপরিবারে দেশে গিয়েছিলেন বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে। এক মাস থেকেছেন। ভেনিসের মাটিতে নামার আগে আগে ভদ্রলোক জানালেন বাংলাদেশের অবস্থা ভালো নেই। আমার মনে হলো তিনি নিজের পিতাকে শুধু কবরে শায়িত করে আসেননি, সাথে দেশটিও ছিলো।

কোনো দেশই ঝামেলামুক্ত নয়, তারপরও ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি উন্নত দেশগুলো রক্ষা করে চলেছে। ভেনিসে নামার পর থেকেই সেটা টের পাওয়া যায়। যাতায়াত ব্যবস্থা এত ভালো যে লাগেজ নিয়ে চলে আসা যায় গন্তব্যে। আশা করছি উৎসবের ভেন্যুতেও পৌঁছে যাওয়া যাবে সহজেই। যদিও আমি একটু দূরেই বাসা ভাড়া নিয়েছি। কিরিনিয়াগো-জেলারিনো এলাকার ভিয়া তসকানা পাড়ার দুই নাম্বার বাড়ি। এখান থেকে স্থল ও জলের বাসে করে পৌঁছুতে হবে চলচ্চিত্র উৎসবে। এই উৎসবটিতে আমার আসার ইচ্ছা অনেকদিন ধরেই ছিলো। এবার সেই সুযোগ হলো আসার।

ভেনিস-থেকে-বিধান-রিবেরু

ভেনিস দুনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো চলচ্চিত্র উৎসব। এর একটি পোশাকি নাম আছে। যথেষ্ট খটোমটো, তারপরও জেনে নেওয়া যাক: ‘মোস্ত্রা ইন্তারনাতসিওনালে দারতে চিনেহমাতোগ্রাফিকা দেল্লা বিয়েনালে দি ভেনেৎসিয়া’, যার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় ভেনিস বিয়েনালের সিনেমাটোগ্রাফিক আর্টের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। ‘ভেনিস বিয়েনালে’ হলো শিল্পের প্রদর্শনী ও উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠান, যেখানে এই চলচ্চিত্র উৎসবও অন্তর্ভুক্ত। ভেনিস বিয়েনালে শুরু হয়েছিল ১৮৯৫ সালে। আয়োজনের মূলমন্ত্র ছিলো দেশ ও জাতির ঊর্ধ্বে গোটা বিশ্বে যে ধরনের আধুনিক শিল্পচর্চা হচ্ছে সেগুলো সকলের সামনে একসাথে তুলে ধরা। দুই বছর অন্তর অন্তর হতো বলে বিয়েনালে। শুরুটা হয়েছিল চিত্রকলা দিয়ে।

পরে ১৯৩০ সালে বিয়েনালেতে সম্পৃক্ত হয় সমকালীন সঙ্গীত উৎসব। ১৯৩২ সালে ভেনিসের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক আয়োজনে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, এটিই ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব নামে পরিচিতি পায়। এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৩০ সাল থেকেই বিয়েনালের কর্তৃত্ব চলে যায় বেনিতো মুসোলিনির হাতে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থার সুযোগ নিয়ে উত্থান ঘটে মুসোলিনির। আন্দোলনের মুখে ১৯২২ সালে মুসোলিনিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী বানাতে বাধ্য হন রাজা ভিক্তর ইমানুয়েল। প্রধানমন্ত্রী হলেও কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা দিয়ে তিনি দেশ চালান আঠারো মাস। এরপর ১৯২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায় এবং নিজেদের সরকার গঠন করে। এর পরপরই প্রকাশিত হয় তাদের কদর্য চেহারা। কমিউনিস্ট ও সোশালিস্ট দলের ওপর দমনপীড়ন শুধু নয়, একে একে অবৈধ ঘোষণা করা হয় বিরোধী দল ও পত্রপত্রিকা। ১৯২৫ সালে সংসদে দাঁড়িয়ে মুসোলিনি বলেছিলেন, “ফ্যাসিবাদ যদি এক অপরাধী ষড়যন্ত্র হয়, তবে আমিই তার প্রধান ষড়যন্ত্রকারী।”

