সরকার বলছে অপরাধ কমেছে, টিআইবি ও আসকের তথ্য বলছে উদ্বেগ রয়ে গেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রকৃত চিত্র জানতে সরকারি তথ্য, বেসরকারি পর্যবেক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তাবোধ, সবই বিবেচনায় নিতে হবে।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ০৭:১৮ পিএমআপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
প্রতীকী ছবি। এআইয়ের সাহায্যে তৈরি
অপরাধের সংখ্যা কমেছে, নাকি জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগই আরও বেড়েছে? বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক এখন এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সংসদে টিআইবির তথ্য তুলে ধরে হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রকে উদ্বেগজনক বলা হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিবেদনটিকে ‘পেপার কাটিং’ নির্ভর বলে সরকারি তথ্য দেখার কথা বলেছেন। পাল্টা টিআইবি বলছে, তাদের প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করা একাধিক উৎসের ভিত্তিতে তৈরি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, টিআইবির মতো প্রতিষ্ঠানকে একেবারে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়; তথ্য ভুল হলে সরকারকে তা প্রমাণসহ চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তবে এই বিতর্কটি অপরাধের পরিসংখ্যান নয়, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, সরকারি স্বচ্ছতা এবং জনআস্থার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
রবিবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা টিআইবির তথ্য তুলে ধরে বলেছেন, হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র প্রমাণ করে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক।
বিপরীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ টিআইবির প্রতিবেদনকে ‘পেপার কাটিং’ নির্ভর বলে মন্তব্য করে বলেছেন, প্রকৃত অপরাধচিত্র জানতে হলে পুলিশ বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য দেখতে হবে।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে নাগরিক নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। সামনে এসেছে বড় ধরনের আস্থার সংকট।
সরকারের দাবি, সরকারি রেকর্ডে অপরাধের চিত্র আগের তুলনায় উন্নত। তবে টিআইবির চার্টে মার্চ-এপ্রিল সময়ে হত্যা, চুরি, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং গণসহিংসতার যে সংখ্যা উঠে এসেছে, তা জনপরিসরে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। একই সময়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আলাদা ডকুমেন্টেশনেও রাজনৈতিক সহিংসতা, কারা হেফাজতে মৃত্যু, গণপিটুনি, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুমের অভিযোগের মতো বিষয়গুলো উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে।
সমস্যার কেন্দ্রে তাই শুধু “সংখ্যা কত” এই প্রশ্নের বাইরে আরেকটি প্রশ্ন উঠছে যে কোন তথ্যকে রাষ্ট্র গ্রহণ করবে এবং কোন তথ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। নাগরিকরাই বা কোন তথ্যের ওপর আস্থা রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবাদপত্রভিত্তিক মানবাধিকার ডকুমেন্টেশনকে সরকার দুর্বল পদ্ধতি বলতে পারে; তবে সরকারি তথ্য যদি নিয়মিত, বিস্তারিত ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না থাকে, তাহলে বেসরকারি সংস্থার তথ্যই আলোচনার প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এখনকার বিতর্ক আসলে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতার বিতর্কও।
কী বলা আছে টিআইবির প্রতিবেদনে
টিআইবি মূলত সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল, এই দুই মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে মার্চে ১ হাজার ৪৮৫টি এবং এপ্রিলে ২ হাজার ১১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বড় বৃদ্ধি দেখা যায়।
ধর্ষণের ক্ষেত্রেও চিত্র উদ্বেগজনক। মার্চে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৩ থেকে ৪৮ জন এবং এপ্রিলে ৩৫ থেকে ৫৪ জন। দুই মাসে মোট ধর্ষণের শিকার ৭৮ থেকে ১০২ জন। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন। শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১ জনের মধ্যে।
