ওনাইসী সাঈদ অনেকের কাছেই পরিচিত রেয়ার সাঈদ নামে এবং অন্য মাদক ব্যবসায়ীদের থেকে তার গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র এবং সচ্ছল পরিবারের সন্তান, পড়াশোনা করেছেন ঢাকার একটি নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান সাঈদ। সেখানে বিবিএ করে দেশে ফেরেন ২০০৭ সালে। ২০১২ সালে পড়াশোনা করতে আবার যান মালয়েশিয়াতে। দুই বছর পর এমবিএ করে দেশে ফিরে দেখভাল শুরু করেন বাবার টেক্সটাইল ব্যবসার।
এভাবে কয়েকবছর চলার পর ২০২২ সালের ১লা অগাস্ট সামনে আসে সাঈদের ভিন্ন এক পরিচয়।
গুলশান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। ‘কুশ’-এর মতো অপ্রচলিত মাদকের মিনি ল্যাব ‘অপারেট’ করাসহ চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আসে তার বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মালয়েশিয়ায় পড়াশোনার সময়ই সাঈদের সাথে পরিচয় হয় ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের বাসিন্দা ফয়সালের। তিনি ছিলেন থাইল্যান্ড প্রবাসী। ফয়সালের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরেই ‘কুশ’, ‘হেম্প’, ‘মলি’, ‘ফেন্টানল’,‘কোকেন’, ‘এক্সট্যাসি’, ‘এডারল’-এর মতো অপ্রচলিত মাদক সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন সাঈদ।
২০১৬ সালে কানাডায় স্থায়ী হন ফয়সাল। সাঈদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। ২০১৮ সালে ‘অত্যন্ত লাভজনক’ বাংলাদেশে অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ ব্যবসা শুরুর সিদ্ধান্ত নেন সাঈদ।
পাকাপাকিভাবে মাদক ব্যবসা শুরু ২০১৯ সালে। টার্গেট করেন ঢাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের। ব্যবসা পরিচালনাসহ সাঈদকে নানা দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন ‘গুরু’ ফয়সাল। কানাডায় বসে সাঈদকে কুশ চাষের বীজ, প্রযুক্তি ও রাসায়নিক উপাদান সরবরাহ করতে থাকেন তিনি।
সেই থেকে ল্যাবে ‘কুশ’ চাষাবাদ করে চার বছর ধরে ঢাকাতে জমজমাট মাদক কারবার গড়ে তোলেন সাঈদ।
‘কুশ’ হলো বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল এক ধরনের বিশেষ গাঁজা বা ক্যানাবিসের প্রজাতি। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে এই বিশেষ জাতের গাঁজার উৎপত্তি হওয়ায় এর নামকরণ করা হয়েছে ‘কুশ’।
এটি ক্যানাবিস ইন্ডিকা প্রজাতিভুক্ত এবং সাধারণ গাঁজার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও মারাত্মক নেশাদ্রব্য হিসাবে পরিচিত।
ঢাকায় বড় হচ্ছে ‘কুশ’-এর বাজার
২০২২ সালের ১লা অগাস্ট রাতে গুলশানে নিজের ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার হন সাঈদ। অভিযানে উদ্ধার করা ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।
সাঈদের কাছ থেকে আরো উদ্ধার করা হয় ১০১ গ্রাম কুশ, ৬ গ্রাম হেম্প, দশমিক শূন্য ৫ গ্রাম মলি, ১ গ্রাম ফেন্টানল, ১৮ গ্রাম কোকেন, ১২৩টি এক্সট্যাসি ও ২৮টি এডারল ট্যাবলেট।
গুলশান থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় সাঈদকে।
এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জেরায় বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঢাকার অভিজাত পাড়ায় ‘মাদক বিজ্ঞানী’ হিসাবে পরিচিত ছিলেন সাঈদ। মোহাম্মদপুরে এক লাখ টাকায় ভাড়া নিয়েছিলেন একটি ফ্ল্যাট।
সেখানে তাপ নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতেন ‘কুশ’। ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ‘কুশ’ উৎপাদনের প্ল্যান্ট ও সেটআপ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সাঈদকে গ্রেপ্তারের সাথে জড়িত ওই সময়ের এক র্যাব কর্মকর্তা জানান, ‘কুশ’, ‘হেম্প’, ‘মলি’, ‘ফেন্টানল’, ‘কোকেন’, ‘এক্সট্যাসি’, ‘এডারল’, ‘আইস’, ‘এলএসডি’, ‘এমডিএমএ’, ‘ডিএমটি’, ‘ডিওবি’, ‘ম্যাজিক মাশরুম’, ‘কিটামিন’, ‘ট্যাপেন্টাডল’ এবং ‘ট্রামাডল’–এর মতো বাংলাদেশে অপ্রচলিত মাদক বাইরে থেকে এনে মূলত ঢাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করতেন সাঈদ।
ওই কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, “কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় সাঈদের নিকটাত্মীয়দের ঠিকানায় পাঠানো হতো মাদকের পার্সেল, আসত থাইল্যান্ড ও কানাডা থেকে। তবে সেগুলো যে মাদক, সে সম্পর্কে কিছুই জানতেন না আত্মীয়রা। তারা ভাবতেন সেগুলো হয়ত প্রয়োজনীয় কোনো পণ্য।”
পার্সেলে আসা ওই মাদকের মূল্য সাঈদ হুন্ডির মাধ্যমে পরিশোধ করতেন বলে জানান তখনকার ওই র্যাব কর্মকর্তা।
তিনি আরো জানান, মাদক নিতেন না সাঈদ, আসক্তি ছিলো ধূমপান ও মদে। তবে গবেষণা করতেন নতুন প্রজন্মের মাদক নিয়ে। তার ইচ্ছা ছিল, মাদক নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। হতে চেয়েছিলেন ‘মাদক বিজ্ঞানী’।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়েছে ১২ ধরনের নতুন মাদক। ২০১৯ সালে প্রথম সন্ধান মেলে আইস-এর। একই বছর এলএসডি ও ডিএমটি, ২০২৩ সালে সাইলোসাইবিন ট্যাবলেট এবং ২০২৫ সালে ধরা পড়ে এমডিএমএ।
আকাশপথে নতুন নতুন এসব মাদক আসছে কুরিয়ার সার্ভিস, ফরেন পোস্টাল, আন্তর্জাতিক দ্রুত ডাকসেবার (ইএমএস) মাধ্যমে। আবার পর্যটকবেশে মাদকের চালান নিয়ে আসছে বিদেশিরাও।
এছাড়াও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান এবং বৈধ ওষুধের সরবরাহ চেইন কাজে লাগিয়েও অপ্রচলিত মাদক আনা হচ্ছে দেশে।
তরুণদের মধ্যে হিরোইনের মতো প্রথাগত মাদকের চেয়ে সিনথেটিক (কৃত্রিম) মাদকের ব্যবহার এখন তুলনামূলকভাবে বেশি বলে জানাচ্ছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
ঢাকায় ‘কুশ’ এর ল্যাব কতগুলো
ঢাকার ওয়ারীতে নিজের বাসায় ‘কুশ চাষ’-এর ল্যাব চালু করেছিলেন আরেক ‘মাদক বিজ্ঞানী’ তৌসিফ হাসান। ওনাইসী সাঈদের মতো তিনিও ছিলেন মেধাবী ছাত্র এবং সচ্ছল পরিবারের সন্তান।
তৌসিফ নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করেন যুক্তরাষ্ট্রে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এখনো অধরাই রয়ে গেছেন তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘কুশ’-এর চাষাবাদ শেখেন বাইশ বছর বয়সি তৌসিফ হাসান। এরপর ওয়ারীতে নিজের বাসায় চালু করেন ‘কুশ’ চাষের ল্যাব। ক্যালিফোর্নিয়ায় বসেই ওয়ারীর ল্যাব ভার্চুয়ালি তদারকি ও পরিচালনা করতেন তৌসিফ।
গত ৭ই জানুয়ারি তার বাসায় অভিযান চালিয়ে ‘কুশ’-এর ল্যাবের সন্ধান পায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাবা মারা যাওয়ার পর তৌসিফের মা বিয়ে করে অন্যত্র চলে যান। দাদা-দাদির সঙ্গে থাকতেন তৌসিফ। ইংরেজি মাধ্যম থেকে ‘ও’ লেভেল শেষ করে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। জানুয়ারিতে তার বাসায় অভিযানের আগে বছরে অন্তত একবার করে দেশে আসতেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে 'কুশ' বা যেকোনো উচ্চ মাত্রার গাঁজা ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় আইনে অবৈধ হলেও অঙ্গরাজ্যভেদে বৈধতার বিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন।
কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে গাঁজার বৈধতা নির্ভর করে তিনি কোন অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করছেন তার ওপর। বর্তমানে ২৪টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে ২১ বছর বা তার বেশি বয়সিদের জন্য বিনোদন ও সাধারণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘কুশ’ কেনাবেচা পেয়েছে আইনি বৈধতা। রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়াও নিউইয়র্কও। 
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ওয়ারীতে তৌসিফের থাকার ঘরের ল্যাব থেকে উদ্ধার করা হয় ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আনা কুশের বীজ, চাষ করা কুশগাছ, সদ্য তোলা কুশ, চাষের উপকরণ, সিসা সেবনের উপকরণ ও বিদেশি মদ।
বাসার ছাদের ওপর টিন ও ফয়েল পেপার দিয়ে বানানো হয়েছিল তাপনিয়ন্ত্রিত ঘর। সেখান থেকে কুশগাছ চাষের অনেকগুলো টবও উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান আলাপ-কে বলেন, “অপ্রচলিত মাদকের মধ্যে ডিমান্ড বাড়ছে ‘কুশ’-এর। এখন পর্যন্ত থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘কুশ’ আসার তথ্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘কুশ’ বৈধ। সেখানে বসবাসকারী তৌসিফ নামে এক প্রবাসী ঢাকার ওয়ারীতে নিজ বাসায় ‘কুশ’ চাষের জন্য ল্যাব করেছিল। সেখান থেকেই তিনি অনলাইনে মনিটরিং করে পরিচালনা করতেন ‘কুশ’ চাষবাস।”
মেহেদী বলেন, “এখন পর্যন্ত আকাশ পথে যেসব চালান এসেছে, বিশেষ করে চলতি বছর তার বেশিরভাগই এসেছে থাইল্যান্ড থেকে। আর বহনকারী হিসাবে যাদের ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় সবাই ভারতের বাসিন্দা। এদের অর্থনৈতিক অবস্থান নিম্নবিত্ত।”
সাঈদ ও তৌসিফ ঢাকায় ল্যাব বানিয়ে চাষাবাদ করেছিল ‘কুশ’। আর সাঈদের ‘গুরু’ ফয়সাল জড়িত ছিলেন কানাডা থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে ‘কুশ’ বাণিজ্য শুধু এই দুই ল্যাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই কাণ্ডে জড়িত হয়েছে আন্তর্জাতিক চক্র এবং ঢাকাকে রুট হিসাবে ব্যবহার করে ‘কুশ’ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্য দেশেও। 
আকাশ পথে আসছে ‘কুশ’
গত ২৪এ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন ভারতীয় নাগরিক মো. জুলফিকার মোল্লা। বিমানবন্দরের আগমনি হলের গ্রিন চ্যানেলে কাস্টমস চেকিংয়ের সময় তাকে আটক করা হয়। পরে তার ট্রলি ব্যাগে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় ২১টি প্যাকেটে থাকা ১১ কেজি ৮০০ গ্রাম ‘কুশ’।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে এসেছিলেন জুলফিকার। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনার রাজারহাটের বাসিন্দা।
বাংলাদেশে তিন দিন অবস্থান করে ভারতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।
১৮ই অগাস্ট শাহজালাল থেকেই আরো ৪ কেজি ১৮০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করে অধিদপ্তর। এই ঘটনায় জড়িত দুই সন্দেহভাজন ভারতীয় নাগরিক আকাশ দুবে ও আকাশ পান্ডে তাদের ট্রলি ব্যাগ ও পাসপোর্টের ফটোকপি রেখে পালিয়ে যান। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দুবে ও পান্ডে অধরাই রয়ে গেছেন।
২২এ অগাস্ট ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে আসেন ভারতের কর্ণাটকের বাসিন্দা হুসাইন আবদুল কাদের শেখ। ৩ কেজি কুশসহ গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
২৪এ অগাস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরে ৫ কেজি ৪০ গ্রাম কুশসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুই নাগরিক সানোয়ার আলী ও ইমতিয়াজ আহমেদকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
২৭এ অগাস্ট ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে করে আসা দুই ভারতীয় নাগরিক আবদুল রহমান ও মোহাম্মদ ইকবাল আনসারির ট্র্যাভেল ট্রলি তল্লাশি করে পাওয়া যায় ৫ কেজি ১২০ গ্রাম কুশ। তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা।