১৯২৬ সালে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আন্তোনিও গ্রামশিকে বিনা কারণে গ্রেফতার করে বন্দী করা হয় কারাগারে।

ফ্যাসিস্ট সরকারের নানাবিধ নীপিড়নমূলক কর্মকাণ্ডকে কার্পেটের নিচে লুকিয়ে ফেলার নিমিত্তে মুসোলিনি শিল্প-সংস্কৃতি, খেলাধূলা, গণমাধ্যম ও স্থাপত্যকলায় ব্যাপক বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন শিল্প ও সংস্কৃতিতে ইতালি সর্বশ্রেষ্ঠ। দেশের ভেতর স্বৈরশাসন চললেও, তিনি চেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতালির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। আর এই মিশনে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন চলচ্চিত্রকে। ফ্যাসিস্ট এই নেতা মনে করতেন “চলচ্চিত্র হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র”। তার এই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সূচনালগ্নে। ত্রিশের দশকে হলিউড যখন দাপটের সাথে এগিয়ে চলেছে ঠিক তখন মুসোলিনি ইউরোপের ভেতর শুধু নয়, গোটা বিশ্বের নজর কাড়তে চলচ্চিত্রকে ‘কোমল কূটনীতি’ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। পুরো দুনিয়া থেকে সেরা তারকা, পরিচালক, প্রযোজক, সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ করে মুসোলিনি ভেনিস উৎসবকে পরিণত করেন সাংস্কৃতিক কূটনীতির পরাকাষ্ঠায়। এর ভেতর দিয়ে দেশের ভেতরেও সম্মতি উৎপাদনের কাজটি সেরে নিচ্ছিল ফ্যাসিস্ট সরকার।  

বিভিন্ন দেশের শিল্পমানসম্মত চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মুসোলিনি যে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা চালাতে শুরু করেছিলেন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের মাধ্যমে, সেটি বুঝতে কারো বাকি থাকেনি। তারপরও, উৎসবটি বিশ্বের বুকে অত্যন্ত ঔজ্জ্বল্য নিয়ে বিরাজ করছে, কারণ আজ যত চলচ্চিত্র উৎসব দেখা যায়, এমনকি কান চলচ্চিত্র উৎসব, সেটিও এই ভেনিসের ধারণা ও সীমাবদ্ধতা থেকেই উৎসারিত। যদিও ১৯৩২ সালের প্রথম আসরে ছিলো না কোনো প্রতিযোগিতা। সে বছর ইতালির লিডো দ্বীপে হোটেল এক্সেলসিয়রে ৬ থেকে ২১ অগাস্ট পর্যন্ত উৎসব চলে। উদ্বোধনী সন্ধ্যায় দেখানো হয় রুবেন মাম্যুলিয়ানের ‘ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড’ ছবিটি। প্রথম আসরে ভেনিসে দেখানো হয় ছয়টি দেশের মোট ৪০টি চলচ্চিত্র। ১৯৩৫ সাল থেকে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব পরিণত হয় বাৎসরিক আয়োজনে।

তবে এর আগের বছর, ১৯৩৪ সালে, মুসোলিনির রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির কারণে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে চালু হয় প্রতিযোগিতা বিভাগ। কিছুদিনের ভেতরেই পুরস্কার প্রদানে ফ্যাসিবাদী রাজনীতি ও তাদের দোসর হিটলারের জার্মানিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। প্রবর্তিত হয় মুসোলিনির নামে সর্বোচ্চ পুরস্কার। ইতালীয় ও বিদেশি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কারের নাম দেওয়া হয় ‘কোপা মুসোলিনি’ বা মুসোলিনি কাপ। পুরস্কারের নাম ও পুরস্কৃতদের কারণে উৎসবটি ক্রমাগতই সমালোচনার মুখে পড়ছিল। মেধা বা শিল্পের বিবেচনা নয়, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতাই হয়ে উঠছিল ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদান করা পুরস্কারের একমাত্র নিয়ামক। উৎসবকে ক্রমাগত রাজনৈতিক কোটারিভুক্ত করে ফেলার কারণে ফ্রান্স সিদ্ধান্ত নেয় ভেনিসে আর নয়। তারাও আলাদা একটি উৎসব করবে, কানে। ১৯৩৯ সালে সেটি শুরুর কথা থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তা স্থগিত হয়ে যায় এবং যুদ্ধ থামার পর ১৯৪৬ সাল থেকে কান চলচ্চিত্র উৎসব নিয়মিত বিরতিতে হয়ে আসছে।

ওদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির লজ্জাজনক পরাজয়ের ভেতর দিয়ে মুসোলিনিও পরাভূত হন, পরিসমাপ্তি ঘটে একটি অন্ধকার অধ্যায়ের। এরপর থেকে গণতান্ত্রিক আবহাওয়ায় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজিত হতে শুরু করে। একদিকে ফ্যাসিবাদের ছায়া থেকে মুক্ত হচ্ছিল চলচ্চিত্র উৎসব, অপরদিকে ইতালিতে তৈরি হচ্ছিল বিশ্ব চলচ্চিত্রের নতুন ইতিহাস। শুরুটা ১৯৪৩ সালে লুচিনো ভিসকন্তি নির্মিত “ওসিসিয়োনে” দিয়ে।

আমি বলছি ইতালীয় নব্যবাস্তববাদী চলচ্চিত্রের কথা। আমরা এই ধারার চলচ্চিত্রের ভেতর পেলাম রোবের্তো রোজেলিনির “রোম, ওপেন সিটি” (১৯৪৫) ও ভিত্তরিও ডি-সিকা বানালেন “বাইসাইকেল থিভস” (১৯৪৮)। ভিসকন্তির আরো একটি ছবি মুক্তি পেলো ১৯৪৮ সালেই, “লা টেরা ট্রিমা”। সবগুলো ছবিই ইতালির সাধারণ মানুষের দারিদ্রের কথা বলেছে, অসহায়ত্বের কথা বলেছে। তারা চলচ্চিত্রকে নিয়ে গিয়েছিল স্টুডিওর বাইরে। আটপৌরে জীবনের ভেতর আর্থিক অনটনের কাহিনি ফুটিয়ে তুলতে তারা কোনো তারকার উপর নির্ভর করেননি, আস্থা রেখেছেন অপেশাদার বা কম পরিচিতি অভিনয়শিল্পীদের উপর। সেসময়ের কথা মনে করে ডি-সিকা বলেছিলেন: “আমাদের ক্যামেরা তখন স্থাপন করা হয়েছিল বাস্তব-জীবনের মর্মমূলে, ক্যামেরা ধরে রাখছে সেই সব দৃশ্য যা তখন আমাদের চোখকে করছে বিস্ময়াবিষ্ট।”

ইতালির নিওরিয়েলিজম যখন মধ্যগগণে, তখন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিকভাবে আরো গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ। বাদ দেওয়া হয় ‘কোপা মুসোলিনি’ পুরস্কার, তার পরিবর্তে ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে দেওয়া হয় ‘গ্র্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ অব ভেনিস’। পরের বছর ১৯৪৯ সালে গ্র্যান্ড প্রাইজের বদলে প্রবর্তন করা হয় ‘গোল্ডেন লায়ন’। বর্তমানে বিশ্ব চলচ্চিত্রে ‘সোনালি সিংহে’র কি দাপট, তা আর আলাদা করে বলার কিছু নেই।

