স্বপ্ন ছিলো দেশে ফিরে শিক্ষকতা করবেন, ফিরলেন কফিনে

হিশামের ফোনের ‘লোকেশন হিস্টোরি’ অনুযায়ী পুলিশ লিমনকে খুঁজতে শুরু করে।  ২৪এ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকলিন ব্রিজের ওপর একটি কালো ময়লার ব্যাগের ভেতর হিশামের মরদেহ পাওয়া যায়।  তার হাত ছিলো বাঁধা, শরীরে ছিলো ছুরিকাঘাতের চিহ্ন।  এই দিনই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের অভিযোগ পেয়ে হিশামকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

 

আপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ১২:১৩ পিএম

জামিল আহমেদ লিমন বাংলাদেশে ফিরে শিক্ষকতা করতে চেয়েছিলেন।  আজ তিনি ফিরে এসেছেন কফিনে।

জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষা নিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে, এগোচ্ছিলেনও সেই দিকে। চিন্তা করছিলেন বিয়ের কথা। তবে এক লহমায় শেষ হয়ে গিয়েছিলো সব স্বপ্ন।

সিএনএনকে দেওয়া লিমনের বড় ভাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, তার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে এক সময় দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবেন। তিনি ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি নিয়ে পিএইচডি করছিলেন।

জামিল লিমনের ফেইসবুক প্রোফাইলে দেশ ও দেশের নানা ঘটনা নিয়ে পোস্ট দেখা যায়। বিদেশ বিভূঁইয়েও যেন দেশের পিছুটান ছাড়েনি।

অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রির ছাত্রী নাহিদা বৃষ্টি ছিলেন পিএইচডি শিক্ষার্থী ও গবেষক। তার ভাই প্রান্ত বলেন, তিনি খুবই হাসিখুশি মানুষ ছিলেন, সবার সাথে মিশতে পারতেন। গান গাইতেন।

লিমনের বড় ভাই বলেন, লিমন পরিবারের সাথে কথা বলার সময় বৃষ্টির প্রশংসা করতেন, তাকে প্রতিভাবান বলতেন। তার গানের গলা ও রান্নার হাতের প্রশংসা করতেন।

বৃষ্টির ফেইসবুক প্রোফাইলজুড়ে দেখা যায় তার গাওয়া গানের ভিডিও। কখনো একা গাচ্ছিলেন, কখনো সাথে ছিলো বন্ধুর গিটারের ধ্বনি।

লিমনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গলা জড়িয়ে আসে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় তার পিএইচডি সুপারভাইজারের। ফেইসবুকে এক ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি বলছেন, “যদি এক শব্দে জামিলের বর্ণনা দিতে হয়, তা হবে উদারতা। তিনি অনেক উদার ছিলেন।” নিজের শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে বাংলায় “বিদায় বন্ধু” বলে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।

হত্যার তদন্তের কথা জানাতে গিয়ে পুলিশও প্রশংসা করেছেন লিমন ও বৃষ্টির। হিলসবোরো কাউন্টির শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার বলেন, লিমন ও বৃষ্টি “শিক্ষার্থী হিসেবে নিবেদিত ও বন্ধু হিসেবে অনুগত” ছিলেন।

তার ভাষায়, বৃষ্টি ও লিমন শুধু শিক্ষার্থীই ছিলেন না, তারা ছিলেন উদ্যমী ও সফল ব্যক্তি, যারা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যোগ্য ছিলেন এবং সেই পথেই এগোচ্ছিলেন।

কীভাবে এই স্বপ্ন শেষ হলো, তার আদ্যোপান্ত জানা যায় হিলসবোরো কাউন্টির শেরিফের তুলে ধরা তদন্তের ঘটনাপ্রবাহে।

গত ১৬ই এপ্রিল লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হন। বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত ফেইসবুকে লিখেন, সেদিন থেকে তার বোনের কোনো খোঁজ নেই।

তেইশে এপ্রিল গোয়েন্দারা লিমনের বাসার কাছে একটি ডাস্টবিনের ভেতর রক্তমাখা কিছু জিনিস খুঁজে পান। এরপরই লিমন ও বৃষ্টিকে 'মিসিং অ্যান্ড এন্ডেনজারড' হিসেবে ক্লাসিফাই করে।

হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফস অফিস এরপর সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে লিমনের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানোর পর রান্নাঘরে ও লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহ-এর ঘরে রক্তের চিহ্ন খুঁজে পান।

বক্তব্যে অসংগতি থাকায় সন্দেহভাজন হন লিমনের রুমমেট হিশাম। তাকে পুলিশ খুঁজে পায় আরেক ঘটনার জের ধরে। চব্বিশে এপ্রিল শুক্রবার সকালে এক বাসা থেকে 'ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের' অভিযোগ পেয়ে পুলিশ অভিযান চালানোর পর সোয়াট সদস্যরা গিয়ে বের করে আনেন হিশামকে। 

হিশামের ফোনের ‘লোকেশন হিস্টোরি’ অনুযায়ী পুলিশ লিমনকে খুঁজতে শুরু করে। সেদিনই হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকলিন ব্রিজের ওপর একটি কালো ময়লার ব্যাগের ভেতর হিশামের মরদেহ পাওয়া যায়।  তার হাত ছিলো বাঁধা, শরীরে ছিলো ছুরিকাঘাতের চিহ্ন।  

এর দু’দিন পর ২৬এ এপ্রিল।  লিমনের মরদেহ যেখানে পাওয়া গিয়েছিলো, তার কাছেই এক জায়গায় কায়াকিং করতে গিয়ে কালো ব্যাগের ভেতর মরদেহের খণ্ডিত অংশ খুঁজে পান কয়েকজন ব্যক্তি। মরদেহের অংশবিশেষে মোড়ানো পোশাকের সাথে বৃষ্টিকে শেষবার সিসিটিভিতে যেই পোশাক পরে থাকতে দেখা যায়, তার মিল পায় পুলিশ। ডেন্টাল রেকর্ড ও ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করে ৩০এ এপ্রিল পুলিশ নিশ্চিৎ হয় যে সেই দেহাবশেষ বৃষ্টিরই।

হত্যার কারণ কী হতে পারে তা এখনো তদন্তে জানা যায়নি, এবং আদালতের নথিতেও এর কোনো ব্যাখ্যা নেই।

তবে হিশামের সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। সিএনএন জানিয়েছে, হিশাম ২০২৩ সালে নিজের ভাই এবং মাকে শারীরিক নির্যাতন করে। সে সময়ের জিজ্ঞাসাবাদে হিশাম তদন্তকারীদের বলেন, “আমি আমার ভাইকে সৃষ্টি করেছি। আমিই তার ঈশ্বর।” 

হিশাম আবুগারবিয়েহকে কারাবন্দি রাখা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডারের দু’টি অভিযোগসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

তদন্তকারীদের প্রতিবেদন, আদালতের নথি ও গণমাধ্যমের রিপোর্ট থেকে বোঝা যায়, হিশাম আবুগারবিয়েহ স্বাভাবিক ছিলেন না। এমন এক ব্যক্তির সাথে থাকছিলেন লিমন, যার সহিংসতার ইতিহাস পুরনো। হয়তো নিজের রুমমেটের এমন প্রবণতা কখনো বুঝে উঠতে পারেননি লিমন। এবং জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়েছে তাকে ও বৃষ্টিকে।

বন্ধুবান্ধব, পরিবার, শিক্ষক এবং পুলিশের ভাষ্যে, লিমন ও বৃষ্টি ছিলেন নিষ্ঠাবান মানুষ। প্রেম, বন্ধুত্ব ও শিক্ষা, এই সবকিছুতেই নিবেদিত ছিলেন। নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছিলেন তারা, দেখছিলেন একসাথে এক ঘরে ওঠার স্বপ্ন। তবে তা আর হয়ে উঠলো না; না ফেরার দেশে পারি জমালেন দু’জন।

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার প্রেসিডেন্ট ময়েজ লিমায়েন শুক্রবার এক শোকসভায় বলেন, লিমন ও বৃষ্টির ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হবে, যাতে তারা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। লিমন ও বৃষ্টি বেঁচে থাকবেন তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী ও দেশের মানুষের স্মৃতিতে, ক্যাম্পাসের স্মৃতিসৌধতে, ও আকাশের নীল ধ্রুবতারা হয়ে।