গণসহিংসতা ও গণপিটুনির ক্ষেত্রেও টিআইবির তথ্যচিত্রে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায়। মার্চে গণসহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা ছিল ২৫ থেকে ৩৬টি, আর এপ্রিলে ৪৪টি। দুই মাসে এ ধরনের ঘটনা ৬৯ থেকে ৮০টির মধ্যে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩১ থেকে ৪১ জন। আহত হয়েছেন ৭০ থেকে ১২৫ জন বলে চার্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও টিআইবির তথ্যচিত্রে মার্চে ৯ থেকে ১২ জন এবং এপ্রিলে ৫ থেকে ৬ জনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে। একই চার্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে আহত ৫ জন, বিচারবহির্ভূত হত্যায় ১ জন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা অপমানের অভিযোগে গ্রেপ্তার ৭ জনের তথ্য রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে টিআইবির আরেকটি টেবিলে দেখা যায়, এই দুই মাসে চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ২২৪টি। এর মধ্যে মার্চে ১ হাজার ১৫১টি এবং এপ্রিলে ১ হাজার ৭৩টি। হত্যা হয়েছে ৬০৫টি। মার্চে ৩১৭টি এবং এপ্রিলে ২৮৮টি। ডাকাতি হয়েছে ৯০টি, রবারি বা ছিনতাই-ধর্মী অপরাধ ২৯৪টি, অপহরণ ১৯৬টি, পুলিশের ওপর হামলা ১২৯টি এবং দাঙ্গা ৩টি।
এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের উদ্বেগ অমূলক নয়। তার মতে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অপরাধচিত্রই দেখাচ্ছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
“টিআইবির নিজস্ব তদন্ত নেই”
তবে টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, “টিআইবির প্রতিবেদন শুধু পেপার কাটিংয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। প্রতিবেদনে তাদের নিজস্ব কোনো তদন্ত নেই। সেহেতু এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
টিআইবি কোনো সরকারি সংস্থা নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রকৃত অপরাধচিত্র জানতে হলে পুলিশ বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য দেখতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, টিআইবির প্রতিবেদন মূলত পত্রিকার কাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তারা নিজেরা কোনো ঘটনা তদন্ত করে না। প্রকৃত ঘটনা বিবেচনা না করে এমন প্রতিবেদন দেওয়া ঠিক নয়। তবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রয়েছে এবং এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, “আমার সামনে সেই রিপোর্টটা নেই। আমরা মাস ভিত্তিতে অপরাধের স্টেটমেন্ট করে থাকি। ডাকাতি, খুন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ তালিকাভুক্ত করা হয়।” “কয়েকদিন আগে আমার কাছে আরেকটি রিপোর্ট এসেছিল, সেখানে দেখেছি ২০২৫ সালের তুলনায় অপরাধের চিত্র বর্তমান সরকারের সময়ে অনেক বেশি উন্নতি লাভ করেছে, অনেক অপরাধ কম,”-বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর টিআইবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সংস্থাটি কোনো তদন্ত সংস্থা নয়, এ কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন। তবে টিআইবি নিজেদের গবেষণা-নির্ভর দুর্নীতিবিরোধী, সুশাসনবিষয়ক অধিপরামর্শ ও জনসচেতনতা-ভিত্তিক সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, তাদের প্রতিবেদনকে শুধু ‘পত্রিকার কাটিং-নির্ভর’ বলা ভিত্তিহীন।
টিআইবির ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গুণগত ও পরিমাণগত তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি অনুসরণ করে তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। সংগৃহীত তথ্য বহুমাত্রিক যাচাইয়ের পর বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়।
সংস্থাটি আরও জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে তাদের প্রতিবেদনের তথ্যসূত্র ছিল বাংলাদেশ পুলিশ এবং তিনটি সুপরিচিত মানবাধিকার সংগঠন। প্রতিবেদনে এসব উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই প্রতিবেদনকে ঢালাওভাবে ‘পেপার কাটিং’ বা সংবাদপত্রের কাটিং-নির্ভর বলা অযৌক্তিক এবং মূল উদ্বেগ পাশ কাটানোর চেষ্টা।
টিআইবি আরও বলেছে, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করা অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই তথ্য গ্রহণের আগে গুণগত মান যাচাই করা হয় এবং একই বিষয়ে সরকারি, বেসরকারি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়।
সংস্থাটির বক্তব্য, সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিজেরাও অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, অবস্থান জানায় বা নিজেদের কার্যক্রম প্রচার করে। সে কারণে টিআইবির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের নামে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে ঢালাওভাবে অবমূল্যায়নের যুক্তি নেই।
সংকট শুধু সংখ্যার নয়, আস্থারও
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) নাসির মনে করেন, টিআইবির মতো প্রতিষ্ঠানকে একেবারে ভিত্তিহীন বা অগ্রহণযোগ্য বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তার মতে, টিআইবি একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। তারা নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে তথ্য প্রকাশ করে। ভুল বা মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও অর্থায়ন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এ কারণে তারা সাধারণত তথ্য প্রকাশের আগে যথেষ্ট সতর্ক থাকে।
তিনি বলেন, “টিআইবির তথ্য যদি সত্যিই ভিত্তিহীন হয়, তাহলে সরকারের উচিত ছিল সেটিকে প্রমাণসহ চ্যালেঞ্জ করা। শুধু ‘ভিত্তিহীন’ বা ‘সঠিক নয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়া আস্থার সংকট আরও বাড়াতে পারে।”
তার ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন শুধু সরকারি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের অনুভূতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধর্ষণ, ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি বা রাজনৈতিক সহিংসতার খবর নিয়মিত সামনে এলে মানুষ কাগুজে পরিসংখ্যানের চেয়ে নিজের নিরাপত্তাবোধকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
তিনি বলেন, “মানুষ যদি রাতে নির্ভয়ে চলাচল করতে না পারে, বাবা-মা যদি সন্তানের নিরাপদে ঘরে ফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে, নারী কর্মজীবীরা যদি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে শুধু অপরাধ কমেছে বলে সংখ্যাগত দাবি জনমনে আস্থা ফেরাতে পারে না।”
নিরাপত্তা এই বিশ্লেষক আরও বলেন, অপরাধের ধারণাকে শুধু খুন, চুরি বা ডাকাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বাস্তব পরিস্থিতির পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না। চাঁদাবাজি, আর্থিক অপরাধ, ব্যাংক খাতের অনিয়ম, সাইবার অপরাধ, মাদক, দলীয় সংঘাত এবং স্থানীয় পর্যায়ের দখলদারিত্বও জননিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়নে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বক্তব্য ও অবস্থান বিপরীতমুখী হলে আস্থার সংকট তৈরি হয় বলে মনে করছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদাও।
তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার ও বেসরকারি সংস্থার বক্তব্য যদি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাই শুধু পাল্টা বক্তব্য না দিয়ে সরকারকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা উচিত।
তিনি বলেন, “সরকার বলতে পারে যে আমরা বিষয়টি দেখছি, তথ্য যাচাই করছি। কিন্তু একেবারে বিপরীত অবস্থান নিলে জটিলতা তৈরি হয়। তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে সঠিক চিত্র বোঝা কঠিন হয়ে যায়।”
প্রকৃত চিত্র খুঁজতে হবে
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত চিত্র জানতে হলে দুই পক্ষের তথ্য ও বক্তব্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, “আসলে ঘটনাটা কোথায়, সেটি মাঝামাঝি জায়গায় খুঁজতে হবে। যারা পেশাদারভাবে বিষয়টি দেখেন, তাদের মতামত নিতে হবে। আবার যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে, তাদের বক্তব্যও জানতে হবে। দুই পক্ষের বক্তব্য দেখলেই বোঝা যাবে, প্রকৃত অবস্থাটা কোথায়।”
একই কথা বলছেন মেজর (অব.) নাসির। তার মতে, সরকারের আরও কার্যকর প্রতিক্রিয়া হতে পারত যে টিআইবির প্রতিবেদন সরকার নজরে নিয়েছে, সরকারি তথ্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বচ্ছভাবে প্রকৃত অপরাধচিত্র প্রকাশ করা হবে। এতে বিতর্ক কমত এবং নাগরিকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হতো।
আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কী
বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে নূর মোহাম্মদ বলেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর হঠাৎ স্বাভাবিক পরিস্থিতি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
নুরুল হুদার ভাষায়, “পরিবর্তন হয়েছে। এর পরপরই সবকিছু হঠাৎ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এটা আশা করা যায় না। সময় দিতে হবে। তারা চেষ্টা করছে, যতটুকু করা যায়, সেরা চেষ্টাই করছে।”
মেজর (অব) নাসিরও মনে করেন, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে আন্তরিক চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “এ কথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু পুলিশের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা, লজিস্টিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ, সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যাচ্ছে না।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনআস্থা নিয়ে প্রশ্ন
সরকার বলছে অপরাধ কমেছে, টিআইবি ও আসকের তথ্য বলছে উদ্বেগ রয়ে গেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রকৃত চিত্র জানতে সরকারি তথ্য, বেসরকারি পর্যবেক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তাবোধ, সবই বিবেচনায় নিতে হবে।
অপরাধের সংখ্যা কমেছে, নাকি জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগই আরও বেড়েছে? বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক এখন এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সংসদে টিআইবির তথ্য তুলে ধরে হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রকে উদ্বেগজনক বলা হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিবেদনটিকে ‘পেপার কাটিং’ নির্ভর বলে সরকারি তথ্য দেখার কথা বলেছেন। পাল্টা টিআইবি বলছে, তাদের প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করা একাধিক উৎসের ভিত্তিতে তৈরি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, টিআইবির মতো প্রতিষ্ঠানকে একেবারে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়; তথ্য ভুল হলে সরকারকে তা প্রমাণসহ চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তবে এই বিতর্কটি অপরাধের পরিসংখ্যান নয়, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, সরকারি স্বচ্ছতা এবং জনআস্থার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
রবিবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা টিআইবির তথ্য তুলে ধরে বলেছেন, হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র প্রমাণ করে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক।
বিপরীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ টিআইবির প্রতিবেদনকে ‘পেপার কাটিং’ নির্ভর বলে মন্তব্য করে বলেছেন, প্রকৃত অপরাধচিত্র জানতে হলে পুলিশ বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য দেখতে হবে।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে নাগরিক নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। সামনে এসেছে বড় ধরনের আস্থার সংকট।
সরকারের দাবি, সরকারি রেকর্ডে অপরাধের চিত্র আগের তুলনায় উন্নত। তবে টিআইবির চার্টে মার্চ-এপ্রিল সময়ে হত্যা, চুরি, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং গণসহিংসতার যে সংখ্যা উঠে এসেছে, তা জনপরিসরে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। একই সময়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আলাদা ডকুমেন্টেশনেও রাজনৈতিক সহিংসতা, কারা হেফাজতে মৃত্যু, গণপিটুনি, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুমের অভিযোগের মতো বিষয়গুলো উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে।
সমস্যার কেন্দ্রে তাই শুধু “সংখ্যা কত” এই প্রশ্নের বাইরে আরেকটি প্রশ্ন উঠছে যে কোন তথ্যকে রাষ্ট্র গ্রহণ করবে এবং কোন তথ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। নাগরিকরাই বা কোন তথ্যের ওপর আস্থা রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবাদপত্রভিত্তিক মানবাধিকার ডকুমেন্টেশনকে সরকার দুর্বল পদ্ধতি বলতে পারে; তবে সরকারি তথ্য যদি নিয়মিত, বিস্তারিত ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না থাকে, তাহলে বেসরকারি সংস্থার তথ্যই আলোচনার প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এখনকার বিতর্ক আসলে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতার বিতর্কও।
কী বলা আছে টিআইবির প্রতিবেদনে
টিআইবি মূলত সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল, এই দুই মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে মার্চে ১ হাজার ৪৮৫টি এবং এপ্রিলে ২ হাজার ১১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বড় বৃদ্ধি দেখা যায়।
ধর্ষণের ক্ষেত্রেও চিত্র উদ্বেগজনক। মার্চে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৩ থেকে ৪৮ জন এবং এপ্রিলে ৩৫ থেকে ৫৪ জন। দুই মাসে মোট ধর্ষণের শিকার ৭৮ থেকে ১০২ জন। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন। শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১ জনের মধ্যে।
গণসহিংসতা ও গণপিটুনির ক্ষেত্রেও টিআইবির তথ্যচিত্রে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায়। মার্চে গণসহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা ছিল ২৫ থেকে ৩৬টি, আর এপ্রিলে ৪৪টি। দুই মাসে এ ধরনের ঘটনা ৬৯ থেকে ৮০টির মধ্যে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩১ থেকে ৪১ জন। আহত হয়েছেন ৭০ থেকে ১২৫ জন বলে চার্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও টিআইবির তথ্যচিত্রে মার্চে ৯ থেকে ১২ জন এবং এপ্রিলে ৫ থেকে ৬ জনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে। একই চার্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে আহত ৫ জন, বিচারবহির্ভূত হত্যায় ১ জন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা অপমানের অভিযোগে গ্রেপ্তার ৭ জনের তথ্য রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে টিআইবির আরেকটি টেবিলে দেখা যায়, এই দুই মাসে চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ২২৪টি। এর মধ্যে মার্চে ১ হাজার ১৫১টি এবং এপ্রিলে ১ হাজার ৭৩টি। হত্যা হয়েছে ৬০৫টি। মার্চে ৩১৭টি এবং এপ্রিলে ২৮৮টি। ডাকাতি হয়েছে ৯০টি, রবারি বা ছিনতাই-ধর্মী অপরাধ ২৯৪টি, অপহরণ ১৯৬টি, পুলিশের ওপর হামলা ১২৯টি এবং দাঙ্গা ৩টি।
এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের উদ্বেগ অমূলক নয়। তার মতে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অপরাধচিত্রই দেখাচ্ছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
“টিআইবির নিজস্ব তদন্ত নেই”
তবে টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, “টিআইবির প্রতিবেদন শুধু পেপার কাটিংয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। প্রতিবেদনে তাদের নিজস্ব কোনো তদন্ত নেই। সেহেতু এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
টিআইবি কোনো সরকারি সংস্থা নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রকৃত অপরাধচিত্র জানতে হলে পুলিশ বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য দেখতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, টিআইবির প্রতিবেদন মূলত পত্রিকার কাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তারা নিজেরা কোনো ঘটনা তদন্ত করে না। প্রকৃত ঘটনা বিবেচনা না করে এমন প্রতিবেদন দেওয়া ঠিক নয়। তবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রয়েছে এবং এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, “আমার সামনে সেই রিপোর্টটা নেই। আমরা মাস ভিত্তিতে অপরাধের স্টেটমেন্ট করে থাকি। ডাকাতি, খুন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ তালিকাভুক্ত করা হয়।”
“কয়েকদিন আগে আমার কাছে আরেকটি রিপোর্ট এসেছিল, সেখানে দেখেছি ২০২৫ সালের তুলনায় অপরাধের চিত্র বর্তমান সরকারের সময়ে অনেক বেশি উন্নতি লাভ করেছে, অনেক অপরাধ কম,”-বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর টিআইবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সংস্থাটি কোনো তদন্ত সংস্থা নয়, এ কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন। তবে টিআইবি নিজেদের গবেষণা-নির্ভর দুর্নীতিবিরোধী, সুশাসনবিষয়ক অধিপরামর্শ ও জনসচেতনতা-ভিত্তিক সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, তাদের প্রতিবেদনকে শুধু ‘পত্রিকার কাটিং-নির্ভর’ বলা ভিত্তিহীন।
টিআইবির ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গুণগত ও পরিমাণগত তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি অনুসরণ করে তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। সংগৃহীত তথ্য বহুমাত্রিক যাচাইয়ের পর বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়।
সংস্থাটি আরও জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে তাদের প্রতিবেদনের তথ্যসূত্র ছিল বাংলাদেশ পুলিশ এবং তিনটি সুপরিচিত মানবাধিকার সংগঠন। প্রতিবেদনে এসব উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই প্রতিবেদনকে ঢালাওভাবে ‘পেপার কাটিং’ বা সংবাদপত্রের কাটিং-নির্ভর বলা অযৌক্তিক এবং মূল উদ্বেগ পাশ কাটানোর চেষ্টা।
টিআইবি আরও বলেছে, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করা অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই তথ্য গ্রহণের আগে গুণগত মান যাচাই করা হয় এবং একই বিষয়ে সরকারি, বেসরকারি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়।
সংস্থাটির বক্তব্য, সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিজেরাও অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, অবস্থান জানায় বা নিজেদের কার্যক্রম প্রচার করে। সে কারণে টিআইবির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের নামে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে ঢালাওভাবে অবমূল্যায়নের যুক্তি নেই।
সংকট শুধু সংখ্যার নয়, আস্থারও
