ঢাকার অগ্রাধিকার, ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার নাও হতে পারে: মাইকেল কুগেলম্যান
মাইকেল কুগেলম্যান দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখালিখি করেন। তিনি আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো। একইসঙ্গে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফ’-এর লেখক। আলাপের পডকাস্টে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক সাহাব এনাম খানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন মাইকেল কুগেলম্যান। আলোচনার ঈষৎ সম্পাদিত অংশ প্রকাশিত হলো।
আলাপ ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩০ পিএমআপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৪ এএম
সাহাব এনাম খান: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমুখী। এখানে শুধু রাজনীতি নয়, বরং অর্থনীতি, সমাজ, মনস্তত্ত্ব, রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব, সবখানেই যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি খুবই স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো— যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে কী চায়? আর আমরা তাদের কী দিতে পারি?
মাইকেল কুগেলম্যান: আমরা যদি ফিরে তাকাই, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন আবার ক্ষমতায় এলেন, তখন এটি ভাবার অনেক কারণ ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণও ছিল। একটি হলো বাইডেন প্রশাসনের শেষ মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কে বড় পরিবর্তন এসেছিল। বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব হয়েছিল, এবং তারপর কিছু বড় পরিবর্তন আসে, যার কারণে বাইডেন প্রশাসনের বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হয়েছে। এবং তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলাদেশের সংস্কার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় কারিগরি সহায়তা দিতে জোর দেয়া।
কিন্তু সত্যি বলতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ধরনের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামান না। তাই একটা সংশয় ছিল, যেভাবে বাইডেনের শেষ মাসগুলোতে সম্পর্কটি বদলেছে, হয়তো ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে সম্পর্কের অবনতি হবে। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকার পরও দেখা যাচ্ছে সম্পর্ক বেশ ভালো অবস্থানে আছে। এটি হয়তো সেরকম গভীর সম্পর্ক নয় যা যুক্তরাষ্ট্রের তার শীর্ষ কৌশলগত অংশীদারদের সাথে থাকে, তবে তা ভালো অবস্থানেই আছে। উচ্চপর্যায়ের এঙ্গেজমেন্ট হয়েছে একাধিকবার। সামরিক মহড়া হয়েছে এবং সম্পর্কে কোনো বড় সংকট নেই।
আমি নিজসহ অনেকেই সন্দেহ করেছিলাম যে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর হয়তো সম্পর্কে কোনো বড় পর্যায়ের পরিবর্তন আসবে। তবে সৌভাগ্যবশত সেদিকে যায়নি, আমরা যারা বাংলাদেশকে সমর্থন করি এবং যারা বাংলাদেশের বন্ধু এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি উষ্ণ ও সফল সম্পর্ক সমর্থন করি, তাদের জন্য এটি স্বস্তির।
এখন যদি আপনার প্রশ্নে আসি, যুক্তরাষ্ট্র কী চায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা কী? আপনি জানেন, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বকে দেখে বাণিজ্য ও লেনদেনের লেন্স দিয়ে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাবা হয় এই দেশগুলো কী দিতে পারবে যেটা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ, বিশেষ করে অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল হবে। এই দিক থেকে, পরিষ্কারভাবেই বর্তমান প্রশাসনের প্রত্যাশা হলো, বাংলাদেশের নতুন সরকার আমেরিকার পণ্য বেশি করে কিনতে চাইবে।
সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে একটি চুক্তি আছে যা অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিনগুলোতে সই হয়েছে। আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র এতে খুশি হয়েছে। তবে অবশ্যই আমার মনে হয়, এই প্রশাসন থেকে এমন প্রত্যাশা আসতে থাকবে যে বাংলাদেশের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, যুক্তরাষ্ট্রের থেকে পণ্য ক্রয় করার ক্ষেত্রে।
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে কাঠামো, তাতে খুব বড় আকারে আমদানি বাড়ানো একটু কঠিন। আমরা জানি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানির একটি বড় ক্রেতা। তবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য কিনতে গেলে, এটার বাস্তবায়ন করাটা একটু মুশকিল। তবে ভালো ব্যাপার হলো, ভালো সম্পর্ক আছে এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তি আছে। আমার মনে হয় এর মাধ্যমেই ‘টোন’ টা ঠিক হয়ে গেছে।
এই সরকারের প্রতি দ্বিতীয় প্রত্যাশা থাকবে, ভূ-রাজনৈতিক, আর সেটি অবশ্যই চীন ইস্যু। ওয়াশিংটনের বর্তমান প্রশাসন চীনকে নিয়ে কী করতে চায় তা নিয়ে সবসময়ই কিছু প্রশ্ন ছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রথাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন। তিনি প্রথম মেয়াদে উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে দেখা করেছেন। তিনি ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশংসা করেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট শি’কে নিয়ে অনেক ইতিবাচক কথা বলেছেন।
অনেকের ধারণা ছিল ট্রাম্প বেইজিংয়ের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় আসতে পারেন যাতে প্রতিযোগিতা কিছুটা কমে। আর এর একটি কারণ হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানেন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব কতটা। তিনি চান না যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু করুক যার কারণে চীন মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত হানতে পারে। তাই বর্তমান প্রশাসন চেষ্টা করেছে চীনের সাথে উত্তেজনা কমানোর, যা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্য ভালো হতো। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন আগের মতো চীনের সাথে কঠোর প্রতিযোগিতার নীতিতেই অটল থাকবে। তাই তারা চাইবে নতুন সরকার যেন চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অংশীদার ও সাহায্যের উৎস বহুমুখী করে। এটা বলা সহজ হলেও করা কঠিন।
তবে আবারও, যেহেতু সম্পর্ক এখন ভালো, আমি এখানেই থামবো। আমি মনে করি না যে ওয়াশিংটন ঢাকাকে এমন কোনো চাপ দেবে যা তাদের অস্বস্তিতে ফেলে।
সাহাব: এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই উন্নয়নের ত্রিমুখী সংকট দেখা দেয়। একদিকে আপনি ওয়াশিংটনকে খুশি রাখতে পারছেন না, আবার অন্যদিকে চীনের পুঁজির প্রবাহ সচল রাখা বা অভ্যন্তরীণ নীতির স্বাধীনতা রক্ষা করা— এই তিনটিই বিএনপি সরকারের জন্য খুব জরুরি। ওয়াশিংটন যে প্রত্যাশা করছে, তা পূরণ করার ক্ষমতা ঢাকার কি আছে ?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। অর্থাৎ বর্তমান সরকার কীভাবে কাজ করবে তা ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে। ওয়াশিংটন কি বিষয়টাকে এভাবেই দেখে?
কুগেলম্যান: খুব ভালো প্রশ্ন। নির্বাচনে গণভোটের বিশাল ব্যবধান ইঙ্গিত করে যে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা গণতান্ত্রিক সংস্কারগুলো চালিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণের জোরালো ম্যান্ডেট আছে। তবে আমি মনে করি যে ট্রাম্প প্রশাসনের সংস্কার নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই।
হ্যাঁ, বাংলাদেশের নির্বাচনের পর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া শোনা গেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট পল কাপুর নিজেই নির্বাচনের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তাই আমার মনে হয় নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশাসন সন্তুষ্ট ছিল। তবে ফল না, প্রক্রিয়া। শান্তিপূর্ণ ছিল, বিশ্বাসযোগ্য ছিল, ইত্যাদি।
তবে আমি শুরুতে যেমনটা বলেছি, ট্রাম্প প্রশাসন মূল্যবোধ-ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী নয়।
আমরা জো বাইডেনের আমলে একটি “মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি” নিয়ে অনেক আলোচনা শুনেছি। কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছিলেন যে আগের প্রশাসন বাংলাদেশকে তাদের এই মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছিল। এই নীতির মধ্যে ছিল—সীমিতভাবে হলেও—গণতন্ত্র, অধিকার এবং পররাষ্ট্রনীতিতে সেগুলোর প্রচার।
এই ধরনের বিষয়গুলো আসলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারে ছিল না—সম্ভবত বিল ক্লিনটন প্রশাসন, এমনকি তারও আগে জিমি কার্টার প্রশাসনের সময়ের পর থেকে। তাই এটি কিছুটা ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল। অধিকাংশ মার্কিন প্রশাসন সাধারণত মূল্যবোধের পরিবর্তে স্বার্থভিত্তিক নীতি অনুসরণ করেছে।
প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে নতুন সরকার জনমতের ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করবে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে। কিন্তু এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন সরাসরি জড়াতে চাইবে না। তারা হয়তো এতে সন্তুষ্ট থাকবে, কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সক্রিয় অবস্থান নেবে না।
আমি মনে করি না তারা প্রযুক্তিগত সহায়তা, দিকনির্দেশনা বা পরামর্শ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। এবং এটি আসলে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি বড় উদ্বেগের সঙ্গে জড়িত। যদি আপনি ভাবেন এই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারগুলো কী হবে, তাহলে দেখবেন—সেগুলোর অনেকগুলোই এমন বিষয়, যেগুলো সত্যি বলতে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে।
এর একটি হলো সংস্কার প্রক্রিয়া। আরেকটি হলো মানবিক সহায়তা। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও কথা বলা যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ও বিশ্বব্যাপী অনেক বিদেশি সহায়তা বন্ধ বা স্থগিত করলেও সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের সহায়তা বাদ রেখেছে— এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একইভাবে আঞ্চলিক সংযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা—এসব বিষয়ও ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকারে নাও থাকতে পারে।
তাই আমার মনে হয় দুই পক্ষকেই প্রত্যাশাগুলো ম্যানেজ করতে হবে। ঢাকার অগ্রাধিকার ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার নাও হতে পারে—আমি সরাসরি বলছি।
সাহাব: গত কয়েক দিনে ঢাকায় একটি বড় আলোচনার বিষয়—সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান ইস্যু। একে আমি সরাসরি একটি কূটনৈতিক জরুরি পরিস্থিতি বলবো। আপনি বলেছিলেন যে ওয়াশিংটন একইসঙ্গে বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশকে দেখে। সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান সেই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিরোধ তৈরি করছে। এই নতুন সরকার, যারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সদিচ্ছা নিয়ে সম্পর্ক গড়তে চায়, তারা কীভাবে এসব সমস্যার মোকাবিলা করবে, যাতে সম্পর্ক বৈরী মনে না হয়?
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, বিষয়টি হলো, যে দেশই হোক না কেন, ওয়াশিংটনের যত কাছেরই হোক, ট্রাম্প প্রশাসনের অপ্রত্যাশিত নীতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্তও সেই ধরনেরই একটি পদক্ষেপ। এটা বাংলাদেশকে মেনে নিতে হবে।
আমার জানা মতে, এটি কেবল দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়। এটি একটি বৃহত্তর নীতির অংশ যা এই প্রশাসন অনুসরণ করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের বাইরেও অনেক অর্থনীতির তদন্ত হবে, আমেরিকার কিছু কাছের মিত্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশই অন্তর্ভুক্ত।
তাই আমি বুঝতে পারি, ঢাকার কাছে এটি কিছুটা বৈরী মনে হলেও এটা ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর নীতির অংশ। যার উদ্দেশ্য মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা এমন সব নীতি থেকে যা যুক্তরাষ্ট্রের চোখে বৈষম্যমূলক কিংবা সমস্যাজনক। আর আমার আগের কথা অনুযায়ী, সম্পর্ক এখন ভালো জায়গায় আছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে, পারস্পরিক শুল্ক কমেছে, এবং নির্বাচনের আগে একটি বাণিজ্য চুক্তিও হয়েছে।
তাহলে এই যে পরিস্থিতিতে, আমি জানি না, এটাকে ‘গতি’ বলা ঠিক হবে কিনা। তবে ইতিবাচক কিছু অগ্রগতি আছে। এই নতুন সিদ্ধান্ত থেকে যে কোনো উত্তেজনা তৈরি হলেও দুই রাজধানীর জন্য তা সামাল দেওয়া সহজ করবে।
তবে আবারও বুঝতে হবে, এটা বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে নেওয়া কোনো পদক্ষেপ নয়। এক ডজনেরও বেশি দেশকে ঘিরে করা হচ্ছে। যার মধ্যে এমন দেশও আছে, যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি গভীর।
সাহাব: আমি একমত, বাণিজ্য চুক্তির ধারাবাহিকতা নিজেই বৃহত্তর সদিচ্ছার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে, বাংলাদেশের কূটনীতিকদের ওয়াশিংটনের ইউএসটিআর অফিসে গিয়ে ঠিক কী ভুল হয়েছে এবং কীভাবে তা ঠিক করা যায়। সেটি স্পষ্টভাবে জানতে হবে। সেই ক্ষেত্রে কীভাবে সম্পর্ক সামলাতে বা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে?
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, একদম ঠিক। আমার মনে হয়, ডনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি দেখেছে।
এবং আপনি জানেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসন প্রথমটির তুলনায় বেশ ভিন্ন। এটি অনেক ইস্যুতে, বিশেষ করে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যদিও প্রথম মেয়াদেও বাণিজ্য নিয়ে কঠোর নীতি ছিল, এবার তা আরও জোরালো।
উদাহরণ হিসেবে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে, সেখানে গত কয়েক মাসে 'আস্থার ঘাটতি' নিয়ে বারবার আলোচনা শুনতে পাওয়া গেছে। দিল্লিতে থাকার সময়েও আমি এই কথাটাই সবচেয়ে বেশি শুনেছি, যদিও সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে।
তবে আবার বলছি, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি নিয়ে আমি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারি না। তবে আমার ধারণা, এটি ততটা নয়, যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল। এর একটি কারণ হলো, সম্পর্ক এখনো বেশ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এবং উচ্চপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথমবারের মতো এশিয়ার জন্য একজন মার্কিন বিশেষ দূত নিয়োগ করা হয়েছে সের্জিও গোর। তিনি ভারতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দিল্লিতে অবস্থান করবেন। তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা, ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ। হোয়াইট হাউস ও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
হ্যাঁ, তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। এ বিষয়টি বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে খুব ইতিবাচক নাও মনে হতে পারে। তবে তিনি খুব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকার অবস্থানে আছেন এবং নিয়মিত বাংলাদেশ সফরও করতে পারেন।
আমরা দেখেছি, তিনি এই ধরনের বার্তার মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন। তাই তিনি সেই মানুষদের মধ্যে একজন হতে পারেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য আস্থার ঘাটতি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারেন। কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
তিনি বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের আরও অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন। তবে আমার মনে হয়, সামনে এই বিষয়টি খেয়াল রাখা দরকার। গোরকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, তা দেখার জন্য এটি আসলে একটি বড় সংকেত, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় আস্থার যে ঘাটতি আছে, তা দূর করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে তিনি কেমন ভূমিকা রাখেন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
অবশ্য এর অন্য একটি দিকও আছে। আমরা জানি, গোর একটি বিশেষ বিষয়ে বাংলাদেশিদের ওপর বেশ চাপ দিচ্ছেন; আর তা হলো বোয়িং-এর সাথে একটি চুক্তি করা, যার মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা বা যুদ্ধাস্ত্রের মতো বিষয় থাকতে পারে। ঢাকায় এই বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কতটুকু কাজে দেবে, তা আমি নিশ্চিত নই। সুতরাং, এখানে একটা লেনদেন বা ব্যবসার দিকও আছে। তবে আমি মনে করি, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ‘গোর ফ্যাক্টর’ অবশ্যই দেখার মতো বিষয় হবে।
সাহাব: আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘ইন্ডিয়া ভ্যারিয়েবল’। আমি কেন একে ভ্যারিয়েবল বলছি? কারণ এটি বাংলাদেশের সাথে সবক্ষেত্রেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। মানে একভাবে বলতে গেলে বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার সম্পর্ক নিয়ে দিল্লির একটা ইস্যু আছে। অবশ্যই দিল্লি এই সম্পর্ক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে করে। ইসলামাবাদের ক্ষেত্রে তো অবশ্যই। এরপর অবশ্যই, ইরান সংকটের পর মোদি সরকার এবং ট্রাম্প সরকারের সম্পর্কের মধ্যে নতুন ধরনের গতিশীলতা আসবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির অধীনে এই সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখছেন, এটি কি আসলেই একটি নতুন সূচনা? নাকি কাগজে-কলমে যতটা ভালো দেখাচ্ছে বাস্তবে ততটা না?
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, ভারত ফ্যাক্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি সংক্ষেপে বলতে পারি কীভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলে। নয়াদিল্লি কয়েক মাস ধরেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে তারা বাংলাদেশে নির্বাচন পরবর্তী সরকারের সাথে কাজ করতে চাইছে।
প্রকৃতপক্ষে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে নয়াদিল্লি আসলেই ঢাকার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চাচ্ছে। মানে, বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস খুব একটা ভালো নয়। আপনি কি মনে করেন যে, বিএনপির বিজয়কে ভারত তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলনামূলকভাবে কম খারাপ ফলাফল হিসেবে দেখেছে?
তারা অবশ্যই চায়নি যে পরবর্তী সরকারের নেতৃত্বে জামায়াত থাকুক। দিল্লির এমন চাওয়ার কারণ আমরা জানি। তাই আমি মনে করি তারা সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত। কিন্তু আমার মতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আসতে পারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।
আমি বলবো, তারেক রহমান ভারতের ব্যাপারে তার প্রকাশ্য বার্তায় খুব সতর্ক ছিলেন। তিনি এমনটা বলেননি যে সম্পর্ক মেরামতের ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই, তবে তিনি খুব সাবধান ছিলেন। তিনি বলেছেন যে এটি একটি সমমর্যাদার সম্পর্ক হতে হবে, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ আগে থাকবে। এগুলো সবই ঠিক আছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে একটি ‘কৌশলগত অপরিহার্যতা’ ঠিক করতে হবে।
আসলে এটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে পুনরায় ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। ঘরোয়া রাজনীতির সঙ্গে এই সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে, কারণ বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ভারত-বিরোধী মনোভাব রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াত এবং এনসিপি এখন বিরোধী দলে আসায়, আমি মনে করি ভারতের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপিকে এখন আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তাই এটি সেখানে একটি বড় ফ্যাক্টর হবে।
এছাড়া শেখ হাসিনা ফ্যাক্টরটিও রয়েছে। হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধে ভারত সাড়া দেবে না। তারা সেটা করবে না। আমরা তা জানি। আমি মনে করি, বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি কাঁটা হয়ে থাকবে। তবে অবশ্যই ছোটখাটো বিষয় দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক, এই জাতীয় বিষয় দিয়ে শুরু করে সামনে এগোনো যায়।
এখন বাংলাদেশের অনেকের মধ্যে এমন ভয় ছিল যে ট্রাম্প প্রশাসন মূলত বাংলাদেশের বিষয়ে ভারতের অবস্থানকেই মেনে নেবে। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে যাদের সন্দেহ আছে, তাদের জন্য এটি সমস্যার হতে পারতো। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম বছরে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় আমরা তেমন কিছু দেখিনি। এবং বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভিন্ন নীতি ছিল। তবে আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি বিষয়ে একমত, আর তা হলো, তারা চায় বাংলাদেশ চীনের সাথে ব্যবসা কমিয়ে দিক, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয়ই চীনের সাথে প্রচুর ব্যবসা করে। আর এই তো সেদিন ভারত চীনের নতুন বিনিয়োগের ওপর কড়াকড়ি শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
যাইহোক, এখানে সবসময় কিছু দ্বিমুখী নীতি কাজ করবেই, তবে এটিও একটি ফ্যাক্টর। মূল কথা হলো, ভারতের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত প্রশাসনের (অন্তর্বর্তী সরকার) সময় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে যে গতিশীলতা দেখা গেছে, সেটিও লক্ষ্য করার মতো বিষয়। মানে, বিএনপি সরকার যদি ভারতের সাথে উত্তেজনা কমানোর জন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তারা চাপের মুখে পড়বে।
তবে আমার মনে হয়, তখন তাদের সম্ভবত বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের যে গতি আমরা দেখেছি তা কিছুটা কমিয়ে আনতে হতে পারে।
এ বিষয়ে আমি শেষ যে পয়েন্টটি বলবো তা হলো, বাংলাদেশের এই সরকারের কাছে এমন কিছু করার সুযোগ আছে যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কোনো সরকার সম্ভবত করতে পারেনি। আর তা হলো পাকিস্তান, ভারত, চীন এবং সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান শক্তি এবং আঞ্চলিক পক্ষগুলোর মধ্যে একটি প্রকৃত ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে ছিল। শেখ হাসিনা সরকার অবশ্যই ভারতের দিকে ঝুঁকে ছিল। আমি মনে করি তারেক রহমানের কাছে একটি সত্যিকারের জোট নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে দেখা যাক এটি কীভাবে কাজ করে।
সাহাব: শুধু ভৌগলিক কারণেই ভারতের সাথে সম্পর্ক করা ছাড়া বাংলাদেশের বিকল্প নেই। অবশ্যই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের অগ্রগতি ছিল বিস্ময়কর। এখন ওয়াশিংটনের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী হিসাব বা মধ্য এশিয়া অথবা ভারতের হিসেবে, ঢাকা-ইসলামাবাদের এমন সম্পর্ক ভিন্ন ধরনের পর্যালোচনার জন্ম দেয়। যখন বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রসঙ্গ আসে। বাংলাদেশ-পাকিস্তান স্বাভাবিক সম্পর্ককে ওয়াশিংটন কতটা সহজভাবে গ্রহণ করবে? অথবা ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক নিয়ে কি ওয়াশিংটন প্রশ্ন তোলা শুরু করবে?
কুগেলম্যান: পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বেশ আশ্চর্যজনক পরিবর্তন এসেছে। আমরা দেখেছি ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ভালো করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রশাসনের অন্যান্যরা পাকিস্তানের প্রশংসা করেছেন। তারা খনিজ সম্পদ, ক্রিপ্টো এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায়।
সুতরাং, বাইডেন প্রশাসনের তুলনায় এমনকি প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের তুলনায়ও ওয়াশিংটনের পাকিস্তান নীতিতে একটি অদ্ভুত এবং আকস্মিক পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে আমি মনে করি না যে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের মধ্যে এখনও তেমন বড় কোনো কিছু ঘটেছে যা ওয়াশিংটনের নজরে পড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা আমরা আগেই বলেছি। এবং দুই দেশে একে অপরকে সহযোগিতার কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, মূলত জনপর্যায়ে। এটি প্রতীকী ছিল, কিন্তু ১৯৭১ সালের পর প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের কোনো পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে এসেছে। তবে দিনশেষে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে মৌলিক পর্যায়ে তেমন কিছু ঘটছে না।
আমি জানি যে ভারত থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে বেশ কিছু ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেখান থেকে তেমন কোনো সারগর্ভ বিষয় বেরিয়ে আসতে আমি দেখিনি। যদিও আমি মনে করি দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ইস্যুতে কিছু যোগাযোগ হয়েছে। তাই আমার মনে হয় এই প্রশাসন আপাতত বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের এই উন্নতির দিকে খুব একটা মনোযোগী নয়। যদি এ সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বাংলাদেশ-পাকিস্তান মিলে চীনের সাথে সম্পর্ক ভালো করার জন্য সমন্বয় করছে, শুধু তখনই এটা ওয়াশিংটনের নজরে আসবে।
আপনার মনে আছে হয়তো, কয়েক মাস আগে চীনের একটি আঞ্চলিক সম্মেলনে এই তিন দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছিল, কিন্তু তা থেকে বিশেষ কিছু হয়নি। এছাড়া, যদি আমরা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বা অস্ত্র চুক্তির ইঙ্গিত পাই, তবে তা ওয়াশিংটনের নজর কাড়বে। কিন্তু আমি সেটা দেখছি না, বিশেষ করে, আমি মনে করি বিএনপি সরকার ভারতের সাথে উত্তেজনা কমাতে যা যা করা দরকার তা করতে চাইবে এবং তাতে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক কিছুটা সীমিত করার প্রয়োজন হতে পারে।
মূল কথা হলো, ওয়াশিংটন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের এই বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছে তা নিয়ে চিন্তা করা অনেকটা ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার’ মতো হবে, কারণ মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের রেইডারে আসার মতো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কিছু এখনও ঘটেনি।
সাহাব: আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশের চরমপন্থা ও উগ্রবাদের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি আছে? এটাই কি সেই ‘রেড লাইন’ যা নিয়ে ঢাকায় কেউ মুখ ফুটে কথা বলতে চায় না?
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, এটি একটি ভালো পয়েন্ট। আমরা জানি কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ একটি কঠিন সময় পার করেছিল। যখন তারা চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের উত্থানের মুখোমুখি হয়েছিল।
আমি মনে করি শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যে পরিবর্তনগুলো এসেছিল তা কট্টরপন্থী ইসলামি শক্তিগুলোকে জন্য জায়গা করে দিয়েছে। তবে একই সাথে আমি এও মনে করি অনেক পর্যবেক্ষক, বিশেষ করে ভারতের অনেকেই একে বাড়িয়ে বলছেন।
তা সত্ত্বেও আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা কিছু উদ্বেগজনক ইঙ্গিত দেখেছি। গত এক বছরে বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে টিটিপি বা পাকিস্তানি তালেবানের সাথে সংযুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এটি এমন একটি গোষ্ঠী যারা এর আগে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের বাইরে কাউকে নিয়োগ দিয়েছে বলে আমার জানা নেই। তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ। এবং যদি সেই অভিযোগগুলো সত্যি হয়, তবে তা অনেক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
তবে আমার মনে হয় না এটি খুব বেশি চিন্তার কোনো কারণ। আর রাজনৈতিক ইসলামপন্থী, যেমন, জামায়াত ও তাদের সমমনা, হেফাজত-ই-ইসলামি, যারা রাজনৈতিক নয় বরং সামাজিক অভিনেতা হিসেবে প্রভাবশালী। এদের এবং জঙ্গিদের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। এই দুটি গোষ্ঠীকে গুলিয়ে ফেলার একটি প্রবণতা আছে, যা বিভ্রান্তিকর এবং এমনকি বিপজ্জনকও হতে পারে। কারণ তখন নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে অতিরঞ্জিত আলোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি, তবে আমি মনে করি বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলাসহ আরও অনেক গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের ইস্যুটিকে সেই একই পর্যায়ের হুমকি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সাহাব: শেষ দুটি বিষয়। প্রথমটি হলো, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি খরচ এমনভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে যেখানে সরকারের কোনো হাত নেই। পশ্চিম এশিয়ার প্রতি এ দেশের মানুষের আবেগ জড়িত থাকায়, এমন একটি মুসলিম প্রধান দেশে এমন এক জনমত গড়ে উঠছে যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করছে। যা নতুন সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না।
দ্বিতীয়টি হলো, আস্থার ফ্যাক্টর। ওয়াশিংটনের সবচেয়ে কাছের ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদারও যেখানে কৌশলগত সন্দেহ প্রকাশ করছে, সেখানে আমরা আজ যা কিছু আলোচনা করেছি তার পেছনের আসল উত্তরটি কী? মানে, ওয়াশিংটন ও ঢাকার মধ্যে কি কোনো টেকসই কাঠামো তৈরি হচ্ছে, নাকি এই উষ্ণতা পরবর্তী মার্কিন নির্বাচনের সাথে সাথেই উবে যাবে?
কুগেলম্যান: আপনার প্রথম প্রশ্ন, ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে। একেবারেই ঠিক। আমি খুব বেশি বাড়িয়ে বলছি না বা এটি কোনো অভাবনীয় তথ্যও নয় যে, এই যুদ্ধ বাংলাদেশে মোটেও জনপ্রিয় নয় এবং বেশিরভাগ মানুষই এর নিন্দা করবে।
এটি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আনে। তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে আমি বলবো বাংলাদেশের মানুষের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মনোভাব মোটামুটি ইতিবাচক। খুব বেশি না হলেও ইতিবাচক।
কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি কীভাবে এই যুদ্ধ অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলছে। যেমন, জ্বালানি, নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে জিসিসি দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। এছাড়া জ্বালানি সংকটের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশে সরাসরি না হলেও প্রভাব ফেলেছে।
তবে আমার ভয় হলো যদি এই যুদ্ধ চলতে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার বর্তমান নীতি বজায় রাখে, তবে বাংলাদেশের জনমত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। আর এটিই আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন অর্থাৎ আস্থার সংকটে প্রভাব ফেলতে পারে। আমি মনে করি প্রশাসনকে এটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে।
আমি নিশ্চিত নই তারা তা করবে কিনা, তবে তাদের করা উচিত।
এখানেই (সার্জিও) গোরের মতো কেউ খুব সহায়ক হতে পারেন। আরেকজন ব্যক্তির কথা আমরা বলিনি, বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন। তিনি সেই বিরল রাষ্ট্রদূতদের একজন যিনি যে দেশে কাজ করতে যাচ্ছেন সে দেশ সম্পর্কে আগে থেকেই খুব ভালো করে জানেন। তিনি এর আগেও সেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সিনেট কনফার্মেশন হিয়ারিং-এ দেখা গেছে তিনি বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক খুব ভালো বোঝেন। তিনি কেবল কূটনীতি নয়, বরং জনসম্পৃক্ততার প্রতিও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই আমি মনে করি আস্থার এই ফাটল বা গ্যাপ সামলাতে তিনি খুব সহায়ক হবেন।
এখন ট্রাম্প-পরবর্তী নতুন প্রশাসন আসতে প্রায় তিন বছর বাকি। এটি দীর্ঘ সময়। তাই ভবিষ্যতের চেয়ে বর্তমানের ওপর আমাদের ফোকাস করা দরকার। এবং সত্যিই ইরানের এই যুদ্ধ, জনমত এবং সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য সমস্যাজনক হতে পারে। কারণ এটি তারেক রহমানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যিনি এমনিতেই অর্থনীতি এবং আরও অনেক কিছু নিয়ে উচ্চ প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন, আর এখন তাকে এই আকস্মিক জ্বালানি সংকটও সামলাতে হচ্ছে।
সাহাব: আমি মনে করি এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যে নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ব্যক্তি। ট্রাম্প যে চিঠিটি ইস্যু করেছিলেন তা ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশ-ওয়াশিংটন সম্পর্ক অনেকটা অ্যাম্বাসেডর ক্রিস্টেনসেনের হাতে থাকবে। তাই প্রত্যাশা অনেক বেশি এবং তিনি একজন কাজের মানুষ।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সেই আশাই করি। এই চমৎকার আলোচনার জন্য এবং আপনার শেষ মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
ঢাকার অগ্রাধিকার, ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার নাও হতে পারে: মাইকেল কুগেলম্যান
মাইকেল কুগেলম্যান দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখালিখি করেন। তিনি আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো। একইসঙ্গে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফ’-এর লেখক। আলাপের পডকাস্টে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক সাহাব এনাম খানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন মাইকেল কুগেলম্যান। আলোচনার ঈষৎ সম্পাদিত অংশ প্রকাশিত হলো।
সাহাব এনাম খান: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমুখী। এখানে শুধু রাজনীতি নয়, বরং অর্থনীতি, সমাজ, মনস্তত্ত্ব, রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব, সবখানেই যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি খুবই স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো— যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে কী চায়? আর আমরা তাদের কী দিতে পারি?
মাইকেল কুগেলম্যান: আমরা যদি ফিরে তাকাই, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন আবার ক্ষমতায় এলেন, তখন এটি ভাবার অনেক কারণ ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণও ছিল। একটি হলো বাইডেন প্রশাসনের শেষ মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কে বড় পরিবর্তন এসেছিল। বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব হয়েছিল, এবং তারপর কিছু বড় পরিবর্তন আসে, যার কারণে বাইডেন প্রশাসনের বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হয়েছে। এবং তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলাদেশের সংস্কার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় কারিগরি সহায়তা দিতে জোর দেয়া।
কিন্তু সত্যি বলতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ধরনের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামান না। তাই একটা সংশয় ছিল, যেভাবে বাইডেনের শেষ মাসগুলোতে সম্পর্কটি বদলেছে, হয়তো ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে সম্পর্কের অবনতি হবে। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকার পরও দেখা যাচ্ছে সম্পর্ক বেশ ভালো অবস্থানে আছে। এটি হয়তো সেরকম গভীর সম্পর্ক নয় যা যুক্তরাষ্ট্রের তার শীর্ষ কৌশলগত অংশীদারদের সাথে থাকে, তবে তা ভালো অবস্থানেই আছে। উচ্চপর্যায়ের এঙ্গেজমেন্ট হয়েছে একাধিকবার। সামরিক মহড়া হয়েছে এবং সম্পর্কে কোনো বড় সংকট নেই।
আমি নিজসহ অনেকেই সন্দেহ করেছিলাম যে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর হয়তো সম্পর্কে কোনো বড় পর্যায়ের পরিবর্তন আসবে। তবে সৌভাগ্যবশত সেদিকে যায়নি, আমরা যারা বাংলাদেশকে সমর্থন করি এবং যারা বাংলাদেশের বন্ধু এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি উষ্ণ ও সফল সম্পর্ক সমর্থন করি, তাদের জন্য এটি স্বস্তির।
এখন যদি আপনার প্রশ্নে আসি, যুক্তরাষ্ট্র কী চায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা কী? আপনি জানেন, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বকে দেখে বাণিজ্য ও লেনদেনের লেন্স দিয়ে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাবা হয় এই দেশগুলো কী দিতে পারবে যেটা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ, বিশেষ করে অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল হবে। এই দিক থেকে, পরিষ্কারভাবেই বর্তমান প্রশাসনের প্রত্যাশা হলো, বাংলাদেশের নতুন সরকার আমেরিকার পণ্য বেশি করে কিনতে চাইবে।
সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে একটি চুক্তি আছে যা অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিনগুলোতে সই হয়েছে। আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র এতে খুশি হয়েছে। তবে অবশ্যই আমার মনে হয়, এই প্রশাসন থেকে এমন প্রত্যাশা আসতে থাকবে যে বাংলাদেশের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, যুক্তরাষ্ট্রের থেকে পণ্য ক্রয় করার ক্ষেত্রে।
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে কাঠামো, তাতে খুব বড় আকারে আমদানি বাড়ানো একটু কঠিন। আমরা জানি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানির একটি বড় ক্রেতা। তবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য কিনতে গেলে, এটার বাস্তবায়ন করাটা একটু মুশকিল। তবে ভালো ব্যাপার হলো, ভালো সম্পর্ক আছে এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তি আছে। আমার মনে হয় এর মাধ্যমেই ‘টোন’ টা ঠিক হয়ে গেছে।
এই সরকারের প্রতি দ্বিতীয় প্রত্যাশা থাকবে, ভূ-রাজনৈতিক, আর সেটি অবশ্যই চীন ইস্যু। ওয়াশিংটনের বর্তমান প্রশাসন চীনকে নিয়ে কী করতে চায় তা নিয়ে সবসময়ই কিছু প্রশ্ন ছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রথাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন। তিনি প্রথম মেয়াদে উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে দেখা করেছেন। তিনি ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশংসা করেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট শি’কে নিয়ে অনেক ইতিবাচক কথা বলেছেন।
অনেকের ধারণা ছিল ট্রাম্প বেইজিংয়ের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় আসতে পারেন যাতে প্রতিযোগিতা কিছুটা কমে। আর এর একটি কারণ হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানেন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব কতটা। তিনি চান না যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু করুক যার কারণে চীন মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত হানতে পারে। তাই বর্তমান প্রশাসন চেষ্টা করেছে চীনের সাথে উত্তেজনা কমানোর, যা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্য ভালো হতো। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন আগের মতো চীনের সাথে কঠোর প্রতিযোগিতার নীতিতেই অটল থাকবে। তাই তারা চাইবে নতুন সরকার যেন চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অংশীদার ও সাহায্যের উৎস বহুমুখী করে। এটা বলা সহজ হলেও করা কঠিন।
তবে আবারও, যেহেতু সম্পর্ক এখন ভালো, আমি এখানেই থামবো। আমি মনে করি না যে ওয়াশিংটন ঢাকাকে এমন কোনো চাপ দেবে যা তাদের অস্বস্তিতে ফেলে।
সাহাব: এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই উন্নয়নের ত্রিমুখী সংকট দেখা দেয়। একদিকে আপনি ওয়াশিংটনকে খুশি রাখতে পারছেন না, আবার অন্যদিকে চীনের পুঁজির প্রবাহ সচল রাখা বা অভ্যন্তরীণ নীতির স্বাধীনতা রক্ষা করা— এই তিনটিই বিএনপি সরকারের জন্য খুব জরুরি। ওয়াশিংটন যে প্রত্যাশা করছে, তা পূরণ করার ক্ষমতা ঢাকার কি আছে ?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। অর্থাৎ বর্তমান সরকার কীভাবে কাজ করবে তা ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে। ওয়াশিংটন কি বিষয়টাকে এভাবেই দেখে?
