হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন

কঙ্কাল আর খুলির স্তূপ: রাখাইনে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের ভয়াল চিত্র

***সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটির কিছু অংশ আপনার অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

“আমরা গ্রামে কোনো গবাদি পশু দেখিনি, প্রতিটি পরিবারেই গবাদি পশু এবং হাঁস-মুরগি ছিলো। আমি সেই ধানক্ষেতেও গিয়েছিলাম যেখানে আমার নিকটাত্মীয়সহ প্রায় ৮০ জন গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।”

আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম

“আমি সব জায়গায় কঙ্কাল আর খুলির স্তূপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখেছি। মাংস পচে গেলেও কাপড়গুলো অক্ষত ছিল”, নৃশংস দৃশ্যের বর্ণনা দিচ্ছিলেন ওমর আহমদ।

জুলাই ২০২৪। ওমর আহমদসহ কয়েকজন রোহিঙ্গা মুসলিমকে লুকিয়ে নিজ গ্রাম হৈয়া সিরিতে ফিরে যান। মিয়ানমারের রাখাইনের বুথিডাংয়ের গ্রামটি তখন জনশূন্য।

এর দুই মাস আগেই হৈয়া সিরিতে রাখাইনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র চালানো এক হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন তারা।

তারা নিজেদের জিনিসপত্র উদ্ধার করতে ফিরে আসেন। তখন তারা দেখতে পান যে তাদের বাড়িঘর লুট হয়েছে ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ওমর আহমদ সেখানে তার স্বজন প্রতিবেশীদের দেহাবশেষ দেখতে পান। তিনি বলেন, “আমরা গ্রামে কোনো গবাদি পশু দেখিনি, প্রতিটি পরিবারেই গবাদি পশু এবং হাঁস-মুরগি ছিলো। আমি সেই ধানক্ষেতেও গিয়েছিলাম যেখানে আমার নিকটাত্মীয়সহ প্রায় ৮০ জন গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।”

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে এই দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন রোহিঙ্গা মুসলিম ওমর আহমদ।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যুদ্ধের আইন লঙ্ঘন করে থাকতে পারে। ছবি: এআই

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে ২০২৪ সালের ২রা মে উত্তর রাখাইনের বুথিডং টাউনশিপের হৈয়া সিরি গ্রামে অন্তত ১৭০ জন রোহিঙ্গা মুসলিম নারী, শিশু, পুরুষকে হত্যা করেছে।

এই গণহত্যার বিষয়টি এক বছরেরও বেশি সময় পর নিশ্চিত করা গেছে, যখন বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছান। তাদেরই একজন ওমর আহমদ।

বার্মিজ ভাষায় গ্রামটি তান শাউক খান নামে পরিচিত। আরাকান আর্মির যোদ্ধারা যখন বেসামরিক নাগরিকদের ওপর তখন গুলি চালিয়েছিল তখন তারা পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিল।

ওই একই সময়ে কাছাকাছি আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর মধ্যেও তুমুল লড়াই হয়।

আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা 'ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান' হৈয়া সিরিতে বেসামরিক নাগরিক হত্যার কথা অস্বীকার করেছে।

বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে, বাহিনীটি রাখাইন রাজ্যে থাকার সময় কিছু গ্রামবাসীকে মিথ্যা ভিডিও জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছিল।

৪১ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি ২০২৪ সালের ২রা মে’র হত্যাকাণ্ড এবং এর পরের ঘটনাগুলোর একটি বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছে।

স্যাটেলাইটের ছবি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গবেষকদের পাওয়া ছবি ও ভিডিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নীরিক্ষা করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যুদ্ধের আইন লঙ্ঘন করে থাকতে পারে।

আরাকান আর্মির বেসামরিক নাগরিক গণহত্যা এবং সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনাটি যুদ্ধাপরাধের শামিল বলেও করে সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউ প্রতিবেদনটির শিরোনাম দিয়েছে, “Skeletons and Skulls Scattered Everywhere: Arakan Army Massacre of Rohingya Muslims in Hoyyar Siri, Myanmar, বাংলায় “কঙ্কাল ও খুলি সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে’: মিয়ানমারের হৈয়া সিরিতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর আরাকান আর্মির হত্যাকাণ্ড”।

সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের মধ্যে ছিল বেসামরিক নাগরিকদের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা, হত্যাকাণ্ড, বেআইনি আটক, হেফাজতে নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহার, অগ্নিসংযোগ ও বেসামরিক সম্পত্তি ধ্বংস, লুটপাট এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সহায়তা প্রদানে ব্যর্থতা।

আরাকান আর্মির যোদ্ধারা প্রথমে হৈয়া সিরি ছেড়ে চলে যাওয়া বেসামরিক নাগরিকদের একটি দলের ওপর গুলি চালায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাদা পতাকা ওড়াচ্ছিলেন।

এক ব্যক্তি বলেন, “প্রথমে আমার ছেলে একটি গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তারপর আমার স্ত্রী ও শিশু কন্যাকে গুলি করা হয়, এরপর আমার আরেক কন্যাকেও।”

গ্রামবাসীরা যখন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখনও আরাকান আর্মির সদস্যরা তাদের ওপর গুলি চালাতে থাকে।

৪১ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি ২০২৪ সালের ২রা মে’র হত্যাকাণ্ড এবং এর পরের ঘটনাগুলোর একটি বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছে। ছবি: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইট

এক নারী জানিয়েছেন, যোদ্ধারা একটি মসজিদের পাশের ধানক্ষেতে গ্রামবাসীদের একটি দলকে জড়ো করে। তিনি বলেন, “কয়েক মিনিটের মধ্যে তারা কিছু না বলেই আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। আমার স্বামীর একটি গুলি লাগে। তারা যখন দেখল সে বেঁচে আছে, তখন তারা আরও কাছে এসে তাকে আরও কয়েকবার গুলি করে।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ হৈয়া সিরি হত্যাকাণ্ডের পর নিহত বা এখনও নিখোঁজ থাকা প্রায় ৯০ জন শিশুসহ ১৭০ জনেরও বেশি গ্রামবাসীর একটি তালিকা তৈরি করেছে। প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করছে সংস্থাটি।

গ্রামের তিনটি আলাদা স্থানে মানুষের দেহাবশেষের ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছে এইচআরডব্লিউ।

সংস্থাটি জানিয়েছে, স্যাটেলাইটের ছবিও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ সমর্থন করে যে, আরাকান আর্মির হৈয়া সিরিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল এবং পুরো গ্রাম ধ্বংস করে দিয়েছিল।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়ার ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “২০২৪ সালে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি কর্তৃক শত শত রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিককে হত্যা এবং তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি মিয়ানমারের জান্তার সাথে সশস্ত্র সংঘাত নিষ্ঠুরতার মাত্রা ছাড়িয়েছে।”

তিনি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডে বেঁচে যাওয়া অনেকে আরাকান আর্মির কাছে আটক আছেন। তাদের কোনো ক্ষতিপূরণও দেয়নি এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায়ও আনেনি।”

যদিও হত্যাকাণ্ডটি দুই বছর আগে ঘটেছিল, তবুও ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান এবং তার সশস্ত্র শাখা আরাকান আর্মি এই নৃশংসতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বা রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রশ্নের লিখিত জবাবে ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান জানিয়েছে, আরাকান আর্মি সব যুদ্ধে তার সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশন কঠোরভাবে মেনে চলেছে।”

বাহিনীটি আরও বলেছে যে, হৈয়া সিরিতে তারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতাদের সহযোগিতায় উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রেবেল গভর্ন্যান্স এবং সীমান্ত বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন সাংবাদিক তানভীরুল মিরাজ রিপন। তিনি আলাপ-কে বলেন, “আরাকান আর্মির উচিত এই ঘটনার সাথে যুক্ত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করা, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনের আওতায় হতে হবে।”

রিপন বলেন, “রাখাইনে যে আন্তঃসাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস ও সংঘাত আছে তা আরাকানের জন্য ভালো ভবিষ্যত বয়ে আনবে না। তাই আরাকান আর্মি ও তাদের প্রশাসনের উচিত সামাজিকম সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া ও আন্তঃসম্প্রদায়িক মেলবন্ধন তৈরিতে জোরালোভাবে কাজ করা “

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষণা বলছে, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আগের মতোই হুমকি হয়ে আছে। এটিও স্পষ্ট যে মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক অংশীদাররা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচারের ঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

আরাকান আর্মি ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি রাখাইনের জনগণের জাতীয় মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। ২০১৮ সালের শেষ দিক থেকে এটি রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণের জন্য মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সাথে সশস্ত্র লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থানের পর বেসামরিক নেতাদের গ্রেপ্তার করে। জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে শত্রুতা ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে তীব্র আকার ধারণ করে।

আরাকান আর্মি যখন রাখাইনজুড়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে। মিয়ানমার জান্তা হেলিকপ্টার, গানশিপ, আর্টিলারি এবং স্থল হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচার হামলায়।

আরাকান আর্মিও জান্তার ঘাঁটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সাথে সাথে তাদের বাহিনী রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে শেল বর্ষণ, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করে।

হৈয়া সিরি গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া অনেকে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্যাম্পগুলোতেই রয়ে গেছেন। যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পেরেছেন তারা ন্যায়বিচার চাইছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, মিয়ানমার জান্তা এবং আরাকান আর্মি উভয় পক্ষ থেকেই চলমান নির্যাতনের কারণে, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ, টেকসই এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি নেই।

এইচআরডব্লিউ’র সুপারিশ হলো, সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর উচিত এ বছর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৬২তম অধিবেশনে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে এই উদ্বেগগুলোর ওপর জোর দেওয়া।

তাদের উচিত রাখাইন রাজ্যে গুরুতর লঙ্ঘনের স্বাধীন তদন্ত জোরদার করা এবং সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া।

সাংবাদিক তানভীরুল মিরাজ রিপন বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের উচিত ‘হৈয়া সিরি’ ম্যাস কিলিংয়ের সার্ভাইভারদের সব ধরনের মানসিক সহায়তা দেওয়া। প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করা।”

এই ধরনের গণহত্যায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এবং রোহিঙ্গাদের সুবিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতাও জারি রাখা উচিত বলে মনে করেন তানভীরুল মিরাজ রিপন।