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) নাসির মনে করেন, টিআইবির মতো প্রতিষ্ঠানকে একেবারে ভিত্তিহীন বা অগ্রহণযোগ্য বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তার মতে, টিআইবি একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। তারা নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে তথ্য প্রকাশ করে। ভুল বা মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও অর্থায়ন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এ কারণে তারা সাধারণত তথ্য প্রকাশের আগে যথেষ্ট সতর্ক থাকে।
তিনি বলেন, “টিআইবির তথ্য যদি সত্যিই ভিত্তিহীন হয়, তাহলে সরকারের উচিত ছিল সেটিকে প্রমাণসহ চ্যালেঞ্জ করা। শুধু ‘ভিত্তিহীন’ বা ‘সঠিক নয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়া আস্থার সংকট আরও বাড়াতে পারে।”
তার ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন শুধু সরকারি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের অনুভূতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধর্ষণ, ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি বা রাজনৈতিক সহিংসতার খবর নিয়মিত সামনে এলে মানুষ কাগুজে পরিসংখ্যানের চেয়ে নিজের নিরাপত্তাবোধকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
তিনি বলেন, “মানুষ যদি রাতে নির্ভয়ে চলাচল করতে না পারে, বাবা-মা যদি সন্তানের নিরাপদে ঘরে ফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে, নারী কর্মজীবীরা যদি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে শুধু অপরাধ কমেছে বলে সংখ্যাগত দাবি জনমনে আস্থা ফেরাতে পারে না।”
নিরাপত্তা এই বিশ্লেষক আরও বলেন, অপরাধের ধারণাকে শুধু খুন, চুরি বা ডাকাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বাস্তব পরিস্থিতির পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না। চাঁদাবাজি, আর্থিক অপরাধ, ব্যাংক খাতের অনিয়ম, সাইবার অপরাধ, মাদক, দলীয় সংঘাত এবং স্থানীয় পর্যায়ের দখলদারিত্বও জননিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়নে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বক্তব্য ও অবস্থান বিপরীতমুখী হলে আস্থার সংকট তৈরি হয় বলে মনে করছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদাও।
তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার ও বেসরকারি সংস্থার বক্তব্য যদি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাই শুধু পাল্টা বক্তব্য না দিয়ে সরকারকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা উচিত।
তিনি বলেন, “সরকার বলতে পারে যে আমরা বিষয়টি দেখছি, তথ্য যাচাই করছি। কিন্তু একেবারে বিপরীত অবস্থান নিলে জটিলতা তৈরি হয়। তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে সঠিক চিত্র বোঝা কঠিন হয়ে যায়।”
প্রকৃত চিত্র খুঁজতে হবে
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত চিত্র জানতে হলে দুই পক্ষের তথ্য ও বক্তব্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, “আসলে ঘটনাটা কোথায়, সেটি মাঝামাঝি জায়গায় খুঁজতে হবে। যারা পেশাদারভাবে বিষয়টি দেখেন, তাদের মতামত নিতে হবে। আবার যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে, তাদের বক্তব্যও জানতে হবে। দুই পক্ষের বক্তব্য দেখলেই বোঝা যাবে, প্রকৃত অবস্থাটা কোথায়।”
একই কথা বলছেন মেজর (অব.) নাসির। তার মতে, সরকারের আরও কার্যকর প্রতিক্রিয়া হতে পারত যে টিআইবির প্রতিবেদন সরকার নজরে নিয়েছে, সরকারি তথ্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বচ্ছভাবে প্রকৃত অপরাধচিত্র প্রকাশ করা হবে। এতে বিতর্ক কমত এবং নাগরিকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হতো।
আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কী
বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে নূর মোহাম্মদ বলেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর হঠাৎ স্বাভাবিক পরিস্থিতি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
নুরুল হুদার ভাষায়, “পরিবর্তন হয়েছে। এর পরপরই সবকিছু হঠাৎ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এটা আশা করা যায় না। সময় দিতে হবে। তারা চেষ্টা করছে, যতটুকু করা যায়, সেরা চেষ্টাই করছে।”
মেজর (অব) নাসিরও মনে করেন, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে আন্তরিক চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “এ কথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু পুলিশের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা, লজিস্টিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ, সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যাচ্ছে না।”
বিষয়: