পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বেকারত্বের ক্ষোভে উত্তাল দিল্লি; পুলিশের দমন আন্দোলনকে দিচ্ছে বৃহত্তর রাজনৈতিক চরিত্র। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল থাকলেও এখনো সরকার পতনের পর্যায়ে যায়নি ভারতের এই জেন-জি আন্দোলন।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ০১:১৭ পিএমআপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৩ পিএম
সোনম ওয়াংচুকের অনশনে আবার চাঙা হয়ে উঠেছে ককরোচ আন্দোলন
একটি অনলাইন রসিকতা মাত্র দুই মাসের মধ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক অস্বস্তিতে পরিণত হয়েছে। যে তরুণদের একসময় ‘ককরোচ’ ও ‘পরজীবী’ হিসেবে অবজ্ঞা করার অভিযোগ উঠেছিল, এখন সেই পরিচয়কে প্রতিবাদের প্রতীকে রূপ দিয়ে দিল্লির রাজপথে নেমেছেন তারা।
তাদের দাবি, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিতে হবে সরকারকে, পদত্যাগ করতে হবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে এবং সংস্কার করতে হবে ভারতের সংকটাপন্ন শিক্ষাব্যবস্থা।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির ডাকে সোমবার হাজার হাজার শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও অভিভাবক দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে যাত্রা করার চেষ্টা করেন। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের পথ আটকে দেয়। একপর্যায়ে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনা ঘটে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ ‘নির্মম’ বলপ্রয়োগ করেছে। পুলিশ অবশ্য পাল্টা দাবি করেছে, কিছু বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড ভেঙে অগ্রসর হওয়া এবং সহিংসতায় জড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।
দিল্লির এই বিক্ষোভ ভারতের সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় সরকারবিরোধী সমাবেশে পরিণত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের সংসদ এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয় এবং কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার খবরও পাওয়া গেছে।
পুলিশের বাধা সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা তরুণেরা বিক্ষোভস্থলে জড়ো হতে থাকেন।
যেভাবে আন্দোলনের শুরু
‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সূচনা হয়েছিল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবে। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে সব ‘ককরোচ’ যদি একত্রিত হয়, তাহলে কী ঘটবে?
‘ককরোচ’ শব্দটি দ্রুত বেকার ও হতাশ তরুণদের আত্মপরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়।
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির নামের আদলে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ প্রথমে মিম, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট ও ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পায়। পরে সেই অনলাইন সমর্থন বাস্তব রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলনের কেন্দ্রীয় স্লোগান, “যাদের রাষ্ট্র গণনায় ধরেনি, তাদের রাজনৈতিক দল।”
প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে বিস্ফোরণ
নতুন করে সিজেপির আন্দোলনের মূল কারণ ছিলো মেডিকেল পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ।
মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নেওয়া ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।
লাখ লাখ পরীক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। অনেক পরিবার কোচিং ও শিক্ষার পেছনে সঞ্চয় শেষ করে দেন, ঋণ নেন।
অথচ প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা পরীক্ষা প্রক্রিয়ার অনিয়মের কারণে পরীক্ষা বাতিল বা পুনরায় নেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক শ্রম সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সিজেপি বলছে, এসব ঘটনায় শুধু নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তা বা প্রশ্নপত্র পাচারকারী চক্রকে দায়ী করলে চলবে না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। তাদের এক দফা তাৎক্ষণিক দাবি হচ্ছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা, প্রশ্নপত্র ফাঁসের স্বাধীন তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোর জন্য প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনে নতুন প্রাণ
ককরোচদের এই আন্দোলন আরও চাঙা হয়ে ওঠে প্রকৌশলী, উদ্ভাবক ও শিক্ষা আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশনের পর। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেন।
অনশনের ২০তম দিনে পুলিশ তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ জানায়, আদালতের নির্দেশনা এবং তার স্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনেই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
তবে ওয়াংচুকের পরিবার ও আন্দোলনকারীরা ঘটনাটিকে বেআইনি আটক এবং আন্দোলন দুর্বল করার চেষ্টা বলে অভিহিত করেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে সংসদ অভিমুখে মিছিলের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতা, নাগরিক অধিকারকর্মী এবং শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে সক্রিয় ব্যক্তিরাও সিজেপির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
সরকারের সঙ্গে সিজেপি নেতাদের সংক্ষিপ্ত বৈঠক হলেও আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
ফলে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সিজেপি প্রেসিডেন্ট অভিজিৎ দীপকে। তিনি বলেছেন, পরিবর্তন এক দিনে আসে না এবং এটি দীর্ঘ লড়াই।
বাংলাদেশ-নেপালের পর এবার ভারত?
