ঈদের বাড়ি ফেরা, না ফেরার গল্প: সড়কে ঝরছে শত প্রাণ, থামছে না মৃত্যুর মিছিল
ঈদযাত্রার ১০ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৩১ জন,অতিরিক্ত ভাড়া, দুর্বল নজরদারি ও সচেতনতার অভাবে বাড়ছে ঝুঁকি।
ইকরামুল হাসান
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএমআপডেট : ০১ জুন ২০২৬, ১১:৩৭ পিএম
ঈদের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে একাধিক সড়ক দুর্ঘটনা।
ঈদ মানেই প্রিয়জনের কাছে ফেরা। দীর্ঘ সময়ের ব্যস্ততা আর দূরত্বের পর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কিছু আনন্দময় সময় কাটানোর অপেক্ষা। তাই ঈদকে ঘিরে লাখো মানুষ ছুটে যায় গ্রামের বাড়ির পথে। কারও চোখে থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ, কারও মনে থাকে সন্তান বা স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের স্বপ্ন। কিন্তু এই আনন্দযাত্রার মাঝেই প্রতি বছর সড়কপথে ঘটে অসংখ্য দুর্ঘটনা। অনেকের জন্য ঘরে ফেরার পথই হয়ে ওঠে শেষ যাত্রা, আর ঈদের আনন্দ বদলে যায় স্বজন হারানোর বেদনায়।
এবারের ঈদুল আজহার আগেও দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে ঘটে যাওয়া একের পর এক দুর্ঘটনা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। কেউ বাড়ি ফিরতে গিয়ে আর ঘরে পৌঁছাতে পারেননি, কেউ ফিরেছেন নিথর দেহ হয়ে। আর যেসব পরিবার অপেক্ষা করছিলো ঈদের সকালে প্রিয়জনের আগমনের, তাদের অনেকের ঘরে এখন শুধুই শোকের মাতম।
ঈদযাত্রার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে। রডবোঝাই একটি ট্রাক উলটে প্রাণ হারান ১৫ জন নির্মাণ শ্রমিক। আহত হন আরও অন্তত ৯ জন। স্বল্প আয়ের এসব শ্রমিক চট্টগ্রাম থেকে গাইবান্ধা যাচ্ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার স্বপ্ন নিয়েই তারা ট্রাকে উঠেছিলেন। কারণ বাসের বাড়তি ভাড়া তাদের নাগালের বাইরে ছিলো।
শুধু টাঙ্গাইল নয়, ঈদের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে একাধিক সড়ক দুর্ঘটনা। রাজধানীর নর্দ্দায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। গোপালগঞ্জে বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে প্রাণ যায় পাঁচজনের। চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে বাস ও লেগুনার সংঘর্ষে নিহত হন চারজন। ফরিদপুরের নগরকান্দা এবং কুষ্টিয়ার খোকসাতেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর গণমাধ্যমে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১এ মে থেকে ৩০এ মে পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনে সারা দেশে ২০০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩১ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৫৬১ জন। তবে হাসপাতালভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে দাবি সংগঠনটির।
মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের ১৫ দিনের হতাহতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। তার মতে, সড়ক-মহাসড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে যানবাহনের গতি বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি নিরাপত্তা ও যাত্রী সচেতনতা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহবুব আলম তালুকদার মনে করেন, দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় এখনো কার্যকর তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
তার মতে, দেশে কত মানুষ ঈদে ভ্রমণ করছেন, কোন চালক কতক্ষণ গাড়ি চালাচ্ছেন, কোন পথে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে এসব বিষয়ে সমন্বিত ডেটাবেজ নেই। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রযুক্তির ব্যবহারও সীমিত রয়ে গেছে।
তিনি আলাপ-কে জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যানবাহন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুললে ট্রাকে যাত্রী পরিবহন, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল কিংবা নিয়ম লঙ্ঘনের মতো অপরাধ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতো। এতে আইন প্রয়োগও আরও কার্যকর হতে পারতো।
তবে প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি সচেতনতার ঘাটতিকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, চালক, যাত্রী, পথচারী থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক, সকল পর্যায়ে নিরাপদ সড়ক বিষয়ে জ্ঞানের অভাব রয়েছে।
