রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন? দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি দায়িত্ব ছাড়তে পারেন—এমন আলোচনা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মূলধারার গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপকভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বঙ্গভবন কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক সূত্রও রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্যের কথা স্বীকার করেননি।
দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের জন্য ইতিমধ্যে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।”
“খুব শিগগির রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করার সম্ভাবনা রয়েছে” সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে প্রথম আলো।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ একজন বলেছেন, জাতীয় সংসদের স্পিকারকে শিগগির চিঠি লিখবেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে ‘পদত্যাগের বিষয়টি’ তিনি তুলে ধরতে পারেন।
ওই প্রতিবেদনে আরও লেখা হয়েছে, “বঙ্গভবনের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাষ্ট্রপতি আমাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রায়ই বলেন, ‘শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, যে কোনো সময় যে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারি'।”
স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে যে, রাষ্ট্রপতি যদি সত্যিই পদত্যাগ করেন, তাহলে এরপর কী হবে? কে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন? নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কী? আর এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক তাৎপর্যই বা কতটা?
পদত্যাগের পর সংবিধানের হিসাব
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন বলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে।
এরপর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে শূন্য পদে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারেন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়া প্রার্থী রাষ্ট্রপতি হবেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে। এ ছাড়া সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য সংবিধানে নির্ধারিত যোগ্যতাগুলোও পূরণ করতে হবে।
নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নেবেন। শপথ নেওয়ার পরই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
চমক দিয়ে বঙ্গভবনে যাত্রা
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪এ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রক্রিয়াটি সে সময় অনেকের কাছেই ছিল চমকপ্রদ। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আমীর হোসেন আমু নিজে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বলে আলোচনা ছিল। তোফায়েল আহমেদের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসে। শেষ পর্যন্ত সবাইকে পেছনে ফেলে রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার রাজনৈতিক অবস্থানও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন—রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পর্যায়েই রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
তিন বছরের মধ্যে তিন ধরনের সরকারকে শপথ পড়ানোর ঘটনাও তার রাষ্ট্রপতি জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। ২০২৪ সালের ১১ই জানুয়ারি তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে শপথ পড়ান। একই বছরের ৮ই আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও তার কাছেই শপথ নেয়। এরপর ২০২৬ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভাকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন।
পদত্যাগের আলোচনা নতুন নয়
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তার পদত্যাগের দাবি উঠেছিল। একাধিক সংগঠন তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচিও পালন করে।
গত বছরের ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি নিজেই বলেছিলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। তার ভাষায়, তিনি “চলে যেতে আগ্রহী” এবং “বেরিয়ে যেতে চান।“
তবে একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন বলেই তিনি পদে রয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিজের অস্বস্তির কথাও প্রকাশ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, তার প্রতিকৃতি বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন থেকে সরিয়ে ফেলা এবং তার মতামতকে উপেক্ষা করার ঘটনায় তিনি অপমানিত বোধ করেছেন।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ওই সময়ে তাকে সাংবিধানিকভাবে সরিয়ে দেওয়ার নানা চেষ্টা হয়েছিল। তবে তার ভাষায়, কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি।
অসুস্থতার কারণেই কি পদত্যাগ?
বর্তমান গুঞ্জনের পেছনে রাষ্ট্রপতির শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান মো. সাহাবুদ্দিন। সেখানে তার ওপেন হার্ট সার্জারি হয়।
এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে হৃদযন্ত্রে ব্লক ধরা পড়ার পর তার এনজিওপ্লাস্টি করা হয় এবং একটি স্টেন্ট স্থাপন করা হয়।
সম্প্রতি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালেও তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে। তার শারীরিক অসুস্থতাকে পদত্যাগের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হতে পারে, এমন আলোচনাও রয়েছে।
এবারে আলোচনা জোরালো হয়েছে প্রবাসে থাকা সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ফেইসবুকে এক পোস্টের পর।
বুধবার তিনি লেখেন, “আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিষ্ময়কর খবর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোন শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।”



