খাবার-দাবার নিয়ে ককরোচদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ, জোট ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টায় বিজেপি

দিল্লির যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলে কয়েক মিনিট পরপরই পৌঁছাচ্ছেন খাবার সরবরাহকারী ডেলিভারি পার্সনরা। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর পাঁচ দফা দাবি। ককরোচদের আন্দোলন বড় হচ্ছে। 

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৭:০১ পিএম

ভারতে শিক্ষা সংস্কার ও প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছে, তরুণদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে সাধারণ মানুষ ও বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলগুলোও। 

দিল্লির যন্তর মন্তরের প্রতিবাদ কর্মসূচির ব্যারিকেডের বাইরে ককরোচদের পাঠানো হচ্ছে পিৎজা, বার্গার, মোমোসহ নানা ধরনের খাবার। এসব পৌঁছে দেওয়ার জন্য কয়েক মিনিট পরপরই আসছেন ডেলিভারি পার্সন। সারাদেশের শত শত মানুষ অনলাইনে আন্দোলনকারীদের জন্য এসব খাবারের অর্ডার পাঠাচ্ছেন।

১৮ বছর বয়সি আয়ু জ্যাকব নামে এক তরুণ ২০ বার পিৎজা পৌঁছে দিয়েছেন। এর মধ্যে চারটি অর্ডার সরাসরি আমেরিকা থেকে এসেছে বলে হিন্দুস্তান টাইমসকে জানিয়েছেন তিনি। 

জ্যাকব বলেন, মঙ্গলবার একবারে ৮০টি পিৎজার একটি বড় অর্ডারও তারা পেয়েছিলেন। চাপ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত রেস্তোরাঁর ম্যানেজার নিজেই খাবার পৌঁছে দিয়েছেন।

বুধবার সকালে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঁচটি দাবি উত্থাপন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে হওয়া সব মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানান তিনি।

তার দাবির মধ্যে আরও রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং বিষয়টি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করা। পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সংস্কার করা দাবি তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা।

তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকে ‘পলিটিক্যালি মোটিভেটেড’ বলছে সরকারি সূত্রগুলো। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরপরই শিক্ষামন্ত্রী একাধিক সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। 

বিক্ষোভের কারণে বুধবার সকালে দিল্লি মেট্রোর ১৬টি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 

পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ‘নিরাপত্তার স্বার্থে’ এসব স্টেশন বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন। 

এর আগে সোমবারও কয়েকটি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তদন্তে নেমেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৩ জনেরও বেশি অভিযুক্তকে। 

সরকার জানিয়েছে, নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।

যদিও ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান দাবি করেছেন, রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। 

এক্স হ্যান্ডেলের এক পোস্টে শিক্ষামন্ত্রী লিখেছেন, “রাহুল গান্ধী নির্লজ্জভাবে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে সংসদের অধিবেশনকে অচল করার চেষ্টা করছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছেন এবং প্রচলিত নিরাপত্তা বিধিও উপেক্ষা করেছেন।” 

“সরকার যখন বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে, তখনও কংগ্রেস গণতান্ত্রিক বিতর্কের বদলে রাজনৈতিক নাটক বেছে নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য কখনোই শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান ছিল না; বরং রাজনৈতিক শিরোনাম তৈরি করা।”

প্রশ্ন ফাঁস ও ককরোচদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে বুধবার প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। 

“প্রশ্নফাঁস মহাপাপ। এটা আটকানোর দায়িত্ব গোটা দেশের" বলেছেন মোদী। 

বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ’র সংসদীয় দলের বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। 

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে রিজিজু বলেন, “প্রধানমন্ত্রী এনডিএ-র শরিক দলগুলোকে সংসদীয় কাজকর্মে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বিরোধী দলগুলোকে সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে দেশের ভবিষ্যৎ এবং তরুণদের কল্যাণে কাজ করা সমস্ত সংসদ সদস্যের একটি যৌথ দায়িত্ব।” 

হাসপাতালে এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষাবিদ এবং পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। টানা ২৫ দিন ধরে অনশনরত ওয়াংচুকের সাথে দেখা করেছেন গুরুগ্রামের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিং।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে ওয়াংচুককে আশ্বস্ত করে বলা হয় যে, শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার। একই সাথে শিক্ষার্থীরা যেন সরকারের ওপর আস্থা রাখে এবং পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাদের প্রতি এই আবেদন জানানোর জন্য ওয়াংচুকের কাছে অনুরোধ জানান দুই মন্ত্রী।

প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারিতে প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনের রেশ এখন পৌঁছে গেছে ভারতের বাইরেও। 

পিটিআই সূত্রে আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, অনশনরত ওয়াংচুকের প্রতি সংহতি জানিয়ে আমেরিকার একটি ‘অ্যাডভোকেসি গ্রুপের’ সদস্যরা নিউ ইয়র্ক এবং সান হোসে শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

আটকের কয়েকঘণ্টা পর ছাড়া পেলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা  

প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও কংগ্রেসের একাধিক শীর্ষ নেতাকে মঙ্গলবার বিকালে আটক করে পুলিশ। আটকের কয়েকঘণ্টা পর মুক্তি পেয়ে যান তিনি। তার সঙ্গে মুক্তি পান প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও।

ভারতীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, তাকে আটক করার পরেই মন্দির মার্গ থানায় গিয়েছিলেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। ছত্রসাল স্টেডিয়াম থেকে রাহুল গান্ধীকে মুক্তি দেওয়ার পর থানা ছাড়েন তিনি। রাত ১০টা নাগাদ আটক করা সমস্ত কংগ্রেস নেতাদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়। 

আটকের কয়েকঘণ্টা পর ছাড়া পেলেন রাহুল প্রিয়াঙ্কা

মঙ্গলবার দুপুরে ভারতের নয়াদিল্লিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের সরকারি বাসভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবন অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন কংগ্রেস নেতারা।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে পৌঁছে রাহুল গান্ধী সড়কে বসে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। পুলিশ বারবার সরে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। দীর্ঘ সময় ধরে অচলাবস্থার পর পুলিশ তাকে জোরপূর্বক সরিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় তার নাকে আঘাত লেগে রক্তপাত হয়। পরে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গেসহ আরও অনেক কংগ্রেস নেতা-কর্মীকেও আটক করে বাসে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।

পুলিশি অভিযানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, "এটাই আজকের ভারতের গণতন্ত্র।"

বিক্ষোভ শুরুর আগে সামাজিক মাধ্যমে রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা মানে দেশের প্রতিটি পরিবারের ওপর হামলা। 

তিনি দাবি করেন, সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের 'নৃশংসতা' নিয়ে কোনো জবাবদিহি করতে চায় না। 

একই সঙ্গে দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। সূত্রের বরাতে এনডিটিভি জানায়, দাবি পূরণ না হলে রাতভর অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিলো তার।

বর্ষাকালীন অধিবেশনের টানা দ্বিতীয় দিনও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ইস্যুতে ভারতীয় সংসদে অচলাবস্থা দেখা দেয়। 

কংগ্রেসের অভিযোগ, তারা শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে চাইলেও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পায়নি। 

বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, ‘’ “সংসদে যদি বিরোধী দলের কণ্ঠই বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক বিতর্ক কোথায় হবে?”

এর আগে সোমবার ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে সংসদ অভিমুখে হওয়া বিক্ষোভে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। 

আন্দোলনকারীদের দাবি, এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হন। তবে দিল্লি পুলিশের ভাষ্য, বিক্ষোভকারীদের সহিংস আচরণ, পাথর নিক্ষেপ ও পুলিশি যানবাহন ভাঙচুরের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হয়। এ ঘটনায় ১১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলেও দাবি পুলিশের।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এনডিএ সংসদীয় দলের বৈঠকে বলেন, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা প্রতিরোধ করা জাতীয় দায়িত্ব। অভিযোগ ওঠার পরপরই সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।