অন্যদিকে নিরাপদ সড়ক চাই-এর মহাসচিব লিটন এরশাদ আলাপ-কে জানিয়েছেন, ঈদের আগে প্রশাসন ও পরিবহন খাতের বিভিন্ন অংশীজনকে নিয়ে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি থেকে যায়।
লিটন এরশাদ বলেন, দেশের বিস্তীর্ণ মহাসড়ক নেটওয়ার্কের তুলনায় হাইওয়ে পুলিশের জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা এখনও অপর্যাপ্ত। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, টাঙ্গাইলের ট্রাক দুর্ঘটনার পেছনেও অতিরিক্ত ভাড়া ও পরিবহনের কৃত্রিম সংকট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ যখন বাসের টিকিট কিনতে পারেন না, তখন বাধ্য হয়ে তারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনে যাত্রা করেন। আর সেই সিদ্ধান্ত অনেক সময় তাদের জীবনের শেষ যাত্রায় পরিণত হয়।
এদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের ভাষ্যমতে, ঈদের সময় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তার মতে, একসঙ্গে বিপুল মানুষের যাতায়াত, পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহন, চালকদের ক্লান্তি এবং দুর্বল নজরদারি এই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সড়কের ওপর চাপ কমাতে রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব বলেও আলাপ-কে জানান তিনি।
যে ঈদ আনন্দ আর ভালোবাসার বার্তা নিয়ে আসে, সেই ঈদই অনেক পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে শোকের স্মৃতি। টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের সন্তানরা হয়তো এখনো অপেক্ষা করছে তার বাবার জন্য। কোনো মা হয়তো ঈদের রান্না তুলে রেখেছিলেন ছেলের জন্য। কোনো স্ত্রী হয়তো ভেবেছিলেন, স্বামী ফিরে এলে একসঙ্গে কুরবানির ঈদ উদযাপন করবেন।কিন্তু তাদের সেই অপেক্ষার আর কোনো শেষ নেই।
বাংলাদেশে প্রতি ঈদে সড়কে ঝরে পড়া প্রাণের সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এর পেছনে রয়েছে শত শত পরিবারের ভাঙা স্বপ্ন, অনিশ্চিত ভবিষ্যত এবং আজীবনের বেদনা। আর সেই বাস্তবতা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে ঈদযাত্রা কি এখনো নিরাপদ, নাকি ঘরে ফেরার পথই ক্রমশ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে?
ঈদের বাড়ি ফেরা, না ফেরার গল্প: সড়কে ঝরছে শত প্রাণ, থামছে না মৃত্যুর মিছিল
ঈদযাত্রার ১০ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৩১ জন,অতিরিক্ত ভাড়া, দুর্বল নজরদারি ও সচেতনতার অভাবে বাড়ছে ঝুঁকি।
ঈদ মানেই প্রিয়জনের কাছে ফেরা। দীর্ঘ সময়ের ব্যস্ততা আর দূরত্বের পর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কিছু আনন্দময় সময় কাটানোর অপেক্ষা। তাই ঈদকে ঘিরে লাখো মানুষ ছুটে যায় গ্রামের বাড়ির পথে। কারও চোখে থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ, কারও মনে থাকে সন্তান বা স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের স্বপ্ন। কিন্তু এই আনন্দযাত্রার মাঝেই প্রতি বছর সড়কপথে ঘটে অসংখ্য দুর্ঘটনা। অনেকের জন্য ঘরে ফেরার পথই হয়ে ওঠে শেষ যাত্রা, আর ঈদের আনন্দ বদলে যায় স্বজন হারানোর বেদনায়।
এবারের ঈদুল আজহার আগেও দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে ঘটে যাওয়া একের পর এক দুর্ঘটনা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। কেউ বাড়ি ফিরতে গিয়ে আর ঘরে পৌঁছাতে পারেননি, কেউ ফিরেছেন নিথর দেহ হয়ে। আর যেসব পরিবার অপেক্ষা করছিলো ঈদের সকালে প্রিয়জনের আগমনের, তাদের অনেকের ঘরে এখন শুধুই শোকের মাতম।
ঈদযাত্রার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে। রডবোঝাই একটি ট্রাক উলটে প্রাণ হারান ১৫ জন নির্মাণ শ্রমিক। আহত হন আরও অন্তত ৯ জন। স্বল্প আয়ের এসব শ্রমিক চট্টগ্রাম থেকে গাইবান্ধা যাচ্ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার স্বপ্ন নিয়েই তারা ট্রাকে উঠেছিলেন। কারণ বাসের বাড়তি ভাড়া তাদের নাগালের বাইরে ছিলো।
শুধু টাঙ্গাইল নয়, ঈদের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে একাধিক সড়ক দুর্ঘটনা। রাজধানীর নর্দ্দায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। গোপালগঞ্জে বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে প্রাণ যায় পাঁচজনের। চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে বাস ও লেগুনার সংঘর্ষে নিহত হন চারজন। ফরিদপুরের নগরকান্দা এবং কুষ্টিয়ার খোকসাতেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর গণমাধ্যমে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১এ মে থেকে ৩০এ মে পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনে সারা দেশে ২০০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩১ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৫৬১ জন। তবে হাসপাতালভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে দাবি সংগঠনটির।
মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের ১৫ দিনের হতাহতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। তার মতে, সড়ক-মহাসড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে যানবাহনের গতি বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি নিরাপত্তা ও যাত্রী সচেতনতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার পেছনে শুধু চালকের ভুল নয়, রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহবুব আলম তালুকদার মনে করেন, দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় এখনো কার্যকর তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
তার মতে, দেশে কত মানুষ ঈদে ভ্রমণ করছেন, কোন চালক কতক্ষণ গাড়ি চালাচ্ছেন, কোন পথে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে এসব বিষয়ে সমন্বিত ডেটাবেজ নেই। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রযুক্তির ব্যবহারও সীমিত রয়ে গেছে।
তিনি আলাপ-কে জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যানবাহন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুললে ট্রাকে যাত্রী পরিবহন, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল কিংবা নিয়ম লঙ্ঘনের মতো অপরাধ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতো। এতে আইন প্রয়োগও আরও কার্যকর হতে পারতো।
তবে প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি সচেতনতার ঘাটতিকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, চালক, যাত্রী, পথচারী থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক, সকল পর্যায়ে নিরাপদ সড়ক বিষয়ে জ্ঞানের অভাব রয়েছে।
অন্যদিকে নিরাপদ সড়ক চাই-এর মহাসচিব লিটন এরশাদ আলাপ-কে জানিয়েছেন, ঈদের আগে প্রশাসন ও পরিবহন খাতের বিভিন্ন অংশীজনকে নিয়ে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি থেকে যায়।
লিটন এরশাদ বলেন, দেশের বিস্তীর্ণ মহাসড়ক নেটওয়ার্কের তুলনায় হাইওয়ে পুলিশের জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা এখনও অপর্যাপ্ত। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, টাঙ্গাইলের ট্রাক দুর্ঘটনার পেছনেও অতিরিক্ত ভাড়া ও পরিবহনের কৃত্রিম সংকট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ যখন বাসের টিকিট কিনতে পারেন না, তখন বাধ্য হয়ে তারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনে যাত্রা করেন। আর সেই সিদ্ধান্ত অনেক সময় তাদের জীবনের শেষ যাত্রায় পরিণত হয়।
এদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের ভাষ্যমতে, ঈদের সময় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তার মতে, একসঙ্গে বিপুল মানুষের যাতায়াত, পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহন, চালকদের ক্লান্তি এবং দুর্বল নজরদারি এই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সড়কের ওপর চাপ কমাতে রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব বলেও আলাপ-কে জানান তিনি।
যে ঈদ আনন্দ আর ভালোবাসার বার্তা নিয়ে আসে, সেই ঈদই অনেক পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে শোকের স্মৃতি। টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের সন্তানরা হয়তো এখনো অপেক্ষা করছে তার বাবার জন্য। কোনো মা হয়তো ঈদের রান্না তুলে রেখেছিলেন ছেলের জন্য। কোনো স্ত্রী হয়তো ভেবেছিলেন, স্বামী ফিরে এলে একসঙ্গে কুরবানির ঈদ উদযাপন করবেন।কিন্তু তাদের সেই অপেক্ষার আর কোনো শেষ নেই।
বাংলাদেশে প্রতি ঈদে সড়কে ঝরে পড়া প্রাণের সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এর পেছনে রয়েছে শত শত পরিবারের ভাঙা স্বপ্ন, অনিশ্চিত ভবিষ্যত এবং আজীবনের বেদনা। আর সেই বাস্তবতা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে ঈদযাত্রা কি এখনো নিরাপদ, নাকি ঘরে ফেরার পথই ক্রমশ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে?
বিষয়: