পাতি মাস্তান থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী কে এই লেদু

৩২ মামলার পলাতক আসামি লেদু। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেও ছিলেন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা। পরে বিএনপি নেতাও হন। অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজা হয়েছে লেদুর। 

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম

লক্ষীপুরের ভবানীগঞ্জ চৌরাস্তার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বাবা হারিজ বেপারির হাত ধরে সপরিবারে ঢাকা এসেছিলেন মনোয়ার হাসান জীবন। ঢাকায় এসে কিশোর বয়সেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। শুরুতে দিন হাজিরার ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য বিক্রি করতেন। পরে নিজেই নিয়ন্ত্রণ নেন এই ব্যবসার। ততদিনে মূল নাম ছাপিয়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন লেদু হাসান নামে।

প্রায় ১৩ বছর বয়সে ১৯৯০ সালে ঢাকায় আসা লেদুর জন্ম ১৯৭৮ সালের ১৫ই জুন। মোহাম্মদপুরের জহুরী মহল্লা বস্তির বাসিন্দা লেদু ছয় ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। তার বাবা ও বড় ভাই রিকশা চালাতেন। লেদুর মা-বোন ফুটপাতে বিক্রি করতেন চা-পান।

নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় পাতি মাস্তান হিসাবে পরিচিতি পাওয়া লেদু পর্যায়ক্রমে এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী বনে যান। হত্যা-চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র, অপহরণসহ ৩২ মামলার পলাতক এই আসামি মঙ্গলবার রাতে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন। মোহাম্মাদিয়া হাউজিং সোসাইটি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।

সবশেষ ১লা জুলাই নবোদয় হাউজিং ইউনিট বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার বাদশাকে হত্যা করে লেদু ও তার সহযোগীরা। লেদু নিজেও স্থানীয় বিএনপি নেতা।

চাঁদ উদ্যান, সাত মসজিদ হাউজিং, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, তুরাগ হাউজিং, বসিলা ৪০ ফিট, কাটাসুর, গ্রীণ হাউজিং,বসিলা গার্ডেন সিটি, একতা হাউজিং, চাঁন মিয়া হাউজিং, মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড, মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি, নবোদয় হাইজিং, বোটঘাট, সাদেক খান রোড, ক্যানসার গলি, রায়েরবাজার, পুলপাড় বটতলা ও শেরেবাংলা রোড পর্যন্ত বিস্তৃত লেদুর অপরাধ জগৎ।

র‌্যাব-২ এর কমান্ডিং অফিসার নয়মুল হাসান বলেন, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, বিএনপি নেতা হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত এই লেদু হাসান।

“বাদশা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে লেদুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে,” বলেন তিনি। 

লেদু হাসানের বিরুদ্ধে যেসব ভুক্তভোগী অভিযোগ জমা দিয়েছেন, তাদেরকে মামলা করার অনুরোধ জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তা নয়মুল। 

সম্প্রতি নিহত বিএনপি নেতা আবুল বাশার বাদশা হত্যা মামলায় এর আগে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

পাতি মাস্তান থেকে লেদুর উত্থান ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা 

লেদু পড়াশোনা করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে তার দৌড় অনেক বেশি। স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতির করার পর যোগ দেন বিএনপিতে। আদাবর থানা বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছিলেন।

চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ২০২৪ সালের ২রা সেপ্টেম্বর লেদুকে বহিষ্কার করে বিএনপি। পরে অবশ্য ওই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারও করা হয়। 

পুলিশ ও র‌্যাবের সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ভাড়াটে খুনি হিসাবে লেদু পরিচিত হয়ে ওঠেন ২০০১ সাল থেকে। 

২০০৩ সালের ১৬ই জুন কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এস আর পলাশকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১০ সালে মোহাম্মদপুরে খুন হন ওহিউদুজ্জামান নামে এক ব্যক্তি। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে খুন হন ছাত্রলীগ নেতা মশিউর রহমান মশু। 

আলোচিত এই তিন হত্যাকাণ্ডেই এসেছে লেদুর নাম।

ওহিউদুজ্জামান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ২০১২ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন লেদু। বের হয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ৯ বছর ছিলেন দাপটের সঙ্গে। 

এরপর ২০২১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর দারুস সালাম এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন লেদু। ওই সময় তার কাছ থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ১টি ম্যাগাজিন ও এক রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়।

পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর বেরিবাঁধ এলাকায় দুই নারীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায়ও লেদু জড়িত ছিলো। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।  

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও এক সময়ের প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত মেজর মঞ্জুরুল কাদেরের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা এবং ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে নতুন করে আলোচনায় আসেন লেদু। 

পুলিশ বলছে, চাঁদা না দেওয়ায় মঞ্জুরুল কাদেরের কেয়ারটেকার মিলনের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালান লেদু হাসান ও তার সহযোগিরা। 

মারধরের শিকার হয়ে মিলন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরে আদাবর থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন।

এজাহারে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর বিকালে শেখেরটেকের রোড ৩ এর ২২ নম্বর বাসায় প্রবেশ করেন লেদু ও তার দলবল। তার সঙ্গে ছিল মো. সাগর, আকবর, তালুকদারসহ ৭/৮ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী। 

তারা বাড়িতে ঢুকে মিলনের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। মিলন রাজি না হলে তাকে লাঠি ও ইট দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়।

একই বছরের ২১এ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় লেদু হাসানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মোহাম্মদ সোলাইমান নামে এক ব্যক্তি। চন্দ্রিমা মডেল টাউন হাউজিংয়ে সোলাইমানের জমি দখলের চেষ্টা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়। 

কিশোর গ্যাংয়ের মদদদাতা এবং লেদুর মাদক সাম্রাজ্য

২০২৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর আদাবরে বান্ধবীকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া এক তরুণকে জিম্মি করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। গ্যাং লিডার পলাশের নেতৃত্বে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

জিম্মির পরিবার পুলিশকে জানালে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। এ সময় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য জনি-রনির মা রেজ্জেকা বেগম পুলিশের ওপর মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেয় এবং পুলিশসহ তিনজনকে কুপিয়ে জখম করে। ভাংচুর করে পুলিশের গাড়িও। 

এই গ্যাংয়ের নেতৃত্বে থাকা জনি, রনি ও কবজি কাটা আনোয়ার লেদুর ঘনিষ্ঠ বলে জানিয়েছে পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা।

পুলিশ জানাচ্ছে, শনিরবিল, শেখেরটেক, জেনেভা ক্যাম্প, জহুরী মহল্লা এলাকায় ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা বিক্রির সিন্ডিকেট চালান লেদু। ১০৮টি স্পট চলে সেখানে। 

মাদব ব্যবসায় বাধা হওয়ার কারণেই ছাত্রনেতা মশিউর রহমান মশুকে লেদু হত্যা করেছিল বলেও তদন্তে উঠে আসে। ওই মামলায় লেদু, মোল্লা স্বপন, সেলিম, সাগরসহ ৮ জন আসামি।