এশিয়ার বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রকে বিশ্ব দরবারে পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ‘গোল্ডেন লায়নে’র ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভেনিসে পুরস্কৃত হয়েছিল বলেই ভারত, জাপান, ইরানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ছবি সম্পর্কে গোটা দুনিয়া আরো ভালো করে জানতে পারে। যেমন ১৯৫১ সালে পুরস্কৃত হলো আকিরা কুরোসাওয়া পরিচালিত ‘রশোমন’ (জাপান), ১৯৫৭ সালে পুরস্কার পেল সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’ (ভারত), ১৯৯২ সালে পুরস্কৃত হলো ঝ্যাং ইয়ামুর ‘দ্য স্টোরি অব চিও জ্যু’ (চীন), ২০০০ সালে পুরস্কায় পায় জাফর পানাহির ‘দ্য সার্কেল’ (২০০০), ২০১২ সালে পুরস্কৃত হয় কিম কি দুকের ‘পিয়েতা’ (দক্ষিণ কোরিয়া), ২০১৬ সালে পুরস্কার পায় লাভ ডিয়াজের ‘দ্য ওম্যান হু লেফট’ (ফিলিপাইন) ইতি ও আদি। আনন্দের বিষয় এবছর লাভ দিয়াজের নতুন ছবি ‘লেট আস থ্রু, ডিয়ার এনসেসটর্স’ দেখানো হবে ভেনিস উৎসবে। অবশ্য ছবিটি প্রতিযোগিতা করবে না অন্য ছবির সঙ্গে।     

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব যে বছর থেকে প্রতিযোগিতা বিভাগ শুরু করলো, সেই ১৯৩৪ সালে বিয়েনালে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চলচ্চিত্রের মতো ভেনিস নাট্য উৎসবও হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক পরিসরে এক অতি পরিচিত ও সমাদৃত নাম। পরে ১৯৯৮ সালে বিয়েনালে যুক্ত হয় নৃত্য ও স্থাপত্যকলা। অর্থাৎ এই ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের আগে পরে এবং চলাকালীন শিল্পকলার অনেক আয়োজন চলতে থাকে। যেমন আমাকে পাঠানো হয়েছে চিত্রকলা প্রদর্শনী ও সঙ্গীত উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র। সময় পেলে যাবো।

আমার নজর মূলত থাকবে চলচ্চিত্র উৎসবের ‘ওরিৎজন্তি’ বা হরাইজন বিভাগের দিকে। এর কারণ এই বিভাগেই প্রথমবারের মতো স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ছবিটি প্রতিযোগিতা করবে আরো এক বাঙালি পরিচালকের ছবির সঙ্গে। ভারতীয় বাঙালি অনুপর্ণা রায়ের ছবিটির নাম ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’। অনুপর্ণা আগের বছর, অর্থাৎ ৮২তম আয়োজনে এই হরাইজন বিভাগ থেকেই সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছিলেন ‘সংস অব ফরগটেন ট্রিজে’র জন্য। শুধু অনুপর্ণা নয়, আরো বহুদেশ থেকেই মোট উনিশটি ছবি রয়েছে এই বিভাগে। শুনেছি প্রতিটি ছবিই নাকি পাল্লা দেওয়ার মতো। দেখা যাক বাংলাদেশের ভাগ্যে কী রয়েছে।

আমার উৎসব শুরু হবে ড্যানি বয়েলের ‘ইংক’ ছবি দেখার মধ্য দিয়ে। ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’খ্যাত ড্যানি বয়েল সাত বছর পর ফিরছেন নতুন ছবি নিয়ে। আশা করি মন্দ হবে না। অবশ্য মন্দ হলেও সমস্যা নেই। উৎসব তো কেবল শুরু। নিশ্চয় চমৎকার সব চলচ্চিত্র অপেক্ষা করছে আমার জন্য। ইতালিতে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে: ‘ফিনকে চে ভিতা চে স্পেরানজা’ (Finché c’è vita c’è speranza), বাংলায় তর্জমা দাঁড়ায়: ‘যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ’। কাজেই যতক্ষণ উৎসব চলবে আমি ভালো ছবি দেখার আশা ছাড়ছি না।