১৪ই অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দরে ৪ কেজি ২৮০ গ্রাম কুশসহ ভারতীয় নাগরিক অভিজিৎ দাসকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাসিন্দা এবং পেশায় বনগাঁ রেলওয়ে স্টেশনের কুলি। বাংলাদেশে তিনদিন অবস্থান করে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তার।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে, চার মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৩ কেজি ৪২০ গ্রাম ‘কুশ’। প্রতি গ্রাম কুশ-এর দাম ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে চার মাসে উদ্ধার করা মাদকের দাম হতে পারে ৩৫ কোটি টাকা পর্যন্ত।
মাদক বহনে ভারতের নিম্ন আয়ের মানুষ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের নিম্ন আয়ের মানুষদের ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা কাজে লাগিয়ে কলকাতা থেকে ব্যাংককে নিয়ে যায় আন্তর্জাতিক মাদকচক্র। এরপর বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাচার করছে মাদক।
এ পর্যন্ত ধরা পড়া ৭ জন ভারতীয় নাগরিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, তারা আকাশপথে ভারত থেকে থাইল্যান্ড যায়। সেখান থেকে ‘কুশ’ এর চালান নিয়ে আকাশপথে নামে ঢাকায়।
নির্ধারিত ব্যক্তির হাতে চালান হস্তান্তরের পর সড়কপথে বেনাপোলসহ বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করার কথা ছিল তাদের।
কয়েক হাজার রুপির বিনিময়ে তারা কুশ চোরাচালানে যুক্ত হয়েছে এবং তাদের ভ্রমণের খরচ মাদক চালানের মালিকরা বহন করে থাকে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন গ্রেপ্তার হওয়া ৭ ভারতীয়।
ঢাকাতে গ্রেপ্তার ও জব্দ এবং ভারতে পাচার
গত ১৭ই অক্টোবর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে গুলশান, ভাটারা ও মগবাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন সৈয়দ আনিম আশরাফুল হক, মিজানুর রহমান, মো. মাসুদুর রহমান, অরিন্দম রায়, তুফাইল আহাম্মদ, মোহাম্মদ শোয়াইব ও মোহাম্মদ আহম্মদ।
অধিদপ্তরের দাবি, গ্রেপ্তার হওয়াদের কাছ থেকে কানাডা থেকে আসা ৭৭২ গ্রাম কুশ ও ৬ মিলিগ্রাম টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল, যুক্তরাজ্য থেকে আসা ৭০ গ্রাম এক্সটাসি/হ্যাপি ড্রাগ এবং ৩৮ কেজি সিসা ও ৩ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে।
বিদেশ থেকে আসা ‘কুশ’ মাদক বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতেও চালান হচ্ছিল বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
গত ৬ই অগাস্ট ভারতে পাচারের সময় সাতক্ষীরা সীমান্তে ১২ কেজি ‘কুশ’ জব্দ করার তথ্য জানায় সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবি। এ সময় তারিকুজ্জামান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, “মোট ১২ কেজি ‘কুশ’ জব্দ করা হয়েছে।”
বাড়ছে ‘পার্টি ড্রাগ’ বা ‘ফ্যানসি ড্রাগ’-এর ব্যবহার
হিন্দুকুশ পর্বত অঞ্চলের আদি বীজ থেকে উৎপাদিত প্রাকৃতিক হাইব্রিড গাঁজাকে কুশ বলা হয়, যেটা ফুল শুকিয়ে ধোঁয়া বা ভেপ-এর মাধ্যমে সেবন করা হয়।
কিন্তু ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক বা সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েড স্প্রে করে তৈরি করা হয় এক ধরনের কৃত্রিম ‘কুশ’, যা স্পাইস বা কে২ নামেও পরিচিত। এটি প্রাকৃতিক কুশের চেয়ে ১০০ গুণ পর্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রাণঘাতী।
এই সিনথেটিক কুশ-এর ব্যবহার এখন বাড়ছে বাংলাদেশে। মাদকসেবীদের কাছে সিনথেটিক (কৃত্রিম) মাদক ‘পার্টি ড্রাগ’ বা ‘ফ্যানসি ড্রাগ’ নামে পরিচিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিনথেটিক মাদক ধ্বংস করে দেয় মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা সেল। হ্রাস পায় স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তার ক্ষমতা। মানসিক বিভ্রান্তি, অবাস্তব কল্পনা ও অহেতুক সন্দেহ বাড়িয়ে তোলে। দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে বেড়ে যেতে পারে তীব্র হতাশা, যা ঠেলে দিতে পারে আত্মহত্যার দিকেও।
এছাড়াও সিনথেটিক ড্রাগের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে হতে পারে লিভার সিরোসিস এবং সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যেতে পারে কিডনি।
পাশাপাশি অত্যন্ত শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদানে তৈরি এই সিনথেটিক মাদক নেওয়ায় হঠাৎ অকেজো হয়ে পড়তে পারে শরীরের প্রধান প্রধান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
সিনথেটিক মাদক ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানের মধ্যে। সাঈদ-ফয়সাল ও তৌসিফদের ল্যাবে তৈরি সিনথেটিক মাদকের প্রধান ব্যবহারকারীও উচ্চবিত্তের সন্তানরাই ছিলেন বলে জানা যাচ্ছে।
তবে এই মাদক ব্যবহার, ব্যবসা ও বিপনণের সাথে কতজন জড়িত, সে বিষয়ে এখনো কোনো সমীক্ষা চালায়নি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই এ নিয়ে কোনো তালিকাও নেই তাদের কাছে।
তবে এই সিনথেটিক মাদক নিয়ে সরকার যে চিন্তিত তা বোঝা যাচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে।
গত ২৫এ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “নতুন সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের আবির্ভাবের ফলে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারজনিত সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ আজ এই মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাদের এখনই চিকিৎসা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার মাদকাসক্তির চিকিৎসা সেবাকে উন্নত ও সহজলভ্য করার জন্য কাজ করছে।”
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক আলাপ-কে বলেন, নানা কৌশল ও উপায়ে দেশে অপ্রচলিত মাদকের বিস্তার ঘটছে। এখন পর্যন্ত অপ্রচলিত মাদকের বিস্তার প্রতিরোধে কার্যকর কৌশল ও পদক্ষেপ নেওয়া গেছে তা বলা যাবে না। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
“আবার তদন্তেও মাদকের সঠিক উৎস, রুট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিস্তারিত জানা যাচ্ছে না। বহনকারীর ভূমিকা এখানে মুখ্য নয়, মুখ্য হলো কারা এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে, সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রাখছে, তাদের খুঁজে বের করাই জরুরি।”
‘কুশ’ মাদক নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের রয়েছে অনেকগুলো কারণ। বিদেশ থেকে ঢাকায় আসছে কুশের চালান, বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হচ্ছে বাহক, বিভিন্ন এলাকায় চলছে অভিযান, জব্দ হচ্ছে ‘কুশ’ এবং ঢাকা শহরেই ‘কুশ’ তৈরির ল্যাব।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- এত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও যদি ‘কুশ’ এর মতো মাদকের চালান আসতেই থাকে, তাহলে এই ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রণ কোথায়? দেশের মধ্যে সাঈদ বা তৌসিফের মতো কি আরো কেউ গড়ে তুলেছে ‘কুশ’-এর ল্যাব? ফয়সাল বা তার মতো আর কোনো ‘গুরু’ কি বিদেশ থেকে দিকনির্দেশনা দিয়ে নতুন কাউকে দিয়ে ল্যাব বানাচ্ছেন?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্য শুধু কতজন বাহক গ্রেপ্তার হলেন বা কত কেজি মাদক উদ্ধার হলো, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না।
আসল সাফল্য নির্ভর করবে মাদক ব্যবসার অর্থদাতা, সংগঠক, সরবরাহকারী ও নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর।