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তরুণদের এমন আন্দোলনে পতন হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।
সেই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ককরোচ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মিল হলো, দুটিই একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা ও চাকরিসংক্রান্ত দাবি থেকে শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ, গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ এবং সরকারের অনমনীয় অবস্থান আন্দোলনটিকে দ্রুত বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত করে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। জাতিসংঘের তদন্তে সাবেক সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্ট অংশের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে আসে।
বাংলাদেশে অবমাননার অর্থে ব্যবহৃত ‘রাজাকার’ শব্দকে আন্দোলনকারীরা বিদ্রূপ ও প্রতিবাদের স্লোগানে রূপ দিয়েছিলেন। ভারতে একইভাবে ‘ককরোচ’ পরিচয়টি অপমান থেকে রাজনৈতিক সংহতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের আন্দোলনের মতো ভারতে এখনো সরকার পদত্যাগের সুসংগঠিত এক দফা দাবি ওঠেনি।
জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা চিন্তক ফরহাদ মজহার অবশ্য মনে করেন ভারতের ককরোচ আন্দোলনে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভূমিকা রয়েছে।
আলাপকে তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের গান শুনছে দিল্লি।”
বাংলাদেশ ছাড়াও নেপালের ২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলনের সঙ্গেও মিল রয়েছে ভারতের ককরোচ আন্দোলনের।
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত ছিলো তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ। তবে তার আগে থেকেই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক পরিবারের বিলাসী জীবন এবং তরুণদের সুযোগের অভাব নিয়ে ক্ষোভ ছিলো।
সেই ক্ষোভই মূলত দ্রুত রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের পর আন্দোলন আরও বিস্ফোরক হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন।
ভারতেও অনলাইন ব্যঙ্গ থেকে আন্দোলনের জন্ম। তরুণেরা মিম, হ্যাশট্যাগ ও ভিডিওর মাধ্যমে এক হয়েছেন।
তারও আগে সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছিলো শ্রীলঙ্কায়। ২০২২ সালের ‘আরাগালয়া’ নামের ওই আন্দোলনের ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং মূল্যস্ফীতি দেশের প্রায় প্রতিটি শ্রেণির মানুষকে আক্রান্ত করেছিল।
শিক্ষার্থী ও তরুণদের পাশাপাশি শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী ও সাধারণ পরিবার ব্যাপকভাবে আন্দোলনে যুক্ত হয়।
সেই আন্দোলনের চাপে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়েন এবং পদত্যাগ করেন।
ভারতের ককরোচ আন্দোলন এখনো মূলত শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও তাদের পরিবারকেন্দ্রিক।
তবে কৃষক, শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী এবং বিস্তৃত মধ্যবিত্ত শ্রেণি সক্রিয়ভাবে যুক্ত না হলে এটি শ্রীলঙ্কার মতো সর্বজনীন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশের আন্দোলনে অবশ্য প্রথমে শিক্ষার্থীরা শুরু করলেও এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং পতন হয় সরকারের।
আন্দোলন কোন দিকে যাচ্ছে
এখন পর্যন্ত ভারতের আন্দোলনের দাবি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষা সংস্কার। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ককরোচ আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সরকারের প্রতিক্রিয়াই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে এর পরবর্তী গতিপথ।
সরকার যদি পরীক্ষার অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আন্দোলনটি একটি সফল শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা আলোচনার মাধ্যমে আংশিক দাবি মেনে নেওয়া হলে রাজপথের উত্তাপও কমতে পারে।
তবে আন্দোলনকারীদের দাবি উপেক্ষা, নেতাদের গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে পারে।
বাংলাদেশ ও নেপালের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় দমন কখনো কখনো আন্দোলন দমন না করে বরং তার সামাজিক ভিত্তি বাড়িয়ে দেয়। পুলিশি সহিংসতার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়লে নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রিয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও নৈতিক ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
বিজেপি নেতা জে নদ্দার সঙ্গে সোমবার কথা বলেন সিজেপি প্রেসিডেন্ট অভিজিৎ। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, সরকার আন্দোলন দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “আমরা যদি চাইতাম, বাংলাদেশ ও নেপালের মতো পরিণতি হতো ভারতের। কিন্তু আমরা হতে দেইনি।”
যদি ভারত সরকার আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ তুলেছে।
আর আন্দোলনকারীদের বড় অংশ নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে একটি স্বাধীন যুবশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চান।
তবে এই মুহূর্তে ককরোচ আন্দোলন সরকার পতনের গণ-অভ্যুত্থান না হলেও যেকোনো সময় এটি বড় আকার ধারণ করতে পারে।
দিল্লির রাজপথে এখন যে প্রশ্নটি উচ্চারিত হচ্ছে, তা শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন কি না সেটি নয়। এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি তার ক্রমবর্ধমান তরুণ জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ শুনবে, নাকি দমন ও অবজ্ঞার মাধ্যমে আরেকটি দক্ষিণ এশীয় বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করবে।
(দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ও হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে)
'গণঅভ্যুত্থানের গান শুনছে দিল্লি'
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বেকারত্বের ক্ষোভে উত্তাল দিল্লি; পুলিশের দমন আন্দোলনকে দিচ্ছে বৃহত্তর রাজনৈতিক চরিত্র। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল থাকলেও এখনো সরকার পতনের পর্যায়ে যায়নি ভারতের এই জেন-জি আন্দোলন।
একটি অনলাইন রসিকতা মাত্র দুই মাসের মধ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক অস্বস্তিতে পরিণত হয়েছে। যে তরুণদের একসময় ‘ককরোচ’ ও ‘পরজীবী’ হিসেবে অবজ্ঞা করার অভিযোগ উঠেছিল, এখন সেই পরিচয়কে প্রতিবাদের প্রতীকে রূপ দিয়ে দিল্লির রাজপথে নেমেছেন তারা।
তাদের দাবি, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিতে হবে সরকারকে, পদত্যাগ করতে হবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে এবং সংস্কার করতে হবে ভারতের সংকটাপন্ন শিক্ষাব্যবস্থা।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির ডাকে সোমবার হাজার হাজার শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও অভিভাবক দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে যাত্রা করার চেষ্টা করেন। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের পথ আটকে দেয়। একপর্যায়ে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনা ঘটে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ ‘নির্মম’ বলপ্রয়োগ করেছে। পুলিশ অবশ্য পাল্টা দাবি করেছে, কিছু বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড ভেঙে অগ্রসর হওয়া এবং সহিংসতায় জড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।
দিল্লির এই বিক্ষোভ ভারতের সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় সরকারবিরোধী সমাবেশে পরিণত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের সংসদ এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয় এবং কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার খবরও পাওয়া গেছে।
পুলিশের বাধা সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা তরুণেরা বিক্ষোভস্থলে জড়ো হতে থাকেন।
যেভাবে আন্দোলনের শুরু
‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সূচনা হয়েছিল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবে। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে সব ‘ককরোচ’ যদি একত্রিত হয়, তাহলে কী ঘটবে?
‘ককরোচ’ শব্দটি দ্রুত বেকার ও হতাশ তরুণদের আত্মপরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়।
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির নামের আদলে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ প্রথমে মিম, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট ও ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পায়। পরে সেই অনলাইন সমর্থন বাস্তব রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলনের কেন্দ্রীয় স্লোগান, “যাদের রাষ্ট্র গণনায় ধরেনি, তাদের রাজনৈতিক দল।”
প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে বিস্ফোরণ
নতুন করে সিজেপির আন্দোলনের মূল কারণ ছিলো মেডিকেল পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ।
মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নেওয়া ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।
লাখ লাখ পরীক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। অনেক পরিবার কোচিং ও শিক্ষার পেছনে সঞ্চয় শেষ করে দেন, ঋণ নেন।
অথচ প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা পরীক্ষা প্রক্রিয়ার অনিয়মের কারণে পরীক্ষা বাতিল বা পুনরায় নেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক শ্রম সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সিজেপি বলছে, এসব ঘটনায় শুধু নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তা বা প্রশ্নপত্র পাচারকারী চক্রকে দায়ী করলে চলবে না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। তাদের এক দফা তাৎক্ষণিক দাবি হচ্ছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা, প্রশ্নপত্র ফাঁসের স্বাধীন তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোর জন্য প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনে নতুন প্রাণ
ককরোচদের এই আন্দোলন আরও চাঙা হয়ে ওঠে প্রকৌশলী, উদ্ভাবক ও শিক্ষা আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশনের পর। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেন।
অনশনের ২০তম দিনে পুলিশ তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ জানায়, আদালতের নির্দেশনা এবং তার স্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনেই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
তবে ওয়াংচুকের পরিবার ও আন্দোলনকারীরা ঘটনাটিকে বেআইনি আটক এবং আন্দোলন দুর্বল করার চেষ্টা বলে অভিহিত করেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে সংসদ অভিমুখে মিছিলের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতা, নাগরিক অধিকারকর্মী এবং শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে সক্রিয় ব্যক্তিরাও সিজেপির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
সরকারের সঙ্গে সিজেপি নেতাদের সংক্ষিপ্ত বৈঠক হলেও আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
ফলে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সিজেপি প্রেসিডেন্ট অভিজিৎ দীপকে। তিনি বলেছেন, পরিবর্তন এক দিনে আসে না এবং এটি দীর্ঘ লড়াই।
বাংলাদেশ-নেপালের পর এবার ভারত?