কুগেলম্যান: খুব ভালো প্রশ্ন। নির্বাচনে গণভোটের বিশাল ব্যবধান ইঙ্গিত করে যে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা গণতান্ত্রিক সংস্কারগুলো চালিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণের জোরালো ম্যান্ডেট আছে। তবে আমি মনে করি যে ট্রাম্প প্রশাসনের সংস্কার নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই।
হ্যাঁ, বাংলাদেশের নির্বাচনের পর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া শোনা গেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট পল কাপুর নিজেই নির্বাচনের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তাই আমার মনে হয় নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশাসন সন্তুষ্ট ছিল। তবে ফল না, প্রক্রিয়া। শান্তিপূর্ণ ছিল, বিশ্বাসযোগ্য ছিল, ইত্যাদি।
তবে আমি শুরুতে যেমনটা বলেছি, ট্রাম্প প্রশাসন মূল্যবোধ-ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী নয়।
আমরা জো বাইডেনের আমলে একটি “মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি” নিয়ে অনেক আলোচনা শুনেছি। কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছিলেন যে আগের প্রশাসন বাংলাদেশকে তাদের এই মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছিল। এই নীতির মধ্যে ছিল—সীমিতভাবে হলেও—গণতন্ত্র, অধিকার এবং পররাষ্ট্রনীতিতে সেগুলোর প্রচার।
এই ধরনের বিষয়গুলো আসলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারে ছিল না—সম্ভবত বিল ক্লিনটন প্রশাসন, এমনকি তারও আগে জিমি কার্টার প্রশাসনের সময়ের পর থেকে। তাই এটি কিছুটা ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল। অধিকাংশ মার্কিন প্রশাসন সাধারণত মূল্যবোধের পরিবর্তে স্বার্থভিত্তিক নীতি অনুসরণ করেছে।
প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে নতুন সরকার জনমতের ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করবে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে। কিন্তু এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন সরাসরি জড়াতে চাইবে না। তারা হয়তো এতে সন্তুষ্ট থাকবে, কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সক্রিয় অবস্থান নেবে না।
আমি মনে করি না তারা প্রযুক্তিগত সহায়তা, দিকনির্দেশনা বা পরামর্শ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। এবং এটি আসলে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি বড় উদ্বেগের সঙ্গে জড়িত। যদি আপনি ভাবেন এই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারগুলো কী হবে, তাহলে দেখবেন—সেগুলোর অনেকগুলোই এমন বিষয়, যেগুলো সত্যি বলতে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে।
এর একটি হলো সংস্কার প্রক্রিয়া। আরেকটি হলো মানবিক সহায়তা। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও কথা বলা যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ও বিশ্বব্যাপী অনেক বিদেশি সহায়তা বন্ধ বা স্থগিত করলেও সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের সহায়তা বাদ রেখেছে— এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একইভাবে আঞ্চলিক সংযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা—এসব বিষয়ও ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকারে নাও থাকতে পারে।
তাই আমার মনে হয় দুই পক্ষকেই প্রত্যাশাগুলো ম্যানেজ করতে হবে। ঢাকার অগ্রাধিকার ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার নাও হতে পারে—আমি সরাসরি বলছি।
সাহাব: গত কয়েক দিনে ঢাকায় একটি বড় আলোচনার বিষয়—সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান ইস্যু। একে আমি সরাসরি একটি কূটনৈতিক জরুরি পরিস্থিতি বলবো। আপনি বলেছিলেন যে ওয়াশিংটন একইসঙ্গে বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশকে দেখে। সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান সেই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিরোধ তৈরি করছে। এই নতুন সরকার, যারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সদিচ্ছা নিয়ে সম্পর্ক গড়তে চায়, তারা কীভাবে এসব সমস্যার মোকাবিলা করবে, যাতে সম্পর্ক বৈরী মনে না হয়?
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, বিষয়টি হলো, যে দেশই হোক না কেন, ওয়াশিংটনের যত কাছেরই হোক, ট্রাম্প প্রশাসনের অপ্রত্যাশিত নীতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্তও সেই ধরনেরই একটি পদক্ষেপ। এটা বাংলাদেশকে মেনে নিতে হবে।
আমার জানা মতে, এটি কেবল দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়। এটি একটি বৃহত্তর নীতির অংশ যা এই প্রশাসন অনুসরণ করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের বাইরেও অনেক অর্থনীতির তদন্ত হবে, আমেরিকার কিছু কাছের মিত্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশই অন্তর্ভুক্ত।
তাই আমি বুঝতে পারি, ঢাকার কাছে এটি কিছুটা বৈরী মনে হলেও এটা ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর নীতির অংশ। যার উদ্দেশ্য মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা এমন সব নীতি থেকে যা যুক্তরাষ্ট্রের চোখে বৈষম্যমূলক কিংবা সমস্যাজনক। আর আমার আগের কথা অনুযায়ী, সম্পর্ক এখন ভালো জায়গায় আছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে, পারস্পরিক শুল্ক কমেছে, এবং নির্বাচনের আগে একটি বাণিজ্য চুক্তিও হয়েছে।
তাহলে এই যে পরিস্থিতিতে, আমি জানি না, এটাকে ‘গতি’ বলা ঠিক হবে কিনা। তবে ইতিবাচক কিছু অগ্রগতি আছে। এই নতুন সিদ্ধান্ত থেকে যে কোনো উত্তেজনা তৈরি হলেও দুই রাজধানীর জন্য তা সামাল দেওয়া সহজ করবে।
তবে আবারও বুঝতে হবে, এটা বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে নেওয়া কোনো পদক্ষেপ নয়। এক ডজনেরও বেশি দেশকে ঘিরে করা হচ্ছে। যার মধ্যে এমন দেশও আছে, যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি গভীর।
সাহাব: আমি একমত, বাণিজ্য চুক্তির ধারাবাহিকতা নিজেই বৃহত্তর সদিচ্ছার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে, বাংলাদেশের কূটনীতিকদের ওয়াশিংটনের ইউএসটিআর অফিসে গিয়ে ঠিক কী ভুল হয়েছে এবং কীভাবে তা ঠিক করা যায়। সেটি স্পষ্টভাবে জানতে হবে। সেই ক্ষেত্রে কীভাবে সম্পর্ক সামলাতে বা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে?
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, একদম ঠিক। আমার মনে হয়, ডনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি দেখেছে।
এবং আপনি জানেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসন প্রথমটির তুলনায় বেশ ভিন্ন। এটি অনেক ইস্যুতে, বিশেষ করে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যদিও প্রথম মেয়াদেও বাণিজ্য নিয়ে কঠোর নীতি ছিল, এবার তা আরও জোরালো।
উদাহরণ হিসেবে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে, সেখানে গত কয়েক মাসে 'আস্থার ঘাটতি' নিয়ে বারবার আলোচনা শুনতে পাওয়া গেছে। দিল্লিতে থাকার সময়েও আমি এই কথাটাই সবচেয়ে বেশি শুনেছি, যদিও সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে।
তবে আবার বলছি, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি নিয়ে আমি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারি না। তবে আমার ধারণা, এটি ততটা নয়, যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল। এর একটি কারণ হলো, সম্পর্ক এখনো বেশ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এবং উচ্চপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথমবারের মতো এশিয়ার জন্য একজন মার্কিন বিশেষ দূত নিয়োগ করা হয়েছে সের্জিও গোর। তিনি ভারতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দিল্লিতে অবস্থান করবেন। তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা, ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ। হোয়াইট হাউস ও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
হ্যাঁ, তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। এ বিষয়টি বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে খুব ইতিবাচক নাও মনে হতে পারে। তবে তিনি খুব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকার অবস্থানে আছেন এবং নিয়মিত বাংলাদেশ সফরও করতে পারেন।
আমরা দেখেছি, তিনি এই ধরনের বার্তার মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন। তাই তিনি সেই মানুষদের মধ্যে একজন হতে পারেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য আস্থার ঘাটতি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারেন। কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
তিনি বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের আরও অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন। তবে আমার মনে হয়, সামনে এই বিষয়টি খেয়াল রাখা দরকার। গোরকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, তা দেখার জন্য এটি আসলে একটি বড় সংকেত, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় আস্থার যে ঘাটতি আছে, তা দূর করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে তিনি কেমন ভূমিকা রাখেন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
অবশ্য এর অন্য একটি দিকও আছে। আমরা জানি, গোর একটি বিশেষ বিষয়ে বাংলাদেশিদের ওপর বেশ চাপ দিচ্ছেন; আর তা হলো বোয়িং-এর সাথে একটি চুক্তি করা, যার মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা বা যুদ্ধাস্ত্রের মতো বিষয় থাকতে পারে। ঢাকায় এই বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কতটুকু কাজে দেবে, তা আমি নিশ্চিত নই। সুতরাং, এখানে একটা লেনদেন বা ব্যবসার দিকও আছে। তবে আমি মনে করি, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ‘গোর ফ্যাক্টর’ অবশ্যই দেখার মতো বিষয় হবে।
সাহাব: আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘ইন্ডিয়া ভ্যারিয়েবল’। আমি কেন একে ভ্যারিয়েবল বলছি? কারণ এটি বাংলাদেশের সাথে সবক্ষেত্রেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। মানে একভাবে বলতে গেলে বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার সম্পর্ক নিয়ে দিল্লির একটা ইস্যু আছে। অবশ্যই দিল্লি এই সম্পর্ক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে করে। ইসলামাবাদের ক্ষেত্রে তো অবশ্যই। এরপর অবশ্যই, ইরান সংকটের পর মোদি সরকার এবং ট্রাম্প সরকারের সম্পর্কের মধ্যে নতুন ধরনের গতিশীলতা আসবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির অধীনে এই সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখছেন, এটি কি আসলেই একটি নতুন সূচনা? নাকি কাগজে-কলমে যতটা ভালো দেখাচ্ছে বাস্তবে ততটা না?
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, ভারত ফ্যাক্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি সংক্ষেপে বলতে পারি কীভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলে। নয়াদিল্লি কয়েক মাস ধরেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে তারা বাংলাদেশে নির্বাচন পরবর্তী সরকারের সাথে কাজ করতে চাইছে।
প্রকৃতপক্ষে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে নয়াদিল্লি আসলেই ঢাকার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চাচ্ছে। মানে, বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস খুব একটা ভালো নয়। আপনি কি মনে করেন যে, বিএনপির বিজয়কে ভারত তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলনামূলকভাবে কম খারাপ ফলাফল হিসেবে দেখেছে?
তারা অবশ্যই চায়নি যে পরবর্তী সরকারের নেতৃত্বে জামায়াত থাকুক। দিল্লির এমন চাওয়ার কারণ আমরা জানি। তাই আমি মনে করি তারা সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত। কিন্তু আমার মতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আসতে পারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।
আমি বলবো, তারেক রহমান ভারতের ব্যাপারে তার প্রকাশ্য বার্তায় খুব সতর্ক ছিলেন। তিনি এমনটা বলেননি যে সম্পর্ক মেরামতের ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই, তবে তিনি খুব সাবধান ছিলেন। তিনি বলেছেন যে এটি একটি সমমর্যাদার সম্পর্ক হতে হবে, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ আগে থাকবে। এগুলো সবই ঠিক আছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে একটি ‘কৌশলগত অপরিহার্যতা’ ঠিক করতে হবে।
আসলে এটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে পুনরায় ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। ঘরোয়া রাজনীতির সঙ্গে এই সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে, কারণ বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ভারত-বিরোধী মনোভাব রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াত এবং এনসিপি এখন বিরোধী দলে আসায়, আমি মনে করি ভারতের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপিকে এখন আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তাই এটি সেখানে একটি বড় ফ্যাক্টর হবে।
এছাড়া শেখ হাসিনা ফ্যাক্টরটিও রয়েছে। হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধে ভারত সাড়া দেবে না। তারা সেটা করবে না। আমরা তা জানি। আমি মনে করি, বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি কাঁটা হয়ে থাকবে। তবে অবশ্যই ছোটখাটো বিষয় দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক, এই জাতীয় বিষয় দিয়ে শুরু করে সামনে এগোনো যায়।
এখন বাংলাদেশের অনেকের মধ্যে এমন ভয় ছিল যে ট্রাম্প প্রশাসন মূলত বাংলাদেশের বিষয়ে ভারতের অবস্থানকেই মেনে নেবে। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে যাদের সন্দেহ আছে, তাদের জন্য এটি সমস্যার হতে পারতো। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম বছরে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় আমরা তেমন কিছু দেখিনি। এবং বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভিন্ন নীতি ছিল। তবে আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একটি বিষয়ে একমত, আর তা হলো, তারা চায় বাংলাদেশ চীনের সাথে ব্যবসা কমিয়ে দিক, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয়ই চীনের সাথে প্রচুর ব্যবসা করে। আর এই তো সেদিন ভারত চীনের নতুন বিনিয়োগের ওপর কড়াকড়ি শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
যাইহোক, এখানে সবসময় কিছু দ্বিমুখী নীতি কাজ করবেই, তবে এটিও একটি ফ্যাক্টর। মূল কথা হলো, ভারতের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত প্রশাসনের (অন্তর্বর্তী সরকার) সময় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে যে গতিশীলতা দেখা গেছে, সেটিও লক্ষ্য করার মতো বিষয়। মানে, বিএনপি সরকার যদি ভারতের সাথে উত্তেজনা কমানোর জন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তারা চাপের মুখে পড়বে।
তবে আমার মনে হয়, তখন তাদের সম্ভবত বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের যে গতি আমরা দেখেছি তা কিছুটা কমিয়ে আনতে হতে পারে।
এ বিষয়ে আমি শেষ যে পয়েন্টটি বলবো তা হলো, বাংলাদেশের এই সরকারের কাছে এমন কিছু করার সুযোগ আছে যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কোনো সরকার সম্ভবত করতে পারেনি। আর তা হলো পাকিস্তান, ভারত, চীন এবং সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান শক্তি এবং আঞ্চলিক পক্ষগুলোর মধ্যে একটি প্রকৃত ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে ছিল। শেখ হাসিনা সরকার অবশ্যই ভারতের দিকে ঝুঁকে ছিল। আমি মনে করি তারেক রহমানের কাছে একটি সত্যিকারের জোট নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে দেখা যাক এটি কীভাবে কাজ করে।
সাহাব: শুধু ভৌগলিক কারণেই ভারতের সাথে সম্পর্ক করা ছাড়া বাংলাদেশের বিকল্প নেই। অবশ্যই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের অগ্রগতি ছিল বিস্ময়কর। এখন ওয়াশিংটনের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী হিসাব বা মধ্য এশিয়া অথবা ভারতের হিসেবে, ঢাকা-ইসলামাবাদের এমন সম্পর্ক ভিন্ন ধরনের পর্যালোচনার জন্ম দেয়। যখন বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রসঙ্গ আসে। বাংলাদেশ-পাকিস্তান স্বাভাবিক সম্পর্ককে ওয়াশিংটন কতটা সহজভাবে গ্রহণ করবে? অথবা ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক নিয়ে কি ওয়াশিংটন প্রশ্ন তোলা শুরু করবে?
কুগেলম্যান: পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বেশ আশ্চর্যজনক পরিবর্তন এসেছে। আমরা দেখেছি ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ভালো করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রশাসনের অন্যান্যরা পাকিস্তানের প্রশংসা করেছেন। তারা খনিজ সম্পদ, ক্রিপ্টো এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায়।
সুতরাং, বাইডেন প্রশাসনের তুলনায় এমনকি প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের তুলনায়ও ওয়াশিংটনের পাকিস্তান নীতিতে একটি অদ্ভুত এবং আকস্মিক পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে আমি মনে করি না যে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের মধ্যে এখনও তেমন বড় কোনো কিছু ঘটেছে যা ওয়াশিংটনের নজরে পড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা আমরা আগেই বলেছি। এবং দুই দেশে একে অপরকে সহযোগিতার কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, মূলত জনপর্যায়ে। এটি প্রতীকী ছিল, কিন্তু ১৯৭১ সালের পর প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের কোনো পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে এসেছে। তবে দিনশেষে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে মৌলিক পর্যায়ে তেমন কিছু ঘটছে না।
আমি জানি যে ভারত থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে বেশ কিছু ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেখান থেকে তেমন কোনো সারগর্ভ বিষয় বেরিয়ে আসতে আমি দেখিনি। যদিও আমি মনে করি দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ইস্যুতে কিছু যোগাযোগ হয়েছে। তাই আমার মনে হয় এই প্রশাসন আপাতত বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের এই উন্নতির দিকে খুব একটা মনোযোগী নয়। যদি এ সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বাংলাদেশ-পাকিস্তান মিলে চীনের সাথে সম্পর্ক ভালো করার জন্য সমন্বয় করছে, শুধু তখনই এটা ওয়াশিংটনের নজরে আসবে।
আপনার মনে আছে হয়তো, কয়েক মাস আগে চীনের একটি আঞ্চলিক সম্মেলনে এই তিন দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছিল, কিন্তু তা থেকে বিশেষ কিছু হয়নি। এছাড়া, যদি আমরা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বা অস্ত্র চুক্তির ইঙ্গিত পাই, তবে তা ওয়াশিংটনের নজর কাড়বে। কিন্তু আমি সেটা দেখছি না, বিশেষ করে, আমি মনে করি বিএনপি সরকার ভারতের সাথে উত্তেজনা কমাতে যা যা করা দরকার তা করতে চাইবে এবং তাতে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক কিছুটা সীমিত করার প্রয়োজন হতে পারে।
মূল কথা হলো, ওয়াশিংটন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের এই বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছে তা নিয়ে চিন্তা করা অনেকটা ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার’ মতো হবে, কারণ মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের রেইডারে আসার মতো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কিছু এখনও ঘটেনি।
সাহাব: আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশের চরমপন্থা ও উগ্রবাদের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি আছে? এটাই কি সেই ‘রেড লাইন’ যা নিয়ে ঢাকায় কেউ মুখ ফুটে কথা বলতে চায় না?
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, এটি একটি ভালো পয়েন্ট। আমরা জানি কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ একটি কঠিন সময় পার করেছিল। যখন তারা চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের উত্থানের মুখোমুখি হয়েছিল।
আমি মনে করি শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যে পরিবর্তনগুলো এসেছিল তা কট্টরপন্থী ইসলামি শক্তিগুলোকে জন্য জায়গা করে দিয়েছে। তবে একই সাথে আমি এও মনে করি অনেক পর্যবেক্ষক, বিশেষ করে ভারতের অনেকেই একে বাড়িয়ে বলছেন।
তা সত্ত্বেও আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা কিছু উদ্বেগজনক ইঙ্গিত দেখেছি। গত এক বছরে বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে টিটিপি বা পাকিস্তানি তালেবানের সাথে সংযুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এটি এমন একটি গোষ্ঠী যারা এর আগে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের বাইরে কাউকে নিয়োগ দিয়েছে বলে আমার জানা নেই। তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ। এবং যদি সেই অভিযোগগুলো সত্যি হয়, তবে তা অনেক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
তবে আমার মনে হয় না এটি খুব বেশি চিন্তার কোনো কারণ। আর রাজনৈতিক ইসলামপন্থী, যেমন, জামায়াত ও তাদের সমমনা, হেফাজত-ই-ইসলামি, যারা রাজনৈতিক নয় বরং সামাজিক অভিনেতা হিসেবে প্রভাবশালী। এদের এবং জঙ্গিদের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। এই দুটি গোষ্ঠীকে গুলিয়ে ফেলার একটি প্রবণতা আছে, যা বিভ্রান্তিকর এবং এমনকি বিপজ্জনকও হতে পারে। কারণ তখন নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে অতিরঞ্জিত আলোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি, তবে আমি মনে করি বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলাসহ আরও অনেক গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের ইস্যুটিকে সেই একই পর্যায়ের হুমকি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সাহাব: শেষ দুটি বিষয়। প্রথমটি হলো, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি খরচ এমনভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে যেখানে সরকারের কোনো হাত নেই। পশ্চিম এশিয়ার প্রতি এ দেশের মানুষের আবেগ জড়িত থাকায়, এমন একটি মুসলিম প্রধান দেশে এমন এক জনমত গড়ে উঠছে যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করছে। যা নতুন সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না।
দ্বিতীয়টি হলো, আস্থার ফ্যাক্টর। ওয়াশিংটনের সবচেয়ে কাছের ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদারও যেখানে কৌশলগত সন্দেহ প্রকাশ করছে, সেখানে আমরা আজ যা কিছু আলোচনা করেছি তার পেছনের আসল উত্তরটি কী? মানে, ওয়াশিংটন ও ঢাকার মধ্যে কি কোনো টেকসই কাঠামো তৈরি হচ্ছে, নাকি এই উষ্ণতা পরবর্তী মার্কিন নির্বাচনের সাথে সাথেই উবে যাবে?
কুগেলম্যান: আপনার প্রথম প্রশ্ন, ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে। একেবারেই ঠিক। আমি খুব বেশি বাড়িয়ে বলছি না বা এটি কোনো অভাবনীয় তথ্যও নয় যে, এই যুদ্ধ বাংলাদেশে মোটেও জনপ্রিয় নয় এবং বেশিরভাগ মানুষই এর নিন্দা করবে।
এটি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আনে। তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে আমি বলবো বাংলাদেশের মানুষের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মনোভাব মোটামুটি ইতিবাচক। খুব বেশি না হলেও ইতিবাচক।
কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি কীভাবে এই যুদ্ধ অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলছে। যেমন, জ্বালানি, নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে জিসিসি দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। এছাড়া জ্বালানি সংকটের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশে সরাসরি না হলেও প্রভাব ফেলেছে।
তবে আমার ভয় হলো যদি এই যুদ্ধ চলতে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার বর্তমান নীতি বজায় রাখে, তবে বাংলাদেশের জনমত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। আর এটিই আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন অর্থাৎ আস্থার সংকটে প্রভাব ফেলতে পারে। আমি মনে করি প্রশাসনকে এটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে।
আমি নিশ্চিত নই তারা তা করবে কিনা, তবে তাদের করা উচিত।
এখানেই (সার্জিও) গোরের মতো কেউ খুব সহায়ক হতে পারেন। আরেকজন ব্যক্তির কথা আমরা বলিনি, বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন। তিনি সেই বিরল রাষ্ট্রদূতদের একজন যিনি যে দেশে কাজ করতে যাচ্ছেন সে দেশ সম্পর্কে আগে থেকেই খুব ভালো করে জানেন। তিনি এর আগেও সেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সিনেট কনফার্মেশন হিয়ারিং-এ দেখা গেছে তিনি বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক খুব ভালো বোঝেন। তিনি কেবল কূটনীতি নয়, বরং জনসম্পৃক্ততার প্রতিও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই আমি মনে করি আস্থার এই ফাটল বা গ্যাপ সামলাতে তিনি খুব সহায়ক হবেন।
এখন ট্রাম্প-পরবর্তী নতুন প্রশাসন আসতে প্রায় তিন বছর বাকি। এটি দীর্ঘ সময়। তাই ভবিষ্যতের চেয়ে বর্তমানের ওপর আমাদের ফোকাস করা দরকার। এবং সত্যিই ইরানের এই যুদ্ধ, জনমত এবং সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য সমস্যাজনক হতে পারে। কারণ এটি তারেক রহমানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যিনি এমনিতেই অর্থনীতি এবং আরও অনেক কিছু নিয়ে উচ্চ প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন, আর এখন তাকে এই আকস্মিক জ্বালানি সংকটও সামলাতে হচ্ছে।
সাহাব: আমি মনে করি এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যে নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ব্যক্তি। ট্রাম্প যে চিঠিটি ইস্যু করেছিলেন তা ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশ-ওয়াশিংটন সম্পর্ক অনেকটা অ্যাম্বাসেডর ক্রিস্টেনসেনের হাতে থাকবে। তাই প্রত্যাশা অনেক বেশি এবং তিনি একজন কাজের মানুষ।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
কুগেলম্যান: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সেই আশাই করি। এই চমৎকার আলোচনার জন্য এবং আপনার শেষ মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।