'অপ্রতিরোধ্য' মমতা কি এখন নিজ দলেই চ্যালেঞ্জের মুখে?

এখনো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি তৃণমূল। দলটির হাতে এখনো জনসমর্থন, বিধায়ক ও সংসদ সদস্য রয়েছে। তবে সমস্যা হলো, ক্ষমতা হারানোর পর দলটি নিজেকে পুনর্গঠনের বদলে যেন ভেতর থেকেই ভেঙে পড়ছে।

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য নাম। টানা ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে তিনি শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বদলে দিয়েছিলেন ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতির মানচিত্র। তবে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে সর্বশেষ নির্বাচনে হেরে যায় মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। এই পরাজয় এমন এক সংকটে ফেলেছে, যা দলটির অস্তিত্ব নিয়েই তুলেছে প্রশ্ন।

মে মাসের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)’র বড় জয়ের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। এরপর থেকেই দলটির ভেতরে দেখা দেয় বিদ্রোহ, ভাঙন এবং উঠে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন। 

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তৃণমূলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিধায়ক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। অভিষেককে দীর্ঘদিন ধরেই মমতার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়।

তবে তৃণমূল এখনো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। দলটির হাতে এখনো জনসমর্থন, বিধায়ক ও সংসদ সদস্য রয়েছে। তবে সমস্যা হলো, ক্ষমতা হারানোর পর দলটি নিজেকে পুনর্গঠনের বদলে যেন ভেতর থেকেই ভেঙে পড়ছে।

বিধানসভা থেকে সংকট পৌঁছাল দিল্লিতে

তৃণমূলের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রাজ্য বিধানসভা থেকে। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দলের বড় অংশের বিধায়করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

বিদ্রোহী নেতারা দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আগের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূল বিদ্রোহী নেতাকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে অনুমোদন দেওয়ার ঘটনাকে দলীয় ভাঙনের বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে।

শুরুতে এই সংকটকে শুধু রাজ্য পর্যায়ের বিদ্রোহ বলে মনে হলেও এখন তা জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।

তৃণমূলের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রাজ্য বিধানসভা থেকে

বিবিসির এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, তৃণমূলের ২৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জনই লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠি লিখে দলের সংসদীয় গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসতে চান। তারা চান বিজেপি নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে যুক্ত হতে।

কেন এত দ্রুত ভাঙছে তৃণমূল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মূলত দুটি শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং ক্ষমতায় থাকার সুবিধা।

ক্ষমতায় থাকার সময়ে স্থানীয় নেতারা প্রশাসনিক প্রভাব, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করতেন। তবে সরকার হারানোর পর সেই সুবিধার কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মমতার ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তির ক্ষয়। এক সময় তার জনসভা মানেই ছিল বিপুল জনসমাগম।

অথচ সম্প্রতি তার এক সভায় জনসমাগম ছিল প্রত্যাশার চেয়েও কম। বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি করে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বলেন, “যা ঘটেছে, তা সত্যিই নজিরবিহীন।”

তৃণমূলের এই দ্রুত ভেঙে পড়া দলের গভীর দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করে। এই তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সালে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে ক্ষমতাচ্যুত করলেও তাদের মতো শক্তিশালী আদর্শিক কাঠামো কখনো গড়ে তুলতে পারেনি। সেকারণেই ক্ষমতা হারানোর পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল টিকে থাকতে পারে কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন।

দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের বলছেন, দলটি দাঁড়িয়ে ছিল দুই স্তম্ভের ওপর “মমতার ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং সরকারি সম্পদ।”

তিনি আরও বলেন, “পশ্চিম বাংলায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মমতা দলীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে শক্তিশালী স্থানীয় নেতাদের ওপর বেশি ভরসা করেছেন এবং নিজ এলাকায় তাদেরকে ব্যাপক স্বাধীনতা দিয়েছেন।”

মমতার দল ক্ষমতায় থাকাকালীন এই ব্যবস্থা ভালোভাবেই কাজ করেছে।

স্থানীয় নেতারা নিজেদের প্রভাব বাড়াতে প্রতিযোগিতা করতেন, এতে অনেক সময় দলীয় কোন্দল ও সংঘর্ষ হতো। আর ক্ষমতায় থাকার কারণে তারা নানান সুবিধা ও অর্থ উপার্জনের সুযোগও পেতেন বলে অনেকে অভিযোগও করেন।

এখন সেই ব্যবস্থার দুই প্রধান স্তম্ভ, রাষ্ট্রক্ষমতা এবং মমতার অপরাজেয় ভাবমূর্তি, দুটিই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ভট্টাচার্য বলেন, “সরকার হারিয়েছে তৃণমূল, এবং কলকাতায় মমতার হারের কারণে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি দুর্বল হয়েছে। তাই অনেক স্থানীয় নেতা এখন বিরোধীদের চাপ, তদন্ত ও জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়ে নিজেদের অবস্থান বাঁচাতে দল পরিবর্তন বা নতুন জোটে যোগ দেওয়ার কথা ভাবছেন।”

বিজেপির উপস্থিতি বদলে দিয়েছে হিসাব 

আগে দলত্যাগ সাধারণত ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকতো। কিন্তু বিজেপি’র শক্তিশালী উপস্থিতি আঞ্চলিক দলের বিদ্রোহী নেতাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র, রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যত প্রভাব, এই তিনটি বিষয় অনেক নেতাকে দল ছাড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

তৃণমূলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। যারা এতদিন ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে রাজনীতি করছিলেন, তারা ক্ষমতা হারানোর পর নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। ফলে এটি শুধু নির্বাচনি পরাজয়ের সংকট নয়, বরং সামনে এনেছে তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতাও।

দিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের ফেলো রাহুল ভার্মা মনে করেন, জাতীয়ভাবে প্রভাবশালী বিজেপি’র উত্থান আঞ্চলিক রাজনীতিকদের সামনে তৈরি করেছে নতুন হিসাব-নিকাশ।

বিজেপি’র উপস্থিতি বদলে দিয়েছে সমীকরণ

ভার্মার মতে, আগে দলত্যাগ সাধারণত একক নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েই বিদ্রোহ করতে পারছে, কারণ বিজেপি তাদের জন্য বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র, সম্পদ এবং রাজনৈতিক সুরক্ষা দিচ্ছে।

তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতির মিল রয়েছে শিবসেনার মতো দলগুলোর সাম্প্রতিক ভাঙনের সঙ্গে, যেখানে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং একটি পরিবারের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় বড় ধরনের বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল।

ভার্মা আরও মনে করেন, তৃণমূলের সংকট আসলে ভারতীয় রাজনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ।

তার মতে, আঞ্চলিক দলগুলো ক্রমশ বেশি কেন্দ্রীভূত এবং পরিবারনির্ভর হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, “উচ্চাভিলাষী সহচররা হয়তো প্রতিষ্ঠাতার কর্তৃত্ব মেনে নেয়, কিন্তু নেতৃত্ব যখন পরিবারের উত্তরসূরির হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন তারা অনেক সময় মেনে নিতে চায় না।”

উদাহরণ হিসেবে তিনি উদ্ধব ঠাকরের ছেলে আদিত্যর কথা বলেন। যাকে রাজনীতিতে সামনে আনার পর শিবসেনায় ভাঙন তৈরি হয়েছিল।

আগে নেতৃত্ব নিয়ে লড়াই মূলত রাজনৈতিক পরিবারের ভেতরেই থাকতো, অথবা যাদের পর্যাপ্ত শক্তি ও সম্পদ ছিলো না, তাদের মধ্যেই সীমিত থাকতো।

কিন্তু বিজেপি’র উপস্থিতি সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে।

ভার্মা বলেন, প্রজন্ম বদলানো এবং সুবিধাভিত্তিক দলীয় কাঠামোর কারণে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই দল যখন ক্ষমতা হারায়, তখন ক্ষমতা ও প্রভাবের জন্য যারা দলে এসেছিল, তারা আর দলে থাকতে আগ্রহী থাকে না।

কঠিন লড়াইয়ের সামনে মমতা

৭১ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও লড়াকু অবস্থানেই আছেন। তিনি বলেছেন, বিজেপির জয় অবৈধ ও অনৈতিক।

তার দাবি অনুযায়ী প্রায় ১০০টি আসনে কারচুপি করে ফলাফল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। 

দলের বিদ্রোহ নিয়ে তৃণমূল এই নেত্রী বলেছেন, এই বিদ্রোহ আসলে সুযোগসন্ধানীদের কাজ। 

তার মতে, “অনেক মানুষ এতদিন ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করেছে। আর এখন মনে হচ্ছে আমরা ক্ষমতা হারানোর পর তারা সঙ্গে সঙ্গে অন্য একটি দলের সঙ্গে পৌঁছে গেছে সমঝোতায়।”

এখনও লড়াকু অবস্থানেই আছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

তবু তিনি বিশ্বাস করেন, দল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। 

তিনি বলেন, “আমরা নতুন করে দল গড়ে তুলবো। তৃণমূল নেতাদের জন্য নয়; তৃণমূল কর্মীদের জন্য।”

তৃণমূল কি অস্তিত্ব সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে?

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনই বলা যাচ্ছে না কী হবে। 

বিদ্রোহটা হয়তো শেষ হয়ে যেতে পারে এবং কিছু নেতা আবার মমতার দলে ফিরে যেতে পারে। 

কিন্তু সংসদ সদস্যরা যদি দল ভাঙার ইঙ্গিতে অটল থাকেন, তাহলে এই চ্যালেঞ্জ শুরুতে যতটা হালকা মনে হয়েছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলা ভুল হবে।

“মমতা এখনও ফিরে আসতে পারেন”, ভট্টাচার্য বলেন। “বাংলায় যদি এমন একজন মুখ থাকেন, যিনি এখনও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন, এবং এমন একটি কণ্ঠ থাকে, যাকে মানুষ সহজে উপেক্ষা করতে পারে না, সেটা একমাত্র মমতাই।”

তবে তার মতে, পুনরুত্থানের জন্য শুধু ব্যক্তিগত আকর্ষণ যথেষ্ট হবে না। দলকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে এবং নেতৃত্ব নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখাতে হবে।

তবে এখন পর্যন্ত মমতা নিজের মধ্যে এই শক্তিশালী দিকটিই দেখাতে পারেননি।

রাজনৈতিক জীবনে মমতা বহুবার অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। কিন্তু এবার তার সামনে যে কাজ, তা আগের যেকোনো চ্যালেঞ্জের চেয়ে আলাদা। সরকার উৎখাত করা এক বিষয়। কিন্তু নিজের নেতারাই যখন দল ছেড়ে চলে যায়, তখন সেই দলকে আবার গড়ে তোলা সম্পূর্ণ ভিন্ন লড়াই।