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তরুণদের এমন আন্দোলনে পতন হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।
সেই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ককরোচ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মিল হলো, দুটিই একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা ও চাকরিসংক্রান্ত দাবি থেকে শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ, গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ এবং সরকারের অনমনীয় অবস্থান আন্দোলনটিকে দ্রুত বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত করে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। জাতিসংঘের তদন্তে সাবেক সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্ট অংশের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে আসে।
বাংলাদেশে অবমাননার অর্থে ব্যবহৃত ‘রাজাকার’ শব্দকে আন্দোলনকারীরা বিদ্রূপ ও প্রতিবাদের স্লোগানে রূপ দিয়েছিলেন। ভারতে একইভাবে ‘ককরোচ’ পরিচয়টি অপমান থেকে রাজনৈতিক সংহতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের আন্দোলনের মতো ভারতে এখনো সরকার পদত্যাগের সুসংগঠিত এক দফা দাবি ওঠেনি।
জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা চিন্তক ফরহাদ মজহার অবশ্য মনে করেন ভারতের ককরোচ আন্দোলনে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভূমিকা রয়েছে।
আলাপকে তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের গান শুনছে দিল্লি।”
বাংলাদেশ ছাড়াও নেপালের ২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলনের সঙ্গেও মিল রয়েছে ভারতের ককরোচ আন্দোলনের।
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত ছিলো তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ। তবে তার আগে থেকেই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক পরিবারের বিলাসী জীবন এবং তরুণদের সুযোগের অভাব নিয়ে ক্ষোভ ছিলো।
সেই ক্ষোভই মূলত দ্রুত রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের পর আন্দোলন আরও বিস্ফোরক হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন।
ভারতেও অনলাইন ব্যঙ্গ থেকে আন্দোলনের জন্ম। তরুণেরা মিম, হ্যাশট্যাগ ও ভিডিওর মাধ্যমে এক হয়েছেন।
তারও আগে সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছিলো শ্রীলঙ্কায়। ২০২২ সালের ‘আরাগালয়া’ নামের ওই আন্দোলনের ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং মূল্যস্ফীতি দেশের প্রায় প্রতিটি শ্রেণির মানুষকে আক্রান্ত করেছিল।
শিক্ষার্থী ও তরুণদের পাশাপাশি শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী ও সাধারণ পরিবার ব্যাপকভাবে আন্দোলনে যুক্ত হয়।
সেই আন্দোলনের চাপে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়েন এবং পদত্যাগ করেন।
ভারতের ককরোচ আন্দোলন এখনো মূলত শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও তাদের পরিবারকেন্দ্রিক।
তবে কৃষক, শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী এবং বিস্তৃত মধ্যবিত্ত শ্রেণি সক্রিয়ভাবে যুক্ত না হলে এটি শ্রীলঙ্কার মতো সর্বজনীন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশের আন্দোলনে অবশ্য প্রথমে শিক্ষার্থীরা শুরু করলেও এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং পতন হয় সরকারের।
আন্দোলন কোন দিকে যাচ্ছে
এখন পর্যন্ত ভারতের আন্দোলনের দাবি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষা সংস্কার। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ককরোচ আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সরকারের প্রতিক্রিয়াই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে এর পরবর্তী গতিপথ।
সরকার যদি পরীক্ষার অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আন্দোলনটি একটি সফল শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা আলোচনার মাধ্যমে আংশিক দাবি মেনে নেওয়া হলে রাজপথের উত্তাপও কমতে পারে।
তবে আন্দোলনকারীদের দাবি উপেক্ষা, নেতাদের গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে পারে।
বাংলাদেশ ও নেপালের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় দমন কখনো কখনো আন্দোলন দমন না করে বরং তার সামাজিক ভিত্তি বাড়িয়ে দেয়। পুলিশি সহিংসতার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়লে নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রিয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও নৈতিক ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
বিজেপি নেতা জে নদ্দার সঙ্গে সোমবার কথা বলেন সিজেপি প্রেসিডেন্ট অভিজিৎ। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, সরকার আন্দোলন দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “আমরা যদি চাইতাম, বাংলাদেশ ও নেপালের মতো পরিণতি হতো ভারতের। কিন্তু আমরা হতে দেইনি।”
যদি ভারত সরকার আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ তুলেছে।
আর আন্দোলনকারীদের বড় অংশ নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে একটি স্বাধীন যুবশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চান।
তবে এই মুহূর্তে ককরোচ আন্দোলন সরকার পতনের গণ-অভ্যুত্থান না হলেও যেকোনো সময় এটি বড় আকার ধারণ করতে পারে।
দিল্লির রাজপথে এখন যে প্রশ্নটি উচ্চারিত হচ্ছে, তা শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন কি না সেটি নয়। এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি তার ক্রমবর্ধমান তরুণ জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ শুনবে, নাকি দমন ও অবজ্ঞার মাধ্যমে আরেকটি দক্ষিণ এশীয় বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করবে।
(দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ও হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে)
বিষয়: