রুশ আগ্রাসনে বিপন্ন উক্রেইনের সংস্কৃতি, বিচারের পথ কতটা কঠিন?

রুশ আগ্রাসনে উক্রেইনের মানুষ ও স্থাপনার পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে দেশটির বই, জাদুঘর, গির্জা, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এসব ধ্বংসযজ্ঞকে অনেকেই একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তবে আন্তর্জাতিক আইনে ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ নামে আলাদা কোনো অপরাধ না থাকায় এসব কর্মকাণ্ডের বিচার ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন।

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ এএম

চেরি গাছের নিচে মাটি খুঁড়ছিলেন ভিক্টোরিয়া আমেলিনা। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর, উত্তর-পূর্ব উক্রেইনের একটি গ্রাম, শিশু সাহিত্যিক ভালোদিমির ভাকুলেঙ্কোর বাড়ির পেছনের উঠান। ভিক্টোরিয়ার হাতে কোদাল, মনে তখন অস্থিরতা। একটা ডায়েরি খুঁজছিলেন তিনি। ভাকুলেঙ্কোর লেখা সেই ডায়েরি রুশ আগ্রাসনের প্রথম দিনগুলোর সাক্ষী।

ভাকুলেঙ্কো নিজেই তা মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, একদিন রুশ বাহিনী তার দরজায় কড়া নাড়বে। শিশু সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি, ছিলেন উক্রেইনের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একজন বাহক। আর তাই নিশ্চিত ছিলেন শুধু তাকে না, তার লেখাও ধ্বংস করে দেবে হানাদাররা। বাবাকে বলে রেখেছিলেন, তাদের গ্রাম মুক্ত হলে যেন ডায়েরিটার কথা পৃথিবীর মানুষ জানতে পারে।

২০২২ সালের ২২এ মার্চ ভাকুলেঙ্কো এবং তার ছেলেকে আটক করে রুশ বাহিনী, সেদিনই অবশ্য ছাড়া পান তারা। কিন্তু, দুই দিন পর আবার ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ভাকুলেঙ্কোকে। এরপর আর ফেরেননি তিনি। 

সেই বছরের শেষের দিকে একটি গণকবরে মেলে অসংখ্য মৃতদেহ, তার একটিতে ছিলো ট্যাটু। ডিএনএ টেস্টে জানা যায় সেটিই ভাকুলেঙ্কো।

শিশু সাহিত্যিক ভালোদিমির ভাকুলেঙ্কো

আমেলিনা মাটি খুঁড়ে ডায়েরিটা পেয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। ২০২৩ সালে সেটি বই হয়ে বের হয়, যার ভূমিকা লিখেছিলেন আমেলিনা। তিনি নিজেও সাহিত্যিক ছিলেন, সেই সঙ্গে  ‘লুকিং অ্যাট উইম্যান, লুকিং অ্যাট ওয়ার’ নামে একটি প্রকল্পের জন্য যুদ্ধাপরাধের তথ্য ও প্রমাণ নথিবদ্ধ করার কাজ করছিলেন।

ভাকুলেঙ্কোর ডায়েরি নিয়ে বই প্রকাশের ছয় মাসের মাথায় রুশ হামলায় মারা যান আমেলিনাও, তখন তার বয়স মাত্র ৩৭।

ভাকুলেঙ্কো আর আমেলিয়ার গল্প কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পেন ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ২০২২ সালের ২৪এ ফেব্রুয়ারি থেকে রুশ বাহিনীর হাতে অন্তত ১০২ জন লেখক-শিল্পী নিহত হয়েছেন। শুধু মানুষ না, বই-স্থাপনা-ঐতিহ্যও পুড়ছে আর ধ্বংস হয়েছে সমানতালে। 

উক্রেইন প্রাভদার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু এই বছরের জুলাই মাসেই ধ্বংস হয়েছে ১৫ লাখেরও বেশি বই। ছাপাখানা ও প্রকাশনা সংস্থার অফিসও রক্ষা পায়নি।

উক্রেইনের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আলাপ-কে ই-মেইলে জানিয়েছে, এই বছরের জুলাই পর্যন্ত  রুশ হামলায় দেশটির ১,৯৯০টি ঐতিহ্যবাহী জায়গা আর ২,৬২৫টি সাংস্কৃতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

রাশিয়ানদের দখলে থাকা লুহানস্ক, জাপোরিঝঝিয়া, দোনেৎস্ক এবং খেরসনের বিভিন্ন এলাকার পুরো তথ্য এখনও জোগাড় করা যায়নি বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা আশংকা করছেন প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়েও বেশি।   

ইউনেস্কোর যাচাইকৃত হিসাব অবশ্য বলছে, ২৯এ জুলাই পর্যন্ত ৫৪৫টি সাংস্কৃতিক স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে।

দুই হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলেও, এই কথা অনস্বীকার্য যে ধ্বংসের পরিমাণটা বিশাল আর তার শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

উক্রেইনের খারকিভের একটি বই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে ২০২৪ সালের ২৬এ মে মিসাইল হামলা  চালায় রুশ বাহিনী। পুড়ে যাওয়া বইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন প্রকাশক সার্জি পোলিতুচিআই

শুধুমাত্র কি স্থাপনা ধ্বংস?      

উক্রেইনভিত্তিক মার্কিন সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জেরিনা জেবরেস্কির মতে, এই ক্ষয়-ক্ষতিকে শুধুমাত্র ইট-কাঠের হিসাবে দেখলে ভুল করা হবে।

“একটি জাদুঘর, গির্জা, স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংসের অর্থ হলো উক্রেইনের ইতিহাসের একটা অংশ হারিয়ে যাওয়া,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

তিনি অভিযোগ করেন, উক্রেইনের শিশুদের রুশ পাঠ্যবই পড়ানো ও “ক্রেমলিনের বয়ানভিত্তিক শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে” তাদের পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।  

“নিজেদের বয়ানকে চাপিয়ে দিয়ে উক্রেইনকে একটি জাতি হিসেবে মুছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

জেবরেস্কি এসব অপরাধকে সরাসরি ‘গণহত্যা’ বলতে চান। কিন্তু আইনের চোখে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।

ইউনেস্কোর সংজ্ঞায়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্মূল অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির ঐতিহ্যের নিদর্শন কোনো অঞ্চল থেকে সরিয়ে ফেলা শুধুমাত্র যুদ্ধ বা সহিংস সংঘাতের সময় ঘটে না। অনেক সময় কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা আধিপত্যবাদের মাধ্যমেও ঘটতে পারে। 

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান সাম্রাজ্যের আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে ধ্বংসযজ্ঞ অথবা জার্মানিতে নাৎসিদের ইহুদিদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা।

আইনের চোখে গণহত্যা, জাতিগত নির্মূল ও সাংস্কৃতিক নির্মূল আলাদা জিনিস। 

১৯৪৬ সালে আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জাতিসংঘের গণহত্যা সনদ অনুযায়ী, কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য থাকলেও গণহত্যার আওতায় পড়তে পারে। তবে, ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ নামে আলাদা কোনো ফৌজদারি অপরাধ আন্তর্জাতিক আইনে নেই।

রাশিয়ার হামলায় এক হাজার বছর পুরনো কেভ-পেচার্স্ক লাভরা বা ডরমিশন ক্যাথেড্রেলে আগুন লেগে যায়

ইতালির ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউটের রবার্ট শুমান সেন্টারের গবেষক আলিনা সলোভিওভা এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনের রাজনীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উক্রেইনের ইউএসএইডি’র সাবেক মিশন ডিরেক্টর জেমস হোসের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন— “ক্রেমলিন মূলত উক্রেইন জাতির অস্তিত্বের ধারণাটাকেই মুছে ফেলতে চায়।”

সলোভিওভা একসময় উক্রেইনের আইন মন্ত্রণালয়ে সুশাসন বিষয়ক পরামর্শক হিসাবে কাজ করেছেন। তার মতে, রাশিয়া পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে উক্রেইনীয়দের সাংস্কৃতিক পরিচয় নষ্ট করে ফেলছে। 

তবে যুদ্ধ-সংঘাতের সময় শুধুমাত্র আদর্শিক উদ্দেশ্য সংস্কৃতিতে আঘাত হানা হয় না, এর পেছনে থাকে কৌশলগত হিসাবও। 

মানবাধিকার সংগঠন রিজিওনাল সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের এনালিস্ট ইয়ারোস্লাভা সেমেন্তসোভার মতে, সাংস্কৃতিক স্থাপনা যুদ্ধের সময় বিশেষ আইনি সুরক্ষা পেলেও সব ক্ষয়-ক্ষতি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। 

“বিষয়টি নির্ভর করে স্থাপনাটি কী ধরনের, কী কাজে ব্যবহার হচ্ছিল, কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হামলাকারীর উদ্দেশ্য কী ছিলো তার ওপর।” 

তিমবাক্‌তু নজির

সংস্কৃতি ধ্বংসের বিচার নিয়ে সবসময় আলোচনায় আসে যে ঘটনা তা হলো, ‘প্রসিকিউশন বনাম আল মাহদি।’  ২০১২ সালের আফ্রিকার দেশ মালিতে ঐতিহাসিক তিমবাক্‌তু শহরের প্রাচীন মুসলিম নিদর্শন ও উপাসনালয় ধ্বংস করে দেওয়া হয়। আর এর নির্দেশদাতা ছিলেন চরমপন্থি গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান আহমাদ আল ফকি আল মাহদি।

ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত নয়টি প্রাচীন মাজার, ১৫ শতকের ঐতিহাসিক ‘সিদি ইয়াহিয়ো’ মসজিদের দরজা ভেঙে গুঁড়িয়ে দে‌ওয়া হয়েছিলো। 

২০১৫ সালে নাইজার থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানো হয়। 

আইসিসি’র ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধাপরাধী হিসেবে পরের বছর নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চান। প্রথমে নয় বছরের সাজা হলেও পরে তা কমে হয় সাত বছর, সঙ্গে ২৭ লাখ ইউরো জরিমানা। ২০২২ সালে মুক্তি পান আল মাহদি।

তবে আদালত এটিকে ‘গণহত্যা’ অভিহিত না করে, বলেছে “সাংস্কৃতিক সম্পত্তি ধ্বংসের যুদ্ধাপরাধ” যার শাস্তি তুলনামূলকভাবে কম। মামলা হলে উক্রেইনও এই একই বাধার মুখে পড়বে। প্রমাণ থাকলেও ধ্বংসযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে কঠিন।

শুধু ধ্বংস নয়, চুরিও হয়েছে

উক্রেইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনলাইন সংবাদপত্র ডিফেন্স ফোর্সেস অব উক্রেইনের প্রতিবেদন বলছে, রাশিয়া শুধু স্থাপনা ধ্বংসই করেনি, সাংস্কৃতিক সম্পদ সরিয়েও নিচ্ছে।

দখলকৃত ক্রিমিয়ার স্টারি ক্রিমে অবস্থিত মধ্যযুগীয় সলখাত এলাকায় উক্রেইনের কোনো অনুমতি ছাড়াই প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চালায় রুশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা। ১৩-১৪ শতকের এই প্রত্নস্থানের সাংস্কৃতিক স্তরের একটা অংশ চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে এই খননে।   

সেইসময় পাওয়া নিদর্শনের একটা অংশ পরে হস্তান্তর করা হয় রাশিয়ার স্টেট হার্মিটেজ মিউজিয়ামে। পরে রাশিয়া সেগুলো নিজেদের যাদুঘরের সংগ্রহ হিসেবে স্টেট ক্যাটালগে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে। চুরি হওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শন বৈধতা পেয়ে যায়।

দোনেৎস্কর একটি ড্রামা থিয়েটারে হামলা চালায় রাশিয়া

লুট করা আর ধ্বংস করা, দুটোকেই একইভাবে দেখেন গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের আইন পরামর্শক লিদিয়া ভলকোভা।

তার মতে, উক্রেইনের পরিচয় হলো তার গির্জা, জাদুঘর, আর্কাইভ, স্মৃতিস্তম্ভ ও ভাষা, আর এসব সম্পদ ধ্বংস কিংবা লুট, দুটোই আসলে একটা জাতির অস্তিত্বকে মুছে ফেলার চেষ্টার অংশ।

আন্তর্জাতিক আইনে বিচার কতটা সম্ভব

সাধারণ বেসামরিক স্থাপনা কিংবা ঘর-বাড়ির চেয়েও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক স্থাপনা আন্তর্জাতিক আইনে বেশি সুরক্ষা পায়।

গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের পরামর্শক নাইরা আরুতিউনোভা আলাপ-কে বলেন, “কোনো ঐতিহাসিক ভবন সাধারণত সামরিক লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কথা নয়। কেউ জেনে-শুনে সেখানে হামলা করলে সেটি যুদ্ধাপরাধ হিসাবে ধরা যেতে পারে।”

তবে, সেনাবাহিনী কোনো ভবনকে সামরিক কাজে বা অস্ত্র রাখতে ব্যবহার করলে সেই সুরক্ষা আর থাকে না, তখন হামলা বৈধ হতে পারে তার ধরন আর ক্ষয়ক্ষতির ওপর নির্ভর করে, ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশনের ১৯৯৯ সালের দ্বিতীয় প্রটোকলে এই ব্যাখ্যা আছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা অপরাধের সংজ্ঞায়নে। “আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে এ নামে কোনো মামলা নেই, কারণ রোম সংবিধিতে ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ নামে আলাদা কোনো অপরাধের বিধান রাখা হয়নি,” জানান ইয়ারোস্লাভা সেমেন্তসোভা।

সাবেক যুগোস্লাভিয়ার ট্রাইব্যুনালেও এই বিষয়টা এসেছিলো কয়েকবার, কিন্তু তা আলাদা অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয়নি।

আলিনা সলোভিওভা অবশ্য বলছেন, সরাসরি ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ না হলেও প্রমাণগুলো মূল গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তোলা সম্ভব।

১৯৫৪ সালের কনভেনশনের ৪ নাম্বার অনুচ্ছেদ বলছে, যুদ্ধে সাংস্কৃতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো যাবে না, কারণ এই ক্ষতি গোটা মানবজাতির ঐতিহ্যের ক্ষতি। রোম সংবিধির ৮ নাম্বার অনুচ্ছেদেও ইচ্ছাকৃত হামলাকে যুদ্ধাপরাধ বলা হয়েছে। 

তবুও এই লড়াইটা সহজ না। ধ্বংসযজ্ঞ প্রমাণ করা এক কথা কিন্তু সেটাকে নির্দিষ্ট কারও নির্দেশ বা উদ্দেশ্যের সাথে এক করা ভিন্ন ব্যাপার।

লিদিয়া ভলকোভার ভাষ্যে, “শুধু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যই যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট নয়,” ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, অভিযুক্তদের বা সাক্ষী পাওয়াই সবচেয়ে কঠিন, স্যাটেলাইট ছবি বা এনজিও প্রতিবেদন দিয়ে সবসময় দোষীদের চিহ্নিত করা যায় না। 

আরেকটা বড় বাধা ভেরিফিকেশন বা যাচাই। ইয়ারোস্লাভা বলছেন, ছবি-ভিডিওর উৎস-সময়-অবস্থান আলাদা করে যাচাই করতে হয়, ‘প্রপাগান্ডা’ ও ‘রিপিটেড’ ছবি কাজটা আরও কঠিন করে তোলে। এছাড়াও রয়েছে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার হওয়া; অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতে বিচার সম্ভব হলেও সাজা কার্যকর করতে অভিযুক্তকে শেষমেশ হাতে পেতেই হবে। 

এখন পর্যন্ত সংস্কৃতি ধ্বংসের অপরাধে সরাসরি কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি আন্তর্জাতিক আদালতে, জানান ইয়ারোস্লাভা। তবে কাজ চলছে । ২০২০ সালে তার সংস্থা ক্রিমিয়ার সম্পদ লুট নিয়ে তথ্য জমা দিয়েছিল, ২০২৫ সালে ফ্রান্সের একটা সংগঠনও আইসিসিতে তথ্য দেয়।

উক্রেইনের প্রসিকিউটর জেনারেলের কার্যালয়ের বিশেষ ইউনিট এখন পর্যন্ত ১১ জন রুশ সেনা সদস্যকে ৪৩৮ ধারায় সন্দেহের নোটিশ দিয়েছে বলে আলাপ-কে জানায়। 

জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনও সীমিত পরিসরে কাজ করছে, ২০২৪ সালের মার্চে ওডেসার ট্রান্সফিগারেশন ক্যাথেড্রালসহ একাধিক ভবনের ক্ষতি নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কথা বললেও, সংস্কৃতি ধ্বংসকে তারা এখনো জাতীয় পরিচয় মুছে ফেলার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছে না। 

জেরিনা জেবরেস্কির মতে, শুধু আইনি লড়াই যথেষ্ট না, দরকার রুশ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং ধ্বংসের হুমকিতে থাকা সাংস্কৃতিক সম্পদকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখা।

ভাকুলেঙ্কো জানতেন তাই লিখে রেখেছিলেন

আইনি কাঠামোর কারণেই হয়তো এখনই কোনো মামলা ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ হিসাবে মেরিট পাবে না। প্রমাণ জোগাড় করা কঠিন, অভিযুক্তকে হাতে পাওয়া তার চেয়েও কঠিন। কিন্তু ভাকুলেঙ্কো যা জানতেন, অনেকে হয়তো এখনো সেটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি; ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য যতই জোরালো চেষ্টা করা হোক না কেন, একটি কাগজের ডায়েরি মাটির নিচে টিকে থাকতে পারে।

যুদ্ধ একদিন শেষ হবে। ততদিনে হয়তো আইন বদলাবে না, কিন্তু এই মুহূর্তে যেসব নথি, ছবি আর লিখা জমা হচ্ছে, সেগুলোই হয়তো একদিন প্রমাণ করবে কী ঘটেছিল। শুধু উক্রেইনের জন্য না, ইতিহাসের জন্যও।